https://www.prothomalony.com/

12176

opinion

অভিমত

সীমান্তে উত্তেজনা: ভারত-বাংলাদেশসীমান্তের উত্তেজনা উত্তেজনার নতুন পর্বে!

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারী ২০২৫ ১৩:৫৮

সীমান্তের উত্তেজনা পৌঁছে গেছে ঢাকা ও দিল্লিতে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক উত্তেজনা ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। ভারতের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক সীমান্তের কিছু স্থানে অবৈধভাবে প্রাচীর নির্মাণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অবৈধভাবে বেড়া নির্মাণের প্রতিবাদে দুই দেশের সীমান্তের বেশ কিছু পয়েন্টে কয়েকদিন ধরেই চলছে বিজিবি-বিএসএফ উত্তেজনা, যাতে যোগ দিচ্ছে স্থানীয়রাও। 

এরই জেরে ১২ জানুয়ারী রোববার  ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে ডেকে পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর পাল্টা জবাবে, পরের দিন বাংলাদেশের ডেপুটি হাই-কমিশনার নুরুল ইসলামকে তলব করে নয়াদিল্লি। পাল্টাপাল্টি এই তলবের ঘটনায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে দেখা দিয়েছে নতুন উত্তেজনা।  

ভারতের অবৈধ বেড়া নির্মাণকাজে প্রতিবাদ জানাতে দেশটির হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সাথে বৈঠকে সীমান্তে বিএসএফের উস্কানীমূলক কর্মকান্ডের উদ্বেগ জানান পররাষ্ট্র সচিব জসীমউদ্দিন। বারবার অঙ্গীকার দিয়েও ভারত সীমান্তে হত্যা অব্যাহত রাখায় জানানো হয় অসন্তোষ। সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ে এমন কোনো উস্কানি না দিতে পরামর্শ।

আগস্টে আওয়ামী সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়াসহ নানা ইস্যুতে ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়ন শুরু হয়। সংখ্যালঘু ইস্যুসহ দেশটির গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদদের বাংলাদেশ নিয়ে উস্কানিমূলক মন্তব্য দুইদেশের সম্পর্ক তলানিতে নিয়ে আসে। টানাপোড়েন কাটাতে বাংলাদেশে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সফর করলেও সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া নিয়ে আবারো প্রতিবেশি দুই দেশকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তবে কোনোভাবেই ভারতের আগ্রাসী মনোভাব মেনে না নেওয়ার বিপক্ষে কঠোর অবস্থানে রয়েছে ড.ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, ভারতীয় পক্ষ এখন আর কোনো কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করছে না। সীমান্তে এখন স্থিতাবস্থা বিরাজ করছে। আগামী মাসে মহাপরিচালক পর্যায়ে বিজিবি ও বিএসএফ’র বৈঠক রয়েছে। সেখানে বিষয়টি তুলে ধরা হবে। তা ছাড়া সীমান্ত নিয়ে দু’দেশের মধ্যে যে অসম চুক্তিগুলো রয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠিও দেওয়া হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের তিনটি জেলার কয়েকটি সীমান্তে বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড বা বিজিবি ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর কয়েকটি স্থাপনা নির্মাণ কাজ নিয়ে আপত্তি তোলার পর সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চৌকো সীমান্তে সীমান্ত রক্ষীদের সাথে গ্রামবাসীরা জড়ো হওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রতিবেশীদের মধ্যে বিদ্বেষ কারো জন্যই ভালো নয় বলে মন্তব্য করে ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী বলেছেন, ‘বাংলাদেশ হলো আরেকটি দেশ, যাদের সঙ্গে আমাদের সীমান্ত আছে। আমরা প্রতিবেশী, আমাদের একসঙ্গে থাকতে হবে, পরস্পরকে বুঝতে হবে। কোনো ধরনের বিদ্বেষ আমাদের কারো স্বার্থের জন্যই ভালো হবে না।’ ১৩ জানুয়ারী সোমবার ভারতীয় সেনাবাহিনীর বার্ষিক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে নানা ইস্যুতে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই নতুন করে আবার সীমান্ত ইস্যুটি সামনে এলো।

বিশেষ করে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীরা কয়েকটি এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ কাজ শুরুর পর বাংলাদেশের তরফ থেকে তীব্র প্রতিবাদ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অংশে ২২০০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা পড়ে। তবে, এই অংশের ২০ শতাংশ জায়গায় এখনো কোনো প্রাচীর নেই। বিএসএফের দাবি, এই অংশগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য প্রাচীর নির্মাণ অত্যাবশ্যক। কিন্তু বাংলাদেশ এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।

নয়াদিল্লি থেকে জানা গেছে, বিএসএফের কার্যক্রমকে তারা "নিরাপত্তা-সংক্রান্ত পদক্ষেপ" হিসেবে অভিহিত করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, "সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও অবৈধ কার্যকলাপ বন্ধ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আমরা প্রতিবেশী দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান দেখাই।"


সীমান্ত হত্যা, অনুপ্রবেশ, এবং প্রাচীর নির্মাণ ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলছে। যদিও উভয় দেশ বিভিন্ন চুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করেছে, তবুও এ ধরনের ঘটনা সেই প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই উত্তেজনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের উপর দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে। উভয় পক্ষের উচিত আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা নিরসন করা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

এদিকে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সীমান্ত সমস্যা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুরোনো ইস্যু। তবে কূটনৈতিক স্তরে এমন তলব-পাল্টা তলব সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষায় সংলাপই একমাত্র সমাধান। 

তারা আরো মনে করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সীমান্ত সমস্যা একটি সংবেদনশীল ইস্যু, যা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা বাড়ানোর মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।


 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন