https://www.prothomalony.com/

11825

north-america

উত্তর আমেরিকা

সিরিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আল বশির

প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ ০১:৪৬

সিরিয়ায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন মোহাম্মদ আল বশির।

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতনের পর দেশটির নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্ববধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন মোহাম্মদ আল-বশির। ২০২৫ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত তিনি এই অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেবেন।

১০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সিরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে দেশটির অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মোহাম্মদ আল-বশির।

বিদ্রোহীদের ১২ দিনের ঝটিকা অভিযানে রাজধানী দামেস্ক দখল হওয়ার আগে মোহাম্মদ আল-বশির বিদ্রোহীদের-নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান স্যালভেশন গভর্নমেন্ট (এসএসজি) এর প্রধান ছিলেন।

আল-জাজিরা জানায়, এই স্যালভেশন গভর্নমেন্ট ২০১৭ সালে ইদলিব প্রদেশে গঠিত হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত জনগণকে সহায়তা করা। এ সরকারের ছিল নিজস্ব মন্ত্রীসহ বিভিন্ন বিভাগ এবং বিচারিক ও নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষও। এসএসজি সরকারে এর আগে বশির উন্নয়নমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

হায়াত তাহরির আল-শাম বিদ্রোহী গোষ্ঠীর (এইচটিএস) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল মোহাম্মদ আল-বশিরের। বাশার আল- আসাদ পতনের অভিযানে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি নেতৃত্ব দিয়েছে। আসাদের পতনের আগে থেকেই ইদলিব প্রদেশ ছিল হায়াত তাহরির আল–শাম এর নিয়ন্ত্রণে। সিরিয়ান স্যালভেশন গভর্নমেন্ট (এসএসজি) কার্যত তাদেরই নেতৃত্বাধীন সরকার।

এসএসজি পরে আলেপ্পোতেও কার্যক্রম শুরু করে। আসাদ পতনের অভিযানে আলেপ্পো ছিল বিদ্রোহীদের দখল করা প্রথম প্রধান শহর। বিদ্রোহীদের বিদ্যুৎগতির আক্রমণে গত রোববার পতন হয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের।

এরপরই সামনে আসে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি। আল-বশিরকে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মনোনীত করার খবর সোমবারই গণমাধ্যমে এসেছে। এবার আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করল বিদ্রোহীরা।

৯ ডিসেম্বর সোমবার ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে বাশার আল আসাদ সরকারের বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জালালি ও আল-বশিরের সঙ্গে বৈঠক করেন বিদ্রোহী গোষ্ঠী এইচটিএস প্রধান আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি। পরে আল-জালালি সিরিয়ান স্যালভেশন গভর্নমেন্টের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি থাকার কথা সংবাদমাধ্যমকে জানানোর পর আল-বশিরকে নতুন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা হলো।

আল-বশির ১৯৮৩ সালে ইদলিবের জাবাল আল-জাউইয়া শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। আলেপ্পো ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে লেখাপড়া সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর শরিয়াহ ও আইন নিয়ে লেখাপড়া করেন ইদলিব ইউনিভার্সিটিতে।

ইংরেজি ভাষা, প্রশাসনিক পরিকল্পনা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা বিষয়েও তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ বিরোধী বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনে যোগদানের আগে তিনি সিরীয় একটি গ্যাস কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন তিনি।

পরে ২০২১ সালে সেই চাকরি ছেড়ে ইদলিবে বিদ্রোহীদের দলে যোগ দেন আল-বশির। ২০২২ ও ২০২৩ সালে সালভেশন গভর্নমেন্টের উন্নয়ন এবং মানবিক কল্যাণবিষয়ক মন্ত্রী হিসাবে কাজ করেন তিনি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইদলিব প্রশাসনের শুরা কাউন্সিল বশিরকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে।

তার মেয়াদে ই-গভর্ন্যান্সের প্রসার, রিয়েল এস্টেট ফি হ্রাস এবং পরিকল্পনাসংক্রান্ত নিয়ম শিথিল করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারে তার নেতৃত্বে একটি স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার গঠনের পরই অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ হবে বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, নির্বাসিত এবং বাস্তুচ্যুত সিরিয়ানদের পুনর্বাসন করাও হবে তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। সাধারণ জনগণও এখন ভেবে পাচ্ছে না সিরিয়ার নতুন অন্তর্বর্তী সরকার আসলে কেমন হবে। কারণ, বিদ্রোহীদের মধ্যে বিভিন্ন উপ-গোষ্ঠীর মধ্যে চরম মতবিরোধ রয়েছে। এসব মতবিরোধ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিতে পারে। এদিকে আসাদের পতনের পর মাত্র দুইদিনে ইসরাইলের চালানো ৩১০টির মতো হামলার কারণে সিরিয়ার সামরিক স্থাপনা তছনছ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতা নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ সংশয় প্রকাশ করেছেন। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক স্যামুয়েল রামানি বলেছেন, বাশারের পতনে এইচটিএসের সঙ্গে যে কয়েকটি গোষ্ঠী ছিল, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এসএনএ)। ভিন্নমতের এ গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনে এইচটিএস কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, এইচটিএস ও এসএনএ-এর মধ্যে ২০২২ সালের আগে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাস রয়েছে। বিদ্রোহী জোট এখনো সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি। এমন একটি অঞ্চলে এ ধরনের ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো নির্দিষ্ট মডেলও নেই। সোমবার দামেস্কে কিছু বিদ্রোহী যোদ্ধা আশা প্রকাশ করেছেন, শিগ্গিরই একটি নাগরিক প্রশাসন দেশ পরিচালনা করবে। ইদলিব প্রদেশের যোদ্ধা ফেরদৌস ওমর বলেন, ‘আমরা চাই রাষ্ট্র এবং নিরাপত্তা বাহিনী যেন ক্ষমতায় থাকে।’ ফেরদৌস শিগ্গির নিজের আদি পেশা কৃষিকাজে ফিরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক লাহিব হিগালও। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেছেন, নতুন সরকার গঠনের পর তারা সিরিয়ার অন্য গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থরক্ষায় কীভাবে ভারসাম্য আনবে এবং কীভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতনভাতা দেবে-এসব বিষয় পরিষ্কার নয়। সিরিয়ায় ইরাকের মতো পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন লাহিব হিগাল।

এমন পরিস্থিতিতে সিরিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি রূপরেখা দিয়েছে কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থান করা বাশারবিরোধী জোট সিরিয়ান ন্যাশনাল কোয়ালিশন। জোটের প্রধান হাদি আল বাহরা রয়টার্সকে বলেছেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সময় প্রয়োজন। এছাড়া ছয় মাসের মধ্যে একটি খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করতে হবে। সিরিয়ায় শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে চীন, ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশও।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন