https://www.prothomalony.com/

11563

north-america

উত্তর আমেরিকা

ট্রাম্পের মন্ত্রিসভায় ইসরায়েলপন্থীদের নিয়োগে মুসলিম সমর্থকদের হতাশা

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৪ ০২:১৬

২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনে মুসলিম ভোটারদের সমর্থন পেয়েছিলেন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু তার নির্বাচিত মন্ত্রিসভার কিছু সদস্যের মনোনয়ন মুসলিম নেতাদের মধ্যে গভীর হতাশা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে, ইসরায়েলপন্থী এবং যুদ্ধকামী ব্যক্তিদের পদায়নে তারা উদ্বিগ্ন। মুসলিম নেতারা বলছেন, নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা মুসলিম ভোটাররা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নিয়ে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ট্রাম্পের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গভীর বৈপরীত্য খুঁজে পাচ্ছেন। গাজা এবং লেবাননে চলমান সংঘাতে ট্রাম্প প্রশাসনের বাছাই করা ব্যক্তিদের কট্টর ইসরায়েলপন্থী অবস্থান মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা আশা করেছিলেন ট্রাম্প মন্ত্রিসভায় এমন ব্যক্তিদের বেছে নেবেন যারা শান্তির পক্ষে কাজ করবেন। কিন্তু তার মনোনীত কর্মকর্তারা মূলত ইসরায়েল এবং যুদ্ধের সমর্থক।

মার্কো রুবিও-মাইক হাকাবি-এলিস স্টেফানিকে নিয়ে সমালোচনা

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্ত্রিসভায় মার্কো রুবিওকে পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে মনোনীত করার বিষয়টি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রুবিও একজন কট্টর ইসরায়েলপন্থী রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত, যিনি গাজার যুদ্ধবিরতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, ‘ইসরায়েলকে হামাসের প্রতিটি উপাদান ধ্বংস করতে হবে।’

তার বক্তব্যে তিনি হামাসকে ‘দুষ্ট প্রাণী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন, যা মুসলিম সম্প্রদায় ও মানবাধিকার কর্মীদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। রুবিওর এমন কড়া অবস্থান শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকে আরও গভীর করার আশঙ্কা জাগাচ্ছে।

ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত হিসেবে ট্রাম্প বেছে নিয়েছেন আরকানসাসের সাবেক গভর্নর মাইক হাকাবিকে। হাকাবি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের সমর্থক এবং ফিলিস্তিনের দুই রাষ্ট্র সমাধানকে ‘অকার্যকর’ বলে দাবি করে আসছেন।

তার মনোনয়ন নিয়ে মুসলিম নেতারা বলছেন, এটি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলবে। হাকাবির ইসরায়েলপন্থী অবস্থান এবং ফিলিস্তিনি স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতি তার কঠোর মনোভাব ইঙ্গিত দেয় যে, ট্রাম্প প্রশাসন এই অঞ্চলে ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হতে পারে।

এছাড়া, জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে ট্রাম্প মনোনীত করেছেন এলিস স্টেফানিককে। স্টেফানিক তার কঠোর ইসরায়েলপন্থী অবস্থানের জন্য পরিচিত। তিনি জাতিসংঘকে ‘সেমিটিজমের সেসপুল’ বলে অভিহিত করেছেন এবং গাজার মানবিক সংকট নিয়ে জাতিসংঘের নিন্দার কড়া সমালোচনা করেছেন।

মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া

মার্কিন মুসলিম এনগেজমেন্ট অ্যান্ড এমপাওয়ারমেন্ট নেটওয়ার্কের (এএমইইএন) নির্বাহী পরিচালক রেক্সিনাল্ডো নাজারকো বলেন, ট্রাম্পের মন্ত্রিসভা গঠনে আমরা শান্তির জন্য কাজ করা এমন ব্যক্তিদের দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার মনোনীত ব্যক্তিদের অবস্থান আমাদের হতাশ করেছে। এই প্রশাসন নব্য রক্ষণশীল ও যুদ্ধপন্থী ব্যক্তিদের দ্বারা পূর্ণ।

মিনেসোটা ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন অধ্যাপক এবং অ্যাবন্ডন হ্যারিস প্রচারণার সহ-প্রতিষ্ঠাতা হাসান আবদেল সালাম বলেন, ট্রাম্পের বাছাই আমাদের জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল না। তবে এটি আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে, তিনি জায়োনিস্ট নীতিকে আরও জোরালোভাবে সমর্থন করছেন। মুসলিম সম্প্রদায় ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমাদের স্রেফ একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

পেনসিলভানিয়ায় ট্রাম্পের মুসলিম সমর্থকদের সংগঠিতকারী রবিউল চৌধুরী বলেন, ট্রাম্প আমাদের কারণেই মিশিগান এবং অন্যান্য সুইং স্টেটে জিতেছেন। আমরা ভেবেছিলাম তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ দেবেন। কিন্তু তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম শুনে আমরা হতাশ হয়েছি। এটি আমাদের জন্য একটি বড় আঘাত।

ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে যা ছিলো


ট্রাম্পের প্রচারণার সময় তার শীর্ষ উপদেষ্টা রিচার্ড গ্রেনেল এবং মেয়ে টিফানি মুসলিম এবং আরব আমেরিকান ভোটারদের সঙ্গে বারবার বৈঠক করেছিলেন। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবেন। ট্রাম্প নিজেও ডিয়ারবর্ন এবং পিটসবার্গ সফরকালে মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে দেখা করেন এবং বলেন, মুসলিমরা শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়। আমি তাদের সেই স্থিতিশীলতা আনতে সাহায্য করব। কিন্তু নির্বাচনের পর তার সিদ্ধান্তে মুসলিম ভোটাররা ক্ষুব্ধ। তাদের মতে, এই প্রশাসন শান্তির পরিবর্তে যুদ্ধকে উৎসাহিত করছে।

যদিও অনেক মুসলিম নেতা ট্রাম্পের বাছাই নিয়ে অসন্তুষ্ট, কিছু মানুষ এখনো তার প্রতি আস্থা হারাননি। ট্রাম্পকে সমর্থনকারী ডিয়ারবর্ন হাইটসের মেয়র বিল বাজ্জি বলেন, আমি ৩ বার ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেছি এবং এখনো বিশ্বাস করি তিনি যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কাজ করবেন। আমরা তার সিদ্ধান্ত নিয়ে হতাশ হতে পারি, তবে ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ।

মিশিগান রিপাবলিকান পার্টির ভাইস চেয়ার রোলা মাক্কি বলেন, আমি মনে করি না ট্রাম্পের প্রতিটি নিয়োগে সবাই খুশি হবে। তবে আমি জানি, ট্রাম্প শান্তি চান এবং এটাই আসল বিষয়। বর্তমান প্রশাসনের সময় সংঘর্ষ আরও বেড়েছে এবং এতে বহু প্রাণহানি হয়েছে। আমরা আশা করি ট্রাম্প এই পরিস্থিতি বদলাতে সক্ষম হবেন।

যা চায় যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সম্প্রদায়

যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সম্প্রদায় আশা করেছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তারা গাজা, পশ্চিম তীর, এবং লেবাননের চলমান সংকট নিরসনে ট্রাম্পের কাছ থেকে নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত উদ্যোগ প্রত্যাশা করে।

মুসলিম সম্প্রদায় মনে করে, গাজার যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ এবং ফিলিস্তিনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত দুই রাষ্ট্র সমাধান গ্রহণ করা জরুরি। তারা চায়, মার্কিন প্রশাসন ইসরায়েলপন্থী একপাক্ষিক নীতি থেকে সরে এসে সকল পক্ষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আলোচনা চালিয়ে যাক।

এ ছাড়া, তারা আশা করে ট্রাম্পের মন্ত্রিসভায় এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যারা যুদ্ধ নয় বরং কূটনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে সংকট নিরসনে কাজ করবে। মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতারা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, তাদের দাবি একটাই—শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি নীতি।

রেক্সিনাল্ডো নাজারকো বলেন, আমরা এখন অন্তত মানচিত্রে আছি। আমাদের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী হচ্ছে। আমরা আশা করছি, ট্রাম্প আমাদের উদ্বেগ বিবেচনা করবেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিমালার দিকে নজর রেখে মুসলিম ভোটাররা তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের ইসরায়েলপন্থী নীতিমালা তার মুসলিম সমর্থনের ভিত্তি দুর্বল করতে পারে।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন