https://www.prothomalony.com/

11423

literature

সাহিত্য

সম্পাদকীয়: গ্রামীন সংস্কৃতির বন্ধন ও সম্প্রীতির হেমন্তের উৎসব কি হারিয়ে গেলো?

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৪ ০৫:০৫

‘ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা খেতে/আমি কি দেখেছি মধুর হাসি…’ আমাদের জাতীয় সংগীতে এভাবেই এসেছে হেমন্তের কথা।

কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় লিখে গেছেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয় হয়তোবা শাঁখচিল শালিকের বেশে, হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/ কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠাল ছায়ায়'।

প্রকৃতিতে এখন হেমন্ত বিরাজমান। পাকা ধানের মিষ্টি ঘ্রাণ, অদ্ভুত হাসি ছড়ানো সূর্যের আলোকিত ঔজ্জ্বল্যের আহ্বানে সর্বজনীন লৌকিক শস্যোৎসব, নবান্নকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এই বাংলায় হেমন্ত আসে এক অনাবিল প্রশান্তি নিয়ে। এক সময় অত্যন্ত সাড়ম্বরে সব মানুষের সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে নবান্ন উদ্‌যাপিত হলেও কালের বিবর্তনে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব বিলুপ্তপ্রায়।

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে হেমন্ত ছুঁয়ে দিয়ে যায় নরম কোমল ঈষৎ পেলবতায়। তবুও হেমন্তের বদলে যাওয়া চিত্র স্পষ্টই ধরা দেয় প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষদের। মানব হৃদয়ের মননশীল অনুভব হেমন্ত ঋতুকে সেভাবেই ছুঁয়ে গেছে যুগে যুগে। তাকে নিয়ে সহস্র ভাবনার বিলাসিতায় উৎসাহিত হয়েছে চিন্তামগ্ন মানুষের হৃদয়। হেমন্তের চরিত্র আর তার বাইরের রূপ নিয়ে জগৎজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য শিল্পকর্ম, লোকগাথা-গল্প, গান ও প্রেমের কবিতা।

বাংলা সাহিত্যে হেমন্ত ঋতু অত্যন্ত প্রিয় একটি বিষয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেক বিখ্যাত কবি তাদের লেখায় হেমন্তের রূপ, ফসলের সোনালি আভা এবং শীতলতার কথা তুলে ধরেছেন। হেমন্তের সৌন্দর্য, ধানের শীষের দোলা, এবং শীতের আগমনের অনুভূতি সাহিত্যিকদের মনের গভীরে দাগ কেটেছে। বাঙালি সংস্কৃতিতে হেমন্ত ঋতু তাই শুধু প্রকৃতির পরিবর্তন নয়, এটি আবেগ, আনন্দ এবং শৈল্পিকতারও এক প্রতীক।

এক সময় বাংলার বছর শুরুই হতো হেমন্ত ঋতু দিয়ে। ‘কৃত্তিকা’ ও ‘আর্দ্রা’ এ দুটি তারার নামানুসারে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসের নাম রাখা হয়েছে। আবার ‘অগ্র’ ও ‘হায়ণ’ এ দু’অংশের অর্থ ‘ধান’ ও ‘কাটার মৌসুম’। অগ্রহায়ণ যেহেতু ফসল তোলার মাস, তাই সম্রাট আকবর বাংলা পঞ্জিকা তৈরির সময় অগ্রহায়ণ মাসকেই বছরের প্রথম মাস বা খাজনা আদায়ের মাস হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

কার্তিক আর অগ্রহায়ণ এই দুই মাসের ভেতর দিয়ে বয়ে যায় হেমন্তের বাঁকফেরা নদী। নদীর স্বর্ণালি চরে চরে কিশোরের দঙ্গল, ভোকাট্টা ঘুড়ির পেছনে উন্মাতাল দৌড়। নদীর কোল ঘেঁষে সবুজ বুনো ঝোপে ঝোপে পতঙ্গের খুনসুটি। একটি কি দুটি ফুলও যায় ঝরে- টুপ করে ঘাসের কার্পেটে। আর যায় ভেসে ডিঙি নাও, বেদেনৌকোর বহর। বর্ষার ঘোর শরতেও থাকে লেগে। তারপর হেমন্তের রেশমি দুপুর এসে সেই লেগে থাকা বর্ষা ও শরতের রুপালি জলের চিবুকে রাখে তার রৌদ্রাঙ্কিত মরমি আঙুল। চার পাশে হেমন্তের এই হুলস্থূল করা আবেশ এই বাংলা ছাড়া আর কোথাও কি দেখা মেলে।

হেমন্তের মৌনতাকে ছাপিয়ে বাংলার মানুষের জীবনে নবান্ন প্রবেশ করে জাগরণের গান হয়ে, মানুষের জীবনে এনে দেয় সার্বজনীন উৎসবের ছোঁয়া। নবান্ন মানেই চারিদিকে পাকা ধানের ম ম গন্ধ, নতুন অন্ন, গ্রামের মাঠে মাঠে চলে ধান কাটার ধুম, হেমন্তে এই ফসল কাটাকে কেন্দ্র করেই ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্ন উৎসব। গৃহস্থবাড়িতে নতুন ধানে তৈরি পিঠাপুলির সুগন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়ায়। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে হেমন্তের এ শাশ্বত রূপ চিরকালীন। 

গ্রামবাংলার মাঠে-খেতে চলবে আমন ধান কাটার মহোৎসব নবান্ন। যা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শস্যোৎসব। নবান্ন হলো নতুন আমন ধান কাটার পর সেই ধান থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হেমন্তে বিভিন্ন ধরনের উৎসব পালিত হয়। নবান্ন তো আছেই, এর সঙ্গে নতুন ধান ঘরে তোলার পর ধান মাড়াই এবং মিষ্টান্ন তৈরি করে পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে বিতরণ করা হয়। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পিঠাপুলি খাওয়ার সময়ও এটি। গ্রামীণ এলাকায় হেমন্তের এই উৎসবগুলো মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন ও সাম্প্রদায়িক মিলনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

গান, কবিতায় কত রং রূপেই না ধরা দেয় হেমন্ত। তবে হেমন্ত শুধু হেমন্ত নয়, হেমন্ত মানে শীতের আগমনীবার্তা। একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়ে, ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি। শহরে অতটা টের পাওয়া না গেলেও গ্রামে খুব চোখে পড়ে প্রকৃতির এ বদলে যাওয়া। গাছিরা এখন খেজুরগাছ পরিষ্কার করার কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। গ্রামবাংলার এই চিরচেনা রূপ হেমন্তের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

আদিপাঠ মতে, কাত্তিকা তারার নামে কার্তিক, আর্দ্রা তারার নামে অগ্রহায়ণ; এই দুই মাসে হেমন্ত ঋতুর বসবাস বিধায় প্রকৃতির নিয়ম ধারায় এই দুই মাসে ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক চিত্র ভেসে ওঠে। হেমন্ত ঋতুকে মূলত ধানের ঋতু হিসেবে গণ্য করা হয়। গ্রাম-বাংলার জনপদে ধানের মৌসুম হিসেবেই একে ধরে নেওয়া হয় আজও, একালেও। আউশ-আমন ধান এ ঋতুর প্রধান ফসল। কার্তিকে এ ধানে সোনার রং লাগে, অগ্রহায়ণে কেটে বাড়ি তোলা হয়। অঞ্চলভেদে কিছুটা আগ-পিছ হলেও এ সময়েই ঘরে তোলা হয় নতুন ধান। উঠানে শুকিয়ে, সেদ্ধ করে ভাত রান্নাকে কেন্দ্র করে হেমন্তে বসে নবান্ন। উৎসবে মেতে ওঠে সারা বাংলা।

এ মাসটি বাঙালির সামাজিক জীবনে ঐতিহ্যবাহী, অসাম্প্রদায়িক বন্ধনে আবদ্ধ। যদিও আকাশ সংস্কৃতির হাল আমলে অনেকটাই পাল্টে গেছে সেই অগ্রহায়ণের চিরাচরিত উৎসবের রীতি। নবান্ন উৎসব পালন যেন ভুলতে বসেছে আধুনিক মনস্ক কৃষক সমাজও। তবে শরতের পরে আর শীতের আগে এ ঋতু এখন যেন কাগুজে ঋতুতে পরিণত হয়েছে। বাস্তবে এ ঋতুর আবেশ বাঙালির ঐতিহ্য থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। 

এখন থেকে যত দিন যাবে, ততই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য কমতে থাকবে। পার্থক্য যত কমবে, তত শীত বাড়তে থাকবে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে এখন প্রকৃতি যেন আর নিয়ম মানছে না। অনেকটা খামখেয়ালী হয়ে উঠেছে।

হেমন্তের অপার সৌন্দর্য মানুষের মনকে নানা রঙে রাঙিয়ে তোলে। এই সৌন্দর্য প্রেমিক হৃদয়কে মাতোয়ারা করে দিয়ে তার মনোলোকে তৈরি করে আশ্চর্য এক জগত। যেখানে জীবন ও মানুষ হয়ে ওঠে মূল শক্তি। আমরা ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি প্রকৃতির গভীর সান্নিধ্য থেকে। উপলব্ধির চেতনায় এখন আর ধরা পড়ে না প্রকৃতির সুনিবিড় দৃশ্যপটগুলোর তাৎপর্য। ছয় ঋতু বাংলার প্রকৃতির বুকে যে গভীর সৌন্দর্য-শোভা ছড়িয়ে রেখেছে, তাও যেন হৃদয় দিয়ে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। আবার ভয় হয়, যেভাবে পৃথিবীর জলবায়ু বদলাচ্ছে, তাতে আগামীতে এই আপন হেমন্তকে খুঁজে পাব তো!

হেমন্ত ঋতু প্রকৃতির সঙ্গে বাঙালির এক অটুট সম্পর্কের প্রতীক। শীতের আগমনের আগে হেমন্ত একদিকে নিয়ে আসে ফসলের স্বর্ণালী সমৃদ্ধি, অন্যদিকে প্রকৃতির রূপান্তরের এক মৃদু আভাস দেয়। শান্ত, সুন্দর এবং প্রেরণাদায়ক এই ঋতু বাংলার প্রকৃতি ও সংস্কৃতিতে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়ে গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশের ষড়ঋতুতে। ঋতুর উপস্থিতিতে ঘটছে তারতম্য। তারপরও কী কমে গেছে হেমন্তের আবেদন! এখনো হেমন্ত হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাদের!

 

...

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন