https://www.prothomalony.com/
11290
literature
গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যাবেলা আমাদের গ্রামে হাটতে বেড়িয়ে পড়ি প্রায় প্রতিদিনই। তবে মাঝে মাঝেই গ্রামের কেন্দ্রে যাই। যদিও সেখানটাকে সবাই বলে ডাউন টাউন, কিন্তু এটা নিতান্তই গ্রাম্য একটা পরিবেশ। একটা প্রশস্ত রাস্তা যার নাম পার্ক এ্যাভিনিউ। সুন্দর এই রাস্তার দুই পাশে সারি সারি কিছু হরেক রকমের দোকানপাট, দুইটা ব্যাংক, ঔষধের দোকান, একটা গির্জা, একটা আইসক্রিমের দোকান সেখানে সব সময় স্কুলের ছেলে-মেয়েদের ভীড় লেগেই থাকে, একটা বাদ্য যন্ত্রের বিক্রি ও মেরামতের দোকান, একটা গ্রামীণ নাট্যশালা যেখানে আমি একজন নাটক-প্রেমী বলে প্রায়ই যাই, বেশ কয়েকটা বিভিন্ন দেশীয় রেস্তোরা যার মধ্যে থাইল্যান্ডেরটা আমার প্রিয়। তবে এতসব রকমারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাঝে একটা আমার দৃষ্টি, মন, হৃদয়, আবেগ, অনুভূতি, ভাল লাগা, সন্মান ইত্যাদি জড়িয়ে নিয়েছে। সেই দোকানটা সম্বন্ধেই কিছু সহভাগিতা করার প্রয়াস এই ক্ষুদ্র লেখনীর মাধ্যমে।
এই অভিনব দোকানটার নাম বাংলা অনুবাদ করলে হবে “শরবত/জুস ও ইত্যাদি”। গ্রীষ্মের গরমে হেঁটে বেড়িয়ে ক্লান্ত হওয়া পথচারীরা ভীড় জমায় এখানে। প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলে পার্ক এ্যাভিনিউর পার্কে স্হানীয় শিল্পীদের গানের অনুষ্ঠান বা কনসার্ট হয় এবং সেসময়ে এই দোকানে জুস পানের জন্যে প্রচুর ভীড় হয়। আমিও যাই গানের বিরতির সময়ে। বিভিন্ন রকমের জুসের মধ্যে আছে আপেল, আঙ্গুর, পেঁপে, কমলাসহ অনেক ফলের, আবার গাজর, বিট, কড়লাসহ কয়েক রকমের সব্জীর মিশ্রণের জুস, এমনকি ঝাল ও অঝাল মরিচের জুস। আমার প্রিয় হলো গাজর, ধন্যা পাতা, আদা ও গোল মরিচের মিশ্রণের একটা অদ্ভুত সুস্বাদু সরবত বা জুস। এর সাথে আরো কিছু নিশ্চয়ই মেশানো হয়, নতুবা এটা এত স্বাদের হবে কেন। তবে এই দোকানের জনপ্রিয়তাঁর পাশাপাশি যে জন্য এটা খুব নামকরা তাঁর কারণ হলো যে এই দোকানের সব কর্মচারীরা মেয়ে। এরা সবাই হাইস্কুলের কিংবা কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। জুস নিয়ে যে কোন টেবিলে বসে কর্মরত মেয়েগুলির দিকে লক্ষ্য করলে একটা বিশেষ সন্মানবোধ সৃষ্টি হয় ওদের কাজ দেখে। কেমন যেন একটা মায়া জেগে উঠে ওদের জন্য। বয়সে ওরা আমার মেয়ে/ভাইঝিদের বয়সী হওয়ায় হৃদয় জুড়ে একটা স্নেহের দানা বাঁধে। ম্যানেজার মেয়েটা কলেজ পড়ুয়া, অন্যান্যরা স্হানীয় স্কুলের কিংবা কলেজের ছাত্রী এবং লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো ওরা বিভিন্ন জাতির। ওদের কেউ সাদা, কেউ কালো, কেউ বাদামী, কারো ভাষা স্প্যানিশ, কারো কোরিয়ান, কারো ইতালিয়ান, কারো আরবী, কারো হিন্দী। এদের মাঝে বাংলা ভাষী কাউকে এখনো পাইনি। তবে দোকানে প্রায় সবাই ইংরেজীতেই কথা বলে, অন্য ভাষাও চলে। আমি দক্ষিণ আমেরিকানদের সাথে সাধারণত স্প্যানিশেই কথা বলি। পড়াশুনার অবসরে ওদের এই স্বল্প মেয়াদী চাকুরীতে কর্মস্পৃহা, নৈপুণ্য, উৎসাহ, হাসিমুখে সেবা, দোকানে আগত ক্লায়েন্টদের সাথে মধুর ভাবে আচরণ ও আলাপচারিতা ইত্যাদি আমাকে মুগ্ধ করেছে প্রতিবার। স্হানীয়দের সাথে কিছু আন্তর্জাতিক ছাত্রীরাও আছে। অর্থাৎ অন্য দেশ থেকে এখানে এসেছে পড়াশুনার জন্য। এই অল্প বয়সী মেয়েদের বালিকা শক্তি সত্যিই প্রশংসনীয়। মেয়েরা যেন একসাথে কাজ করে দলীয় চেতনা বা টীম স্পিরিট গঠন করতে পারে তার জন্যই এই উদ্যোগ। তবে বৈষম্যের কোন ভয় নেই, ছেলেদের জন্যও এ’রকম ব্যবস্হা আছে।
স্কুলের বালিকারা পড়াশুনায় ও স্কুলের কারিকুলামের অন্তর্ভূক্ত সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডসহ কিছু খেলাধুলায় জড়িত থাকে। তবে ছেলেদের মত হাতখরচ রোজগারের সুযোগ মেয়েরা এখনো তেমন পায় না। ফলে ভবিষ্যত কর্ম জীবনের জন্য প্রযোজ্য প্রাথমিক অভিজ্ঞতা অর্জনে এরা বঞ্চিত হয়। আমাদের গ্রামের কিছু বর্ষিয়ান, অল্পবয়সীদের মঙ্গলকামী নারী-পুরুষ বালিকা ও কিশোরীদের জন্য কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। বালিকা শক্তিকে কর্মঅভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিকশিত করার লক্ষ্যেই এই মহতী উদ্দেশ্য। এরকম প্রকল্পের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর বালিকারা যখন পূর্ণ নারী হয়ে উঠে, তখন তাঁদের পড়াশুনা ও কর্মঅভিজ্ঞতার সংমিশ্রণের কারণে কর্ম ও সামাজিক জীবনে এরা সার্থক ও সফল হয়ে উঠে। এই প্রকল্পের ব্যবস্হাপকদের প্রশংসা করতেই হয়। তবে বালকদের ও যুবদের জন্যও বিভিন্ন প্রকল্প আছে তাদের উন্নয়নের জন্য। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গ্রীস্মের ছুটির সময় ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য গ্রীষ্মকালীন কাজের ব্যবস্হা করা হয়, যার মাধ্যমে এরা কর্ম-অভিজ্ঞতা অর্জন করতে থাকে।
নারীশক্তির পূর্ণ বিকাশ ও নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁদের শিশুকাল থেকেই শুরু করতে হবে। পারিবারিক পরিবেশ এমন হতে হবে যেখানে মেয়ে সন্তানেরা শিশুকাল থেকেই সমানভাবে সমাদৃত হবে। আগের দিনে ছেলেদের যেমন প্রাধান্য দেয়া হতো ভবিষ্যতে সংসারের হাল ধরার কথা মাথায় রেখে, তেমন না করে ছেলে ও মেয়ে সব সন্তানকেই সমান নজরে দেখে সমানভাবে বড় করে তুলতে হবে। ছোটকাল থেকেই তাদের সমানভাবে দায়িত্ববোধ সম্বন্ধে সচেতনতা শেখাতে হবে। শুধু ছেলেরাই যে বড় হয়ে পরিবারের হাল ধরবে তাই নয়। বরং মেয়েরাও এখন পরিবারের ভরণপোষণ ও অন্যান্য পারিবারিক দায়িত্বভার বহন করার যোগ্যতা রাখে, প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও কর্ম-সুযোগ পেলে। পারস্পারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নারী-পুরুষ যে সমভাবেই সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে তার প্রমান রয়েছে প্রচুর। এক্ষেত্রে দু’জনকেই একে অন্যের উপর বিশ্বাস ও আস্হা রাখতে হবে। তবে এটা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম যে বন্ধু-বান্ধবী, প্রেমিক-প্রেমিকা ও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে যে কোন একজনকে প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে হয়, নেতৃত্ব দিতে হয়, এক সাথে সময় কাটানোর পরিকল্পনা করতে হয়, সামনে এগিয়ে যাবার অনুপ্ররণা যোগাতে হয়। পরিবার পরিচালনায় ও রক্ষণাবেক্ষণেও এই বিষয়টা বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অর্থাৎ পুরুষ-নারীর সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একটা সুখী ও সাফল্যময় পরিবার গড়ে উঠে। এই রকম পরিবেশে বেড়ে উঠা নারীরা শুধু পরিবারে নয়, সামাজিক কর্ম-কান্ডে, যে কোন পেশায়, ব্যবসায়, সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে, পুলিশ, সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীতে, এমনকি দেশের সর্বোচ্চ পদমর্যাদাপূর্ণ স্হান প্রেসিডেন্ট পদেও সমাসীন হতে পারবে। একজন নারীকে “ম্যাডাম প্রেসিডেন্ট” বলে সম্বোধন করতে ঐতিহাসিক সুযোগটা সব মা-বাবাদেরই মনের গহীনে এই কথাটিই বারবার বলে দেবে “আমাদের মেয়েও পারবে, অন্তত পথটা খোলা আছে যে কোন কিছু করার ও হওয়ার।” এ’জন্যে বালিকাশক্তি ও বালকশক্তি দু’টোকেই সমভাবে দেখতে হবে। তবে বালক-বালিকা, যুবক-যুবতীরা যেন জানে যে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক যে কোন প্রয়োজনে কিংবা সমস্যায় তারা সব সময়ই পিতা-মাতা ও পরিবারের বর্ষিয়ানদেন কাছে পরামর্শ চাইতে আসতে পারে। এ’রকম পারস্পারিক আস্হা সবারই যেমন কাম্য, তেমনি বালিকা ও বালক শক্তির সুষ্ঠ বিকাশও আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের প্রাপ্য॥
লেখক : ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী, হলি ক্রশ ও সেইন্ট যোসেফ স্কুল, নটরডেম কলেজের প্রাক্তন ছাত্র, নিউ জার্সিবাসী, একজনরোমান ক্যাথলিক যাজক এবং ধর্মবিষয়ক কলামিস্ট।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন