https://www.prothomalony.com/

11091

bangladesh

বাংলাদেশ

সম্পাদকীয়

ড. মুহাম্মদ ইউনুসের যুক্তরাষ্ট্র সফর : বহুমাত্রিক অর্জন, সুফল পাবে বাংলাদেশ

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৪ ০২:১১

বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এই সফরে তিনি বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানদের সাথে বৈঠকও করেছেন। নানা কারণে প্রধান উপদেষ্টার এই সফরটিকে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। নানা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের একপ্রকার সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছিল। এই সফরে সেই সংকট অনেকটাই কেটেছে। বিশেষ করে গণতন্ত্র, মানবাধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি সংকট ছিল, এই সফরে সেটা কাটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সফরে ড. মুহাম্মদ ইউনূস মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ ১২টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সাইডলাইনে ৪০টি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন। সফরের সময় প্রধান উপদেষ্টার ব্যাপক কর্ম-তৎপরতা বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিশ্বের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং অংশীদারিত্ব এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।  এসব বৈঠকে তিনি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সার্বিক সংস্কারে বিশ্ব সম্প্রদায়ের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ থেকে প্রায় সাড়ে ১৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতিও পেয়েছেন। জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ২৭ সেপ্টেম্বর ভাষণে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণ বিশেষ করে যুবসমাজ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে এবং নতুন প্রজন্ম এজন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। উদারনীতি, বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর মানুষের গভীর বিশ্বাস থেকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়। ১৯৭১ সালে যে মূল্যবোধ বুকে ধারণ করে গণমানুষ যুদ্ধ করেছিল, সেই মূল্যবোধ বহু বছর পর এ দেশের জেনারেশন জেড (জেন-জি) নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে। সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে ‘মনসুন অভ্যুত্থান’ আখ্যায়িত করে তিনি আরও বলেন, এই অভ্যুত্থান বিশ্বে ন্যায়বিচারের অনুপ্রেরণা জোগাবে। বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের সবচেয়ে সফলতম সফর ছিল এবার বলেও মনে করা হয় এবং জাতিসংঘে ড. ইউনূসের ভাষণ মাইলফলক। ড. মুহাম্মদ ইউনুসের এই সফর পরিবর্তনের হাওয়ায় ক্ষমতার পালাবদলের সুফল পাবে বাংলাদেশ। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আগের টানাপড়েন অনেকটা কেটেছে। উল্টো ড. ইউনূসকে কেন্দ্র করে এসব শক্তির বাংলাদেশের পাশে থাকার ও সমর্থনের আশ্বাসের জোয়ার দেখা গেছে। ঢাকার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংস্কার ও অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুতি মিলেছে। তবে সেই সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে। এই সফরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র তুলে ধরেছেন প্রধান উপদেষ্টা, পেয়েছেন আস্থা। তারাও গণতান্ত্রিকভাবে ও টেকসই সংস্কারের জন্য সব ধরনের সাপোর্ট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি এবং নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী ডিক শুফের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন ড. ইউনূস। তার সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি জে ব্লিঙ্কেন, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেয়েন, জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক, জাতিসংঘের হাইকমিশনারের শরণার্থী বিষয়ক কমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গ ও ইউএসএইডের প্রশাসক সামান্থা পাওয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যুক্তরাষ্ট্রে ড. ইউনূসের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলো এখনকার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ও প্রয়োজনের আলোকে হয়েছে। এর মাধ্যমে অনেক সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ড. ইউনূসের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে ঢাকাকে সহযোগিতারও আশ্বাস দিয়েছে ওয়াশিংটন। বিশ্লেষকদের মতে, প্রক্রিয়াটা জটিল হলেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার চেষ্টা শুরু করেছে সরকার। যেসব দেশে বাংলাদেশের টাকা-পয়সা পাচার হয়েছে, সেই দেশগুলোকে চাপ দিতে হবে, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রসহ ক্ষমতাধর দেশগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের নতুন যাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের অংশীদারত্ব চেয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, তাঁর সরকারের নেওয়া বহুমুখী সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তাঁরা। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে বাংলাদেশের নতুন সরকারের এক ধরনের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছিল। যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে বাংলাদেশের একটি বৈঠকের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় নি সফরসূচীতে মিল না থাকায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিবেশী দু’টি দেশের সরকার প্রধানের মধ্যে এই মূহুর্তে একটি বৈঠক হলে তাতে সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতো। আর্থিক ক্ষেত্রে সুশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের দায়িত্ব শুধুমাত্র অন্তর্বর্তী সরকারের না, রাজনৈতিক দলগুলোরও রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সংস্কারের জন্য বাংলাদেশকে সব ধরনের সাপোর্ট দিচ্ছে। কিন্তু তারা চাইছে এই সংস্কার যেন হয় গণতান্ত্রিকভাবে, যেটাকে টিকিয়ে রাখা যায়। এর সুফল যেন সাধারণ মানুষের কাছে পৌছায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফরেই অন্তত পৌনে সাত বিলিয়ন ডলারের অর্থ জোগাড়ের প্রাথমিক সাফল্য পাওয়া গেছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই বড় অঙ্কের ডলার পাওয়ার আশ্বাস এসেছে। ফলে শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা যোগ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর বাইরেও চীনের প্রস্তাবে বড় বিনিয়োগের সোলার প্লান্ট স্থাপন, নেপালের পক্ষ থেকে পানিবিদ্যুৎ, জ্বালানি আমদানিসহ বিভিন্ন খাতে সহায়তারও আশ্বাস এসেছে বিশ্বনেতাদের কাছ থেকে। অর্থনীতিবিদরা এটাকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের প্রাথমিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন। তবে এ জন্য ঋণের শর্ত মেনে নানা খাতের সংস্কারগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ড. ইউনূস বৈঠক করেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে। বৈঠকে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে সংস্কারে খরচের জন্য সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে দুই বিলিয়ন ডলার দেবে একেবারে নতুন ঋণ হিসেবে আর বাকি দেড় বিলিয়ন ডলার দেবে আগের প্রকল্পগুলো চালিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে। মোটা দাগে সরকার এই অর্থ ডিজিটাইজেশন, তারল্য সহায়তা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পরিবহনে খরচ করতে পারবে। ক্ষমতার পালাবদলে বিশেষ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব নিয়ে প্রথমবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ড. মুহাম্মদ ইউনুস যোগ দিলেও স্বল্প সময়ে তিনি সেখানে এখন বিশ্বনেতাদের মনোযোগের কেন্দ্রে। আগে থেকেই খ্যাতি ও সমীহ পাওয়া ড. ইউনূস এবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছেন নতুন পরিচয়ে। এবার তিনি বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আর তাই প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশগ্রহণের ওপর নজর ছিল বিশ্বনেতাদের। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে বৈঠকটি সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনের কূটনীতিকরা বলেছেন, জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে কোনো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন বৈঠক বিরল ঘটনা! আর বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো, যা সম্ভব হয়েছে একমাত্র নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য।সবকিছু মিলিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের যুক্তরাষ্ট্রের এই সফর বাংলাদেশের সাথে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থা এবং বিশ্বাসের জায়গাটি ফিরে পাওয়া, এটা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন