https://www.prothomalony.com/

10302

decoration

সাজসজ্জা

শি ল্প ঘর

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৪ ০৮:২৫

ভূমিকাঃ গহনা পরতে কে না ভালোবাসে? প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে গহনা বা অলঙ্কারের প্রচলন। অলঙ্কার বা গহনা একপ্রকার পরিধেয় সামগ্রী যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে সুসজ্জিত ও আকর্ষণীয় করার উদ্দেশ্যে পরা হয়। অলংকার এর প্রতি মানুষের চাহিদা সৃষ্টির আদিকাল থেকেই বিশেষ করে নারীরা অলংকার খুবই পছন্দ করে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের জন্য পৃথক পৃথক ধরনের গহনা ব্যবহার করা হয়।জাতি ও সংস্কৃতি ভেদে অলংকারের গড়ন ও প্রকৃতি বিভিন্ন হয়ে থাকে। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় লোহার তৈরি গহনার বিশেষ কদর ছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষাংশে প্লাটিনামের গহনা তৈরিও শুরু হয়। প্রাচীন কালে সোনা, রূপা, মনি-মুক্তার প্রচলন ছিল না। অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহৃত হতো ফুল, লতা-পাতা, গাছের ছাল-বাকল, শেকড়, জন্তু-জানোয়ারের হাড়, শিং, পাখির পালক ইত্যাদি। অবশ্য অলঙ্কার হিসেবে ফুলের কদর এখনও কমে নি। বিয়ে বাড়িতে হলুদের অনুষ্ঠানে এখনও ব্যবহৃত হয় ফুলের গহনা। আর র্বতমানে অলঙ্কার হিসেবে এসেছে সোনা, রূপা, হীরা, মুক্তা রত্নরাজি। তবে বর্তমানে সোনা,হীরার গহনার  চেয়ে ইমিটেশনের হালকা গহনায় বেশি জনপ্রিয়। এখন মাটির সাথে বিভিন্ন মেটালের সমন্বয়ে নানা ধরনের গহনা তৈরি হয়। সেগুলো সাজে আনে নতুনত্ব। ফুটিয়ে তোলে বাঙালিয়ানা। হাল ফ্যাশনের সাথে আরো যুক্ত হয়েছে মেটাল ও বিডসের গহনা। কাঠ, বাঁশ, পুঁতি, সুতা, টারশেল দিয়েও তৈরি হচ্ছে ফ্যাশনাবল গহনা। আজকাল সোনার চেয়ে রূপার গহনা বেশ জনপ্রিয়। এর কারণ সোনার দাম এবং নিরাপত্তার অভাব। আবার অন্যদিকে সোনা বা রূপার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ইমিটিশেনের গহনা। পোশাকের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পরা হয় সেসব। আর দাম কম হওয়ায় কেনাও সহজ। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ডিজাইনের পরির্বতন ঘটেছে। নানি-দাদীরা ভারি গহনা ছাড়া চিন্তাই করতে পারতেন না। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে। বদল হয়েছে রুচির। এখন ভারী গহনার চেয়ে হালকা গহনায় বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। 

'শিল্পঘরে'-এক আজকের আয়োজন দু'জন গহনা শিল্পীকে নিয়ে।  আশাকরি আপনাদের ভালো লাগবে। 

ধন্যবাদান্তে - রোকেয়া দীপা


হস্তশিল্পের প্রতি অনুরাগী সিতুয়া আফরিন জ্যোতি

গহনা যদি হয় খুব ফ্যাশনেবল আর একেবারেই নিজের হাতে তৈরি করা, তবেতো কথাই নেই! চোখ জুড়ানো এমন সব গহনাই ডিজাইন করেন সিতুয়া আফরিন জ্যোতি। দারুণ স্টাইলিশ, ক্রিয়েটিভ এবং ভীষণ কাজপাগল মানুষ সিতুয়া আফরিন জ্যোতি। তিনি বর্তমানে নিউইয়র্কের কুইন্সে বাস করছেন। নিজেকে আর্টিস্ট পরিচয় দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তার কাজের জন্ম সেই ২০০৫ সাল থেকেই। এস এস সি পরীক্ষা শেষ হবার পর ঘরে বসে বসে বিভিন্ন রকম হাতে তৈরি ঘর সাজানোর জিনিষ তৈরির নেশা হয়ে গিয়েছিল তার। সেখান থেকেই কখনো দেয়াল সাজানোর জিনিস বা কখনোও গ্লাস পেইন্টিং করতেন। নিজের জন্য এবং বান্ধবীদের জন্য হাতের ব্রেসলেট বা পায়ের নূপুর তৈরি করা দিয়ে শুরু। তার বান্ধবীরা প্রায়ই তাকে অর্ডার করতো জামার সাথে ম্যাচ করে কিছু বানিয়ে দেবার জন্য। 
 

ছোট বেলা থেকে হস্তশিল্পের প্রতি তার তীব্র অনুরাগ ছিল। তার কাছে আর্ট বা শিল্প বলতে চিরাচরিত ক্যানভাস বা রংতুলি বলে মনে হয় না। শিল্প তার প্রাত্যহিক জীবনের সাথে জড়িত থাকতে হবে। সকালের চায়ের কাপ থেকে রাতে ঘুমাবার আগে বালিশে মাথা রাখা পর্যন্ত ব্যবহৃত প্রতিটি জিনিষেই থাকবে শিল্পের ছোঁয়া। শিল্প একজন মানুষের অভিরুচিকে উপস্থাপন করবে, শিল্প একটি দেশকে উপস্থাপন করে। তাই শিল্প সীমাহীন। তার আশেপাশের প্রতিটি জিনিষই তার হস্তশিল্পের অণুপ্রেরনা যোগায়। 

সিতুয়া আফরিন জ্যোতির কাজের পরিধি বিশাল। তিনি কখনো দেয়ালঘড়ি তৈরি করেন, কখনো ক্যানভাসে আঁকেন, কখনো তৈজসপত্রে অঙ্কন করেন, কখনো গহনা তৈরি করেন। আবার কখনো দাবার সেট বানান। কখনো তার চেষ্টা থাকে আয়নার ফ্রেমে রং করবার। তিনি এসকল কাজের ক্ষেত্রে রং নির্বাচন করেন প্রকৃতির রং থেকে। কখনোবা তার কাজে সমুদ্রের ঢেউ আর ফেনা রাশির প্রাধান্য দেখা যায়। কখনোও বা থাকে ফুলের আতিশয্য। 

সিতুয়া আফরিন জ্যোতি বলেন, 'শিল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবসময়ই নিজের ভালোলাগাকে প্রাধান্য দিই। এই একটি জায়গায় আমি একদম বাঁধনহারা, স্বাধীনচেতা, সম্পূর্ন কারো নিয়ন্ত্রণের বাহিরে। আমার কাজের ধারা শুরুতে ছিল গ্লাস পেইন্টিং।' কাঁচের উপরে পেইন্টিং করে বাংলাদেশে ২০০৭ সালে তিনি বেশ সাড়া জাগিয়েছিলেন। তার কাছে অনেকে পেইন্টিং শিখতে আসত। কিন্তু পড়াশোনার জন্য ঐভাবে কখনোও চর্চা করার সাহস হয়নি। এভাবেই ২০১০ সালে তিনি বেশ বড় একটি কাজের অর্ডার পান। অস্ট্রেলিয়ার একটি সংস্থায় বাংলাদেশি সুভেন্যির হিসেবে তিনি প্রায় ১৫ পিস গ্লাস পেইন্টিং সেল করেন। এরপরেই বিভিন্ন গিফট শপে, রেস্টুরেন্টে এমনকি অফিসের কালচারাল রুমেও তার গ্লাস পেইন্টিং এর জন্য অর্ডার আসতো। পরবর্তীতে পড়াশোনা, বিয়ে আর চাকরিতে জয়েন করার ফলে এই শখের কাজে ভাটা পড়ে যায়। তবে মনের কোনো এক কোণায় সবসময়ই পিপাসা ছিল তার, এই কাজটাকে নিয়ে নতুন করে ভাবার। 

২০১৪ সালে তিনি জাগো ফাউন্ডেশানে এ অনলাইন টিচার হিসেবে জয়েন করেন। তখন ঢাকার অফিসে বসে অনলাইনে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের স্কুলটিচার ছিলেন। অনলাইনে ওদের গণিতের টিচার থাকলেও তিনি ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ওদের ড্রইং ও শিখাতেন। এমন করেই একদিন শুনলেন, তার কাছ থেকে আঁকা শিখে ওরা একজন ঢাকার কোন একটা অংকন প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে। সিতুয়া আফরিন জ্যোতি বলেন, 'নিজেকে খুব বেশি যোগ্য মনে হয়েছিল সেদিন। আমি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিইনি  শিল্পের জন্য। পুরোটাই নিজের আগ্রহে শেখা। তাই সবসময়ই একটা দ্বিধা কাজ করতো মনে। মানুষ আমার কাজকে ভালোবাসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল। তাই কখনোই ভালোবাসার এই জায়গাটাকে বৃহৎভাবে প্রকাশ করতে চেস্টা করিনি।' 

২০১৬ সালে সিতুয়া আফরিন জ্যোতি আমেরিকা চলে আসেন। তখন থেকেই তার প্রিয় জায়গা যে কোনো আর্ট এন্ড ক্র্যাফ্ট স্টোর। এখানে আসার পর তার স্বপ্ন ছিল, নিজের একটা আর্ট এন্ড ক্রাফ্ট এর স্টোর করার, যেখানে প্রতিটি জিনিসে থাকবে তার হাতের ছোঁয়া। থাকবে ঘর সাজানোর সব ধরনের শৈল্পিক জিনিস, হাতে তৈরি গহনা আর প্রতিদিনের ব্যবহার্য ব্যাগ-পোশাক আশাক সবকিছু। 

এই উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য নিয়ে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের শিল্প এবং সংস্কৃতিকে নতুন মাত্রা যোগ করে ভিন্ন আঙ্গিকে আমার সেকেন্ড হোম আমেরিকায় উপস্থাপন করাই আমার লক্ষ্য। আমার স্বপ্ন-কেবল বাঙালিরা নয় বরং সবদেশের মানুষের কাছে আমার স্টোরের একটি হলেও সামগ্রী থাকবে। সেই স্বপ্ন থেকেই আমি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জিনিস তৈরির কাজ শিখছি, বানাচ্ছি। আমার এই স্বপ্নের নাম "Afrin's only। এভাবেই 'Afrin'S Only' তে গহনা তৈরির বিষয়টি মাথায় আসে আমার। গহনা তৈরি করা বেশ পরিশ্রমের কাজ। কিন্তু গহনা নিজের দেশের সংস্কৃতিকে মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে দেবার একটি চমৎকার মাধ্যমও। তাই গহনা তৈরির ওপর আমি একটি কোর্স করি। এবং সেখান থেকে সম্পূর্ন নিজের আইডিয়া নিয়ে তৈরি করি মাসকট গহনা।' 

এক্ষেত্রে তার অনুপ্রেরণা ছিল বাংলাদেশি পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায় বহন করা বিশালাকৃতির মাসকটের আকৃতি গুলো। এর সাথে ছিল দেশীয় বাদ্যযন্ত্র। ২০২৩ সালে এসে তিনি একটি সংস্থার সাথে যুক্ত হন যারা বিভিন্ন দেশীয় শিল্পীদের নিয়ে কাজ করছে। এই সংস্থাটির নাম HUG xyz . ।তাদের উদ্দ্যেশ্য হল বিবিধ দেশের সংস্কৃতিকে নতুন ধারার রূপ দিয়ে এমন কিছু হস্তশিল্প সৃষ্টি করা যা আগে কেউ কখনোও দেখেনি। সেই প্রচেস্টা থেকেই তার সাথে ওরা যোগাযোগ করেন। এবং তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি যে এত বড়ো পরিসরে কাজ করবার সুযোগ পেয়েছেন।

সিতুয়া আফরিন জ্যোতি ওদেরকে সর্বপ্রথম তার হাতে তৈরি গহনা প্রদর্শন করেন। তার তৈরি রেসিন আর্ট প্রদর্শন করেন, ওরা তার কাজের বেশ প্রশংসা করেন এবং তার সাথে আরও অনেক ভিন্নদেশীয় শিল্পীদের কাজের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সেই প্রদর্শনীতে সিতুয়া আফরিন জ্যোতির প্রায় ১৫০ জোড়া দুল বিক্রি হয় , যার অধিকাংশই ছিল মাসকট দুল। ঐ প্রদর্শনীতেই তিনি একটি মেক্সিকান বিয়ের উপহার হিসেবে ৩০০ জোড়া দুলের অর্ডার পান। এরকম আরও অনেক হস্তশিল্প যা তার দেশকে তুলে ধরে যেমন রিকশা পেইন্টিং, ঘড়ি, চায়ের মগ, চেজবোর্ড এসবের অর্ডার ও পেয়েছেন এবং এখনো পাচ্ছেন। 

সিতুয়া আফরিন জ্যোতির কাজের একটি বড় দিক হচ্ছে তিনি প্রতিটি কাজের গুণগত মান নিয়ে অসম্ভব খুঁতখুঁতে। তিনি যেহেতু শখের আর্টিস্ট নন, পেশাদার হতে চান তাই এই বিষয়ে তিনি সবসময়ই বেশ সিরিয়াস থাকেন। তার পেইন্টিং করা রান্নাঘরে ব্যবহৃত জিনিষের ক্ষেত্রে রং সবসময়ই ফুডগ্রেড এবং ন্যাচারাল। একই ভাবে গহনার ক্ষেত্রেও গহনার ব্যবহার করা ধাতু যাতে ত্বকের জন্য নিরাপদ থাকে সেটা মাথায় রাখেন। আবার রেসিনের ক্ষেত্রেও বর্তমানে FDA আ্যপ্রুভড রেসিন তিনি সবসময় ব্যাবহার করেন। যেহেতু তার এসকল কাজের সময় তার বাচ্চারা সাথে থাকে তাই নিরাপত্তার বিষয়টা সবসময়ই তার মাথায় থাকে। এসব শিল্পের নিখুঁত কাজ বেশ সময়, খরচ ও শ্রমসাপেক্ষ । কিন্তু ব্যাক্তিগত ভাবে তিনি চ্যালেঞ্জিং কাজ করতে বেশ ভালোবাসেন বলে তার শিল্পকে তিনি খুব শ্রদ্ধার সাথে সৃষ্টি করেন।

সিতুয়া আফরিন জ্যোতির কাজের পরিসর বেশ বিস্তৃত। তিনি বলেন, 'প্রতিনিয়ত নতুন করে শিখতে হয়। নতুন জিনিসের আইডিয়া নিয়ে ভাবতে হয়। গহনা তৈরির পাশাপাশি আরও বেশ কিছু জনপ্রিয় হাতে তৈরি শৌখিন শিল্প ভাবনা আছে আমার। বর্তমানে কাজ করছি ডেকোরেটিভ আয়না নিয়ে। এক্ষেত্রেও আমাকে অনেক সূক্ষ্ম বিষয় জানতে হচ্ছে। কাজের ফিনিশিং এবং জিনিসের  টেকসই এর ব্যাপারটাও আমাকে  রিসার্চ করতে হয়। যেহেতু কাজকে আমি ব্যবসার আকারে রুপ দিতে চাই, তাই কাজটি মানসম্পন্ন কিনা তাও আমাকে  চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হয়।'

তার নিজস্ব উদোগে সৃষ্টি এই ব্যবসায় প্রকল্প অন্য সকল বাংলাদেশিদের থেকে অনেক ভিন্ন। আমাদের যারা এদেশে শৌখিন জিনিসের বিজনেস করছেন তাদের বেশিরভাগই দেশ থেকে এনে এখানে দেশীয়দের মাঝেই সেল করছেন। তার প্রচেষ্টা হল দেশীয় সংস্কৃতিকে আমেরিকান কালচারের সাথে যুক্ত করে সকল ধরনের শৌখিন হস্তশিল্প নিজের হাতে তৈরি করে নিউইয়র্কের বুকে একটি শপ চালু করা। এই উদ্যোগ থেকেই বর্তমানে তিনি বিভিন্ন ভিন্নদেশীয় মেলায় অংশগ্রহণ করছেন। সেখানে তিনি নিজের স্টল নিয়ে হাতে তৈরি শৌখিন সামগ্রী দিয়ে সাজান। মোট কথা তিনি নিজস্ব ব্রান্ড 'Afrin's only' কে প্রোমোট করেন। তার এই প্রকল্পটি তার সন্তানের মতোই। 

সিতুয়া আফরিন জ্যোতির বলেন, 'আমার সাত বছর ও দুইবছর বয়সী ছেলে রাহীন ও ঋষভের মতোই আমার নিজস্ব প্রকল্প 'আফরিন'স অনলি' ধীরে ধীরে বড় হয়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটি প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে এবং আমেরিকার বুকে জায়গা করে নেবে, যে কোন দেশের মানুষ নিঃসংকোচে macys বা walmart এর মতন যে কোন শৌখিন জিনিস কেনার জন্য আমার শপের কথা মনে করবে, এটাই আমার স্বপ্ন। জানি অনেক বড় স্বপ্ন দেখেছি, কিন্তু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের ভাষায় "মানুষ তার আশার সমান বড়।" আমার স্বপ্ন বড়ো কিন্তু অসম্ভব নয়। সবার সাপোর্ট আর দোয়া পেলে আমি এই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে পারবো বলে বিশ্বাস করি। ইতোমধ্যেই দেশী বিদেশী অনেকেই আমার কাজকে ভালোবাসছেন। প্রশংসা করছেন। মেলায় অংশগ্রহণের জন্য আমাকে আমন্ত্রণ করছেন। এভাবেই আশা করি সবার মাঝে আমার স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে পারবো।' 



গহনা বানাতে ভালো লাগে-সুমাইয়া সুলতানা

 

আমাদের আরেকজন গহনা শিল্পী সুমাইয়া সুলতানা। গহনা গায়ে জড়ানোর প্রতি তার কখনোই কোনো ফ্যাসিনেশন ছিল না। কিন্তু তারপরও কিভাবে চলে আসলেন এই সেক্টরে, ঠিক মনে নেই। তবে গহনা বানাতে ভালো লাগে তার। 

সুমাইয়া সুলতানা বিজনেস শুরু করেন ২০১৭ সালে, বয়স যখন তার ঊনিশের কোঠায়। ভার্সিটি উঠেছেন। বাসা থেকে কোনো  আর্থিক সাপোর্ট নিতে চান নি তিনি। তাছাড়া আম্মুকে সাহায্য করবেন এই ভাবনা। তাই ৩০০ টাকা দিয়ে ক্রাফ্ট সামগ্রী কিনে হ্যান্ডমেইড গহনা বানানো শুরু করেন। আর সাথে কিছু টুকটাক কাগজের জিনিস। 

একটা ফেইসবুক পেইজ ওপেন করেন Anbaar's নামে।সেখান থেকে আস্তে আস্তে আফগানি এবং ইন্ডিয়ান গহনা নিয়ে কাজ করা শুরু তার। তবে তা ছিল অল্প সময়ের জন্য। একসময় তিনি  দেখলেন, বেশ কিছু পেইজে সেইম আইটেম সেল করা হচ্ছে। আরও কিছু ইস্যু চলে আসলো সামনে। তারপর হন্যে হয়ে তিনি নিজের ডিজাইনের পিছনে লেগে পড়লেন।  

সুমাইয়া সুলতানার ভাবনা ছিল, নিজের দেশের ডিজাইন করা জিনিস বানাবেন, তাহলে এর সাথে সাথে দেশের মানুষের উপকার হবে। মাসের পর মাস পাগলের মত ঘুরার পরে গহনার কারিগরের সোর্স পান। তখন ছিলো ২০১৯ সাল।  শুরু করেন দুইটা ডিজাইন দিয়ে। 

সুমাইয়া সুলতানা জানান, দেশী গহনা করা হয় মিক্সড মেটাল দিয়ে বিশেষ করে পিতল। তারপর যে যার পছন্দসই গোল্ড প্লেটেড, সিলভার বা নিকেল প্লেটেড করে নেয়। এই গোল্ড কালারেও ভালো খারাপ কোয়ালিটি আছে, বুঝে শুনে কিনেন। তখন যে দেশী গহনার পেইজ একদম ভরপুর ছিলো এমনটা নয়। আস্তে আস্তে তিনি পুরনো দিনের গহনা রিক্রিয়েট করা শুরু করেন কারণ সেকেলে জিনিস তাকে খুব টানে। 

তিনি বলেন, 'এর মধ্যে কাটাই গহনার কথা না বললেই নয়। এই গহনা একটা আর্ট। পাত কেটে নকশা করা হয় তারপর ছোট করাত দিয়ে খোদাইকর্ম। নিজে ডিজাইন করে, অন্য গহনা মডিফাই করে কাস্টমাইজড অর্ডার নেই, কারিগরের ডিজাইন সেল করে এভাবেই চলতে থাকি। কোভিডের প্রথম দুইটা লকডাউনে ব্যবসা ছিলো রমরমা। তখন বেশ কিছু নতুন ডিজাইন আনি, এর মাঝে জামদানী মোটিফ ও ছিলো। এত সাড়া পেয়েছি যে, মনে হয় হাজার হাজার পিস সেল করেছি। সেখানে আমাদের নিজস্ব নকশা ছিলো আবার কারিগরেরও। এছাড়া আমাদের বেশিরভাগ গয়নাই সর্বোচ্চ ২৪ পিস করে বানানো হয়।' 

সাত বছর ব্যবসার বয়স হলেও প্রচার এবং পুঁজির অভাবে এখনও বেশ ছোট বিজনেসই রয়ে গেছে সুমাইয়া সুলতানার। তাছাড়া ব্যবসা বৃদ্ধি করতে হলে ভালো লিঙ্ক আপের একটা ব্যাপার আছে, পরিচিত মহল থেকে যেই সুবিধা পাওয়া যায় সেটা তিনি কখনো পাননি। এরজন্য একসময় ভীষণ মন খারাপ হতো তার। তবে তিনি সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট পেয়েছেন তার মা, বোন আর পার্টনার থেকে। তবে বরাবরই প্রতিবন্ধকতা ছিলো তার পুঁজি। যা সেল করতেন তাই আবার ইনভেস্ট করেছেন। এভাবে কখনোই বড় কোনো প্রজেক্ট হাতে নিতে পারেননি তিনি। মাঝে একটা বিশাল ভুল করে ফেলেন। নিজের সর্বস্ব দিয়ে একটা স্টুডিওতে ডিসপ্লে কর্নার দেন। যেটা লস প্রজেক্ট ছিলো। সেটা সামাল দিতে খুব কষ্ট হয়েছে তার। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, 'যখন বড় ব্যবসায়ী হবো তখন আমার স্ট্রাগল শুনে কেউ মোটিভেট হতে পারে।এখনও পূর্ণ সাফল্যের কাছাকাছি আসতে পারিনি, তবে কাজ করে যাচ্ছি।' 

সুমাইয়া সুলতানা কানাডায় আছেন দু'বছর যাবত। এখানে চাকরি করছেন আর Anbaar's Canada নামে একটা উইং ওপেন করেছেন। যেখানে তার গহনার পাশাপাশি দেশীয় শাড়ি, ব্যাগ, ব্লাউজ, জুতা থেকে শুরু করে মোটামুটি সব ইউনিক আইটেম রাখার চেষ্টা করেছেন। এখানে অল্প সময়ে পরিচিতি পেয়ে গেছেন। তবে মজার ব্যাপার হলো গহনার ক্লায়েন্ট বেশি আমেরিকাতে।সবাই খুব পছন্দ করে তাদের জুয়েলারি। একসাথে দুই দেশে সময় দেয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার তার জন্য। তাই দেশে Anbaar's  পরিচালনা করার জন্য পার্টনার হিসেবে এক বছর যাবত আছে তার ফ্রেন্ড ফাহিমা। এর আগ পর্যন্ত বিজনেসের 'এ টু জেড' সব নিজেই হ্যান্ডেল করেছেন। তবে সাথে টুকটাক হেল্প করতো তার ছোট বোন।

নতুন গহনার আইডিয়া পাওয়া আসলে সহজ নয়। যেহেতু তাদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান নেই ডিজাইনিং নিয়ে। তাই দেখা যায় বিভিন্ন সোশ্যাল সাইটে দেখা জুয়েলারি, ফুল, বা জ্যামিতিক নকশা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি গহনা বানান। তবে আশা করছেন শীঘ্রই একাডেমিক কোনো কোর্স করবেন।

ক্লায়েন্ট কম হলেও  যারা  তার কাছে থেকে কিনেন, ভীষণ ভালো এবং রুচিশীল। একটা নির্দিষ্ট ক্লায়েন্ট বেইজ। আজ পর্যন্ত তিনি গহনা নিয়ে খুব একটা অভিযোগ পাননি বলে জানান।

এই বিজনেস কখনো শখ ছিল না তার। তাছাড়া খুব একটা প্রফিটেবলও না। ছাড়ার চেষ্টা করেছেন কয়েকবার। তারপরও কোনো এক অজানা টানে তিনি ছাড়তে পারেননি। 

সুমাইয়া সুলতানা বলেন, 'মায়া কাটানো বেশ মুশকিল। একটা উদ্যোগ নিজের সন্তানসম সবাই বলে।ইচ্ছে আছে বিদেশের মাটিতে দেশী পণ্যের এক বড় আসর বসাবো। একই ছাদের নিচে যেনো মানুষ সবকিছু পেয়ে যায়।'

তাছাড়া গোল্ড এবং ডায়মন্ড নিয়েও কাজ করতে চান তিনি। রুপার কাজ তিনি বহুদিন ধরে করছেন।  সুমাইয়া সুলতানা আরো বলেন, 'সাজ-সজ্জায় পোশাকের পর গহনা পরা হয় সৌর্ন্দয বাড়াতে। তাই জানা প্রয়োজন কোন অনুষ্ঠানে কী শাড়ি ও কী রকম মেক-আপ এর সাথে কী ধরনের গহনা পরলে আপনাকে মানাবে। আধুনিক নারীরা এখন আর আগের মতো ভারি গহনা পরেনা। তাঁতের শাড়ির সঙ্গে বাহারি মাটির গহনা বেশ মানানসই। এসব গহনা যে কোনো পোশাকের সাথে বেশ মানিয়ে যায়। যেমন টপসের সাথে মেটালের মালার সাথে বড় লকেট পরতে পারেন। সালোয়ার কামিজের সাথে কাঠ, বাঁশ বা মাটির যে কোন গহনা বেশ মানিয়ে যাবে। আর শাড়ির সাথে পরতে পারেন হালকা বা ভারি মেটালের গহনা।'

বিদেশে থেকেও দেশীও ডিজাইন নিয়ে গহনা করার মত আনন্দ সুমাইয়া সুলতানার মনকে ছুঁয়ে যায় বারবার।

সাজসজ্জা থেকে আরো পড়ুন