https://www.prothomalony.com/
10291
literature
নববধূ
নববধূ
ফজলুর রহমান চৌধুরী
মৌলভীবাজারের মুন্সীবাজার এলাকার নারায়ণক্ষেত্র গ্রাম। সবাইকে ওখানে বরযাত্রী যেতে হবে। তবে শর্ত আছে একটা- সবাইকে পাঞ্জাবী পায়জামা পরতে হবে। অলিখিত আইন বা ঘোষণা। যিনি বলেছেন তিনি এ বাড়ির একজন পরম শ্রদ্ধাভাজন ব্যাক্তিত্ব , আলোকিত , পরোপকারী একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ। সকলের প্রিয় পরহেজগার মানুষ। তিনি বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার সৈয়দ মুজাহিদ আলী মামা। বাড়ির সকলের ভালো মন্দ খোঁজ খবর রাখতেন। কাছের দৃরের সকল আত্মীয়, অনাত্মীয়ের মঙ্গল কামনা করতেন। বিপদে এগিয়ে আসার চেষ্টা করতেন। ১৯৮৪-৮৫ সালের ঘটনা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসসি ফাইনাল ইয়ারে পড়ছি। এ পরিচয় দিতেও কেমন জানি একটু ভালো লাগত। ছেলে- পুরুষ সবার পরনে পাঞ্জাবী, মাথায় টুপি। আমি ঢাকা থেকে এসেছি। বরযাত্রী যেতে তো হবেই। আমার নিজের পাঞ্জাবী ধোয়া বা ইস্ত্রী আছে কিনা কে জানে। সোজা পীরের গাও নানা বাড়ি দক্ষিনের ঘরে ঢুকে আলনা থেকে একটা রেডি পাঞ্জাবী পড়ে নিলাম। সাইজে একটু বড় তাতে কী। আগে নিজের জান বাঁচানো। কে এটার মালিক পরে দেখা যাবে। এ ঘরের বড়ভাই সৈয়দ জয়নাল আবেদীন নুহু ভাইসাব নিজের রেডি করা পাঞ্জাবী খোঁজা খুঁজি করে না পেয়ে আর একটা পড়ে বরযাত্রী গেলেন। আমি উনারটা পরিধান করেছি শুনে আর কথা বললেন না।
ছোট মামার বিয়ে। অনেক দিন ধরে আমাদের স্বাধ ইচ্ছে ছোটমামা, কারো ছোট চাচা, কারো চাচামণি, কারো ছোট দাদা, ডাইরেক্টর দাদা, কারো ‘মতই দা এর আরাধ্য বিয়েতে ধুমধাম করব, মজা করব। ৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের তুখোর ছাত্র নেতা , সমাজকর্মী, শিক্ষক , রাজনীতিবিদ, পল্লিবিদ্যুৎ সমিতির ডাইরেক্টর/ প্রেসিডেন্ট , চুনারুঘাট বাজারে একটি ফার্মেসী ব্যবসার মালিক সৈয়দ মুদাব্বীর আলী ছোট মামা। খুবই রুচিশীল, আধুনিক মনা, নেতৃত্য গুণসম্পন্ন অভিভাবক সুলভ ব্যক্তিত্ব বাড়ির সকলের , আত্মীয় পরিজনের অনুকরণীয়। মেয়েরা এ বিয়েতে তেমন সুবিধা করতে পারেনি পর্দানশীন শাসনে থাকার কারণে। জামাই কী করেন, আয় রোজগার কত এগুলো সম্পর্কে মেয়ের পক্ষ অনেক প্রশ্ন করত। ছোট মামা সরাসরি উত্তর না দিয়ে বুদ্ধিকরে সমাজে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। অনেক ক্ষেত্রে মেয়ে পক্ষ বা ছেলে পক্ষ এক মত হতে পারেনি। তবে এসে গেল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মরহুম ডাক্তার মুনিম সাহেবের শ্বশুড় বাড়ি নারায়ণক্ষেত্র , মুন্সিবাজার। তিনি আমাদের অনেকদিকে আত্মীয়। একজন আত্মীয়বৎসল আন্তরীক মানুষ। উনার স্ত্রীর ভাইএর মেয়ে স্কুল শিক্ষিকা রেবী চৌধুরী আজকের কনে। ডাক্তার সাহেবের মাধ্যমে এ আলাপটা শুভ পরিণয়ের দিকে যায়। একান্নভূক্ত বড় পরিবারের মেয়ে বর পক্ষের ও এররম বড় পরিবারের ঝামেলা সমলাতে পারবেন। এ রকম ইতিবাচক বিভিন্ন গুণাবলীর কথা শুনা যাচ্ছিল। বর ছোটমামা মেয়ে , কন্যা বা হবু বউকে দেখে ভালোই সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন ।
কনে বাড়িতে বিয়ের আক্দ , খাওয়া দাওয়া শেষে আমরা কজন(হুসেন ভাই , মুহিত, তুজাম্মুল, টেনু ভাই সাব) ছোট মামীর বাপ- চাচার সাথে কুশল বিনিময় করছিলাম নিজ নিজ পরিচয় দিয়ে। এক নানা সাহেব বলতে লাগলেন , “তোমাদের সৌভাগ্য আমরার এ পুরীরে নিয়ে যাচ্চ তোমাদের পরিবারে। এ রেবী চৌধুরী ছোট হাড়ি দিয়ে ভাত রাধতে জানেনা”। "ডেগের তলা অনেক গভীরে”। এ গুণকীর্তনভরা কথাগুলো নতুন আত্মীয় এডভোকেট মরহুম আব্দুল হক চৌধুরী নানার কাছ থেকে শুনে আমরা খুশিতে আটকানা। উপস্থিত সবাই এর মর্মকথা সাথে সাথে না বুঝতে পারলেও পরক্ষণে বুঝে নেন। আক্দ সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে উনারা আমরা পারস্পরিক পরমাত্মীয়-বন্ধু হয়ে গেলাম। নতুন জামাই অন্দর মহলে প্রবেশ করতে যাবেন রোছমৎ সুসম্পন্ন করার জন্য । তখন বর পক্ষের অন্য কোন পুরুষ সাথে যাওয়া নিষেধ হল । সেটা কিন্তু মূলত আমাদের পর্দাশীলতার কারণেই। তবে আমি এক ফাঁকে সাহস আর অধিকার নিয়ে ছোট মামীকে দেখতে ভিতরে চলে গেলাম। পাঞ্জাবী টুপি পরিহিত অপরিচিত একটি ছেলেকে ভিতর ঘরে দেখে কচি খালা (ছোট মামীর ছোট বোন) একটু চড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন , এখানে বর পক্ষের কোন ছেলে পুরুষ আসছে নাকি, পর্দার বরখেলাপ হবে। আমি ভীত আর শুকনো গলায় বল্লাম আমার ছোটমামীকে দেখতে এসেছি, চলে যাব নাকি। ঠিক আছে থাকেন তবে আর কাউকে ঢুকতে দেয়া হবে না। পরে এগুলো নিয়ে কত হাসাহাসি হয়েছে!
ভারী মিষ্টি চেহারার মিষ্টি রঙের ছোট মামীকে দেখে মনটা খুশীতে ভরে গেল। নানা নানুর পরিবারের আদরের ছোট ছেলে, বড় ভাই -বোনদের চোখের মণি, অতি স্নেহের ছোট ভাই মুদাব্বীর(মতই) এর আরাধ্য সকলের পরমাহ্লাদের বউ রেবী কে যখন বাড়িতে নিয়ে আসা হলো তখন সবাই মুগ্ধ হয়ে গেলেন।
যত দিন যেতে লাগল ছোট মামী ততই মুগ্ধতা ছড়াতে থাকলেন । যেন তার জন্মই হয়েছিল এ ঘরের বৃদ্ধা শাশুড়ীর, ভাসুর ভাবী-জাদের , দেবর , ননাস- ননদের, জামাই - বউ, ভাতিজা - ভাতিজী, ভাগ্না-ভাগ্নীদের , এ বাড়ির সকলের মেহমান - মুসাফিরির দায়িত্ব নিজকাঁধে তুলে নিতে। যেন পরম তৃপ্তিতে মমতাভরা আদর আপ্যায়নে, দায়িত্বে সকলের মন প্রাণ ভরিয়ে দিতে তিনি এসেছেন আল্লাহ তায়ালার এক স্বর্গীয় রহমত আর স্বাধ -ইচ্ছা নিয়ে। ছোট মামার বয়োঃজ্যাষ্ঠ নাতি নাতনিরা উনাকে আদরে ছোট দাদা বা মতই দা ডাকলেও ছোট মামীকে অনেকে ছোট দাদী বা ছোট ভাবী ডাকতেন। কারো আপদে বিপদে, বা সৌন্দর্য্য আর মুখরাখার আপ্যায়নে ছিলেন এক আস্থার স্থল, ভরসার যায়গা। স্বামী ভক্ত ছোট মামী নিজের ছোট ছোট জমানো টাকা পয়সা পরিকল্পনা করে আত্মীয় পরিজনের আদর আপ্যায়নে , প্রয়োজনে আবার ব্যয় করে সান্তনা পেতেন। নিজের ঘর বা বাড়ির অন্য ঘরে মেহমান , নাইয়রী আসার সুসংবাদে তিনি পুলকিত হতেন। শত ঝামেলার মাঝেও কয়েক পদের রান্না বা নাস্তার পসরা সাজিয়ে সুন্দর মিষ্টি রঙের শাড়ি পড়ে মিষ্টি হাসিতে অতিথিদের আমন্ত্রণ জানাতেন। এদিক সেদিক আশপাসের সবাইকে ডেকে অংশ গ্রহণ করাতেন। অভূতপূর্ব পরিবেশনায় ভরে যেত আগতদের দেহ মন।
বাড়ির লিডারের স্ত্রী- বরের ইস্পাত কঠিন সিদ্ধান্তের অন্তরালে যেন সমর্থন দিয়ে এক মায়াবী নেত্রী , অর্ধাঙ্গিনী -কে কোথায় আছে পরমা সুখে বা দুংখে সে খোঁজ খবরে ব্যস্ত হতেন। আরামে ব্যারামে দাওয়াই, খাদ্য আর সেবা দিতে ব্যস্ত হয়ে যেতেন। কারো দিতেন উৎসাহ আর অমোঘ সান্তনার বাণী। “আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে,আসে নাই কেহ অবনী ‘পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে ” ।
সবাইকে যেতে হবে এ ধরনী থেকে। কিছু কিছু চলে যাওয়া কাম্য নয়, মোটেই কাম্য হতে পারে না। কারণ সে যাওয়া তো দুরারোগ্য কোন ব্যারামে নয়, বার্ধ্যক্য জনিত কোন রোগে নয়। সে চলে যাওয়া তো আচমকা এক দুর্ঘটানার ফসল। এক সুন্দর সকাল বা উপভোগ্য বিকেলে বিনা মেঘে বজ্রপাত। দুর্ঘটনায় পড়ে পা দুটো ভেঙ্গে সিলেটের আলহারামাইন ক্লিনিকে ৪ মাস অবস্থান। পরিস্থিতি আসেনি সেখান থেকে অন্য রোথাও যাবার। একের পর এক অস্ত্রোপাচারে ক্ষত বিক্ষত দেহ মন, সকল আত্মীয় শুভাকাঙ্খীদের মন। সাথে আছে নববধূর মা ভাই-বোন, আছে বরপক্ষের ভাাতিজা- ভাতিজী, ভাগ্না, জা, ননদ- নাতনি। দূর দেশ থেকে গুটি জনেক ভাতিজা- ভাগ্নার ব্যর্থ আহাজারী! নববধূর জীবন সঙ্গী, সেই কঠিন প্রেমিক পুরুষ, আরাধ্য স্বামীর হাসপাতালের কেবিনে দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী একত্রে বসবাস। হৃদরোগী বর একটি রজনী ও প্রিয়তমা অসুস্থ স্তীকে ছাড়া কোথাও যাপন করেন নি । যত কষ্টই হউক ইস্পাত কঠিন শক্ত ভালোবাসা, শক্ত হৃদয়ে ইতি টানছেন।
নববধূ যখন এ ক্লিনিক থেকে ছুটি পেলেন তখন সময় যে একেবারেই শেষ। আল-হারামাইন হাসপাতাল থেকে সিলেট ওসমানী হাসপাতালের আইসিইউ তে শেষ নিঃশ্বাস। এ মুহূর্তে আল্লাহর দরবারে অন্তরের প্রার্থনা ছিল তাই। নববধূর সাদা কাপড় পরিহিত শেষ যাত্রা হল শ্বশুড় বাড়ির কবরস্থানে ২৮ মে ২০২৪। বুক ফাটা কান্নায় ভেসে গেলেন সবাই, কান্নায় ভেঙ্গে গেলেন নববধূর তিন বড় জা- আমাদের মামীগণ । যারা মামাদের অবর্তমানে তাদের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে আমাদের স্নেহ মমতায় আগলে রেখেছেন। তাদের সাথে ছোট বউ রেবীর অনেক স্মৃতি, অনেক ভালোবাসা। সবচেয়ে যে শেষে এসেছিল সে দিয়েছে সকল শূন্য করে। লন্ডন থেকে মেঝ মামী (ব্যারিস্টার মামার স্ত্রী) ফোনে কান্নাকাটি করে বল্লেন, “এবার কিসের কোরবানি ঈদ ! “রেবী যেখানে নেই আমাদের কোরবানি ঈদ ও নেই”। বাড়ির সবার, আত্মীয় পরিজনের হৃদয়ে শুন্য হাহাকার। ছোট মামী আর ফোনে বলবেন না , “মনু নি বা, ঈদে আমরারে দেইখ্যা যাইবায়, সবারে বুজ্যা শুইন্যা চালাইতেছ। ‘তোমার উপর তোমার মায়ের দোয়া আছে বা”। বেঁচে থাকা ছোট মামার হৃদয়ের কথা আর কী বলব! হৃদয়ে শান্তি আর সুস্থতা কামনা। ছোট মামীকে আল্লাহ পাক জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন।পরিবারের সবাই ভালো থাকেন।#
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন