https://www.prothomalony.com/

10203

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত্য

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৪ ১২:০৮

আমেরিকার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন ফোর্থ অফ জুলাই, স্বাধীনতা দিবস। ১৭৭৬ সালের ২ জুলাই ইংল্যান্ডের শাসন থেকে পৃথক হওয়ার জন্য ভোট দেন আমেরিকার দ্বিতীয় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস। এর দুদিন পর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় কংগ্রেস। কিন্তু পৃথক হতে ব্রিটেনের সঙ্গে চূড়ান্ত স্বাক্ষর ২ আগস্টে অনুষ্ঠিত হলেও প্রত্যেক বছর ৪ জুলাই স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করে যুক্তরাষ্ট্র। এ দিনটির জন্য জীবন দেন ২৫ হাজার বিপ্লবী আমেরিকান এবং ২৭ হাজার ব্রিটিশ ও জার্মান সেনা। এই দিনটি শুধু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরের উদযাপন নয়, বরং এটি জাতির আত্মপরিচয়, ঐক্য, এবং স্বাধীনতার মূলমন্ত্রকে পুনরায় স্মরণ করার দিন। আমেরিকার জন্মকথা, সংগ্রামের ইতিহাস, এবং স্বাধীনতার মূল্যবোধকে গভীরভাবে অনুভব করার একটি বিশেষ উপলক্ষ। উত্তরের সাহিত্য পাতায় আমরা তাই এই বিশেষ দিনটিতে আমেরিকার ইতিহাস, উৎসবের নানা রং, এবং সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাধীনতার অর্থ তোলে ধরে আমেরিকাকে জানাতে চাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা। স্বাধীনতার এই বিশেষ দিনটিকে উদযাপন করার জন্য আমাদের সাহিত্য পাতায় আপনাকে স্বাগতম।

- এইচ বি রিতা। 



স্বাধীনতা একটি তরবারির মতো  

তমিজ উদ্‌দীন লোদী 



স্বাধীনতা একটি তরবারির মতো ধারালো, নিপুণ 

রক্ত লেগে থাকে, ঝলসানো লাশের গন্ধ লেগে থাকে 

শাস্তি, নিগ্রহ-নিপীড়ন লেগে থাকে 

মায়ের বার্ধক্য পীড়িত বিয়োগব্যথার অনুষঙ্গ লেগে থাকে

 

ফাঁসির রজ্জু দুলতে থাকে, ক্রসফায়ারে উড়ে যায় খুলি 

দলিত-মতিত যুবতীর লজ্জা ও ক্লেদ প্রশ্নাতুর হয় 

ক্যামফ্লেজে ঢেকে যায় মাথা 

ফ্যাকাসে আকাশ কিংবা চরম রৌদ্র থেমে থাকে না 

অসহায়, ভীত, নগণ্য মেঠো ইঁদুরের মতো সময় থমকে থাকে 

 

রক্তের উষ্ণীষ পরে দাঁড়িয়ে থাকে স্বাধীনতা 

গৃহযুদ্ধের ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে স্বাধীনতা 

উচ্ছন্ন উন্মূল উদ্বাস্তু মানুষের অশ্রু নিয়ে বেঁচে থাকে স্বাধীনতা 

 

মারটিন লুতার কিং জুনিয়র ও তাঁর সিভিল রাইটস

মুভমেন্ট-এর মধ্যে 

জেগে থাকে স্বাধীনতা 

 

মানবধিকার প্রতিষ্ঠা ও 

গণতন্ত্রের পদতলে বেঁচে থাকে স্বাধীনতা 



জুলাইয়ের চতুর্থ ভোর

রুদ্রশংকর



চোখের সামনে ফিলাডেলফিয়া শহর...  

ঘন্টা বাজলে একটু একটু করে 

মাথার মধ্যে ঝলসে উঠছে স্বাধীনতা 

এ হাতে প্রেম, ও হাতে বিরহ নিয়ে  

শরীর থেকে কোথাও খসে পড়ছে ছায়া

কোথাও দোল খাচ্ছে আনন্দ 

কি জানি, কি ভেবে আমি ও আমার ইচ্ছেরা 

যেখানের যত স্বাধীনতা কুড়িয়ে 

রাখে আসি সমুদ্র থেকে আরও উজ্জ্বল সমুদ্রে 

 

কখনো চঞ্চল হলে আমি তাদের কথা শুনি

যত্ন করে সেলাই করা প্রতিটা বাক্য  

যেন একটা সাহসের গল্প

যেন একটা লড়াইয়ের কবিতা 

এইভাবে প্রতি বছর জুলাইয়ের চতুর্থ ভোর হয়  

আমাদের প্রাচীন ও নতুন ঐতিহ্যে 

লাল, সাদা, নীলের সিম্ফনি মেখে পতাকা ওড়ে 

তোমাকে ছুঁতে পারার আনন্দে বুঝতে পারি  

কতটা আঘাত বুকে জমলে 

স্বপ্নগুলো ওড়ে, স্বাধীনতার জন্ম দেয় সভ্যতা।     



শুভেচ্ছা, আমেরিকা

খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন



আমেরিকা একটি বিশাল দেশ, এসো পরস্পর হাতে 

হাত ধরি-এখানে নিজেদের প্রাঙ্গণ রচনা করি

এখানে নানান দেশের; নানান বর্ণের মানুষ আমরা

নানান গোত্রের নানান ধর্মের

নিরঝঞ্জাটে নিরাপদেই; আছি সকলেই বেশ!

 

এখানে বিভেদ বিসম্বাদ সব ভুলে

নিজেদের সংস্কৃতির জানালা খুলে

নির্বিবাদে আমরা; প্রাণ মন তুলে ধরি

মুক্তবাক হয়ে; স্বাধীন ব্যক্তিসত্তা নিয়ে

দৃপ্তপদে এক তালে; পাশাপাশি যাই এগিয়ে

একযোগে সকলকে; আমরা বিকশিত করি।

 

আমেরিকা একটি সুন্দর-বিশাল মানবজমিন     

এসো এখানে বুনন করি; আমাদের স্বপ্ন রঙিন

আমাদের জাতিসত্তা; তুলে ধরি অনন্য উচ্চতায়

বাঙালি, বাংলাভাষা, বাংলাদেশকে এক কথায়

উন্মুক্ত এই পরিসরে; বিশ্বসভায় করি পরিচিত

এই আমেরিকায়; আমরা বাঙালি সকলে হই স্থিত।

 

আমেরিকা এখন; আমাদের সকলের আর একটি দেশ

স্বাধীনতা দিবসে তাকে জানাই; আমাদের শুভেচ্ছা অশেষ।



স্বাধীনতা

আহসান জামান 



স্বাধীনতা; অনেক অন্ধকার ঠেলে

বেরিয়ে আসা সূর্যালোক; প্রত্যশার

গান, একদল বুনো ফুলের মিতালি।

 

স্বাধীনতা; অনেক কষ্টের সমাহার

থির হয়ে ডুবে যায় গহীন তলদেশে;

সর-পরা ক্ষীরের নিচে জমে থাকা

কত অজানা গল্প; অন্ধ মৃত্যুকূপ।

 

স্বাধীনতা; ফির-ফিরে হাওয়াদোল 

উচ্ছল দামাল, যেনো এক অজান্তা

নাচের ঘুঙুর; হৈ হৈ করে বেড়ে ওঠে

জীবন; মানুষের অদম্য স্বপ্ন চাষাবাদ।

 

স্বাধীনতা; অনেক কিছু ভেঙেচূঁড়ে 

অথবা হারিয়ে সে আসে শান্তির

সাদা কবুতরের ডানায় ভেসে।



উই দ্য পিপল

আশরাফ হাসান 



আমাদের আইনসভা আক্রান্ত হয়েছে 

কালো নৈরাশ্যমাখা বিদ্বেষ-বাহুতে 

উচ্চকিত হয়েছে প্রলয় ও প্রমত্তভয় 

দ্বিখণ্ডিত চাঁদের মতো আদিম হাতে উঠেছে সাদাকালোর

বিভাজন-পতাকা l

ফুল ও পাতায় কিট সংক্রমণের মতো 

আটলান্টিকের বাতাসে 

উড়ে এসেছে টোটালিটারিয়ান চর 

মানুষের চোখ থেকে মুছে দিতে চেয়েছে 'উই দ্য পিপল' 

 

অভিষেকে ভাসলে তুমি 

অবশেষে সমুদ্রে বারুদের ঘ্রাণ ভেসে যাওয়ার মতো 

জনতার স্রোতে ভেসে উঠলো সবুজ গণতন্ত্র 

তরুণী পাঠ করলো অস্ত্রনমিতকরণের কবিতা। 

নেকড়ের উল্লাস থেকে বাসি চিৎকারের মতো 

আকাশ থেকে মেঘের গর্জন নেমে এলো দিগন্তে। 

তুমি ভেঙে দিলে অবরুদ্ধ ভালোবাসার প্রাচীর 

যেনো আবারো আব্রাহাম মানুষের ইশতেহার পাঠ করলেন। 



মানবিক পতাকা

 মনিজা রহমান



অন্য এক মানচিত্রে, অন্য এক মানবিক পতাকা

আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে সব। সবকিছু কড়ায় গন্ডায়।

সেই চেরি ফোটার দিনে এই শহরে আমি অপরিচিত।

অনিশ্চিত। বেঁচে ছিল কেবলই বর্তমান।

বর্ষায় জমে থাকা জলে নিজের চেহারা 

চিনতে পারিনি নিজেই। অথচ একদা আমার আকাশ ছিল।

নিজস্ব জ্যোৎস্না ছিল, নিষ্পাপ নিঃশ্বাস ছিল।

জমাট বিষণ্ণতায় মনোজগত আকীর্ণ তখন।

 

শুরু করি শূন্য থেকে। 

বিমুখ বাতাস ফিরে এসে জনান্তিকে বলে গেল

'তোমার নাম স্পেশাল মা’। আমিও তবে স্পেশাল?

অতঃপর ফিরে পেলাম নিজস্ব আকাশ, বিহ্বল জানালা,

পুরনো ল্যাপটপ এবং আমারই মত আমার ছায়া।

ফিরে পেলাম শৈশবের নদী। আর নদী-পাখিদের গোল্লাছুট।

মেঘের দরোজা খুলে ঈগলেরা উড়িয়ে দিল লাল-নীল কনফেটি।

দিগন্তে জেগে উঠল আমার পরিচয়– আমি স্পেশাল মা।

বাতাসের সাথে মায়াবী ঈগল আর মানবিক পতাকার

 আদর -জানিয়ে দিল জীবন সত্যের মত অনিন্দ্য।



উত্তরীয় লাবণ্য

সুমন শামসুদ্দিন



তোমার বক্ষে বিচিত্র রূপে নানান ঢঙের শোভা,

ক্রাঁতিবৃত্তের ভূমি থেকে শেষে ক্যানিয়ন মনোলোভা!

প্রশান্ত থেকে অতলান্তিক প্রান্ত ছুঁয়েছে জল,

অ্যাপালেশিয়ান হিম হয়ে থাকে গগন ছোঁয়ার দল।

 

মনুমেন্ট ভ্যালি, কলোরাডো তীর, গিরিখাত সুবিশাল,

বিস্ময়তায় জুড়ায় যে চোখ, গড়েছে মুগ্ধজাল।

ব্যাডওয়াটার, ডেনালির চূড়া, ঈগলচোখের দৃষ্টি,

বুনো পশ্চিম, পূব-উত্তর চমক-ভূমের সৃষ্টি!

 

হিমেল আঁখিতে জীর্ণ-শীর্ণ উলঙ্গবন স্থির,

গ্রীষ্মে তোমার চিরহরিতের স্নিগ্ধ শান্তনীড়।

ইয়েলোস্টোনের উষ্ণফোয়ারা প্রাকৃতিক চারুশোভা,

আলপাইনের মনোরম জলে চোখে ভেসে ওঠে প্রভা।

 

এ্যান্টেলোপের অবাকদৃশ্য মুগ্ধভূমির ছবি,

বৃহৎ হ্রদের পারে বসে তাই বিমুগ্ধ দেশকবি।

ভেদাভেদহীন বিচিত্রভূমি যেন এক মাধুরিকা ,

শত-সহস্র লাবণ্যময়ী এই রূপ-চয়নিকা।


তোমার কাছে নত হতেই হয় আমেরিকা

এইচ বি রিতা

 

তোমার কাছে নত হতেই হয় 

যতটা হই প্রভু-মা আর মাটির কাছে 


হৃদয়ের স্পন্দন জীবনের অনুচ্ছেদে

লেগে আছে বিজ্ঞানের ছোঁয়া তোমার হাত ধরে

মৃত ডানায় স্বপ্নের উড়াল শিখিয়েছো তুমি

শিখিয়েছো-শির উচ্চে দাঁড়ানোর সংজ্ঞা, অস্তিত্বের 

প্রয়োজনে লড়াই কিংবা প্রতিবাদের সুগম পথ

 

এই পতাকা তোমার-আমার

উড়ুক বিশুদ্ধ বাতাসে 

লাল, সাদা, নীলের ছায়া ঢেকে রাখুক আশ্রয়হীন

উদ্বাস্ততের দল; 'বিশেষ' বিশেষণে আমাদের অস্তিত্ব

স্বপ্নের পাখনায় উড়ুক সম্ভাবনা-ন্যায্য ও সমতা

ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে সামিল হোক বিশ্ব

শান্তি আর প্রগতির পথে, এগিয়ে যাই আমরা 

 

আমেরিকা, তুমি হও আরও উদ্ভাসিত

তোমার কাছে নত হতেই হয় 

যতটা হই প্রভু-মা আর মাটির কাছে। 

 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন