শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ ০০:২৪
মানুষ কিছু কিছু বড় পাপকে হালকা করে দেখে থাকে এটাই তার চিরাচরিত অভ্যাস। এর মধ্যে একটি পাপ আমাদের সমাজে মহামারী আকার ধারণ করেছে তা হলো পুরুষের টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরা, তা প্যান্ট, পায়জামা, লুঙ্গি বা জুব্বা যেকোনো পোশাকই হোক না কেন। ছোট-বড়, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবাই অনায়াসে এই কাজ করে থাকে। এ বিষয়ে কেউ উপদেশ দিলে তাকে সেকেলে বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়, আধুনিকতার দোহাই দিয়ে যুক্তি খণ্ডন করার চেষ্টা করা হয়।
আমরা মসজিদে কাতারবন্দী হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সালাত আদায় করি, অথচ সালাত শেষে অনেকেই প্যান্ট বা পায়জামা টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে দেয়। সালাতে আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের ইহুদী-নাসারাদের পথে পরিচালিত না করেন (ফাতিহা: ৭), অথচ সালাত শেষ হতে না হতেই তাদেরই অনুকরণ শুরু করি। আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহর নামে কৃত অঙ্গীকার ও নিজেদের শপথকে স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করে, আখেরাতে তাদের কোনো অংশ নেই; কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবেন না, আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি (আলে-ইমরান: ৭৭)।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এই পাপের ভয়াবহতা উল্লেখ করলেন, তখন আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন তারা কারা। তিনি বললেন, যে টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরে, যে পণ্যের কাটতির জন্য মিথ্যা কসম করে এবং যে দান করার পর খোঁটা দেয় (মুসলিম: ১০৬)। আল্লাহ পৃথিবী সৃষ্টির সময় একশত দয়া সৃষ্টি করেছেন, যার একটি সমগ্র সৃষ্টিজগতে বিতরণ করেছেন আর বাকি নিরানব্বইটি নিজের কাছে রেখেছেন বিচারের দিন বান্দাদের ক্ষমা করার জন্য (বুখারী: ৬৪৬৯, মুসলিম: ২৭৫২)। এরপরও এই সামান্য পাপের কারণে কেউ যদি আল্লাহর দয়া থেকে বঞ্চিত হয়, তবে হাশরের ময়দানে তাকে আঙুল কামড়াতে কামড়াতে জাহান্নামে যেতে হবে (ফুরক্বান: ২৭-২৮)। সেদিন কেউ কারো উপকারে আসবে না; আল্লাহ বলেন, সেদিন মানুষ পালাবে তার ভাই, মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তান থেকে, প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ে বিভোর থাকবে (আবাসা: ৩৪-৩৭)।
প্যান্ট, লুঙ্গি, পায়জামা, জামা সবগুলোর ক্ষেত্রেই একই বিধান প্রযোজ্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি অহংকারবশত কোনো পোশাক হেঁচড়িয়ে চলবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে তাকাবেন না (বুখারী: ৫৭৮৩, ৫৭৮৪; মুসলিম: ২০৮৫)। কেউ ভাবতে পারেন, তিনি অহংকার করে নয়, স্টাইল হিসেবে এমন করেন। কিন্তু ইসলামের বিধান অবজ্ঞা করা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করাই মূলত অহংকার। এমনকি এক ব্যক্তি অহংকার করে টাখনুর নীচে কাপড় পরার কারণে তাকে জমিনে ধসিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং কিয়ামত পর্যন্ত সে জমিনের মধ্যে ধসতে থাকবে (বুখারী: ৩৪৮৫, ৫৭৮৯; মুসলিম: ২০৮৮)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। তখন একজন জিজ্ঞেস করলেন, কেউ তো তার পোশাক ও জুতা সুন্দর হোক তা পছন্দ করে, এটাও কি অহংকার? তিনি বললেন, আল্লাহ নিজে সুন্দর এবং সৌন্দর্য পছন্দ করেন; অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা (মুসলিম: ৯১)।
টাখনুর নীচে কাপড় পরিধানকারীর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার বলেছেন, কাপড় টাখনুর নীচে যে পরিমাণ ঝুলবে সে পরিমাণ জাহান্নামে যাবে (বুখারী: ৫৭৮৭)। তিনি আরও বলেছেন, তিন প্রকার লোকের সাথে আল্লাহ কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না, বরং তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি টাখনুর নীচে কাপড় পরিধানকারী, খোঁটাদানকারী ও মিথ্যা কসমে পণ্য বিক্রয়কারী (মুসলিম: ১০৬)। কেউ ভাবতে পারেন কেবল টাখনুর নীচের অংশই জাহান্নামে যাবে, বাকি শরীর নয়। কিন্তু বিদ্যুতের শকের মতোই পুরো শরীর এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জাহান্নামবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে কম আযাব হবে যাকে আগুনের ফিতাসহ জুতা পরানো হবে, যাতে তার মগজ ফুটতে থাকবে তামার পাত্রের পানির মতো, অথচ সে হবে সবচেয়ে কম শাস্তিপ্রাপ্ত (মুসলিম: ২১৩)।
সালাত অবস্থায় টাখনুর নীচে কাপড় পরিধান করলে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে যায়। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি সালাত অবস্থায় নিজের কাপড় টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে পরবে, তার হালাল বা হারাম অবস্থায় থাকা নিয়ে আল্লাহর কিছু যায়-আসে না, অর্থাৎ তার দায়িত্ব আল্লাহ নেবেন না (আবু দাউদ: ৬৩৭)। তাই সালাতে যাওয়ার সময় কাপড় গুটিয়ে না নিয়ে সবসময় টাখনুর উপরে রাখাই শ্রেয়, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাতে কাপড় বা চুল গুটাতে নিষেধ করেছেন (বুখারী: ৮১৬, মুসলিম: ৪৯০)।
পুরুষরা ঠিক কতটুকু কাপড় পরতে পারবে তা-ও ইসলামে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর নলার পেছনের অংশ ধরে বলেছিলেন, এটা লুঙ্গি বা পায়জামা পরিধানের স্থান; না মানতে চাইলে আরেকটু নীচে নামানো যায়, তবু না মানলে জেনে রাখো, টাখনু স্পর্শ করার কোনো অধিকার কাপড়ের নেই (তিরমিযী: ১৭৮৩)। সুতরাং পুরুষের কাপড় টাখনু পর্যন্ত থাকতে পারে, তার নীচে নয়—তবে অসতর্কতাবশত কখনো নেমে গিয়ে সাথে সাথে তুলে নিলে কোনো গুনাহ হবে না ইনশাআল্লাহ।
মহিলাদের ক্ষেত্রে বিধান ভিন্ন। উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মেয়েরা কাপড় কতটুকু ঝুলিয়ে পরবে। তিনি বলেছিলেন, এক বিঘত পরিমাণ। উম্মে সালামা বললেন, তাহলে তো পা উন্মুক্ত হয়ে যাবে। তিনি বললেন, তাহলে এক হাত পরিমাণ, তার বেশি নয় (তিরমিযী: ১৭৩১)। অর্থাৎ মহিলাদের কাপড় পদতল পর্যন্ত ঝুলিয়ে পরতে হবে, যাতে চলাফেরার সময় পায়ের সৌন্দর্য প্রকাশ না পায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে মহিলাগণ এভাবেই কাপড় পরতেন, ফলে তাদের কাপড় মাটিতে হেঁচড়িয়ে চলত।
বর্তমানে অনেক পুরুষ প্যান্ট-পায়জামা-লুঙ্গির পাশাপাশি জুব্বাও টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে পরে থাকেন, যা আরও পরিতাপের বিষয়—কারণ অপরাধের দিক থেকে এসব সমান। কেউ কেউ ভাবেন জুব্বা বা আলখেল্লা হয়তো ব্যতিক্রম, কিন্তু মূলকথা হলো টাখনুর নীচে যেকোনো পোশাক পরাই একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত। মনে রাখা প্রয়োজন, পুরুষের নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত মূল সতর যা ঢেকে রাখা ফরয, অথচ আজকাল অনেকে নাভি উন্মুক্ত রেখে টাখনু ঢাকতে ব্যস্ত। নারী-পুরুষ উভয়কেই তাই নিজ নিজ বিধান যথাযথভাবে মেনে চলা প্রয়োজন। কোনো নোংরা বা কাদাযুক্ত পানি পার হওয়ার সময় মানুষ ঠিকই কাপড় টাখনুর উপরে তুলে নেয়, দুনিয়ার সামান্য কাদা থেকে বাঁচার জন্য এই সতর্কতা নেওয়া হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে একই সতর্কতা কেন নেওয়া হয় না, তা ভাবার বিষয়।
সুন্নাহকে খুঁটিনাটি বলে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এমন এক কঠিন সময় আসবে যখন সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে ধারণকারী ব্যক্তি বিশাল নেকী লাভ করবে। তাই কোনো বিধানকে ছোট মনে না করে তা যথাযথভাবে পালন করা উচিত, কারণ এতে যেমন দুনিয়াবি উপকার রয়েছে তেমনি রয়েছে অফুরন্ত নেকীও। আল্লাহ আমাদের সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন!
অভিমত থেকে আরো পড়ুন