https://www.prothomalony.com/

17964

opinion

অভিমত

আর্কিটেক্ট কাজী খালেদ আশরাফ : প্রবাসের এক আলোকবর্তিকা

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ ০১:০৭

কাজী খালেদ আশরাফের পরিচয় গর্ব করার মতো। আমার কাছে কিছু মানুষের শীর্ষে তার অবস্থান। কেউ যখন জিজ্ঞেস করে প্রবাসীরা বাংলাদেশে বিনা পয়সায় পড়াশুনা করে বিদেশ গিয়ে সবাই কেন মাতৃভূমিকে ভুলে যান? এটি সঠিক নয়। তখন আমরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারি একজন কাজী খালেদ আশরাফের নাম। বিভিন্ন কারণে খুব কম প্রবাসী আছেন যারা অবদান রাখতে পারেন বা রাখার চেষ্টা করেন। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই তা পারেন না। যারা পারেন তারা আমাদের দায়বদ্ধতাকে কিঞ্চিৎ হলেও রক্ষা করে আমাদেরকে প্রেরণা দেন, আমাদের আশার আলো দেখান, উৎসাহ দেন। আমরা নীরবে কৃতজ্ঞতাবদ্ধ হই।

তাদের অনেককেই আমরা চিনি না। কিন্তু যাদের চিনি তাদের নিয়ে আলাপ আলোচনা করলে প্রকারান্তরে আমরাই উপকৃত হই। আগামী রোববার,  ২৩ আগস্ট  ফিলাডেলফিয়াতে আমরা কাজী খালেদ আশরাফ নিয়ে একটি বিকেলের আয়োজন করেছি। তার কথা, তার কাজ, তার জীবনের চ্যালেঞ্জ আর ভবিষ্যতের প্রকল্পনার কথা শুনতে চাই। আমার ভালো লাগলো এই অনুষ্ঠানে সবার উৎসাহ দেখে। সবাই শুনতে চায় আমাদেরই একজন কমিউনিটির সদস্য, প্রবাসী হয়ে ও দেশের জন্য কত বড় বড় কাজ করে যাচ্ছে। মেধা, কল্পনা আর ভালোবাসা নিয়ে কোনো এক দায়বদ্ধতার টানে নিজেকে বিলিয়ে দেয় কিছু মানুষ।

১৯৭১ সালে স্থাপিত বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ ডেলাওয়্যার ভ্যালি, বাংলাদেশ আমেরিকান কমিউনিটি ফোরাম, ফিলাডেলফিয়া পত্রিকা সহ, স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ একসাথে এগিয়ে এলেন। বিভাজন নেই, মতান্তর নেই। শুধু আছে সম্মাননা আর এক অনাবিল ভালোবাসা। ফিলাডেলফিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান।

ছোট ভাইয়ের মতো খালেদকে আমি গভীরভাবে চিনি ১৯৮৭ থেকে ফিলাডেলফিয়া একসাথে বেড়ে ওঠার কারণে। তার সম্বন্ধে লিখতে গেলে তা শেষ হবে না। খালেদ আশরাফ একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। একজন বিনয়ী, স্বল্পভাষী, মানবিক এবং স্রষ্টার বহু আশীর্বাদপুষ্ট। তিনি একজন শুধু আর্কিটেক্টই নন, তিনি একজন নামকরা নগর পরিকল্পনাবিদ, একজন বিখ্যাত একাডেমিক, বিদগ্ধ গবেষণাবিদ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক, ডকুমেন্টারি নির্মাতা এবং তাত্ত্বিক। বর্তমানে তিনি ঢাকার স্বনামধন্য বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড সেটেলমেন্টের ডিরেক্টর জেনারেল।

১৯৮৩ সালে বুয়েট থেকে আর্কিটেকচারে ডিগ্রি নেবার পরে আমেরিকার এমআইটি থেকে মাস্টার্স, তারপরে ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া থেকে পিএইচডি লাভ করেন। তারপর ২৫ বছর ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াই, ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া এবং টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেন। তারপর এতদিনের অভিজ্ঞতা আর শিক্ষাকে বাংলাদেশের উন্নতির জন্য নিজের তাড়না থেকে ২০১৫ সালে বাংলাদেশে ফিরে যান। তার সহপাঠী স্ত্রী আর্কিটেক্ট হাসিনা চৌধুরী ও সন্তানেরা ফিলাডেলফিয়াতে থেকে যান। খালেদ তখন দুই দেশ বাংলাদেশ আর ফিলাডেলফিয়ার বাসিন্দা হয়ে যান। জীবনযুদ্ধ যতই কঠিন হোক না কেন বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে খালেদের নিরলস কাজ থেমে থাকেনি। তিনি তার সেন্টারকে উপমহাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় গবেষণা এবং ডিজাইন কেন্দ্র হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। ২০২০–২০২২ সালে আগা খান অ্যাওয়ার্ডের মাস্টার জুরি কমিটিতে নির্বাচিত হন। পৃথিবীর বহু জায়গায় তিনি আন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তৃতা করেছেন। লেখক হিসাবে খালেদ আশরাফ বিভিন্ন বিষয়ে তার জ্ঞানগর্ভ লিখনি দক্ষিণ এশিয়ার আর্কিটেকচার, আর্কিটেক্ট লুই কান এবং আরো অনেক বিষয়ে নামকরা জার্নাল, বই, গবেষণাপত্র আর এনসাইক্লোপিডিয়াতে প্রাধান্য পেয়েছে।

তার লেখা থেকে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে আধুনিক স্থাপনা আর তার বিশ্লেষণ থেকে ঢাকা শহর আর এই ব-দ্বীপ দেশে নগরায়নের দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

তার প্রবন্ধ থেকে বাংলাদেশের কিংবদন্তি স্থপতি মাজহারুল ইসলামের চিন্তাধারাকে উন্মোচিত করেছে। আমেরিকার স্থপতি লুই কানের কাজের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমেরিকা আর বাংলাদেশে তার অনেক লেখা, আর আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী বহুল সম্মানিত হয়েছে। বাংলাদেশের ডেইলি স্টার পত্রিকার তিনি একজন নিয়মিত লেখক। তার ইদানীংকালের সবচেয়ে নামকরা বই হচ্ছে পদ্মা নদীর উপর লেখা “দ্য গ্রেট পদ্মা: দ্য এপিক রিভার দ্যাট মেড দ্য বেঙ্গল ডেল্টা”।

১৯৯৭ সালে খালেদ জেমস বেলুয়াডের সাথে মিলে নিউইয়র্ক শহরে দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিকতাকে তুলে ধরার জন্য আর্কিটেক্টস লীগ অফ নিউইয়র্কে একটি এক্সিবিশন করেন। দ্য এক্সিবিশন, “অ্যান আর্কিটেকচার অব ইন্ডিপেন্ডেন্স: দ্য মেকিং অব মডার্ন সাউথ এশিয়া”, দ্যাট হাইলাইটেড দ্য ওয়ার্কস অব বালকৃষ্ণ দোশি, অচ্যুত কানভিন্দে, চার্লস কোরিয়া অ্যান্ড মুজহারুল ইসলাম। এই এক্সিবিশন আমেরিকার ৫টি শহরে প্রদর্শন করা হয়।

খালেদ আশরাফের সম্পাদনায় একটি স্পেশাল বই “আর্কিটেকচারাল ডিজাইন অন কনটেম্পোরারি আর্কিটেকচার ইন ইন্ডিয়া” বের করার জন্য তাকে “ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব আর্কিটেকচারাল ক্রিটিকস ইন ২০০৮” অ্যাওয়ার্ড দিয়ে সম্মাননা করা হয়। তার আরেকটি বই “দ্য মাদার টাং অব আর্কিটেকচার” এই বছর ২০২৬ সালে আরেকটি সম্মাননা “ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব আর্কিটেকচারাল ক্রিটিকস ইন ২০২৬” লাভ করেন।

ঢাকায় ছাত্র থাকতেই জনপ্রিয় কার্টুন ম্যাগাজিন “উন্মাদ” পত্রিকার তিনি যুগ্ম সম্পাদক হিসাবে ১৯৭৮ সালে তা প্রকাশ করেন। তা ছাড়াও তার কার্টুন বাংলাদেশের টি নেশন, আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া ইনকোয়ারার আর স্বনামধন্য নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয়েছে।

ঢাকায় যাবার পরে খালেদ আশরাফ ডিজাইন প্র্যাকটিসে মনোযোগ দেন। তার বর্তমান কাজের বিষয় হচ্ছে জল আর ভবিষ্যতের শহর বা স্থাপনায় জলের ব্যবহার আর সুযোগ তৈরি করা। এই দেশে জলের ব্যবহারকে নিয়ে তার চিন্তাধারাগুলি তিনি নতুন ডিজাইন নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছে।

একজন নগর আর্কিটেক্ট হিসাবে তার বেঙ্গল ইনস্টিটিউট থেকে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর যেমন নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, মোংলা কে উন্নতির জন্য পরিকল্পনা করেছেন। ঢাকায় তার বহু কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবহন, পরিবেশ, খোলা জায়গার রূপায়ণ করে ঢাকার মতো একটি জটিল মহানগরীকে কীভাবে বিভিন্ন পদ্ধতিতে রূপান্তর করে সুন্দর করা যায়।

কাজী খালেদ আশরাফ নিঃশর্ত, নিঃস্বার্থ, নিজ এবং পরিবারের আত্মত্যাগ দিয়ে যে জীবনের রচনা করেছেন তার মহিমা আমাদের প্রবাসীদেরকে বিশেষ অনুপ্রেরণা দেবে বলেই আমার বিশ্বাস।

জিয়াউদ্দিন আহমেদ
কিডনি বিশেষজ্ঞ। অধ্যাপক টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়, এমেরিটাস অধ্যাপক ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ মেডিসিন, ফিলাডেলফিয়া।
 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন