https://www.prothomalony.com/

17990

opinion

অভিমত

বুক জ্বলে না, তবু কি অ্যাসিড রিফ্লাক্স হতে পারে?

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ ০১:৫৯

রাতে ঘুমাতে গেছেন। হঠাৎ শুকনো কাশি। গলাটা কেমন খুসখুস করছে। সকালে উঠে দেখলেন কণ্ঠস্বরও একটু ভাঙা। অথবা দিনের পর দিন মনে হচ্ছে গলার ভেতর যেন কিছু একটা আটকে আছে।

স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে—অ্যালার্জি, সর্দি কিংবা গলার কোনো সমস্যা।

কিন্তু এর পেছনে যে পাকস্থলীর অ্যাসিডও দায়ী হতে পারে, তা আমরা অনেকেই ভাবি না।

আমাদের কাছে ‘অ্যাসিডিটি’ বা ‘গ্যাস’ বললেই প্রথমে মনে পড়ে বুকজ্বালা, টক ঢেকুর কিংবা পেটের অস্বস্তির কথা। অথচ অ্যাসিড রিফ্লাক্সের গল্পটি শুধু বুকজ্বালায় সীমাবদ্ধ নয়। কখনো দীর্ঘদিনের কাশি, গলা ভাঙা, মুখে টক স্বাদ, বুকব্যথা, এমনকি রাতে কাশি বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গের সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

কেন অ্যাসিড ওপরে উঠে আসে?

খাদ্যনালী ও পাকস্থলীর সংযোগস্থলে একটি পেশিবদ্ধ ভালভ রয়েছে—লোয়ার ইসোফেজিয়াল স্ফিঙ্কটার (LES)। খাবার পাকস্থলীতে পৌঁছানোর পর এটি অনেকটা দরজার মতো বন্ধ হয়ে যায়।

কিন্তু সেই ‘দরজা’ যদি ঠিকমতো বন্ধ না হয়, পাকস্থলীর ভেতরের অ্যাসিড ও অন্যান্য উপাদান উল্টো পথে খাদ্যনালীতে উঠে আসতে পারে। এটাই gastroesophageal reflux।

মাঝেমধ্যে এমন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন এটি বারবার হয়, বিরক্তিকর উপসর্গ তৈরি করে বা খাদ্যনালীতে ক্ষতি করে, তখন আমরা তাকে বলি GERD—Gastroesophageal Reflux Disease।

বুকজ্বালা—সবচেয়ে পরিচিত সংকেত

বুকের মাঝখানে, বিশেষ করে বুকের হাড়ের পেছনে জ্বালাপোড়া—রিফ্লাক্সের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ। বেশি খাওয়ার পর, তৈলাক্ত খাবার খেলে, সামনে ঝুঁকলে কিংবা খাওয়ার পর শুয়ে পড়লে এটি বেড়ে যেতে পারে।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে।
রিফ্লাক্স থেকে বুকব্যথা হতে পারে ঠিকই, কিন্তু বুকব্যথাকে কখনো শুরুতেই ‘গ্যাসের ব্যথা’ ধরে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে নতুন ধরনের বুকব্যথার সঙ্গে যদি শ্বাসকষ্ট, ঘাম, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা কিংবা হাত, ঘাড় বা চোয়ালে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে। তাহলে হৃদ্‌রোগের জরুরি মূল্যায়ন প্রয়োজন।

‘আমার তো গ্যাসের সমস্যা আছে’—এই ভেবে অপেক্ষা করা কখনো কখনো বিপজ্জনক হতে পারে।

মুখে টক পানি আসে?

রিফ্লাক্সের আরেকটি পরিচিত লক্ষণ regurgitation। খাওয়ার কিছুক্ষণ পর মনে হতে পারে খাবার বা তরল আবার গলার দিকে উঠে আসছে। এটি ঠিক বমি নয়। কখনো শুধু টক বা তেতো তরল মুখের পেছনে এসে পৌঁছায়।

অনেকে সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখে অস্বাভাবিক টক বা তেতো স্বাদও অনুভব করেন। বারবার ঢেকুরও হতে পারে।

আরেকটি কম পরিচিত উপসর্গ হলো হঠাৎ মুখে অনেক লালা জমে যাওয়া—যাকে বলা হয় water brash। অ্যাসিড খাদ্যনালীতে উঠে এলে শরীরের প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া হিসেবে অতিরিক্ত লালা তৈরি হতে পারে।

গলায় যেন কিছু আটকে আছে

কিছু রোগী খুব সুন্দর করে সমস্যাটি বর্ণনা করেন—
‘ডাক্তার, গলায় সব সময় মনে হয় কিছু একটা আটকে আছে।’

অথচ পরীক্ষা করলে বা খাবার গিলতে গেলে সত্যিকার অর্থে কিছু আটকে থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় না। এই অনুভূতিকে বলা হয় globus sensation।

রিফ্লাক্স এর একটি কারণ হতে পারে। তবে গলার অন্যান্য সমস্যা, অ্যালার্জি কিংবা মানসিক চাপের সঙ্গেও এমন অনুভূতি হতে পারে। তাই একটি উপসর্গ দেখেই রোগ নির্ণয় করা ঠিক নয়।

কাশি আর গলা ভাঙার পেছনেও কি রিফ্লাক্স?

এখানেই অ্যাসিড রিফ্লাক্স অনেক সময় নিজেকে অন্যভাবে প্রকাশ করে।

কিছু রোগীর বুক একেবারেই জ্বলে না। কিন্তু মাসের পর মাস শুকনো কাশি থাকে। বারবার গলা পরিষ্কার করতে হয়। সকালে কণ্ঠস্বর ভাঙা থাকে। গলায় খুসখুস করে।

রিফ্লাক্স খাদ্যনালীর ওপরের দিকে উঠে গলা ও কণ্ঠনালীর অঞ্চলে প্রভাব ফেললে এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। একে অনেক সময় laryngopharyngeal reflux বা LPR বলা হয়।

তবে এখানেও সাবধানতা জরুরি। সব দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা গলা ভাঙার কারণ রিফ্লাক্স নয়। অ্যালার্জি, সাইনাসের সমস্যা, অ্যাজমা, কিছু ওষুধ কিংবা ফুসফুসের রোগেও একই ধরনের উপসর্গ হতে পারে।

তাই শুধু কাশি আছে বলে বছরের পর বছর নিজের ইচ্ছায় অ্যাসিডের ওষুধ খাওয়া সমাধান নয়।

রাতের ঘুমেও হানা দিতে পারে:

রাতে শুয়ে পড়ার পর অনেকের reflux বেড়ে যায়। কারও কাশি হয়, কারও ঘুমের মধ্যে choking-এর মতো অনুভূতি হয়, আবার কারও wheezing বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

বিশেষ করে ভারী রাতের খাবার খেয়ে দ্রুত বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস থাকলে সমস্যা বাড়তে পারে।

এ কারণেই রাতের খাবার ও ঘুমের মধ্যে অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টার ব্যবধান রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

খাবার আটকে গেলে অবহেলা নয়

অ্যাসিড রিফ্লাক্সের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেতগুলোর একটি হলো dysphagia—খাবার গিলতে অসুবিধা।

ধরুন, আগে স্বাভাবিকভাবে সব খাবার খেতে পারতেন। এখন মনে হচ্ছে মাংস, ভাত বা শক্ত খাবার বুকের মাঝখানে আটকে যাচ্ছে।

দীর্ঘদিনের reflux-এর কারণে খাদ্যনালীতে প্রদাহ ও scar তৈরি হয়ে সেটি সরু হতে পারে। আবার খাদ্যনালীর অন্য রোগেও একই উপসর্গ হতে পারে।

তাই খাবার গিলতে সমস্যা হলে শুধু ‘অ্যাসিডিটির ওষুধ’ খেয়ে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কোন লক্ষণগুলো বিপদের ঘণ্টা?

রিফ্লাক্স খুব সাধারণ একটি রোগ। কিন্তু কিছু উপসর্গকে সাধারণ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

খাবার গিলতে ক্রমশ সমস্যা হওয়া, খাবার আটকে যাওয়া, কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, বারবার বমি, রক্তবমি, কালো পায়খানা বা রক্তপাত এবং অজানা কারণে iron deficiency anemia—এগুলো alarm symptoms।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শে upper endoscopy-সহ আরও পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

প্রতিদিনের কয়েকটি অভ্যাসেই মিলতে পারে স্বস্তি

রিফ্লাক্স নিয়ন্ত্রণের শুরুটা অনেক সময় ওষুধ দিয়ে নয়, জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তন দিয়ে।

#ডাঃ বি এম আতিকুজ্জামান - কনসালট্যান্ট,গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট, অরল্যান্ডো হেলথ, ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র
শিক্ষক, গবেষক, লেখক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসক।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন