https://www.prothomalony.com/
9924
bangladesh
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের সাড়ে তিন মাসের মাথায় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ভারতের লোকসভা নির্বাচন। ভোট পূর্ববর্তী ভারতের সব জনমত জরিপই বলছে, বাংলাদেশের মতো ভারতের নির্বাচনেও ক্ষমতায় পরিবর্তনের তেমন কোনও সম্ভাবনা নেই।
এ কারণেই সম্ভবত এই নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ কিছুটা স্তিমিত। তবুও ঐতিহাসিকভাবে দিল্লিতে কী হচ্ছে তা সব সময়ই বাংলাদেশকে প্রভাবিত করে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে লোকসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে ১৯ এপ্রিল, ৭ দফায় ভোট চলে ১ জুন পর্যন্ত। ইভিএম বা ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোট গ্রহণ চলছে। ফল মিলছে ৪ জুন। এবারে মোট ভোটার ৯৬ কোটির বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, ৬০ থেকে ৭০ কোটি মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে তীব্র গরমের মধ্যেও লাইনে দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশে দাবদাহ চলছে, জনজীবন অতিষ্ঠ। ভারতের অনেক স্থানেও এমন গরম, অনেক স্থানে এর চেয়েও বেশি তাপ ও উত্তাপ। এর মধ্যেও চলছে নির্বাচনের প্রচার। ক্ষমতাসীন বিজেপি ২০১৯ সালের ভোটে ৫৪৩ আসনের লোকসভায় ৩০৩টি আসন পেয়েছিল। কিন্তু তারা পেয়েছিল মোট ভোটের মাত্র ৩৭.৭ শতাংশ। অন্যদিকে, কংগ্রেস বিজেপির অর্ধেকের কিছু বেশি ১৯.৯ শতাংশ ভোট পেলেও আসন পেয়েছিল মাত্র ৫২টি। অন্যরা প্রায় ৪৩ শতাংশ ভোট পেয়েও আসন পেয়েছিল ১৮৮টি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতের নির্বাচন বাংলাদেশের উপর কী প্রভাব ফেলবে? প্রথম যে প্রভাবটির কথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে তা হলো, এই নির্বাচনের সময়ে ভারত অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটাবে। বিশেষ করে, রাষ্ট্র এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোযোগ দেবেন। ফলে পশ্চিমা ষড়যন্ত্রকারী যারা বাংলাদেশের গণতন্ত্র চায় না বা অন্যরকম কিছু হোক চায় তারা একটা সুযোগ পাবে। ভারতের কম নজরদারির সুযোগে বাংলাদেশে কোনো অস্থিরতা বা অস্থিতিশীলতা তৈরি করা যায় কি না সে নিয়ে অনেকে চেষ্টা করবে। বিশেষ করে, ডক্টর ইউনুসের নেতৃত্বে সুশীল সমাজ এবং পশ্চিমারা ভারতের এই ব্যস্ততার সুযোগটা গ্রহণ করতে পারে বলে কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করে৷
দ্বিতীয়ত, এই নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হোক না হোক যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন, বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হবে না বলেই মনে করেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কারণ ভারত কতগুলো মৌল নীতির উপর দাঁড়িয়ে আছে এবং যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, এই মৌলিক নীতির কোনও পরিবর্তন হয় না। বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কটি ভারতের মৌলিক নীতিরই একটি অংশ এবং ভারতের উভয় দলই মনে করে যে বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক রাখাটা বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা অত্যন্ত জরুরী
বিজেপি এবং কংগ্রেস উভয় দলই মনে করে যে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আছেন জন্যই বাংলাদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে না। ভারতের রাজ্য গুলো বিশেষ করে সেভেন সিস্টার একটা শান্তির মধ্যে রয়েছে। আর বিচ্ছিন্নতা বাদীদেরকে মদদ দেয়া হচ্ছে না বলেই ভারত এখন বিচ্ছিন্নতা বাদী মুক্ত হতে অনেকটাই সক্ষম হয়েছে।
আর এ কারনেই ভারতে বিজেপি বা কংগ্রেস যারাই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় আসুক না কেন বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হবে না এবং ভারতের বাংলাদেশ নীতিরও কোনো পরিবর্তন হবে না।
ভারত বাংলাদেশে সব সময় চায় যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে অসাম্প্রদায়িক চেতনার একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকুক এবং এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোন বিকল্প ভারতের কাছে নেই। আর তাই ভারতের নির্বাচনের সময়টি বাংলাদেশের জন্য স্পর্শকাতর। তবে নির্বাচনের পরবর্তীতে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক একই ধারায় অব্যহত থাকবে বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা
বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজজীবনে ভারতীয় প্রভাবের কথা বিবেচনায় রেখে বলা যায় ভারতের নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। গত ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় এবং বিএনপিসহ তার মিত্রদের আন্দোলনকে উড়িয়ে নিজ দল ও নিজের পছন্দমতো অন্য দলের মধ্যে আয়োজন করে নির্বাচন সম্পন্ন করে আবার ক্ষমতায় শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ।
বিরোধী দল মনেই করে যে, আন্তর্জাতিক মহলের সব চাপ নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে শেখ হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় বসাতে বড় ভূমিকা রেখেছে ভারতের নরেন্দ্র মোদির সরকার। বিরোধী দলের এমন ভাবনার সমর্থন পাওয়া যায় সরকারি দলের কোনো কোনো নেতার কথায়ও। গত ১৬ মার্চ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ভারত পাশে ছিল বলেই বাংলাদেশের নির্বাচনে বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্র অশুভ হস্তক্ষেপ করতে পারেনি।
অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ভারতের লোকসভা নির্বাচন নিয়ে তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাজে আগ্রহ অনেক। যদিও নির্বাচনে মোদির জয়লাভ নিশ্চিত জেনে সাধারণ মানুষের আগ্রহে কিছুটা হলে ভাটা পড়েছে, বাস্তবতা হলো—এরপরও মানুষ সেদিকে নজর রাখছে।
ভারতে সংখ্যালঘু নিপীড়নের খবরে বাংলাদেশে উদ্বেগ বাড়ে এবং তার কিছু প্রতিফলনও দেখা যায় এ দেশে। ভারতের নির্বাচনের ঠিক আগে ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদি সরকার বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) কার্যকর করার জন্য সক্রিয় হয়েছে। এ পদক্ষেপের ফলে সেখানকার মুসলমানরা যে অবস্থায় নিপতিত হবেন তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুরা কীরকম পরিস্থিতিতে পড়বেন সেটাও বিবেচনার মধ্যে আসছে। উভয় দেশের রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজে বিষয়টি আলোচনায় থাকছে। সিএএ বাস্তবায়নের পর ‘এনআরসি’ বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বাস্তবায়নেরও পরিকল্পনা রয়েছে বিজেপির। এই এনআরসি কার্যকর হলে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে বহু মুসলিম ভারতের নাগরিকত্ব হারাতে পারেন, যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশ সীমান্তে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন ভারতের ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। ঐতিহ্যগতভাবে মূলত কংগ্রেসের সঙ্গেই আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক। কিন্তু ২০১৪ সালে বিজেপি ভারতের ক্ষমতায় আসার পর সেই সরকারেরও জোরালো সমর্থন পেয়েছে আওয়ামী লীগ। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসায় তখন বিএনপি ও জামায়াত সেই বিজয়কে উদযাপন করেছিল এটা ভেবে যে, আওয়ামী লীগের প্রতি বিজেপির সমর্থন এতটা নিরঙ্কুশ হবে না। কিন্তু গত দশ বছরে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অনেক অমীমাংসিত ইস্যু রয়ে গেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন। দুই দেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তিস্তাসহ আলোচনায় থাকা আটটি নদীর পানি ভাগাভাগির ব্যাপারে এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। বেশি জলঘোলা হয়েছে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে। চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরোধিতায় তা আর বাস্তবায়ন করা যায়নি।
একটি বড় ইস্যু সীমান্ত হত্যা। বারবার আশ্বাস দিয়েও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা বন্ধ করছে না। এ বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসেও দুজনকে হত্যা করেছে বিএসএফ। বিএসএফ বাহিনী কেন এত হত্যা প্রিয় সেটা ভারত সরকারেরই বলা দরকার। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে শান্তিতে রেখেও বাংলাদেশের নাগরিকরা ভারতীয় বাহিনীর আক্রমণ থেকে বাঁচতে পারছে না।
বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক সুবিধা নিচ্ছে ভারত। ভারতকে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি ভারতকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে আমাদের সরকার। ভারতকে সেই সুযোগ দেওয়া হলেও স্থলবন্দর, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে নেপাল কিংবা ভুটানে পণ্য রপ্তানি করার জন্য এখনো অনুমতি পায়নি বাংলাদেশ। এ দেশের মানুষ মনেই করে যে, ‘একতরফাভাবে’ অনেক কিছু দেওয়া হলেও তার বিনিময়ে বাংলাদেশ ‘তেমন কিছু’ পায়নি ভারত থেকে।
তাই এসব নানা সমীকরণে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভারতীয় লোকসভা নির্বাচন ব্যাপক আগ্রহের একটা বিষয়। নরেন্দ্র মোদি আবার আসেন বা অন্য কেউ যদি প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে কি বাংলাদেশের বিষয়গুলো ভিন্নভাবে দেখা হবে?
ভারতের রাজনীতি, নির্বাচন বা গণতন্ত্র নিয়ে কেন আমাদের এই আশঙ্কা? এর কারণ হলো, ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। দেশটির সঙ্গে আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। কোনো কারণে ভারতে যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আরও অবনমন হয়, তাহলে বাংলাদেশেও নিশ্চিতভাবে সেটার প্রভাব পড়বে। এর ফলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে যে সংকট চলছে তা আরও বাড়তে ও দীর্ঘায়িত হতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য তাই প্রতিবেশী হিসেবে গণতান্ত্রিক ভারতের কোন বিকল্প নাই।
নির্বাচন-পরবর্তী ভারতের পররাষ্ট্র নীতির যেকোনো পরিবর্তন এই অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণে, বাংলাদেশের কৌশলগত ভূমিকাকে প্রভাবিত করতে পারে। অন্যদিকে চীনও বাংলাদেশের অন্যতম অর্থনৈতিক সহযোগী দেশ হিসেবে ক্রমবর্ধমানভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বাংলাদেশের অবকাঠামো প্রকল্পে চীন একটি বড় বিনিয়োগকারী হলেও ঋণের স্থায়িত্ব এবং কৌশলগত প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ প্রবল। বাংলাদেশ তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সাথেই তার সম্পর্কের একটি ভারসাম্য চায়।
বাংলাদেশ শুধু ভারতের প্রতিবেশী একটি দেশ নয় কৌশলগত মিত্রও বটে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকবে অতীতের সব সমস্যার (আন্তঃসীমান্ত অসম বাণিজ্য, নাগরিকত্ব আইন, তিস্তা চুক্তি ও অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহার এবং নিরাপত্তা) দ্রুত সমাধান হোক এবং বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের সম্পর্ক সমতার ভিত্তিতে অন্য উচ্চতায় এগিয়ে যাক।
দিল্লি সব সময় চায় বাংলাদেশে তাদের সাথে যে দল সম্পর্ক ভালো রাখবে ও তাদের প্রয়োজন মেটাবে, তারাই ক্ষমতায় থাকুক।
কিন্তু দিল্লির মসনদে বাংলাদেশের পছন্দের কেউ বসুক, বাংলাদেশের এই চাওয়া ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে খুব একটা গুরুত্ব বহন করে না বলেই বিশ্লেষকদের অনেকের অভিমত।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন