https://www.prothomalony.com/
9851
bangladesh
বিগত কয়েক বছরে মে মাসে বারবার আছড়ে পড়ছে ঘূর্ণিঝড়। মে মাস মানেই যেন ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ার শঙ্কা। আইলা, আমফান, ইয়াস বা অশনির পর মোখা- ঘূর্ণিঝড়গুলো সৃষ্টি হচ্ছে সেই মে মাসেই। মে মাসে কেন ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা এত বেশি?
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০০৯ সালে ২১ মে, বঙ্গেপসাগরে তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড় আইলা, উপকূলে যা আছড়ে পড়ে ২৫ মে। ২০১৯ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় ফণি এবং ২০২০ সালের মে মাসে এসেছিল আমফান। ২০২১ সালের মে মাসের শেষ দিকে বঙ্গোপসাগরে উৎপন্ন হয় ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। আর ২০২২ সালের ৭ মে ধেয়ে এসেছিল অশনি। ২০২৩ সালে ১৪ মে ঘূর্ণিঝড় মোখা আঘাত হানে বাংলাদেশে।
এবার আলোচনা শুরু হয়েছে ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ নিয়ে, যা বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছে ২৬ মে। সেক্ষেত্রে অনেকেরই প্রশ্ন, বারেবারে এই মে মাসেই কেন তাণ্ডব চালায় ঘূর্ণিঝড়? এর নেপথ্যে কি কোনো ভৌগলিক বা বিজ্ঞান ভিত্তিক ব্যাখ্যা রয়েছে?
কারণ হিসেবে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, প্রাক বর্ষার মৌসুমে এপ্রিল এবং মে মাসই ঘূর্ণিঝড়ের উপযুক্ত মৌসুম। এর মধ্যে মে মাসে ঘূর্ণিঝড় সবথেকে বেশি হয়। মে মাসে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় হওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ থাকে। বেশ কয়েকটি কারণে উপরে এই ঘূর্ণিঝড় নির্ভর করে। সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রার উপর ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নির্ভর করে। সাধারণত ন্যূনতম তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলেই তা ঘূর্ণিঝড়ের জন্য উপযুক্ত। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য তা অনুকূল।
অন্যদিকে, হাওয়া উপরের দিকে উঠতে থাকলেও ঘূর্ণিঝড় হওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। অনেক সময় দেখা গিয়েছে, বঙ্গোপসাগরের উপরে এসে অনেক দুর্বল ঘূর্ণাবর্ত বা নিম্নচাপও ফের সজীব হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন মহাসাগর থেকে কোনো ঘূর্ণাবর্ত বা নিম্নচাপ বঙ্গোপসাগরের উপরে পৌঁছে তা ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের জন্যও অনেক সময় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া প্রবল ঘূর্ণিঝড় এবং সাধারণ ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা কমছে। এই সাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টিও আগের চেয়ে কমেছে। ১৯৪৮ থেকে সর্বশেষ ২০২৩ সাল পর্যন্ত আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
আবহাওয়া ও জলবায়ুবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের অন্যান্য সাগরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গোপসাগরেও তাপমাত্রা বাড়ছে। এর ফলে ঘূর্ণিঝড়গুলো হয়তো তীব্র হচ্ছে। কিন্তু এর সংখ্যা কমছে। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ভূপৃষ্ঠের সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠেরও তাপমাত্রা সমানভাবে বৃদ্ধির ফলে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সহায়ক পরিবেশে বিঘ্ন ঘটছে। নিম্নচাপ ও এর ফলে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়লে উপকূল শুধু নয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে।
১৯৪৮ থেকে ২০২৩ সাল অর্থাৎ মোট ৭৫ বছরের বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া ঘূর্ণিঝড়, প্রবল ঘূর্ণিঝড় এবং নিম্নচাপের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন জলবায়ুবিশেষজ্ঞরা, সেই অনুযায়ী, ৭৫ বছরে বঙ্গোপসাগরে ১৫১টি প্রবল ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ঘূর্ণিঝড় হয়েছে নভেম্বর মাসে—৫১টি। এরপরই বেশি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে মে মাসে—৩০টি। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে অক্টোবর মাসে—২৯টি।
১৯৪৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রতি দেড় দশক ধরে হিসাব করে দেখা গেছে, ১৯৪৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত সময়ে ঘূর্ণিঝড় উৎপত্তি হয়েছে ২০টি। সবচেয়ে বেশি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে ১৯৬৩ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সময়ে। এ সময় ৫২টি ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তি হয় বঙ্গোপসাগরে। এর পরই রয়েছে ১৯৭৮ থেকে ১৯৯২ সাল। এই সময়ে উৎপত্তি হওয়া প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ছিল ৩০। ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত সময়ে ২২টি, এরপর ২০০৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়ে ২৪টি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তি হয়েছে।
বছরের হিসাবে সবচেয়ে বেশি ছয়টি ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তি হয়েছিল ১৯৬৮ সালে।
গত রোববার আঘাত হানা প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমাল ঘূর্ণিঝড় আকারে সৃষ্টি হয় শনিবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে। এটি ২৪ ঘণ্টা পর আঘাত হানে। এটাকে অনেকটা অস্বাভাবিক বলছেন আবহাওয়াবিদরা। তাদের মতে, গত বছর আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় হামুন এবং আইলাও সৃষ্টি হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে আঘাত হানে। এর অর্থ হলো, এখন ঘূর্ণিঝড়গুলো দ্রুত শক্তিশালী হওয়ার উপাদান পাচ্ছে।
কেন বার বার এই মে মাসেই আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড়। বাংলাদেশে আগে যে সমস্ত ঘূর্ণিঝড় এসেছিল তার ইতিহাস কিন্তু বলছে সিংহভাগ ক্ষেত্রে মে মাসেই এসেছে ঘূর্ণিঝড়।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্ষা আসার আগে ও বর্ষা আসার পরে ভারত মহাসাগরের উত্তর অংশ অতিরিক্ত স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা থাকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। এই জোড়া অনুকূল পরিস্থিতির জেরে নিম্নচাপ দ্রুত ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। লো প্রেশার বা নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাকে বলা হয় সাইক্লোজেনেসিস। আর এই সাইক্লোজেনেসিস তৈরি হওয়ার পেছনে কতকগুলি অনুকূল পরিস্থিতি থাকে। যার অন্যতম হল ওয়ার্ম সি সারফেস টেম্পারেচার। অর্থাৎ মার্চ, এপ্রিল, মে অর্থাৎ গরমকালে সি সারফেস টেম্পারেচার বা সমুদ্রের জলের উপরের যে তাপমাত্রা তা অনেকটাই বেশি থাকে। জলের প্রায় ৫০ মিটার গভীর পর্যন্ত এই তাপমাত্রা থাকে। মূলত সেই কারণেই মার্চ, এপ্রিল, মে বা বাংলার কোথাও কোথাও জুন মাসেও ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়। তবে বর্ষা চলে আসার পরে পরিস্থিতি এমনটা থাকে না।
ভৌগলিক অবস্থান ও জলবায়ুু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগ প্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর মে মাস আসলেই বঙ্গোপসাগরে বাড়ছে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ। গত দুই যুগে এমাসে নয়টি প্রলয়ঙ্করী ঝড় হয়েছে। এ দুর্যোগে সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও কমেছে প্রাণহানি।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস এখন অন্তত পাঁচ দিন আগে দেওয়া হয়। তাই নিরাপদে থাকার প্রস্তুতি আগের তুলনায় বেশি সময় পাওয়া যাচ্ছে। এবারও মে মাসে তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। একশ বছরে এপ্রিল মে মাসে দেশে আঘাত হেনেছে ৬৫ ঘূর্ণিঝড়।
এপ্রিলে টানা তাপপ্রবাহের পর মে মাসেও ছিলো সূর্যের দাপট। আকাশে মেঘের আনাগোনা কম। ফলে সূর্যের তাপ ভূখণ্ড তো বটেই, সমুদ্রের পানিকে অস্বাভাবিক উত্তপ্ত করে তুলছে। এ ধরনের আবহাওয়ায় মে মাসে বঙ্গোপসাগরে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি করছে। গত চার বছরে শুধু এই মাসে মোট চারটি ঘূর্ণিঝড় বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয়েছে, যার সব কটি বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ১৩টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত করেছে। এর মধ্যে ৭টি ঝড় আসে মে মাসে।
জলবায়ু ও আবহাওয়াবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এপ্রিল ও মে মাস সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ হয়ে উঠছে। এর মধ্যে এপ্রিলে তাপপ্রবাহের পাশাপাশি উজানে অতিবৃষ্টি হয়ে হাওরে আগাম বন্যা সৃষ্টি হচ্ছে। ২০১৭, ২০২০ ও ২০২১ সালে এ ধরনের বন্যা হয়েছে। ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ পর্যন্ত টানা তাপপ্রবাহ এবং এ বছরগুলোর মে মাসে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার প্রবণতা বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশে মে মাসে সবচেয়ে চরম আবহাওয়া থাকছে। দুর্যোগগুলো এ সময়ে বেশি আঘাত হানছে। ফলে এই সময়কে মাথায় রেখে আমাদের দুর্যোগ মোকাবিলা এবং পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, সাধারণত এপ্রিলে বাংলাদেশ, ভারতসহ বঙ্গোপসাগর এলাকায় তাপপ্রবাহ থেমে থেমে আসে। দেশের মাঝের ভূখণ্ডে কালবৈশাখী এবং সাগরে লঘুচাপ বা নিম্নচাপ তৈরি হয়। এতে বায়ুমণ্ডলে জমে থাকা তাপ কমে আসে। ফলে একবারে অনেক বেশি তাপমাত্রা জমে না। কিন্তু গত এক যুগ ধরে সাগরে লঘু বা নিম্নচাপের প্রবণতা কমে যাচ্ছে। নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে তা দ্রুত ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এর আগে ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এ ধরনের আবহাওয়া দেখা গিয়েছিল। ওই সময়ে এপ্রিলে প্রচণ্ড উষ্ণতা আর মে মাসে প্রায় প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানত। এই সময়টাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে চরম আবহাওয়ার সময়কাল হিসেবে মনে করা হয়।
বাংলাদেশে মে মাসে সবচেয়ে চরম আবহাওয়া থাকছে। দুর্যোগগুলো এ সময়ে বেশি আঘাত হানছে। ফলে এই সময়কে মাথায় রেখে আমাদের দুর্যোগ মোকাবিলা এবং পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে নানা সময়ে, বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন ঊপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা। তবে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝড়ে প্রাণহানি কমেছে।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন