https://www.prothomalony.com/

9691

opinion

অভিমত

বাড়ছে বিদেশমুখি প্রবনতা

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৪ ১০:৫২

রাজধানীর ফ্লাইওভার, উড়ার সড়ক, মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, কর্ণফুলিতে বঙ্গবন্ধু ট্রানেল, রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেখলে মনে হয় দেশ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বাড়ছে জিডিপি’র আকার, মাথাপিছু আয়। জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যপক পরিবর্তন। কয়েক বছর আগেও বাসায় এসি, ফ্রিজ, প্রাইভেট কারকে বিলাসিতা মনে করা হলেও এখন তা প্রয়োজনীয়। দেশ উন্নয়নশীল থেকে মধ্য আয়ের দেশের পরিণত হতে চলেছে। উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ। কিন্তু এরপরও কমছে না তরুণ-যুবকদের মধ্যে দেশ ছেড়ে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা। বরং প্রতিবছরই বাড়ছে বিদেশগামীদের সংখ্যা। এর মধ্যে যেমন গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারের উচ্চশিক্ষিত যুবক রয়েছে, আবার শহুরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর স্বল্প-শিক্ষিত বেকার ও উচ্চাভিলাষী তরুণ-তরুণীও আছে, শিক্ষিত, চাকরিজীবীসহ নানা শ্রেণির মানুষই এখন বিদেশমুখী। তাদের কেউ কেউ দেশ ছাড়াছেন উচ্চশিক্ষা লাভের আশায়, কেউবা চাকরির জন্য। এতে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে মেধা। সেই সঙ্গে যাচ্ছে অর্থও। প্রতি বছর গড়ে অর্ধলক্ষ ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যায়। তাদের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অষ্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের অন্তত ৫৮টি দেশ। অনেকেই আবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মরুভুমি, বন, সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকা পাড়ি দিচ্ছেন। তাদের ভাগ্য ভালো হলে প্রাণ নিয়ে ইউরোপ, আমেরিকা পৌঁছাচ্ছেন, নয়তো সাগরে ডুবে মৃত্যু। আবার ইউরোপে পৌঁছতে পারলেও মিলছে না আশ্রয়। প্রশ্ন হচ্ছে দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে চলমান হলে দেশের এতো বিপুল সংখ্যক মানুষ বিদেশমুখি হচ্ছেন কেন? কেন হাজার হাজার মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা ‘ভবিষ্যৎ গড়ার’ প্রত্যাশায় বিদেশ চলে যাচ্ছেন? আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে ২০২১ সালে ইইউ প্লাস দেশগুলোতে আশ্রয়ের আবেদন জানিয়েছিলেন ২০ হাজার বাংলাদেশি। এবার এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

বেসরকারি দাতব্য সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান তৃতীয়। প্রতি বছর এই সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকাডুবিতে গড়ে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। একই সংস্থার তথ্য মতে, ২০২১ হতে ২০২৩ সালের জুন মাস অবধি ২৯ হাজার ৭৭৮ জন বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছে। আর ২০০৯ থেকে ২০২৩ অবধি এই সাগরে পাড়ি দিয়েছে ২৬ লাখ ১৪ হাজার ৯৪ জন বাংলাদেশি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রকাশিত ‘দ্য গ্লোবাল এমপ্লয়মেন্ট ট্রেন্ডস ফর ইয়ুথ-২০২২’ এর প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। লন্ডনের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে ৪৭ জনই বেকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে উন্নয়নে জনগণের সম্পৃক্ততা নেই, সে উন্নয়নে জনগণ আস্থা রাখতে পারছে না। আর ব্রীজ-ফ্লাইওভার দৃশ্যমান উন্নয়নের চেয়ে বেশি প্রয়োজন কর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন। বাংলাদেশ এ দুটোতে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ফলে দৃশ্যমান উন্নয়নের চেয়ে জনসম্পদ উন্নয়নের দিকে জোর দিতে হবে।

 উচ্চশিক্ষা শেষ করেও চাকরি না পাওয়া, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের অভাব, আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা, সুচিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা, দুর্নীতি ছাড়া সেবা না পাওয়া, ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা, দূষিত পরিবেশ, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মতো বিষয়গুলো দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করছে।

বাংলাদেশের যুবগোষ্ঠীর বড় অংশ আর্থসামাজিক ঝুঁকির মধ্যে আছে। বাংলাদেশে একটা নিম্ন মানের চাকরি করতে গেলেও ঘুষ দিতে হয়। কোন কিছুর নিরাপত্তা নেই। সবখানে সব সময় যে যেভাবে পারছে ক্ষমতা দেখাতে ব্যস্ত। কোথাও কোন কাজে গেলেও ঘুষ ছাড়া হয় না। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। আর বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরাও লেখাপড়া থেকে রাজনীতি করতে বেশি পছন্দ করেন। যা বিদেশে নেই। 

উচ্চ-স্তরের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার সুযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী দেশগুলির প্রলোভন মানুষকে বিদেশে পাড়ি দিতে ইন্ধন যোগাচ্ছে। কারণ পেশাদাররা নিজেদের এবং তাদের পরিবারের জন্য উন্নতমানের জীবন কামনা করে। পরিবারের উন্নত মানের জীবনযাত্রার পাশাপাশি বাইরের দেশগুলি প্রায়শই মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দেয়, অভিভাবকদের সন্তানদের সর্বোচ্চ মানের শিক্ষা দিতে সেদিকে আকৃষ্ট হন। এই আকাক্সক্ষার জন্য প্রায়শই বাবা-মায়েরা সন্তানদের নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেন, এমনকি বিদেশে তাদের ক্যারিয়ার অসুবিধার সম্মুখীন হলেও তারা পরোয়া করেন না।

বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আছে প্রশাসনে কর্মরতদের সন্তান। অসৎ উপায়ে টাকা অর্জনকারী এবং বিদেশে টাকা পাচারকারীদের সন্তানরাও বিদেশমুখি। দুর্নীতিবাজরা ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার নামে তারা অনেকেই বিদেশে পাচার করে দিচ্ছেন বৈদেশিক মুদ্রা। ওই টাকায় সংশ্লিষ্ট দেশে গাড়ি-বাড়ি কিনে কিংবা ব্যবসায়ী সেজে স্থায়ী বসবাসের (পিআর) অনুমতি নিচ্ছেন। এরপর শুরু হয় তাদের উচ্চাভিলাষী জীবনযাপন।

শিক্ষাজীবন শেষ করে সবারই পছন্দের তালিকায় থাকে বিসিএসসহ সরকারি চাকরি। তবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের এখন টার্গেটে পরিণত হয়েছে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য বিদেশ পাড়ি দেয়া। বিগত এক দশকে এটিতে লক্ষণীয় পরিবর্তন হয়েছে। এক বছরের তুলনায় বেড়েছে পরের বছরের হার। উচ্চশিক্ষায় বিদেশযাত্রায় একটা নীরব বিপ্লব হয়ে গেছে দেশে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ালেও মানসম্মত শিক্ষার অভাব, রাজনৈতিক নিশ্চয়তা, সামাজিক সুরক্ষার অভাব, দেশে কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ ইত্যাদি কারণে শিক্ষার্থীদের দেশ ছাড়ার প্রবণতা বাড়ছে। এসব শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গেলেও পরবর্তী সময়ে সেখানেই স্থায়ী হচ্ছেন। ফলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে পাড়ি দেয়ার ঘটনায় প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। এমনকি বাংলাদেশ থেকে অন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত বা রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল দেশে চলে যাচ্ছেন অনেকে। বাংলাদেশিরা  বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছে এবং বাংলাদেশিরা বিপজ্জনক সমুদ্রপথ দিয়েও ইউরোপে প্রবেশ করেছে। অবৈধভাবে ইউরোপে পাড়ি দিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক  বাংলাদেশি কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরীয় পথ ব্যবহার করেছেন। যারা এই ধরনের সমুদ্র যাত্রায় নিজেদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলেন তাদের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন তথ্য অনুসারে, প্রতি বছর আনুমানিক সাত লাখ বাংলাদেশি যারা বিভিন্ন দেশে অভিবাসী হতে পছন্দ করেন, তারা এই ঝুঁকির মুখোমুখি হন।

দেশের তরুণদের একটি অংশ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাত্রার প্রবণতা তো আছেই, এর পাশাপাশি এখন চাকরিজীবীদের মধ্যেও এটি লক্ষণীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যেও অনেকে চাকরি ছেড়ে শিক্ষা শিক্ষা গ্রহণ কিংবা ভাল ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্যে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন দক্ষ ব্যক্তিরা। দৈনন্দিন এবং পেশাগত জীবনে একাধিক অসুবিধার সম্মুখীন হওয়ার জেরে এই ঘটনাটি বাড়ছে। জানা যায়, যারা দেশ ছাড়ছে তাদের মধ্যে অনেকেই স্নাতক হয়ে চাকরির জগতে সদ্য যোগ দিয়েছে, এখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি যারা পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে চাকরি করছেন, সদ্য বিবাহিত, পরিবারে শিগগিরই একটি সন্তানের প্রত্যাশা করছেন, অথবা একটি ছোট শিশু আছে তারাও বিদেশে যেতে আগ্রহী। এই লোকেরা বেশিরভাগই সাধারণ কোনো পরিবার থেকে উঠে এসে বিশ্ব বাজারে নিজের আলাদা একটা পরিচয় তৈরি করছে। বাংলাদেশি পেশাদারদের বিদেশের মাটিতে পা রাখার সব থেকে লোভনীয় কারণ উচ্চতর কর্মজীবনের সুযোগ।

আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারগুলি প্রায়শই উচ্চতর পারিশ্রমিক প্যাকেজ, ব্যাপক সুবিধা এবং পেশাদার অগ্রগতির অনন্য সুযোগ দিচ্ছে। এছাড়াও, দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। কিছু পেশাদার বিশ্বাস করেন, তাদের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারে অধিকতর প্রশংসিত হয়েছে, বেড়েছে আর্থিক পারিশ্রমিক। বৈচিত্রপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন এবং স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও কাজের পরিবেশের এক্সপোজার পেশাদারদের অনুপ্রেরণার আরো একটি উৎস। অভিবাসনের একটি অবিচ্ছেদ্য দিক হলো একটি উন্নত মানের জীবনযাত্রা।
 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন