https://www.prothomalony.com/
9598
north-america
সূর্যের উষ্ণ সংবর্ধনা
সুবীর কাস্মীর পেরেরা
বাইরে সূর্যের উষ্ণ সংবর্ধনা!
আগুনের ফুলকি ফুলের বর্ষণ,
মাথা বেয়ে গা এবং পা অবধি বাদ যায়নি সবুজ গাছ,
ফসলের মাঠ-আমার চিরচেনা ঢাকা শহর!
নিম্ন এবং মধ্যবিক্ত-সংবর্ধনার প্রধান আকর্ষণ!
সব সময় নিষ্পেষিত-নিপীড়িত এবং
উর্ধ-নিম্ন চাপের হাতিয়ার।
কখনো কর্মের অভাব, কখনো বাসস্থান
আবার কখনো খাদ্যের দুর্ভিক্ষ!
তারপরেও সূর্যের তীব্র উপহাস!
উচ্চবিত্ত কি জানে কষ্টের বেদনা?
জানে কি ক্ষুধা কাকে বলে?
কিংবা অতিষ্ঠ গরমে এসির বাইরে একটি নরক
যন্ত্রণা আছে? কিংবা রাস্তায় এসি গাড়ি ছাড়াও
ঘর্মাক্ত একটি পথ ও জীবন আছে?
ধনীর নাকে টাকার গন্ধ, চোখ বাস্তবতায় অন্ধ!
সূর্য দেবতা, বন্ধ হোক তোমার-
নরকীয় উপহাস, অগ্নি সংবর্ধনা!
অসহায় মানুষ হাসতে চায়
বৃষ্টির কান্নার অঝোর ধারায়।
বিনীত প্রার্থনা
দর্পণ কবীর
সূর্যকে আড়াল করে দাঁড়িয়ো না
সূর্যোদয়ের গানে ভেঙেছে আমার দীঘল ঘুম
এই দেখো, বুকের পাঁজরে
খিলখিলিয়ে হাসছে অবরুদ্ধ বেদনা
ফুটছে স্বপ্নের পারিজাত;
পাখিরা গলা সাধছে বনে
নদীরা ফিরে পেয়েছে যৌবন
কবিতার মিছিলে সময় ছিঁড়েছে দুঃসময়ের শেকল।
আমার আঙিনায় সব সুন্দর মেতেছে ধ্রুপদী গপ্পে
ভোরের ডালিতে খুঁজো না দীর্ঘশ্বাস
স্মৃতির সিম্ফনি...
প্রাণের আলোতে আজ প্রাণের ঝিলিমিলি।
কোনো দাবি নেই, দফা নেই
ভালবাসি এবং বাসব বলেই
আমি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি।
সূর্যকে আড়াল করে দাঁড়িয়ো না।
তক্ষকের কাব্য
বিশ্বজিৎ মণ্ডল
১.
প্রতিরাতে একটা তক্ষক আসে, আমার টেবিলে
নিতান্ত দুর্বল শরীরে নাড়া দেয় বার বার...
আমাকে দেখে আড়াল খোঁজে ইতঃস্তত
অভ্যাস হয়ে গেছে তার সন্ধ্যার যাতায়াত
২.
আজ রাতে আমি বাড়ি নেই
মধ্য দুপুরের কোলাহল ছেড়ে, সুনশান পাড়া গাঁ...
এখানে তক্ষক নেই
নেই আমার পড়ার টেবিল
মিহিন জ্যোৎস্নায় ধুয়ে যাচ্ছে, বারান্দা
শিউরে উঠে দেখি-চাঁদ বেয়ে নেমে আসছে
অলীক এক তক্ষক।
আমাকে ভাবায়
মোঃ ইজাজ আহামেদ
শক্তির নিত্যতা সূত্র আমাকে ভাবায়
আদম-হাওয়া থেকে আজ সাতশো কোটিরও বেশি আমরা
আমাদের কত কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে এই নীল গ্রহের খাতায়
অন্তর্জালের মতো আকাশে বাতাসে ভাসছে
মানব সৃষ্টির কাল থেকে কত মনীষীদের বাণী মুখে মুখে
ভ্রমণ করছে
কিছু লিপিবদ্ধও হয়েছে বইয়ের পাতায়
পরিবর্তন ছুঁয়েছে, কিছু বিকৃত হয়েছে কিছু অবিকৃত রয়েছে
শক্তির নিত্যতা সূত্র আমাকে ভাবাচ্ছে
পূর্বপুরুষদের শব্দরা ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে
আকাশে বাতাসে ইন্টারনেটের মতো বর্তমান প্রযুক্তির
মোবাইল বা কম্পিউটার ধরতে পারছে না
শক্তির নিত্যতা সূত্র আমাকে ভাবায়
যদি তাদেরকে ধরার ভবিষ্যত প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়
তবে অবিকল ভাষাগুলো শুনতে পাবো;
দেখতে পাবো বিচার দিবসের মতো।
মনে রাখার গল্প
আব্দুল্লাহ আল মামুন রিটন
বহুদিন পর যখন আবার আমাদের দেখা হলো
তখন শরীরের সাথে ভাঁজ পড়েছে চোখেরও
বাঁকা চোখ সোজা হয়ে তীক্ষ্ণ হয়েছে আরও
শুধু কারো বদলায়নি মনে রাখার আদিম চরিত্র।
মুখোমুখি হওয়ার সাথেই জাপটে ধরলো অতীত
তোমার কিছু প্রশ্ন ছিল, আমারও ছিল কিছু গল্প
আমাদের চায়ের কাপের সাথে চললো কথা খরচ
তারপর, আবার সেই বিচ্ছিন্ন হওয়ার কঠিন সময়।
দুজন দুটি পথের পথিক হয়েও বারবার ফিরে এসে
আমাদের এই যে হঠাৎ মুখোমুখি হওয়ার এই ক্ষণ
এ যেন গোপনে পরখ করা ভেতরের নির্গত প্রস্রবণ
কতটা নির্মল, কতটা পরিচ্ছন্ন, কার জন্য কতটুকু।
বয়সের সন্ধিক্ষণেও একবার দেখা হোক এভাবেই
দেখা হোক দুজনের, লম্বা হোক মনে রাখার গল্প।
পূর্ণের মধ্যে শূন্যের কান্না
সৌরভ দুর্জয়
হাসির লঙ্গরখানায় লুকানো ক্ষুধার অন্ন নাই
ধনবতী পৃথিবীর গোলায়
তাই বুঝি এস্কিমোরা বরফের ঘরে পোড়ে
শীতল আগুনের রুক্ষ ছায়ায়
কুবের কাঁধে চালের চাতালে বসে
দু'মুঠো ভাতের লাগি
সাগরে পায় না তৃষ্ণার জল
ভাসমান নাবিক কোনকালে কোনদিন।
এভাবেই পূর্ণের মধ্যে শূন্যের কান্না
চলছে এবং চলবে বিরামহীন চিরদিন।
আশীর্বাদ
সাধন চন্দ্র দাস
যাহারে দেখিতে সদয় কৃপা
করিয়াছেন অনাথের নাথ।
তাহার চরণে প্রণতি জানাও
নত মস্তকে করি প্রণিপাত।
সৃজন করিলেন যাহারে তোমার তরে
তাহারে রাখিও সদা প্রফুল্লচিত্তে।
অজস্র বর্ষ তুমি বাঁধিও ডোরে
থাকিও একই বৃন্তে যুগ যুগ ধরে।
অজানা বাগানে যেই ফুল ফুটিলো
তোমার পূজায় লাগবে বলে।
সেইফুলের গন্ধ, সুধা হৃদয়ে করিও ধারণ
পূর্ণ চন্দ্রের রুপ সদাই করিও অবগাহন।
তোমাদের আগমনী বার্তায় আনন্দিত
ছিলো যতো পরমাত্মীয় -স্বজন।
তাহাদের সুখ দু:খ গ্রহণ করিও
প্রিয়জন হইয়া থাকিও সারাজীবন।
প্রজন্ম হইতে প্রজন্মান্তরে সুহৃদ
জানুক যতো আপনজন।
সত্য সুন্দরে মন করিও অর্পণ
আলোকিত হউক তোমাদের পূর্ণ জীবন।
সুইসাইডালের বৈঠকে
ইফাদ ইমতিয়াজ অয়ন্ত
দুর্ভাগ্যক্রমে একটি সুইসাইডাল বৈঠকে
আকাশ থেকে পড়েছি।
গোলটেবিল বৈঠক,
হতেও পারে একটি বাইজির আড্ডা
কেউ নাচায় তো কেউ নাচে।
জয়েন্টে টান দিয়ে যখন ঘোরে ঘোরে
জন্ম দিয়েছিল আমায়
সেই নেশা নিয়ে আমি ছিটকে পড়ি
গোলটেবিলের উপর।
রক্তে মাখামাখি ছিল আমার আপাদমস্তক
সেদিন রক্ত আর নেশায় একাকার হয়েছিল
আমার মানস।
সেই থেকে আমিও সুইসাইডাল হওয়ার
প্রতিযোগিতায় রেসের ময়দানে।
আহ্! কি নিষ্ঠুর প্রতিযোগিত
যে যাকে পারে মাড়িয়ে সামনে এগোয়
একবার গাছটির দিকে তাকাও কিংবা নদীটার দিকে,
তোমায় দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে তারা-
যেমন করে সার্কাসের জোকার দেখে আমরা হাসি।
আর তুমি-আমি বীরের বেশে ছুটছি
সুইসাইডালের বিদ্যাগ্রহণের উদ্দেশ্যে।
নিঃসঙ্গ মানুষের পাঁচালী
শেখর ভট্টাচার্য
মাঝে মাঝে নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ মনে হয়। স্বজন, বন্ধুরা ঘিরে থাকলেও মনে হয় বড় একাকী। তাল মেলাতে পারিনা অনেকের সঙ্গে। প্রত্যকের সাথে প্রত্যেকের সম্পর্ক আছে, তারপরও সম্পর্কহীন হয়ে যাচ্ছে মানুষ। কী আশ্চর্য! সম্পর্ক না-কী মূলধন, সোশ্যাল ক্যাপিটাল। আপনার যদি ক্ষমতা কাঠামোর মানুষের সাথে সুম্পর্ক থাকে তাহলে এটি ভাঙ্গিয়ে আপনি অর্থ, বিত্ত অর্জন করতে পারেন। সব কিছু পারবেন এ'ক্ষেত্রে চিত্তের প্রসার ঘটাতে পারবেননা।
সম্পর্কের সাথে মূল ধনের যোগাযোগ তত্ত্ব, এটি কোন সেল কোম্পানির বিজ্ঞাপনের ভাষ্য-না, মানুষ এখন এটি বিশ্বাস করে। তক্কে তক্কে থাকে, সম্পর্কের নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি ঘটানোর জন্য। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক মুলধন বা ক্যাপিটাল হয় কী করে।
হ্যাঁ, ক্যাপিটেল হয় আজকাল। আপনি মধ্যবিত্তদের দেখবেন, ক্যাপিটেল বাড়ানোর জন্য সম্পর্ক তৈরি করতে মরিয়া। বিয়েবাড়ি, শেষকৃত্য কিংবা কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে দেখে দেখে মন্ত্রী-মিনিস্টার, ভিসি, ডিসি, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, এমপিদের হাজির করা হয়। বিভিন্ন অঙ্গনের তারকাদের বহুবার আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসা হয়। তাদের আসা নিশ্চিত করতে বিনয়ের অবতার সেজে চারবার ফোন, এবং দুবার সশরীরে উপস্থিত হয়ে আমন্ত্রণ জানানো এখন রীতি হয়ে গেছে।অনুষ্ঠানের দিন ভিন্ন প্রজাতির প্রভাবশালীদের সাথে সেলফি, হেলফি থেকে শুরু করে নানারকম ছবি তুলে বন্দী করে রাখা হয় সম্পর্ক। পারিবারিক অনুষ্ঠানে আজকাল নিমন্ত্রণ করা হয় নানা ভাবে। একদলের উপস্থিতি নিশ্চিত করতেই হবে কারণ তারা উপস্থিত না হলে ক্যাপিটেলের বিস্তৃতি ঘটবেনা, আর একদলকে আমন্ত্রণ "জানানো হয়" প্রাণহীন ভাবে। দরজার নিচ দিয়ে আমন্ত্রণপত্র ফেলে দিয়ে আসা হয়, এদের আসা না আসার উপর সোশ্যাল ক্যাপিটাল বাড়ানোর কোন সম্পর্ক নেই।
সোশাল ক্যাপিটাল বাড়াতে গিয়ে আন্তরিকতাকে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে। এর পর মহান সেজে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে গাম্ভীর্য বজায় রেখে তত্ব, তথ্যের সংমিশ্রণে ওজনদার গলায় বক্তৃতা চলতে থাকে। পুরোনো সেই কথা, আমরা যা বিশ্বাস করি তা' বলিনা আবার যা বলি তা' কোন ভাবেই অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করিনা। মুখের সামনের মুখোশকে ভেদ করে আসল চেহারা দেখতে দেইনা কাউকে।
চারপাশের মানুষ গুলোর অস্থিরতা খেয়াল করেছেন? সবাই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। দিব্যেন্দু পালিতের একটি উপন্যাসে পড়েছিলাম, রেসের মাঠের প্রতিযোগির পিছন ফিরে তাকাতে নেই। কে পিছনে পড়ে থাকলো এতে তার কিছু আসে যায়না। সবার আগে উইনিং লাইনে পা'দিতে হবে। প্রতিযোগিতায় কেউ কেউ মুখোশ পড়ে নামে আর কেউ কেউ এতো চলাকি করতে পারেনা, তাদের মুখোশ খুলে যায়। দ্বিতীয় প্রজাতি থেকে প্রথম প্রজাতি বিপদজনক। নিজের কাজে যতোটুকু নিবেদন, মনোযোগ দেয়ার প্রয়োজন ততোটুকু নেই। মেধা যেমন নেই, ধৈর্যের বলিহারি। এরকম মানুষের সহজ পথে সম্পর্ককে মূলধন হিসেবে ব্যবহার করে উপরে উঠতে কষ্ট করতে হয়না। সম্পর্ক দিয়ে হাজার কোটি টাকা ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিতে পারেন খুব সহজে। আবার সম্পর্ক আপনাকে পদ, পদবী দেবে সামাজিক স্বীকৃতি দিবে এমন কী জাতীয়, স্থানীয় পুরস্কারও দিতে পারে। এবার বাংলা একাডেমির পুরস্কার প্রাপ্তদের একজনের নামে চোর্যবৃত্তির অভিযোগ উঠেছে। কী এসে যায়, পুরস্কারই প্রধান। পুরস্কার প্রাপ্তির পর কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে আপনাকে সংবর্ধনা দেয়ার জন্য। পারস্পরিক লাভের জন্য এই সংবর্ধনা। এখানেও সম্পর্ক হলো মূলধন।
সম্পর্কের মই ব্যবহার করতে গিয়ে মানুষের শ্রম, মেধা, নিবেদন দ্রুত কমে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে আত্মবিশ্বাস। সামাজিক সংস্কৃতি, মূল্যবোধের ব্যারোমিটার দ্রুত নেমে আসছে। যতোই নামুক "কুছ পরোয়া নেহি"। আমাদের যে "ঋষি রবীন্দ্রনাথে"র ভাব মূর্তি আছে সেটি টিকে থাক। যারা এই রেসে নেই, যারা চালাকি করতে দক্ষ নয়, যাদের মানসিকতা এতো নিচে নামতে পারেনা, তারা বড় অসহায় এ'দেশে। তারা বিশাল প্রান্তরে একা দাঁড়িয়ে। কেউ কেউ জনারণ্যে থেকেও বড় একা। তারা একা তবে তাদের মেরুদণ্ড বড় শক্ত। ভাঙ্গবে তবুও মচকাবে। তারা সংখ্যায় কম। ক্রমাগত কমে আসছে। তবে তাদের জন্যই কিন্তু সমাজ এখনও টিকে আছে। তারা দূর থেকে বলেন, হে ঈশ্বর লজ্জাহীন রেসের ঘোড়াদের জন্য করুণা বর্ষণ করুন।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন