https://www.prothomalony.com/

9524

opinion

অভিমত

আমি মোটা, শুকনা, লম্বা, বেঁটে, অবিবাহিত-নন অফ ইউর বিজনেস

প্রকাশ: ০২ মে ২০২৪ ১৪:৩১

একটি নিখুঁত শরীরের সামাজিক উপলব্ধি-শতাব্দী ধরে বিকশিত হয়েছে এবং এখনও এই ধারণাগুলি বিদ্যমান। উপযুক্ত স্বাস্থ্য ও সুন্দর শরীরের গঠনের এই সংজ্ঞাগুলি থেকে বিচ্যুত যে কোনও মন্তব্য বা আচরণ অপমানজনক, বিভ্রান্তিকর এবং লজ্জাজনক; যাকে বডি শ্যামিং বলা হয়। বডি শ্যামিং হল একজন ব্যক্তির শারীরিক রূপ বা গঠন সম্পর্কে নেতিবাচক এবং অযাচিত মন্তব্য করা, প্রশ্ন করা। এই ধরনের মন্তব্য বা আচরণ প্রায়শই বোঝায় যে 'আপনার এই স্বাস্থ্য বা শরীরের গঠন অন্যদের তুলনায় ভিন্ন।' আপনি কতটা পাতলা, কতটা শুকনা, কতটা মোটা, আপনার উচ্চতা কতটা বেশি না কম, শরীরে লোমহীনতা বা বেশি লোম, চুলের রঙ, শরীরের আকৃতি, পাতলা বা মোটা পেশীবহুলতা, লিঙ্গের আকার বা স্তনের আকার বড়ো না ছোট, রোগাগ্রস্ত শরীর, মুখের বৈশিষ্ট্য...ইত্যাদি সম্পর্কে মন্তব্য করে বা প্রশ্ন করে কাউকে লজ্জাকর ও বিভ্রান্তি অবস্থায় ফেলাই হলো- বডি শ্যামিং। ‌‌

অন্যদিকে সাইকোলোজিক্যাল হ্যারেজমেন্ট বা মানসিক হয়রানি হল অপমানজনক, অনৈতিক এবং অবমাননাকর আচরণ, অন্যের আবেগ ব্যবহার করে তার সমালোচনা করা, বিব্রত করা, লজ্জায় ফেলা বা দোষারোপ করা যা একজন ব্যক্তির আত্মসম্মানকে হ্রাস করে এবং তাকে যন্ত্রণা দেয়। এটি সরাসরি মৌখিক মন্তব্য, ক্রিয়া বা আকার ইঙ্গিতে অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও হতে পারে। যেমন ধরুন-আপনি একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি এবং আপনি অবিবাহিত। এ নিয়ে যখন কেউ আপনাকে প্রশ্ন করবেন, 'আপনি কেন বিয়ে করেননি' কিংবা অবাক চোখে তাকিয়ে যখন বলবেন 'আপনি এখনো অবিবাহিত?', তখন সেটা ব্যক্তিকে  অস্বস্তিতে ফেলবে, জবাব দিতে বিভ্রান্ত করবে, কখনো লজ্জাকর পরিস্থিতিতে ফেলবে। কখনো এই ধরনের প্রশ্ন বা আচরণ অন্যের মনে নানা ব্যর্থতার উদ্রেগ করবে। ব্যক্তি  নিজেকে অন্যের জীবনযাপনের সাথে তুলনা করতে শুরু করতে পারেন। কখনো ব্যক্তি মানসিকভাবে এতটাই হতাশ হবেন যে পুরো দিনটি হয়তো কেবল চুপচাপ বিছানায় শুয়ে কাটাবেন। তাদের মনে হবে, আমার জীবনটা অন্যরকমও হতে পারতো। মূলত-এটাই হলো অন্যের পক্ষ থেকে কাউকে সাইকোলোজিক্যালি হয়রান করা।

বডি শেমিং তখনই ঘটতে পারে যখন আপনার শরীরের কোনো দিক সাংস্কৃতিক বা সামাজিক শরীর-ভিত্তিক স্টেরিওটাইপের সাথে খাপ না খায়। আমাদের বাঙালিদের মধ্যে শরীরের রূপ-গঠন বা সৌন্দর্য সম্পর্কে বেশ কিছু স্টেরিওটাইপ রয়েছে। যেমন-সুন্দর আকর্ষণীয় নারী মানেই চুল এবং চোখ কালো হওয়া, শরীরের আকার পাতলা বা সরু থাকার প্রত্যাশা এবং ফর্সা ত্বক, চোখের নিচে বা গালে কালো দাগ না থাকা, শারীরিকভাবে ফিট থাকা। পুরুষের স্মার্টনেস বলতে লম্বা গঠন, শ্যামবর্ণ, পোশাকআশাকের আধুনিকতা, কম কথা বলা, মেয়েদের সাথে হাহা হিহি না করা, প্রকাশ্যে কান্না না করা...ইত্যাদি। এবং এই জিনিসগুলি যখন প্রত্যাশার বাইরে চলে যায়, তখন অনেকেই প্রশ্ন করে বসেন। যেমন- তুমি এতো লম্বা কেন/ তুমি এতো মোটা কেন/ তোমার চোখের নিচে কালো দাগ পড়ছে কেন, ঘুমাওনা বুঝি কিংবা এতো টেনশন করো কেন/ তুমি এতো শুকিয়ে যাচ্ছে কেন, এভাবে হাঁটছো কেন...ইত্যাদি। কোনো পুরুষ যদি এই প্রত্যাশার বাইরে চলে যায়, তবে বলা হয়, 'সে বাইট্টা/ মেয়েদের মতো ফর্সা গায়ের রঙ/ সে মেয়েদের মতো হাসে/ মেয়েদের মতো কান্না করে....নানা কথা। 

বডি শ্যামিং এর একটি বিশাল অংশের মধ্যে রয়েছে অক্ষমতা নিয়ে থাকাদের নিজেদেরকে ভালবাসতে শেখানো  যাতে তারা সেই ভয়ঙ্কর বার্তাগুলিকে মনে না রাখে বা না ধরে যা সমাজ তাদের পথ চলায় নিক্ষেপ করে। একটি উদাহরণ টানি-যখন আপনি কাউকে হুইলচেয়ারে বা লাঠি হাতে হাঁটতে দেখে কিংবা অসুস্থতা নিয়ে লড়াই করা কাউকে বলবেন যে, 'এতো চাপ নিও না, তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে কিংবা তুমি অসুস্থতা নিয়ে লড়ছো বেশি চাপ নেওয়া ঠিক না'- তখন আপনি তার শারীরিক গঠন এবং অবস্থার দিকে নজর দিয়েই মূলত তাকে দৈনন্দিন স্বাভাবিক জিনিসগুলো থেকে দূরে থাকতে পরামর্শ দিচ্ছেন। এই পরামর্শ কিন্তু আপনি শারীরিকভাবে সুস্থসবল কাউকে দিচ্ছেন না। এখানে বডি শ্যামিং এর সাথে বিশাল একটি পৃথকীকরণও জড়িত। অর্থাৎ আপনি ব্যক্তিকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, 'তোমার ভাবনা, ধারণ গ্রহণে সীমাবদ্ধতা আছে।' 

আমরা জানি  বাঙালি আবেগ রাখে। বাঙালিরা একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে। এইসব কথাগুলো অনেকেই ভালোবাসা প্রকাশের উপায় হিসাবে বলেন। এটা খুবই ভালো একটি গুণ। তবে আমরা অনেক সময় সহমর্মিতা প্রকাশ করতে গিয়ে অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও এমন কিছু বলে ফেলি, যা অন্যকে আহত করে এবং মনের উপর বিরাট নেতিবাচক একটা প্রভাব ফেলে। 

কারো উচ্চতা নিয়ে আপনি যখন কাউকে বলবেন, 'তুমি তো খাটো কিংবা বিশেষ করে কোনো নারীকে যখন বলবেন, 'তুমি তো বেশ লম্বা', তখন এর মানে হলো তোমার উচ্চতা স্বাভাবিক নয়। আপনি যখন কাউকে ডাইট করার বা ব্যায়াম করার পরামর্শ দিবেন তখন তার মানে আপনি তাকে ইঙ্গিতে বোঝাতে চাচ্ছেন যে, 'তুমি মোটা, স্বাস্থ্য কমাতে হবে।' আপনি যখন কাউকে জিজ্ঞাসা করবেন যে, 'তুমি মোটা হয়েছো কেন, তখন আপনি তাকে বেঝাতে চাচ্ছেন যে, 'তুমি ব্যক্তি-সামাজিকভাবে ফিট না।' 

এবং যখন কেউ এই মন্তব্য বা প্রশ্নগুলির সম্মুখিন হয়, তখন সে মারাত্বকভাবে বিভ্রান্ত হয়। লজ্জায় পড়ে যায়। কখনো তার নিজেকে নিয়ে অসন্তুষ্টি জন্মাতে পারে, আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে, ব্যক্তি আবেগী হয়ে উঠতে পারে যা তার মানসিক শক্তিকে ধ্বংস করতে যথেষ্ট। 

একইভাবে, কোনো মেয়ে যদি বিয়ের বয়স পার করে ফেলে বা সিঙ্গ্যাল থাকে, তখন তাকে যদি প্রশ্ন করেন, 'তুমি বিয়ে করোনি কেন বা কবে বিয়ের দাওয়াত পাবো', তখন সে মেয়েটিও বিভ্রান্ত হবে, অস্বস্থতিবোধ করবে। সে হয়তো বিয়ে করেছিল কিন্তু সংসার টেকেনি বলে আর বিয়ে করছে না, সে হয়তো পারিবারিক বা পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতার কারণে বিয়ে বিমুখ, সে হয়তো কোনো অসুখে ভুগছে যার জন্য বিয়ে থেকে বিরত, সে হয়তো পরিবারের খরচ টানতে গিয়ে বিয়ে করতে চাচ্ছে না কিংবা সে হয়তো একাই থাকতে পছন্দ করছে। কিন্তু আপনি যখন এমন সব প্রশ্ন করবেন বা বিয়ে না করার কারণ জানতে চাইবেন, তখন সে আহত হবে। আবেগি হয়ে উঠবে। হতাশায় পড়বে। প্রতিটা নারীই সংসার চায়। সে সংসার কেন গড়ছে না তার পিছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। সেগুলো আপনার বা আমার জানার দরকার নেই। 

আরো একটা বিষয় হলো কেউ সিঙ্গ্যাল মানেই অনেক পুরুষরা তাদেরকে মেসেজ পাঠাতে থাকেন। খাতির করতে চান। নারীরাও পিছিয়ে নেই বাঁকা চোখে তাকানো থেকে। এসবই মানসিক নির্যাতন। হয়রানি। 

আদিম যুগ সভ্যতার বাহিরে ছিল বলেই তারা নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রকৃতি বা বণ্য পশুর থেকে নিজেকে আলাদা করে বা অন্য মানুষদের থেকে নিজেকে উন্নত প্রাণি হিসাবে ভাবতে পারেনি। তাই বর্বরতারও শেষ ছিল না। আজ জ্ঞান-বিজ্ঞান সভ্যতায় একবংশ শতাব্দির শূন্য দশকে দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদের আচার আচরণে কতটা সভ্য করতে পেরেছি-তা এক প্রশ্ন। 

সভ্যতা একটি গুণ। সভ্যতার গুণটি ব্যক্তি সামাজিক ও নাগরিক শৃঙ্খলা রক্ষা করার ক্ষমতা রাখে। কিছু লোক সভ্যতা এবং উপযুক্ত যোগাযোগ করতে লড়াই করেন। কখন কাকে কি বলতে হবে-তা নিয়ে হিমশিম খান। এর পেছনে  বিভিন্ন কারণ রয়েছে। পারিবারিক লালন-পালনের পার্থক্য, সাংস্কৃতিক নিয়ম, যোগাযোগ দক্ষতার উপর শিক্ষার অভাব, এমনকি মানসিক চাপ বা নিরাপত্তাহীনতার মতো ব্যক্তিগত সমস্যাগুলিও এর কারণে হতে পারে।  আবার অনেকেই অনিচ্ছাকৃত ভাবে মৌখিক বা আচরণের মাধ্যমে অন্যকে হয়রান করেন, মানসিক যন্ত্রণায় ফেলেন। যখন কেউ  অন্যদের উপর তাদের কথা বা কাজের প্রভাব সম্পর্কে অসচেতন থাকেন, তখনই এমন ঘটতে পারে।  এটি সামাজিক সংকেত, সাংস্কৃতিক পার্থক্য বা অচেতন পক্ষপাতের অজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত হতে পারে। সম্মানজনক ভাবে কথা বলা বা যোগাযোগের বিষয়ে নিজেদেরকে শিক্ষিত করতে হবে। আমাদের কথা বা আচরণ কীভাবে অন্যদের প্রভাবিত করতে পারে, সে সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। আমরা আদিযুগে বাস করছি না। আমাদের কথা বলা জানতে হবে হবে। যদিও দীর্ঘদিনের আচার-আচরণ ও চলাফেরায় আমরা যা শিখেছি তা এক সপ্তাহ বা মাসের ব্যবধানে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। তবে চেষ্টা করতে হবে। 

নিউ ইয়র্ক সিটি হিউম্যান রাইটস ল' (এটি "NYCHRL" বা "NYC হিউম্যান রাইটস ল" নামেও পরিচিত) এর অধীনে লোকেদের অধিকার এবং দায়িত্ব বোঝার জন্য সহায়তা করে, শহরের এমন একটি সংস্থা হল 'নিউ ইয়র্ক সিটি কমিশন অন হিউম্যান রাইটস।' এই পৃষ্ঠাটি NYCHRL-এর ব্যক্তির ওজন এবং উচ্চতা বিধিনিষেধের উপর আলোকপাত করে, যা ২৬শে মে, ২০২৩-এ মেয়র এরিক অ্যাডামস দ্বারা স্বাক্ষর করা হয় এবং ২৬শে নভেম্বর, ২০২৩-এ কার্যকর হয়ে ওঠে। 

নিউ ইয়র্ক সিটিতে বাস করা এবং কাজ করা ব্যক্তিদের যারা তাদের শরীরের আকার, যেমন-উচ্চতা বা ওজন এবং ওজনের সমন্বয়ের উপর ভিত্তি করে বৈষম্যের শিকার হয়, NYC হিউম্যান রাইটস ল'-সেই ব্যক্তিদের রক্ষা করে। 

মানবাধিকার আইন চাকরি, আবাসন এবং জনসাধারণের বাসস্থানে (যেমন, হাসপাতাল, জিম, রেস্তোরাঁ, বা থিয়েটার) উচ্চতা বা ওজনের উপর ভিত্তি করে বেআইনি বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করেছে। NYCHRL-এর উচ্চতা এবং ওজনের বিধানগুলি ছাড়াও আরো রয়েছে, বয়স, রঙ, অক্ষমতা, লিঙ্গ, লিঙ্গ পরিচয়, জাতীয়তা এবং জাতি পরিচয়ের বৈষম্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। 

যে কেউ তাদের উচ্চতা, ওজন বা শরীরের আকারের কারণে বৈষম্য বা পক্ষপাতের শিকার হতে পারেন। আপনি যদি বৈষম্য অনুভব করেন বা প্রত্যক্ষভাবে এসবের শিকার হোন, তবে  212-416-0197 নম্বরে কমিশনের সাথে যোগাযোগ করে অভিযোগ করতে পারেন। কিংবা অনলাইনে এই লিঙ্কে Report Discrimination - CCHR বৈষম্যের অভিযোগ করতে পারেন। আপনি বেনামী হয়েও অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন