https://www.prothomalony.com/
17831
new-york
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ ০২:৪৫
নিউইয়র্কের কুইন্সের ফ্লাশিং বহুদিন ধরেই পূর্ব এশীয় অভিবাসীদের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এই এলাকাকে ভিন্ন এক কারণে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেইডকে ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে শত শত মিলিয়ন ডলারের প্রতারণার একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। আর সেই নেটওয়ার্কের প্রধান লক্ষ্যবস্তু—অভিবাসী কমিউনিটির প্রবীণ সদস্যরা।
নিউইয়র্ক পোস্টের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, মাত্র এক মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে ৭৭টি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার (এসএডিসি) কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। এক বছরে এসব কেন্দ্র মেডিকেইড থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিল করেছে, যা পুরো নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার খাতে ব্যয়ের প্রায় ১৪ শতাংশ।
সংখ্যাটি যেমন বিস্ময়কর, বাস্তব চিত্র তার চেয়েও উদ্বেগজনক।
প্রতিবেদকরা যখন সবচেয়ে বেশি অর্থপ্রাপ্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে যান, তখন অনেকগুলোই ছিল বন্ধ। যেগুলো খোলা ছিল, সেখানেও রোগীর উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে।
নর্দার্ন বুলেভার্ডের লিভিংওয়েল ডে কেয়ারের সরকারি নথিতে দেখা যায়, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ২৬ হাজার ৫০০-এর বেশি রোগীর নামে মেডিকেইড থেকে ২৭ মিলিয়ন ডলার বিল করেছে। অথচ সরেজমিনে গিয়ে প্রতিবেদকরা দেখেছেন, ভবনটি কার্যত জনশূন্য।
একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে বাও কাং অ্যাডাল্ট ডে কেয়ারেও। একজন কর্মী প্রতিদিন শতাধিক মানুষের উপস্থিতির দাবি করলেও নিরাপত্তা ক্যামেরার মনিটরে দেখা গেছে প্রায় সব কক্ষই ফাঁকা।
এই কেন্দ্রগুলোর উদ্দেশ্য ছিল গুরুতর অসুস্থ, শারীরিকভাবে অক্ষম কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজন এমন প্রবীণদের সেবা দেওয়া। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনেক ক্ষেত্রে সুস্থ-সবল মানুষ সেখানে সময় কাটাচ্ছেন, খেলাধুলা করছেন, গল্প করছেন, বাইরে থেকে খাবার এনে খাচ্ছেন—আর পুরো ব্যয় বহন করছে করদাতাদের অর্থে পরিচালিত মেডিকেইড।
অভিযোগ আরও গুরুতর।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক প্রবীণকে মাসে ৫০০ থেকে ১,০০০ ডলার পর্যন্ত নগদ অর্থ বা বিভিন্ন সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে এসব কেন্দ্রে নিবন্ধিত করা হয়। বিনিময়ে প্রতিটি ব্যক্তির নামে কেন্দ্রগুলো মাসে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত মেডিকেইড বিল করে।
ফেডারেল কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই ফ্লাশিংয়ের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১২০ মিলিয়ন ডলারের প্রতারণার অভিযোগ এনেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, নগদ অর্থ, উপহার কার্ড, ভুয়া প্রেসক্রিপশন এবং অপ্রয়োজনীয় সেবার নামে বছরের পর বছর মেডিকেইড থেকে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এই ঘটনাকে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট কমিউনিটির সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
বরং এটি নিউইয়র্কের প্রতিটি অভিবাসী কমিউনিটির জন্য একটি সতর্কবার্তা।
কারণ এই ধরনের প্রতারণার শিকার হন সাধারণত সেইসব মানুষ, যারা ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, তথ্যের অভাব এবং পরিচিত মানুষের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসের কারণে সহজেই প্রভাবিত হন। অনেক প্রবীণকে বলা হয়, "এটি সরকারি সুবিধা", "শুধু কাগজে সই করুন", "কিছুই করতে হবে না", কিংবা "মাসে কিছু টাকা পাবেন।" অনেকেই না বুঝেই স্বাক্ষর করে দেন। পরে সেই স্বাক্ষরই ব্যবহার করা হয় হাজার হাজার ডলারের বিল তৈরিতে।
বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় সতর্কসংকেত।
আজ ফ্লাশিংয়ের ঘটনা সামনে এসেছে। কিন্তু আগামীকাল একই ধরনের অভিযোগ কুইন্সের জ্যামাইকা, ওজোন পার্ক, জ্যাকসন হাইটস, ব্রুকলিনের কেনসিংটন কিংবা ব্রঙ্কসের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় উঠবে না—এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।
বাস্তবতা হলো, প্রথম প্রজন্মের হাজার হাজার বাংলাদেশি এখন অবসরজীবনে নিউইয়র্কে বসবাস করছেন। অনেকে প্রতিদিন হেঁটে মসজিদে যান, কেউ জ্যাকসন হাইটসের ডাইভার্সিটি প্লাজায় সময় কাটান, কেউ ছোটখাটো ব্যবসা করেন। কিন্তু একই সময়ে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের হোম কেয়ার, পার্সোনাল কেয়ার বা অন্যান্য মেডিকেইড-ভিত্তিক সেবার সুবিধাভোগী।
অবশ্যই এই সুবিধাগুলোর বড় একটি অংশ বৈধ এবং প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতেই প্রদান করা হয়। কিন্তু কমিউনিটিতে এমন অভিযোগও শোনা যায় যে, কেউ কেউ নিজের শারীরিক সক্ষমতার চেয়ে বেশি অক্ষমতার দাবি করে সুবিধা নিচ্ছেন, আবার কোথাও কোথাও পরিচিতজনের পরামর্শে বা আর্থিক প্রলোভনে এমন কর্মসূচিতে যুক্ত হচ্ছেন, যার প্রকৃত নিয়মকানুন সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অবগত নন।
এই পরিস্থিতিই অসাধু চক্রগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করে।
আজ নিউইয়র্কের বিভিন্ন এলাকায় মেডিকেইড, হোম কেয়ার এবং অ্যাডাল্ট ডে কেয়ারকে কেন্দ্র করে এক ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। ফোন কল, বাড়ি বাড়ি প্রচার, পরিচিতজনের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ, এমনকি নগদ অর্থ বা অন্যান্য সুবিধার প্রলোভনের অভিযোগও মাঝেমধ্যেই শোনা যায়।
যদি কেউ আপনাকে বলে, "শুধু নাম লিখিয়ে দিন", "কাগজে সই করুন", "মাসে কিছু টাকা পাবেন", অথবা "সরকারের টাকা, না নিলে ক্ষতি"—তাহলে সেখানেই সতর্ক হওয়া উচিত।
কারণ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির উদ্দেশ্য চিকিৎসা ও সেবা নিশ্চিত করা, নগদ অর্থ বিতরণ করা নয়।
এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের কমিউনিটি কি যথেষ্ট প্রস্তুত?
বাংলাদেশি সংগঠনগুলো কি নিয়মিতভাবে মেডিকেইড প্রতারণা, প্রবীণদের অধিকার এবং সরকারি সুবিধার সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতামূলক কর্মসূচি করছে? মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার এবং বাংলা গণমাধ্যম কি এই বিষয়গুলো নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা করছে?
নাকি আমরা অপেক্ষা করছি, একদিন কোনো বাংলাদেশি পরিচালিত প্রতিষ্ঠান বা কোনো বাংলাদেশি পরিবারের নাম ফেডারেল তদন্তের নথিতে উঠে আসার পর বিষয়টি নিয়ে কথা বলব?
প্রতিটি কমিউনিটিতেই কিছু অসাধু মানুষ থাকে। কিন্তু একটি সচেতন কমিউনিটি প্রতারণাকে কখনোই স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হতে দেয় না।
ফ্লাশিংয়ের ঘটনাটি তাই শুধু একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিষয় নয়। এটি আমাদের জন্যও একটি আয়না।
সেই আয়নায় নিজেদের দেখে এখনই সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। কারণ প্রতারণার শিকার হওয়া যেমন অপরাধ নয়, তেমনি সচেতন না থাকা কখনো কখনো ভবিষ্যতের বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আজ যদি আমরা সতর্ক না হই, তাহলে আগামী দিনের শিরোনাম হয়তো হবে—বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় মেডিকেইড জালিয়াতির তদন্ত।
সেই দিনের অপেক্ষা না করে, আজ থেকেই সচেতন হওয়াই আমাদের সবার দায়িত্ব।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন