https://www.prothomalony.com/

17829

north-america

উত্তর আমেরিকা

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ফাইনালের অনুষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবক: জীবনের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ ০২:০৯

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাসকারী একজন বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপ সরাসরি দেখার স্বপ্ন ছিল অনেক দিনের। প্রায় তিন বছর আগে নিউইয়র্কে আসার পর যখন জানতে পারলাম, ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হবে, তখন থেকেই মনে একটি স্বপ্ন জেগেছিল—কীভাবে এই ঐতিহাসিক বৈশ্বিক আয়োজনের অংশ হওয়া যায়।

ফিফার স্বেচ্ছাসেবক কর্মসূচির মাধ্যমে সেই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়েছে।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর স্বেচ্ছাসেবক নির্বাচন প্রক্রিয়া ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক একটি কার্যক্রম। বিশ্বের ২২০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ১১ লাখ মানুষ স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। দীর্ঘ ও কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার পর প্রায় ৬০ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে নির্বাচিত করা হয়।

নিউইয়র্ক/নিউজার্সি আয়োজক এলাকার জন্য আবেদন করেছিলেন এক লাখেরও বেশি মানুষ। তাদের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার আবেদনকারীকে সাক্ষাৎকারের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার মানুষকে নির্বাচিত করা হয়।

আমি তাদের একজন হতে পেরে অত্যন্ত গর্বিত ও কৃতজ্ঞ। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ফাইনালের অনুষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নির্বাচিত হওয়া ছিল আমার জন্য এক অসাধারণ সম্মান। ফাইনাল ম্যাচে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র কয়েকশ স্বেচ্ছাসেবক। সেখানে কয়েকজন বাংলাদেশির একজন হিসেবে অংশ নিতে পারা আমার জন্য আরও বিশেষ এক গর্বের বিষয়।

আমার ফিফা স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার যাত্রা শুরু হয় ২০২৫ সালের আগস্টে, যখন আমি আবেদন জমা দিয়েছিলাম। এরপর শুরু হয় অনলাইন আবেদন, মূল্যায়ন, সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক ধাপ।

২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আমি স্বেচ্ছাসেবক বাছাইয়ের ট্রায়াল ও সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পাই। সাক্ষাৎকার সফলভাবে সম্পন্ন করার পর ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ফিফা থেকে নিশ্চিতকরণ ইমেইল পাই যে, আমি ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর একজন অনুষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি।

তখনও আমি জানতাম না যে, শেষ পর্যন্ত আমাকে বিশ্বকাপ ফাইনালের দায়িত্বে নিয়োগ করা হবে।

নির্বাচনের পর আমি প্রয়োজনীয় ব্যাকগ্রাউন্ড চেক সম্পন্ন করি এবং সরাসরি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নিই। চূড়ান্ত ধাপে দায়িত্ব বণ্টনের সময় আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান ছিলাম যে, আমাকে ফাইনাল ম্যাচের অনুষ্ঠানের টিমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

২০২৬ সালের মে মাসে আমি ফিফার অফিসিয়াল স্বেচ্ছাসেবক ইউনিফর্ম সংগ্রহ করি এবং জুন মাসে শুরু হয় বিশ্বকাপের মূল আয়োজন। পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, আবেদন, মূল্যায়ন, সাক্ষাৎকার, প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির প্রতিটি ধাপই ছিল এই অসাধারণ অভিজ্ঞতার জন্য মূল্যবান।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ফাইনালে কাজ করা, স্টেডিয়ামের ভেতর থেকে পুরো ম্যাচ সরাসরি দেখা এবং মাঠের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হওয়া ছিল সত্যিই স্বপ্ন পূরণের মতো।

মিরপুর, ঢাকায় ছোটবেলায় বেড়ে ওঠার সময় কখনো কল্পনাও করিনি যে একদিন ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে উপস্থিত থাকব।

ফাইনালের দিন কিছু মুহূর্ত ছিল, যা আজীবন মনে থাকবে। শাকিরা ও স্পিডের সরাসরি মহড়া নিজের সামনে দেখতে পাওয়ার অনুভূতি ছিল অবিশ্বাস্য। তখন নিজেকেই প্রশ্ন করছিলাম—“এটা কি সত্যিই ঘটছে?”

এছাড়া ফাইনালের দিন মাঠের টানেলের কাছে কার্লোস পুয়োল, ডেভিড ভিয়া, ওয়েন রুনি এবং কার্লোস তেভেজের মতো কিংবদন্তি ফুটবল ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল।

এই স্মৃতিগুলো আমার জীবনের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে।

নিউইয়র্ক-নিউজার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ফাইনালের অনুষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল প্রোডাকশন টিমকে সহযোগিতা করা এবং ফাইনালের অনুষ্ঠান কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সহায়তা করা। 

আমার দায়িত্বগুলোর মধ্যে ছিল:

বিনোদন দলের সদস্য, পারফর্মার এবং অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের স্বাগত জানানো ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা।

স্টেডিয়ামের বিভিন্ন অংশ, যেমন মাঠ, টানেল এবং নির্ধারিত কার্যক্রম পরিচালনার এলাকায় কাস্ট ও ক্রু সদস্যদের চলাচলে সহায়তা করা।

পারফর্মার, ক্রু সদস্য এবং প্রোডাকশন টিমের মধ্যে যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করা।

সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং মহড়া ও সরাসরি অনুষ্ঠান চলাকালে সুশৃঙ্খল কার্যক্রম নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করা।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজনের অংশ হিসেবে আমাকে বিশ্বাস করার জন্য আমি ফিফার কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। এই দায়িত্ব পালন করা আমার জন্য ছিল এক বিরল সম্মান ও গর্বের বিষয়।

এই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের এমন একটি স্মৃতি, যা আমি সারাজীবন ধরে লালন করব।

বহু বছর পর যখন আমি আমার নাতি-নাতনিদের এই গল্প বলব, তখন গর্ব করে বলতে পারব—আমি ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ফাইনাল শুধু দর্শক হিসেবে দেখিনি, একজন ফিফা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবেও সেই ইতিহাসের অংশ ছিলাম।

ধন্যবাদ ফিফা, আমার জীবনের এই অবিস্মরণীয় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য। # 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন