https://www.prothomalony.com/
9427
bangladesh
তীব্র তাপদাহে পুড়ছে দেশ। দিনদিন তাপমাত্রার পারদ ওপরের দিকে উঠছে। দেশের উষ্ণতম মাস এপ্রিল। এর প্রমাণ আমরা পাচ্ছি প্রকৃতিতে। রাজধানীসহ সারা দেশে মৃদু থেকে মাঝারি, কোথাও কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। চুয়াডাঙ্গায় পরপর তিনদিন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা ছিল ১৭ এপ্রিল বুধবার, ৪০ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ অবস্থায় সারা দেশে হিট অ্যালার্ট জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। রাজধানীর তাপমাত্রা গত বেশ কয়েকদিন ধরে ৩৭ ডিগ্রিতে উঠছে।
প্রখর তাপে বিপর্যস্ত জনজীবন। গরম ও অস্বস্তিতে হাঁসফাঁস করছে সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে খেটে খাওয়া শ্রমজীবীরা। তাপদাহের ভেতরেই তাদের বের হতে হচ্ছে। নাভিশ্বাস উঠেছে খেটে খাওয়া মানুষের। অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাচ্ছেন না। আগামী ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রচণ্ড গরমের কারণে অনলাইনে ক্লাস নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
রৌদ্রের প্রখর তাপে বিভন্ন জেলায় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের পাশাপাশি হিটস্ট্রোকে বিভিন্ন পশুপাখি মারা যাচ্ছে। বেড়েছে ডায়রিয়া, জ্বরসহ বিভিন্ন রোগ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। তীব্র গরমে স্বভাবতই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। বিশেষজ্ঞরা মানুষকে, বিশেষ করে অসুস্থ ও বয়স্ক ব্যক্তিদের ঘরের বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু জীবিকার তাগিদে মানুষকে বাইরে বের হতেই হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, চলতি মাসে দুই থেকে চারটি মৃদু ও মাঝারি তাপপ্রবাহ এবং এক থেকে দুটি তীব্র থেকে তীব্রতর তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। কাজেই এ মাসে সবারই উচিত চলাফেরায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা।
গরমে অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়। বেড়ে যায় তাপমাত্রা। এ পরিস্থিতিতে হিটস্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা থাকে, বিশেষ করে যারা শারীরিকভাবে অসুস্থ, যাদের হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের। এছাড়া ঊষ্ণ আবহাওয়ার কারণে সর্দিজ্বর এবং ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন হাসপাতালে এ ধরনের রোগীর চাপ বেড়েছে। জানা গেছে, প্রচণ্ড দাপদাহে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা মহাখালীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর’বি) বা কলেরা হাসপাতালে ভিড় করছে। শিশু হাসপাতালেও ভিড় বাড়ছে শিশু রোগীদের।
যে কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে শিশু, বেশি বয়স্ক ব্যক্তি এবং দরিদ্র তথা অপুষ্ট জনগোষ্ঠীর। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই তীব্র গরমে শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। তারা রোদে পুড়ে, ঘাম ঝরিয়ে শ্রমের বিনিময়ে যে টাকা রোজগার করে, তাই দিয়েই তাদের পরিবার-পরিজনের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। আর এ সময় তাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই নিজেদের বিষয়ে সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রত্যেক সামর্থ্যবানের উচিত এই তীব্র গরমে শ্রমজীবী মানুষকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখা, তাদের প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
দেশের অন্তত ৪৩টি জেলার ওপর দিয়ে বইছে মৃদু থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ। গরমে অনেকটা থমকে গেছে জনজীবন। রোদের উত্তাপে শুধু মানুষ নয়, কাবু গোটা প্রাণিকূল। ইতোমধ্যে হিট স্ট্রোকে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দাবদাহে গরম আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কায় ‘হিট অ্যালার্ট’ দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
গত কয়েকদিন ধরে যশোর, চুয়াডাঙ্গা, পাবনা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, খুলনাসহ কয়েকটি জেলার তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে। রাত-দিন বইছে লু হাওয়া। দেশজুড়ে বৈশাখের তপ্ত খরতাপে বিপর্যস্ত জনজীবন। আবহাওয়া অফিস বলছে, ২৪-২৫ এপ্রিলের দিকে তাপপ্রবাহের তীব্রতা কমে এলেও চলতি মাসজুড়ে বিরাজ করবে তাপপ্রবাহ। তীব্র গরমে কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন জেলার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে জ্বর-ডায়েরিয়াসহ পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা। এদের বেশির ভাগই শিশু ও বয়স্ক। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হওয়ার পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি ও তরল খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সূর্যের প্রখরতা ও তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময় ছায়ায় থাকা, নিতান্ত না হলে বাইরে বের না হওয়া, সুতি পোশাক পরা, বেশি পানি পান করা এবং কোমলমতি শিশুদের বাইরে খেলাধুলা না করার পরামর্শ দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে এপ্রিল উষ্ণতম মাস, তবে মে মাসেও নতুন করে তাপমাত্রা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে । গত বছর বাংলাদেশ ৪৭ বছরের মধ্যে উষ্ণতম ছিল; কিন্তু এ বছর সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে- অর্থাৎ উষ্ণতম বছর হবে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জলীয়বাষ্পের আধিক্যের কারণে অস্বস্তি বাড়তে পারে। পাশাপাশি জনসাধারণকে সচেতন থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে ক্রমশ জলীয়বাষ্পসমৃদ্ধ বাতাস প্রবাহিত হওয়ায় গোটা বাংলাদেশে তাপমাত্রা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশবিজ্ঞানীরা। এছাড়া তারা উষ্ণতা ও তাপপ্রবাহ বাড়ার আরো তিন কারণ হিসেবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, হিমালয়ের বরফ গলে কঠিন শিলা বের হওয়া এবং দেশে মানবসৃষ্ট- সবুজায়ন ধ্বংস করা, দখল-দূষণ প্রভৃতির কথা উল্লেখ করেছেন।
তাপমাত্রার তীব্রতার প্রথম কারণ হলো বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন। এর কারণে বিশ্বব্যাপী ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়ছে। এর প্রভাবও আছে বাংলাদেশের ওপর। দ্বিতীয়ত আঞ্চলিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে তাপমাত্রাটা বাড়ছে। হিমালয়ের বরফ গলে কঠিন শিলা বের হয়ে আসছে। এ অঞ্চলে নদনদীর ও বনভূমির সংখ্যা কমে গেছে। এ কারণে এ অঞ্চলে তাপমাত্রা বাড়ছে। এর একটা উদাহরণ হলো- সমুদ্রপৃষ্টে তাপমাত্রা বেড়েছে এলনিনোর প্রভাবে। এতে সমুদ্রপৃষ্ট থেকে উষ্ণ ও শুষ্ক বাতাস বাংলাদেশের ওপর দিয়ে দক্ষিণ দিক থেকে প্রবাহিত হচ্ছে। সে কারণেও বাংলাদেশের আবহাওয়া উত্তপ্ত, লু হাওয়া বয়ে যাচ্ছে।
আর তৃতীয়ত স্থানীয় কারণের মধ্যে বহু ফ্যাক্টর রয়েছে। এর মধ্যে আমাদের এখানে যে পরিমাণ গাছপালা ও জলাধার থাকা দরকার, তা নেই। অর্থাৎ সবুজায়ন ও জলাধার কমে যাওয়া। সঙ্গে সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণেও পৃষ্ঠ উত্তপ্ত থাকছে। তিনি বলেন, লক্ষ্য করেছি- ঢাকা নগরীতে প্রায় ১৬ লাখ যানবাহন চলাচল করছে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ লাখ গ্যাসের চুলা জ্বলছে আর ৪০ থেকে ৫০ লাখ ইউনিট এসি চলছে। এগুলো প্রতিনিয়িত এ শহরকে উত্তপ্ত করছে। তাছাড়া যেখানে-সেখানে বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে। বায়ুদূষণ বাড়ছে। এখানে বিল্ডআপ স্পেস ৯৫ শতাংশ। কোনো খালি জায়গা নেই। ভবনসহ নানা স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। মাত্র পাঁচ থেকে ১০ ভাগ আছে- মাটি দেখা যায়। কাচের ভবন করা হচ্ছে। এতে উত্তাপ ধারণ করে রাখা হচ্ছে। এ কারণে তাপমাত্রাটা বাড়ছে।
আজকের এই অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি এক দিনে হয়নি। তাপমাত্রা থেকে রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। দেশের কোথাও কোনো খালি জায়গা রাখা যাবে না, নতুন গাছ লাগাতে হবে। গাছ কাটায় জিরো টলারেন্সে যেতে হবে। সবুজায়ন করার কমিটমেন্ট থাকতে হবে। জলাধার সংরক্ষণ ও দখল-দূষণ থেকে উদ্ধার করা এবং নতুন জলাধার তৈরি করতে হবে। কাঁচের ভবনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ইটের ব্যবহারের মাধ্যমে উষ্ণতা সহনশীল রাখতে পারি। আর জীবাষ্ম জ্বালানি বন্ধ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার করতে হবে।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন