https://www.prothomalony.com/

9388

opinion

অভিমত

বাচ্চার যত্ন নেয়া এক সেকেন্ডের ব্যাপার!

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৪ ১২:৩৩

একবার এক লোক হন্তদন্ত হয়ে আমার বাবার কাছে তার বৌ সম্পর্কে নালিশ করতে আসলেন। নালিশটি ছিল, তার বৌ সদ্য জন্ম দেয়া বাচ্চাটিকে ঠিকমত যত্ন করতে পারছেন না। সকালে কাজে যেতে হয়। বাচ্চা রাতভর কান্না করে। তিনি ঘুমাতে পারেন না। লোকটার সর্বশেষ ভাষ্য ছিল, 'বাচ্চার যত্ন নেয়া এক সেকেন্ডের ব্যাপার। আসলে তার সংসারে মন নাই। কি ভাবে দিনরাত কারে নিয়া ভাবে আল্লাহ মালুম।'

আব্বা খুব মনোযোগ দিয়ে লোকটার কথা শুনলেন। তারপর বললেন, 'এক কাজ করো। বৌ'কে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দাও এক সপ্তাহের জন্য। এই এক সপ্তাহ তুমি কাজে না গিয়ে ঘর সামলাবে, বাচ্চাকে দেখাশোনা করবে। তোমার সপ্তাহের বেতন আমি দিব।'

অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও লোকটা রাজি হলেন। এছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না। শহরের নেতার আদেশ বলে কথা। 

যাইহোক, এরপর কান্না করতে করতে বৌ চলে যেল বাপের বাড়ি। ২ মাস বয়সী বাচ্চাটা থেকে গেল বাবার কাছে। 

একদিন পার হলো। দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় লোকটা আবার এসে হাজির। আব্বা বললেন, 'আবার কী হলো?'

তিনি আমতা আমতা করে বললেন, 'বৌ'কে নিয়া আসতে চাই। বাচ্চা কিছুই খেতে চায় না। রাথরুম করে যখন তখন। আমি এসব পরিস্কার করতে পারি না। আমার মায়েরও বয়স হয়েছে। বিছানায় পড়া। তারও যত্ন দরকার।' 

আমার বাবা হাসলেন। 

তারপর কি হয়েছিল, সেদিকে না-ই বা গেলাম। 

সন্তান পালন কি আসলেই এক সেকেন্ডের ব্যাপার? একজন নারী যখন সন্তান জন্ম দেন, তখন তার শারীরিক এবং মানসিক-দুই পর্যায়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন OB/GYN সাধারণত ছয় সপ্তাহের চিকিৎসাসেবার পরে আমাদের সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার করে বলে মনে করেন।কিন্তু আমাদের শরীরে গর্ভাবস্থার পরিণতিগুলি প্রায়শই দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, আমাদের শিশুরা স্কুল শুরু করা পর্যন্ত, এমনকি তারা পিতামাতা না হওয়া পর্যন্ত কিছু ক্ষতি লক্ষণীয় হয় না। যোনিপথে বা সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর, মূত্রাশয়, লিগামেন্ট, অন্ত্র, পেশী এবং যৌন ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুতে চাপ পড়তে পারে। যদিও জেনেটিক্স এখানে একটি ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু গর্ভাবস্থা নিজেই পরবর্তী সমস্যাগুলোর কারণ হতে পারে। যেমন-পেলভিক বা শ্রোণীতে ব্যথা, প্রস্রাব ও মল লিক করা বা ফুটো হওয়া, পেলভিকের কাঠামো ঝুলে যাওয়া বা ফুলে যাওয়া যাকে 'পেলভিক অর্গান প্রল্যাপস' বলা হয়। হার্ভার্ড বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এই সমস্যাগুলির প্রতিকূলতা আমাদের প্রসবের সংখ্যার সাথে বেড়ে যায় - বিশেষ করে শিশুর জন্মের ওজনের সাথে যোনিপথে। 

আমাদের পরিবারের লোকজন এখনো মনে করেন, সন্তান জন্ম দেয়া প্রকৃতি ও সৃষ্টির নিয়ম এবং সব নারীই সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য। হ্যাঁ, নারী মানেই মাতৃত্বের অংশ এবং আমরা সন্তান জন্ম দিই নিজের খুশিতে, নিজের প্রয়োজনে। সন্তান মানেই আমাদের সুখ। সন্তান মানেই আমাদের বেঁচে থাকার উৎস। বিষয় সেটা না। বিষয় হলো অনেক মায়েরাই সন্তান গর্ভে ধারণ করে এবং জন্ম দিয়ে পর্যাপ্ত যত্ন এবং পরিবার থেকে পর্যাপ্ত সাহায্য বা সহযোগিতা পাবার বদলে কটু কথা শুনেন। সন্তান রাতভর কান্না করলে সেটা মায়ের দোষ। সন্তান খেতে না চাইলে মায়ের দোষ। সন্তানের কোনো অসুখ বা দুর্ঘটনা ঘটতে সেটা মায়ের অযত্নে ঘটে। শিশুটির  যত্ন করতে গিয়ে পরিবারের অন্যান্য কাজগুলি ঠিকঠিক মতো না করতে পারলে, শুরু হয় অশান্তি।

সন্তান জন্মের পর যে একজন মায়ের শরীরের যত্ন নিতে হয়, তাকে উপযুক্ত পুষ্টিকর খাবার খেতে হয়, তা অনেক পরিবার উপেক্ষা করে যান। অনেকেই মনে করেন সন্তান জন্মের পর চল্লিশ দিন পর্যন্ত ভালো খাবার খেলেই সব ঠিক হয়ে যায়। 

হার্ভার্ড-অধিভুক্ত বেথ ইজরায়েল ডেকোনেস মেডিকেল সেন্টারের পেলভিক ফ্লোর ফিজিক্যাল থেরাপিস্ট জেনা লিডার এ নিয়ে বলেন, 'এখানে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে। লোকেরা মনে করেন যে শিশু জন্মের ছয় বা আট সপ্তাহ পরে, আপনি সুস্থ হয়ে গেছেন। আমি শেষ পর্যন্ত যা দেখছি তা হলো, রোগীদের সন্তান জন্ম নেবার ১৫ বা তারও বেশি বছর পরে, জীবন-পরিবর্তনকারী এই সমস্যাগুলি থেকে গেছে এবং তারা এতগুলো বছর ধরে এই সমস্যাগুলির সাথে বসবাস করছেন।'  বেথ ইজরায়েল ডেকোনেসের 'ফিম্যাল পেলভিক মেডিসিন এন্ড রিকনস্ট্রাক্ট্রিভ সার্জারি' বিভাগের একজন ইউরোগাইনোকোলজিস্ট ডাঃ মল্লিকা আনন্দ, এর সাথে একমত হয়েছেন। তিনি বলেন, 'উপসর্গগুলি প্রসবের পরেই দেখা যেতে পারে। তবে বেশিরভাগই কয়েক দশক পরেও দেখা যায়।' 

একটি সন্তান জন্ম দেয়ার পর শারীরিক ক্ষতিকর প্রভাবগুলো প্রায় প্রতিটি নারীই তার জীবদ্দশায় কম বেশি ভুগে যান। আমাদের মা-দাদীদের সময়কালে গাইনি  চিকিৎসা এতো উন্নত ছিল না এবং সংসার সামলাতে গিয়ে তাদের এসব নিয়ে বলার সুযোগও ছিল না। অনেকেই বুঝতেনও না। তাছাড়া এসব গাইনি সমস্যাকে লজ্জাজলক মন্দ কিছু মনে বলে করা হতো। তাদের অনেকেরই একটা ভয় ছিল, জরায়ুর সমস্যা মানেই স্বামী অন্য দিকে মুখ ঘুরাবেন। তাই এসব লুকিয়ে রাখাই ছিল তাদের জন্য উত্তম। 

আজকের দিনেও সমাজ ব্যবস্থা আর চিকিৎসার উন্নতি হলেও  নারীদের গাইনি সমস্যাগুলো নিয়ে বড় সংখ্যক মানুষ এমনই ভাবেন। খুব বেশি কিছু যে পরিবর্তন হয়েছে-তা নয়। 

এবার আসা যাক সদ্য জন্ম দেয়া মায়ের মানসিক অবস্থার দিকে। একটি নতুন শিশুর জন্ম অবশ্যয়ই আনন্দের একটি সময়। কিন্তু এটি একটি বিশাল পরিবর্তনের সময়ও - যা কোনো কোনো মায়ের মধ্যে ভয় এবং উদ্বেগ সহ বিভিন্ন ধরনের আবেগকেও জাগিয়ে তুলতে পারে। একটি শিশুর জন্মের পরে মেজাজের পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয় বিশেষ করে সেটা যদি হয় প্রথম সন্তান। অনেক মায়েরা পরিবারে একটি নতুন শিশু যুক্ত করার আনন্দদায়ক ঘটনার পর পরই দুঃখবোধের সাথে লড়াই করেন এবং এ বিষয়ে বিভ্রান্ত বোধ করেন। অনেক মায়েরা কখনো আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেন, খিটখিটে মেজাজ বা অভিভূত বোধ করেন, অজানা কারণেও অশ্রুসিক্ত হোন, উদ্বিগ্ন হোন, ধৈর্যহীন ও অস্থির বোধ করেন। এবং তারা প্রায়শই এটি সম্পর্কে কথা বলেন না। একে বিশেষজ্ঞরা "বেবি ব্লুজ" বলে চিহ্নিত করেন। সদ্য জন্ম নেয়া মায়ের জন্য এই লক্ষণগুলি স্বাভাবিক। এগুলি সাধারণত ক্ষণস্থায়ী হয় এবং কাউকে স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা দেয় না। এটি একটি বিরক্তিকর সময় হতে পারে তবে সাধারণত ১০/১৫ দিনের মধ্যে বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চলে যায়। 

হ্যাকেনস্যাক ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের একজন ওবি/জিওয়াইএন জুডি আর. জেরার্ডিস(এমডি) বলেছেন, 'নতুন মায়েরা জন্মের পরপরই বিভিন্ন হরমোনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন হ্রাস পায়, যা "বেবি ব্লুজ"তে অবদান রাখতে পারে। এ সময় অক্সিটোসিন বৃদ্ধি পায়, যা জরায়ুকে সংকুচিত করতে এবং প্রসবোত্তর অত্যধিক রক্তপাত প্রতিরোধে সহায়তা করে। প্রোল্যাক্টিন-স্তন্যপান করানোর জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন বৃদ্ধি করে।"  এই কঠোর পরিবর্তনগুলি প্রসবের পরে কাঁপুনি সৃষ্টি করতে পারে এবং মায়েরা ক্র্যাম্পিং ব্যথা সহ হটফ্ল্যাশ অনুভব করতে পারেন-বলেছেন হ্যাকেনস্যাকের আরেকজন ওবি/জিওয়াইএন, লিজাবেথ এ. কপ, এমডি। 

"বেবি ব্লুজ" এর সঠিক কারণ এখনো অজানা। তবে এটি গর্ভাবস্থায় এবং শিশুর জন্মের পরে ঘটে যাওয়া হরমোনের পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত। এই হরমোনের পরিবর্তন মস্তিষ্কে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে যার ফলে বিষণ্নতা দেখা দেয়। এছাড়াও সন্তান জন্মের পর ঘুমের ব্যাঘাত, রুটিন পরিবর্তন হওয়া, শিশুর জন্মের পরে যে পরিমাণ পরিশ্রম আসে এবং অভিজ্ঞতামূলক আবেগগুলি সবই একটি মায়ের অনুভূতিতে অবদান রাখতে পারে। 

যদি বেবি ব্লজ লক্ষ্যণগুলি সময়ের সাথে পরিবর্তন না হয় বরং লক্ষণগুলোর তীব্রতা বাড়তেই থাকে, তবে এটি কখনো আরও গুরুতর কিছু হতে পারে যা সনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা প্রসবোত্তর বিষণ্নতার পরিণত হ$তে পারে। প্রসবোত্তর বিষণ্নতা বেবি ব্লুজ থেকে আলাদা। প্রসবোত্তর বিষণ্নতার অনুভূতিগুলি "বেবি ব্লুজ" এর চেয়ে বেশি তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়। এগুলি একজন মাকে শিশুর যত্ন নেওয়া এবং অন্যান্য দৈনন্দিন কাজগুলি পরিচালনা করার ক্ষমতাতে হস্তক্ষেপ করে। এই লক্ষণগুলি সাধারণত সন্তান জন্ম দেওয়ার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিকাশ লাভ করে। লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে-বিষণ্ণতা, মুড সুইং, ক্রমাগত কান্না করা, শিশু সন্তানটির সাথে বন্ধনে জড়াতে না পারা, পরিবার এবং বন্ধুদের কাছ থেকে প্রত্যাহার, ক্ষুধা কমে যাওয়া বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খাওয়া, ইনলোমনিয়া বা খুব বেশি ঘুমানো, অত্যধিক ক্লান্তি বা শক্তি হ্রাস, উপভোগযোগ্য কার্যকলাপে আগ্রহ কমে যাওয়া, তীব্র বিরক্তি এবং রাগ প্রকাশ করা, ভালো মা না হতে পারার ভয়, আশাহীনতা, নিজেকে মূল্যহীন ভাবা, লজ্জাবোধ, অপরাধবোধ, সঠিকভাবে চিন্তা বা মনোনিবেশ করতে না পারা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস, অস্থিরতা, গুরুতর উদ্বেগ এবং প্যানিক এ্যাটাক, নিজের বা শিশুর ক্ষতি করার চিন্তা, মৃত্যু বা আত্মহত্যার চিন্তা..ইত্যাদি। 

কেউ কেউ শিশু জন্মের পর প্রসবোত্তর পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD) বিকাশ করতে পারেন। এটি হলো এক ধরনের উদ্বেগজনিত ব্যাধি। এটি বার্থ ট্রওমা হিসাবেও পরিচিত। এটি কারো মধ্যে বিকাশ করতে পারে যদি কেউ প্রসব বা প্রসবের সময় আঘাতপ্রাপ্ত হোন। কদাচিৎ, কারো কারো পোস্টপার্টাম সাইকোসিস নামে একটি চরম মেজাজের ব্যাধিও প্রসবের পরে বিকশিত হতে পারে। পোস্টপার্টাম সাইকোসিস যদিও বিরল একটা অবস্থা, তবে এটি সাধারণত প্রসবের পর প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বিকাশ লাভ করে। মাতৃ আচরণ এবং চিন্তা প্রক্রিয়ার এই পরিবর্তন বিভিন্ন জৈব-সাইকো-সামাজিক কারণে ঘটতে পারে। শারীরিক এবং হরমোনের পরিবর্তন, ঘুমের অভাব, ক্লান্তি, এবং নবজাতকের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি ভূমিকা এবং প্রতিশ্রুতির সূচনা, যা শারীরিক এবং মানসিকভাবে উভয়কেই চ্যালেঞ্জিং করে তোলে। প্রসবোত্তর সাইকোসিস হলো সেই শ্রেণীর মানসিক অসুস্থতার সবচেয়ে গুরুতর রূপ যা চরম বিভ্রান্তি, বাস্তবতার সাথে সংস্পর্শ হারিয়ে ফেলা, বিভ্রান্তি, অসংগঠিত চিন্তা প্রক্রিয়া এবং হ্যালুসিনেশন দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। এটি সন্তান জন্মদানের বয়সের সময় প্রতি এক হাজার মহিলার মধ্যে প্রায় এক থেকে দুইজনকে প্রভাবিত করে এবং সাধারণত জন্মের প্রথম ছয় সপ্তাহের মধ্যে কয়েকদিনের মধ্যে ঘটে। পোস্টপার্টাম  সাইকোসিস জীবন-হুমকির চিন্তা বা আচরণের দিকে নিয়ে যেতে পারে কাউকে। 

এসব আমার কথা নয়, বিশেষজ্ঞদের দেয়া তথ্য। 

সন্তান পালন এক সেকেন্ডের ব্যাপার- বিষয়টা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ভেবেছি। ভেবে ভেবে হতাশ হয়েছি। একটি সদ্য জন্ম নেয়া সন্তানের লালন পালন করতে গিয়ে একজন মা ঠিক মতো ঘুমাতে পারেন না। সময় মতো খেতে পারেন না। প্রয়োজনে কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়া বা ফোন কলে কথা বলা সীমিত করতে হয় তাকে। সন্তানের যত্নে ব্যস্ততা বাড়ে তাই সেসময় তাকে শখের কাজগুলো বাদ দিতে হয়। একজন মায়ের এ সময় চুল ঝরে যায়, বুকের সাইজ বদলে যায়। মসৃণ ত্বকের শরীরের পেটে-উড়ুতে ফাঁটা দাগ পড়ে, চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে। তার দৈনন্দিন জীবনের পুরো রুটিন বদলে যায়। কিন্তু কয়েকদিন পার হলেই তাকে আবারো শিশুর যত্নের পাশাপাশি স্বামী ও পরিবারের অন্যদের যত্নসেবা দিতে হয়। ঘুম ভেঙ্গে নিয়মিত নাস্তা বানাও, দুপুরের রাতের খাবার করো, ঘর-টয়লেট পরিস্কার করো, পরিবারে বয়স্কদের বাড়তি যত্ন করো...নানা দায়িত্ব। তারউপর বাচ্চাটির চুল পরিমাণ কোনো কিছু হলে, সেটার জন্যও মাকেই দায়ী করা হয়। এইসব চাপের কারণে যখন কেনো মায়ের মন খারাপ হয়, তখন সেটাও তাকে চুপচাপ সয়ে যেতে হয়। কারণ প্রকাশ করতে গেলে পরিবারের অন্যদের মেজাজ বদলে যাবে এবং কটু কথা শোনাবেন। এই মা-যাবেন তো কার কাছে যাবেন? তাকে তো প্রসবোত্তর ডিপ্রেশনে পড়তেই হবে। 

একটি শিশুর জন্ম মানে একজন মায়ের জন্য সেটা জীবনের এক চরম সুখের শুরু। কিন্তু সেই মা যখন সদ্য জন্ম দেয়া শিশুটির যত্ন ঠিকঠাক নিতে পারছেন না, তখন পরিবারের সদস্যদের বুঝতে হবে সমস্যাটা কোথায়। তাকে শিশুর যত্নে সাহায্য করতে হবে, শিশুটিকে পরিবারে স্বামী বা অন্যদের কাছে রেখে তাকে কখনো বাইরে যেতে সুযোগ করে দিতে হবে। তার দিনটি আনন্দময় ও সহজ করে তোলতে পরিবারের অন্যান্য কাজ ও দায়িত্বগুলো ভাগ করে নিতে হবে। কিন্তু সেটা না করে পরিবর্তে মা কেন মনমরা হয়ে আছেন, শিশুটিকে মনোযোগ দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, পরিবারের অন্যদের সেবা করছেন না-এসব নিয়ে যদি তাকে নানা কটু কথা শুনতে হয়, তাহলে সেই মায়ের মানসিক অবস্থা বিপাকে পড়বে। পরিবারকে কেবল শিশুটির যত্নে চিন্তিত হলে হবে না, শিশুটির মায়ের প্রতিও যত্নশীল হতে হবে। এখানে একজন স্বামীর ইতিবাচক ও সহযোগী ভূমিকা অ‌ত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

প্রতিটা মা তার সন্তান জন্মের পর ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি দ্বারা প্রভাবিত হোন। একটি সন্তান জন্ম দেয়া কেবল খুশির খবর, প্রাকৃতিক বা স্রষ্টার আশীর্বাদ নয়। একটি সন্তান জন্ম দেয়া মানে একজন মায়ের মাতৃত্ব ও সুখের অনুভূতির সাথে বহু শারীরিক ক্ষতির সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত থাকা। সেই সাথে মানসিক সমস্যাগুলি সবার মধ্যে উপলদ্ধ না হলেও অনেকের মধ্যে উপলদ্ধ হয়। অনেক মায়েরাই শরীরের দুর্বলতার সাথে প্রাথমিক বিষণ্ণতায় ভুগেন। কিন্তু যখন তাদের জন্য যত্ন ও সাহায্যের অভাব হয় তখন সেটাই প্রসবোত্তর বিষণ্নতায় পরিণত হতে পারে। একটি সন্তানের লালন পালন এক সেকেন্ডের ব্যাপার তখনই হতে পারে যখন স্বামী এবং পরিবারের অন্যরা সেই মাকে সার্বিকভাবে সাহায্য করবেন। একটি বাচ্চার লালন পালনের দায়িত্ব কেবল মাযের একা নয়, বাবারও সমান দায়িত্বে পড়ে। 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন