https://www.prothomalony.com/
9156
opinion
ঈদের সেকাল - একাল
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে বহু শতাব্দী ধরেই ঈদ এক প্রধান উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। এই উৎসবের ধরন-ধারণ সময়ের সাথে সাথে নানাভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু এর মূল প্রকৃতি অপরিবর্তীত রয়ে গেছে। সকালের নামাজের সমাবেশ খুশি ও আনন্দে ভরপুর এক পুনর্মিলনীর প্রতীক। নামাজের পর আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধুদের বাড়িতে যাওয়া এবং আপ্যায়িত হওয়া দিনটিকে নতুন করে সৌহার্দ্য, সখ্য ও বন্ধুত্বের আবহে মুখর করে তোলে।
নতুন জামাকাপড়, জুতা ও অলঙ্কার সবার জন্যই বিশেষত শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য যেন এই দিন উপলক্ষে অবশ্য প্রয়োজনীয় জিনিস হিসেবে গণ্য করা হয়। সব কিছুই এই দিনে হয়ে ওঠে এক নতুন আনন্দময় সূচনার প্রতীক। যে চিরঞ্জীব আনন্দের ধারা ঈদ উৎসবের মৌলিক উপাদান তারই নবায়ন ঘটে এই দিনে।
ঈদের আনন্দ সবসময়ই একই ধারায় বহমান। বিশেষ করে, শৈশবের ঈদ মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় বহন করে। সময়ের পরিবর্তনে উৎসবের আমেজে হয়তো রঙ বদলায়, আনন্দ নয়।
আবার একেক এলাকায় উদযাপনে হয়তো ভিন্ন ভিন্ন ধারা থাকে, মাত্রা থাকে, ধারাবাহিকতা থাকে। ঈদের আনন্দ, সবার জন্য এক নতুন বার্তা নিয়ে আসে। ঈদের দিন মানেই ঝরঝরে নতুন সময়ের শুরু।
আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যে থাকা পরিবারগুলোয় সে সময়ে ঈদের কেনাকাটায় তেমন বাহুল্য ছিল না। তখন বাইরে গিয়ে ঈদের বাজার করার মতো তেমন একটা চলও ছিল না। বাড়িতে গজ কাপড় এনে, ঘরের সেলাই মেশিনেই একাধারে ভাইবোন সবার জন্য ফ্রক, পাঞ্জাবি, কামিজ আর ব্লাউজ তৈরি করতেন বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলারা।
নতুন শাড়ি আনা হলে তাতে সুই সুতায় হাতে নকশা তুলতো সবাই মিলে। তবে সারা বছর যে শাড়ি লাগে তেমন শাড়িই আনা হতো। ছেলেদের জন্য সাদা পাঞ্জাবি আর পায়জামাই ছিল সহজ চল। ঈদের দিন নতুন জুতার বাহানা সব ঘরেই শিশুদের আগ্রহের কেন্দ্রস্থল হিসেবে বরাবরের মতোই ছিল খুব বেশি। মধ্যবিত্তের আগামী দু’বছর জুতা আর কেনা হবে না, এই ভাবনায়, শিশুদের পায়ের মাপ থেকে একটু বড় কেনা জুতায় তুলো ভরে চালিয়ে নিতেন।
সেই সময়ে চাকচিক্যের বাহুল্য নয়, একতায় সহজ সাধারণ আনন্দের মাঝেই ঈদের দিন যাপিত হতো। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল নয় এমন আত্মীয় স্বজনদের ঈদের দিন বাটি ভরে রান্না করা খাবার পাঠানো হতো। সারা বছরই এমন পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক সাহায্যের চল সবসময়ই থাকতো।
ঈদের একালে বাহ্যিক চাকচিক্য বেড়েছে বহু গুণ। সময়ের গতিধারা বহন করে এনেছে প্রচুর অনুষঙ্গ। আকাশ তরঙ্গ নির্ভর সাংস্কৃতিক চর্চায় সাজগোজ আর আতিথেয়তায় বদল এসেছে অনেক। প্রতি বছরই তাই নতুন আদলে ঈদের চেহারা বদলাতে থাকে।
কখনো কোনো সিনেমার নায়িকার শাড়ি ভর করে নারীদের মাঝে, আবার কখনো লাখ টাকার লেহেঙ্গা। অনেকে হালফ্যাশনের কাপড় অলংকার কিনতে দেশের বাইরেও চলে যায় আজকাল। এই সময়ের ঈদ, কেনাকাটা নির্ভর হয়ে গেছে। আবার দেখা যায়, অনেকে ঈদের দিনে রান্নাবান্না, আত্মীয়স্বজন আপ্যায়নকে ঝামেলা মনে করে সেই সময়ে ছুটি কাটাতে দেশের বাইরে চলে যায়। আয়োজন, উদযাপনে এতশত বদল হওয়ার পরও ঈদের নতুনত্ব সবার জন্যই পৃথক অর্থে হলেও হাসিমাখা সময়ের কথাই বলে চলে এখনো।
সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর যেন এক নতুন মাত্রায় ভূষিত হয়েছে। যা অতীতে ছিল পুরো সমাজের সার্বিক আনন্দের এক অনাড়ম্বর এবং সরল বহিঃপ্রকাশ, তা বর্তমানে লাভ করেছে বহু বিচিত্র মাত্রা। এখনকার ঈদে দেখতে পাওয়া যায় সংশ্লিষ্ট সবার ব্যাপক এবং আরো সক্রিয় অংশগ্রহণ। সন্দেহ নেই, বেড়ে ওঠা জনসংখ্যা এর পেছনে ক্রিয়াশীল একটি কারণ। যেখানে ষাটের দশকে জনসংখ্যা ছিল চার কোটি এবং ১৯৭০ দশকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের জনসংখ্যা ছিল সাত কোটি তা এখন পৌঁছেছে ১৮ কোটির কোঠায়। কেবল জনসংখ্যা বৃদ্ধিই এই উৎসবের রূপ পরিবর্তনের মূল বা একমাত্র কারণ নয়। নাগরিকদের এক অংশ যা তুলনামূলকভাবে সংখ্যায় কম অথচ বিত্তে ও সম্পদে গুরুত্বপূর্ণ, তারা এই পরিবর্তনের প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এদের অর্জিত যে নয়া অর্থ ও সম্পদ এসেছে, ফলে বেড়েছে টাকার সরবরাহ। এই অর্থ সাম্প্রতিককালের ঈদের সময় এদের নতুন এবং দামি জামাকাপড়, গয়না, জুতা, অন্যান্য উপহারসামগ্রী যথেষ্ট কেনার সামর্থ্য এনে দিয়েছে। এসবই এখনকার ঈদকে সঞ্জীবিত করেছে। কয়েক লাখ লোকের হাতে যে বাড়তি অর্থ জমা হয়েছে, উৎসব উপলক্ষে তার অংশ, যার পরিমাণও কয়েক শ’ কোটি খরচ করার ফলে কেনাকাটা সারা দেশেই এক নতুন বিশাল মাত্রা পায়। আজকের বাংলাদেশে ঈদ মাত্র এক দিনের ব্যাপার নয়, বরং এই উৎসব এখন যেন মূলত এবং কার্যত এক মাসব্যাপী বা তার চেয়েও বেশি দিন ধরে স্থায়ী আনন্দের ঋতুর রূপ লাভ করেছে। যারা সচ্ছল ও সম্পদশালী, তাদের জন্য কেনাকাটার পর্ব শুরু হয় প্রথম রমজান থেকেই। রমজানের মাসব্যাপী সংযম ও ত্যাগের সময়ের সাথে যেন তাল মিলিয়ে চলে নতুন ভোগ্যসামগ্রী ও উপহার সংগ্রহের পালা।
যাদের তেমন কোনো সঙ্গতি নেই, যাদের আয়-উপার্জন তুলনামূলক অনেক কম, তারাও ঈদ উপলক্ষে ব্যস্ত থাকে সেসব উপহার কেনাকাটায়, যার দাম তাদের আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ঈদ তার আগমনের বার্তা সবখানে রেখে যায় : মহানগর ও শহরে জনাকীর্ণ ও ব্যস্ত সরণিতে, যুগপ্রাচীন গ্রামীণ বাজারে, পরাক্রমশালী ও বিত্তবান ব্যক্তিদের প্রাসাদে এমনকি দরিদ্র ও বঞ্চিতদের কুঁড়েঘরের আঙিনায়।
প্রবীণ প্রজন্মের সদস্যদের মনে পড়তে পারে তাদের প্রথম কৈশোরের কলকাতায় উদযাপিত ঈদের কথা। অবিভক্ত বাংলার রাজধানীতে সেই ঈদ ছিল এমন এক সংখ্যালগিষ্ঠ সম্প্রদায়ের উৎসব, যা ছিল বিশেষ করে সেই সংখ্যালঘু কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মানবগোষ্ঠীর আনন্দ ও খুশির সময়। সে সম্প্রদায়ের আদিবাস ছিল এমন এক উপমহাদেশে, যা ছিল তখনো অবিভক্ত এক বহুজাতিক, বহু ধর্মানুসারী, বহু ভাষাভাষী বিশাল মানবগোষ্ঠীর বাসভূমি। মূলত ধর্মীয় এই উৎসব এমন এক বিচিত্র সমাজে পালনের যে আনন্দ তা ছিল অনাড়ম্বর অথচ সখ্যের প্রীতিতে উজ্জ্বল। বিশেষ এক ধর্মের উৎসব হয়েও তা সহাবস্থানকারী অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের বোধ এবং অনুভবের বাইরে ছিল না, তারাও এই উৎসবে অভিনন্দন এবং আনন্দ দেয়া-নেয়ায় ব্যস্ত হয়ে উঠত। আজকের মতোই সেদিনও নতুন জামাকাপড়, জুতা এবং সুস্বাদু খাবারের সমারোহ ছিল। সব উপহারের মধ্যেই ছিল মা-বাবার স্নেহ ও ভালোবাসার মায়াময় পরশ। ধন ও ঐশ্বর্য এবং আরম্ভর সব কিছুকে ছাপিয়ে যেত না। সব অমূল্য উপহারই ছিল সেই ভালোবাসায় দীপ্ত, যা ছিল মহামূল্যবান মণিমুক্তার মতোই উজ্জ্বল।
গ্রামে ঈদ উদযাপনের স্মৃতি। ছায়াময় গাছের নিচে সেই ছোট মসজিদ, সরল ও সহজ এবং পরিচ্ছন্ন জামাকাপড়ে ভূষিত গ্রামীণ জনসাধারণের ভিড় রঙ-বেরঙের জামাকাপড়ে সজ্জিত হাসিখুশি শিশুর সমাবেশ এবং সুস্বাদু অথচ তুলনামূলক কমমূল্যের খাদ্যসামগ্রী এবং অনিঃশ্বেস আনন্দ। এই ছিল সেই গ্রামীণ ঈদের জীবন্ত রূপ। মসজিদে ঈদের জামাত ছিল বহু জাতি ও বর্ণের এক বিচিত্র ও বর্ণিল মিলনমেলা। তারা পরস্পর অবদ্ধ ছিল একই বিশ্বাসে বিশ্বাসী সখ্যে এবং একই আনন্দ উৎসবের অংশীদারের প্রীতি ও ভালোবাসায়।
সহজ ভাষায় ঈদের অর্থ হচ্ছে নতুনকে পাওয়া, দিনটি আনন্দ-উচ্ছ্বাসে কাটিয়ে দেওয়া। যেখানে থাকবে না কোনো দুঃখ-দুর্দশা। প্রাণ খুলে আমরা শান্তি ও পরকালীন মুক্তির অন্বেষণে ঈদ উদযাপন করতে পারি। ঈদের দিন মানুষে মানুষে মিলনের অঙ্গীকার। কিন্তু বর্তমান সমাজের বাস্তবতায় এই অঙ্গীকার যেন আগের মতো থাকছে না। ধনী-গরিবের বৈষম্য এতো বেড়ে গেছে যে, ঈদের দিনের মিলনটা একটা প্রথাগত মিলনে পরিণত হতে যাচ্ছে।
ঈদের দিনে আত্মীয়তার একটি বন্ধন নির্মিত হয়। এ আত্মীয়তা হচ্ছে কাছের ও দূরের সকলের সাথে আত্মীয়তা। আমরা ঈদের দিনে সমাজের নানাবিধ বৈষম্য থাকা সত্বেও একে অন্যের কাছে আসি। কর্মক্ষেত্রে মিলনের মধ্যে অনেক সময় স্বার্থের সম্পর্ক বড় হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু ঈদের দিনের মিলনে একটি সুন্দর অভিব্যক্তি আছে। এই মিলনে স্বার্থের সম্পর্ক নেই, আছে কেবল ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার তাগিদ।
ঈদ আনন্দ বয়ে আনুক সবার চিত্তে। সবাই হেসে উঠুক ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, অর্থের বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন