https://www.prothomalony.com/
8957
opinion
কবি রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায় তার 'স্বাধীনতা' কবিতায় সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, 'স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়? দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়'।
মানুষের জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বিষয় হচ্ছে স্বাধীনতা। স্বাধীনতাহীনতায় কেউ বাঁচতে চায় না। দাসত্বের শৃঙ্খল পরতে চায় না কেউ। কিন্তু অনেকের জীবনে মুক্ত বিহঙ্গের মতো সেই স্বাধীনতার স্বাদ অলীক স্বপ্ন হয়েই থেকে যায়। কোনো কোনো জাতি দশকের পর দশক স্বাধীনতার জন্য রক্ত ঝরিয়েও পাচ্ছে না স্বাধীন ভূখণ্ড, মানচিত্র, পতাকা। অনেক জাতি আবার নামেমাত্র স্বাধীন। ঔপনিবেশিকতার বেড়াজালে আটকা।
আমাদের যদি কোনো ব্যক্তিস্বতন্ত্রতা না থাকে, চিন্তার স্বাধীনতা না থাকে; তবে কখনোই তার মধ্যে অন্তর্নিহিত সুকুমার বৃত্তিগুলোর জাগরণ ঘটবে না। তাই পরাধীন অবস্থায় মানুষ যা চিন্তা করে, চিন্তাগুলো খুব একটা ফলপ্রসূ হয় না।
বাংলাদেশ আজ মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের গৌরবদীপ্ত সুবর্ণজয়ন্তী অতিক্রম করেছে। অথচ দুঃখজনকভাবে আমরা দেখছি, আমাদের সংস্কৃতির অভিমুখ ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে দেশে বিদেশে ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো হচ্ছে। স্বাধীনতার মূলস্রোতের মানুষদের উদাসীনতায় সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং সাহস দিনে দিনে বেড়ে অসহনীয় হয়ে যাচ্ছে। আজ অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রীয়ভাবে, দলীয়ভাবে চর্চা করে তৃণমূলে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন
মুক্তি সংগ্রামের দিক থেকে ভাগ্যবান জাতি হচ্ছে বাঙালি। যারা নিজের ভাষার নামে একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছে। পেয়েছে স্বতন্ত্র মানচিত্র। লাল-সবুজের পতাকা পত পত করে ওড়ে জানান দেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সগৌরব অস্তিত্ব।
একটা দেশের জনগণ যখন অন্য দেশ দ্বারা শাসিত হয় অর্থাৎ তাঁদের ভৌগোলিক স্বাধীনতা যখন খর্ব হয়, তখন সেই দেশ তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আক্রমণ করে, দাবিয়ে রাখে। কারণ, দীর্ঘ মেয়াদে ভৌগোলিক স্বাধীনতা হরণ করার জন্য ভাষা ও সংস্কৃতিকে দাবিয়ে রাখার দরকার হয়। বাংলাদেশ যখন তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসনে ছিল, তখন তারা একই কাজ করেছিল। ২২ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম ও ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়া নিছকই ভৌগোলিক স্বাধীনতার প্রশ্ন । ‘আমরা এ দেশের মানুষের মুক্তি চাই’ বঙ্গবন্ধু যখন এ কথা বলেন, তিনি আসলে এ দেশের শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির কথাই বলেন। কারণ, বঙ্গবন্ধুর ভাবনা জুড়ে ছিল খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ তথা কৃষক ও শ্রমিক। তাঁর অসংখ্য বক্তৃতায় এর সাক্ষ্য মেলে।
গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় মানুষের সার্বিক স্বাধিকারের কথাই বলা হয়েছে, যার মধ্যে আছে ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার, সম্পদের অধিকার—সব। সরকার যদি প্রকৃত অর্থেই জনগণের হয়, তাহলে সে আবশ্যিকভাবেই জনগণের স্বার্থের জন্য কাজ করবে।’ কিন্তু বাংলাদেশে যেহেতু নির্বাচনী ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে, নির্বাচনে জেতার জন্য জনগণের ভোটের ওপর নির্ভর করতে হয় না তাই জনগণের স্বার্থ রক্ষার দিকেও নজর দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এখন মুষ্টিমেয় লোকের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত এবং বৈষম্যের মাত্রাও পর্বতপ্রমাণ।
নারীর মুক্তি ও শ্রমিকের মুক্তি ছাড়া কোনো সমাজের মানুষের সার্বিক মুক্তি হয় না। নারীর মুক্তি ও শ্রমিকের মুক্তি ছাড়া একটি রাষ্ট্রে সমতাও নিশ্চিত করা যায় না। আর সমতা ছাড়া মানুষের সুখ সর্বাধিক করা যায় না। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে জীবনমানের বিস্তর ব্যবধানই বাঙালিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু নিজ দেশেই আজ নারী, শ্রমিক ও সংখ্যালঘুর অবদমন অব্যাহতভাবে বেড়ে চলছে। যার কারণে অনেক মুক্তিযোদ্ধাই আজ প্রশ্ন তোলেন, দেশ স্বাধীন করে কী লাভ হলো?
স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দী পরেও আমাদের 'পলিটিক্যাল সোসাইটি' ধর্ম–বর্ণ–শ্রেণি নির্বিশেষে সব মানুষের বেঁচে থাকার, সবার স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার চাহিদাটুকুও পূরণ করতে পারল না। একদল অধিকতর গুরুত্ব ও মর্যাদা পেয়ে দাপট দেখাচ্ছে, শাঁসানি দিচ্ছে, আরেকদল কাচু–মাচু হয়ে কোনো মতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। দারিদ্র্য আর অধিকারহীনতার মাপকাঠিতেই তারা বাঁধা থাকছে, আর 'প্রিভিলেজ্ড' শ্রেণিটি ধনী হতে হতে ১৮ তলা, বিশ তলা অট্টালিকা বানাচ্ছে! নানা কায়দায় বিদেশে টাকা পাচার করে সম্পদের মালিক হচ্ছে। স্বাধীনতা যেন তাদেরই জন্য !
স্বাধীনতার মূল চেতনা হলো মানুষের মুক্তি আর মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করা মানেই পৃথিবীকে আরও একটু সুন্দর রেখে যাওয়ার বাসনা। স্বাধীনতার স্বপ্ন। যে স্বপ্ন একদিন বাঙালি দেখেছিল। সেই স্বপ্ন বাঙালির চোখে এঁকে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব করে। ভয়াবহতার হিসাব করে না। নৃশংস ও নির্মমতার দিক থেকে পৃথিবীর যেকোনো গণহত্যার চেয়ে ভয়ংকর ছিল পাকিস্তানিদের গণহত্যা। নির্মম বা নৃশংস কোনো শব্দই এই নির্মমতা প্রকাশের জন্য যথেষ্ট নয়। যেখানে এক রাতেই রক্তের নদী বানিয়ে ফেলেছিল ঢাকা শহরে। একদিন পৃথিবীতে আমাদের সেই বীর মানুষ থাকবেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা তাদের হারিয়ে ফেলব। কিন্তু তাদের স্বপ্ন, তাদের দেখানো পথ আমাদের সামনে থাকবে। আমাদের মাঝেই তারা বেঁচে থাকবেন। স্বাধীনতা একটি স্পর্শমণি যা প্রত্যেকেই চায়। আমরাও চেয়েছিলাম। অনেক ত্যাগ, অনেক শ্রম আর বুকের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। যেসব মানুষ আমাদের একটি স্বাধীন দেশ এনে দিতে জীবন বাজি রেখেছেন, তাদের কেউ কেউ আজো অবহেলিত। দেশকে ভালোবেসে যাওয়াই তাদের একমাত্র সান্ত¦না। কিন্তু তাদের জন্য কিছু না করতে পারাটা আমাদের ব্যর্থতা। আমরা চাই একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যিনি এ দেশের জন্য রণাঙ্গনে জীবন বাজি রেখেছিলেন তিনি তার কর্মের স্বীকৃতি পাক। এসব মুক্তিযোদ্ধাকে খুঁজে বের করে তাকে তার সম্মান দেওয়া হোক। তাদের ঋণের শোধ না হলেও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা করাই যায়।
সময়ের সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীন থাকবে অনন্ত সময় ধরে। মুক্ত আকাশে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মাহুতি দেয়া বীরদের স্মরণ করে উড্ডীন থাকবে। দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন, রক্ত দিয়েছেন- এমন অনেকেই আর বেশীদিন বেঁচে থাকবেন। বাংলার মানুষ তাদের রক্তের ঋণ শোধ করার জন্য ব্যাকুল থাকবে অনন্ত সময়কাল। এখনো যেসব বীর মুক্তিযোদ্ধা বেঁচে আছেন, তাদের পাশে রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে। বাংলা মায়ের শ্রেষ্ট সন্তানদের প্রতি অনেক অবহেলা হয়েছে। আর নয়। আমাদের সবটুকু সামর্থ, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দিয়ে দাঁড়াতে হবে বীরদের পাশে। তবেই উর্বর বাংলায় বীরের জন্ম হবে বারবার।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন