https://www.prothomalony.com/

8719

opinion

অভিমত

বয়স্ক নি র্যা ত নঃ কীভাবে ঝুঁ কি পূ র্ণ সংকেতগুলো চিহ্নিত করবেন

প্রকাশ: ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ ০৭:১৪

প্রতিটা মানুষ,সে যে বয়সেরই হোক না কেন,তার ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও যত্নের দরকার আছে।ব্যক্তি যার সাথে থাকে,যার সাথে যোগাযোগ রাখে,যে তার যত্ন নেয় এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের দ্বারা ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকার যোগ্য তারা। সবাই পরিবারে বয়স্কদের যত্ন করেন। তারপরও আমরা সিডিসি'র রেকর্ডে দেখতে পাই যে, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী যারা বাড়িতে থাকেন, তাদের ১০ জনের মধ্যে ১জন, দুর্ব্যবহার, অবহেলা, শোষণের শিকার। পুরো বিশ্ব জুড়ে পরিবারে বা প্রাতিষ্ঠিক সেবাকেন্দ্রে বয়স্কদের প্রতি অবহেলা, দুর্ব্যবহার ও শোষণ-আজ নতুন কিছু নয়। বাঙালি সম্প্রদায়েও বয়স্কদের প্রতি নির্যাতন, শোষণ, অবহেলা রয়েছে। 

শিশু নির্যাতনের মতো বয়স্ক নির্যাতন/ অপব্যবহার অর্থাৎ 'এডাল্ট এবিউজ' ব্যাপক। ন্যাশনাল সেন্টার অন এল্ডার অ্যাবিউজ (NCEA) অনুসারে, বয়স্কদের অপব্যবহার হল এমন একটি শব্দ যা পরিচর্যাকারী বা অন্য কোনও ব্যক্তির দ্বারা ইচ্ছাকৃত, অনিচ্ছাকৃত বা অবহেলামূলক কাজকে বোঝায় যা একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে ক্ষতি করে এবং গুরুতর ঝুঁকিকে ফেলতে পারে। অনেক গবেষকদের মতে, বয়স্কদের প্রতি অপব্যবহারের কোন একক প্যাটার্ন নেই। এটি একটি জটিল সমস্যা যা একাধিক কারণের সমন্বয়ে উদ্ভূত হতে পারে। যেমন-পরিবারের মধ্যে বিরক্তিকর এবং হিংসাত্মক মিথস্ক্রিয়া থাকা, জীবনযাত্রার সামঞ্জস্য, বয়স্কদের অসুস্থতা বা নতুন দীর্ঘস্থায়ী রোগ-চিকিৎসার কারণে উদ্ভূত বিরক্তি ও উত্তেজনা। একজন তত্ত্বাবধায়ক যিনি বয়স্ক ব্যক্তিটির দায়িত্বে আছেন, তার ব্যক্তিগত সমস্যাগুলিও বয়স্কদের প্রতি অপব্যবহারের কারণ। যেমন, তত্ত্বাবধায়কের সাংসারিক বা কাজের চাপ, মানসিক অসুস্থতা, অ্যালকোহল বা অন্যান্য মাদকের আসক্তি, আর্থিক সঙ্কট বা অন্যান্য ব্যক্তিগত সংকটগুলোও একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে অপব্যবহারের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিছু সামাজিক মনোভাবও বয়স্ক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় অবদান রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রায়শই পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ পর্যন্ত নগণ্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ তারা উৎপাদনশীন নন বরং বোঝা। তারা অহেতুক কথা বলেন, বেশি কথা বলেন, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, সৃষ্টিশীল চিন্তা করতে পারেন না...ইত্যাদি। যার ফলে সমাজ ট, য়স্ক ব্যক্তিদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ, সহায়ক জীবন পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। এবং বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদের অবমূল্যায়ন, সম্মানের অভাব, বাড়িতে ঘটে যাওয়া অপব্যবহার গুলোকে সমাজ বিশ্বাস করে যে, এগুলি পারিবারিক বিষয়। মূলত এগুলি সামাজিক  সঙ্কট। আমাদের বাঙালি পরিবার ও সমাজে বেশির ভাগ ৬০/৬৫ পার করা বয়স্কদের কথা ও আচরণের মাধ্যমে আমরা বুঝিয়েই দিই যে, ইউ আর গুড টু গো নাও।কখনো এই বয়সীরা নিজেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন। 

বয়স্ক নির্যাতন বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যার মধ্যে রয়েছে: শারীরিক নির্যাতন, মৌখিক-মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, আর্থিক অপব্যবহার ও শোষণ এবং তত্বাবধায়ক অবহেলা। 

শারীরিক নির্যাতনঃ 
বয়স্কদের গায়ে থাপ্পড় মারা, ধাক্কা দেওয়া, মারধর করা, দড়ি বা শিকল দিয়ে আটকে রাখা, লাথি মারা, চিমটি দেওয়া, জ্বালানো বা কামড়ানোর মতো আচরণও অন্তর্ভুক্ত। যত্ন করতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে জোরে ধরা বা চাপ দেয়াও শারীরিক নির্যাতন। এতে ওষুধের অনুপযুক্ত ব্যবহার এবং যে কোনও ধরণের শারীরিক শাস্তিও অন্তর্ভুক্ত। 

মৌখিক ও মানসিক নির্যাতনঃ  
বয়স্কদের সাথে চিৎকার করা, হুমকি দেওয়া, অপমানজনক বা অসম্মানজনক মন্তব্য করা, বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্ককে বারবার উপেক্ষা করা-মৌখিক ও মানসিক নির্যাতন। যেকোন ধরনের জবরদস্তিমূলক বা হুমকিমূলক আচরণ মানসিক নির্যাতন যা বয়স্কদের এবং তার পরিবারের সদস্য বা পরিচর্যাকারীর মধ্যে ক্ষমতা দ্বারা করা হয়। একজন বয়স্ক ব্যক্তির সাথে শিশুর মতো আচরণ করে তাকে পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং নিয়মিত কার্যকলাপ থেকে বিচ্ছিন্ন করাও মানসিক নির্যাতন। আমরা বলে থাকি, একটা বয়সের পর সব বৃদ্ধরাও শিশু হয়ে যায়। তবে সেই শিশুটিকে বাধা দিয়ে নয় বরং স্বাধীনতা দিয়ে খুশি রেখেই যত্ন করতে হয়। কারণ তারা প্রকৃত শিশুর মতো অবুঝ নন, তারা জীবনের দীর্ঘ সময় অভিজ্ঞতার আলোকেই এ পর্যন্ত পৌঁছেছেন। 

যৌন নির্যাতনঃ 
এর মধ্যে রয়েছে অনুপযুক্ত স্পর্শ, ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙ্গিতে বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদের ছবি তোলা, পর্নোগ্রাফি দেখতে বাধ্য করা এবং যেকোনো অবাঞ্ছিত যৌন আচরণ। বিশ্বজুড়ে নার্সিং হোমগুলেতে, বিরল হলেও অসুস্থ, মৃত্যুপথযাত্রী ও প্রতিবন্ধকতায় থাকা বয়স্ক নারীরা সেবাসহকারীদের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হোন। তাদের অনেকেই কথা বলতে পারে না। শয্যা ত্যাগ করে প্রাকৃতিক কাজকর্মের জন্য তারা সেবাদানকারী ও হুইলচেয়ারের উপর নির্ভরশীল। 

আর্থিক অপব্যবহার এবং শোষণঃ 
এটি একজন বয়স্ক ব্যক্তির অর্থের অপব্যবহার এবং অর্থ ও সম্পদ আত্মসাৎকে বোঝায়। বয়স্ক ব্যক্তির নামে জাল চেক ব্যবহার করা, পরিচয় চুরি, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড চুরি ও ব্যবহার,লটারি স্ক্যাম, টেলিমার্কেটিং বা ইন্টারনেট স্ক্যাম, বয়স্কদের অবসর গ্রহণের পেনশন বা সোস্যাল সিকিউরিটি বেনিফিট এর সুবিধা নেওয়া, অথবা কোনো বয়স্কদের ক্রেডিট কার্ড এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট তাদের অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করা... ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। বয়স্ক ব্যক্তির উইল, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, জীবন বীমা পলিসি, অনুমতি ছাড়া তাদের   বাড়ির মালিকানা পরিবর্তন করাও আর্থিক অপব্যবহার এবং শোষণকে অন্তর্ভুক্ত করে। 

তত্বাবধায়ক অবহেলাঃ 
এটি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত হতে পারে। ইচ্ছাকৃতভাবে বয়স্ক ব্যক্তির শারীরিক, সামাজিক বা মানসিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হওয়া অবহেলার পর্যায়ে পড়ে। অবহেলার মধ্যে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, ওষুধ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ক্রিয়াকলাপে সহায়তা না করা বা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধিতে সহায়তা প্রদান না করাও অন্তর্ভুক্ত। এই অবহেলায় বয়স্ক ব্যক্তি নিজেদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়। 

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস ওয়েবসাইটে বয়স্কদের নির্যাতনের নিন্মুক্ত লক্ষণগুলোকে চিহ্নিত করেঃ 
(১) শারীরিক নির্যাতনের সতর্কতা সূচক কিছু লক্ষণ হতে পারে, কালো চোখ, হাইভস্, ত্বকে গভীর ক্ষত, কাটা, দড়ির চিহ্ন, ভাঙা হাড়, ভাঙ্গা মাথার খুলি, খোঁচা, খোলা ক্ষত এবং নিরাময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে চিকিৎসা না করা। আঘাত, মোচ, রক্তপাত, ভাঙা চশমা বা ফ্রেম, শারীরিক শাস্তির বাহ্যিক ইঙ্গিত, ওষুধের ওভারডোজ বা প্রেসক্রিপশনের ওষুধের কম ব্যবহার ইত্যাদি। 

(২) একজন বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কের মৌখিক-মানসিক নির্যাতনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকা, উত্তেজিত হওয়া, প্রত্যাহার, নিজেকে অযোগ্য ভাবা, সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্নতা, প্রতিক্রিয়াশীল না হওয়া, অস্বাভাবিক আচরণ(যেমন-চুষা, কামড়), ঘুমের ধরণ বা খাওয়ার অভ্যাসের পরিবর্তন, ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন(যেমন-অতিরিক্ত ক্ষমা চাওয়া, জবাবদিহিতা করা, হতাশা বা উদ্বেগ বৃদ্ধি)..ইত্যাদি। 

(৩) আর্থিক অপব্যবহার এবং শোষণের মধ্যে থাকতে পারে, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বা ব্যাঙ্কিং পদ্ধতিতে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন, অনুমতি ছাড়া অর্থ উত্তোলন করা, বয়স্ক ব্যক্তির ব্যাঙ্ক স্বাক্ষর কার্ডে অন্য কারো নাম যোগ করা, এটিএম কার্ড থেকে অননুমোদিত অর্থ উত্তোলন, উইল বা অন্যান্য আর্থিক রেকর্ডে আকস্মিক পরিবর্তন, পর্যাপ্ত তহবিল পাওয়া গেলেও অপর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া এবং ব্যক্তির বিল পরিশোধ না করা, বয়স্কদের সম্পত্তির শিরোনামে জাল স্বাক্ষরের প্রমাণ পাওয়া, আত্মীয়দের অপ্রত্যাশিত আগমন যারা পূর্বে সম্পর্কে জড়িত ছিল না এবং বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কের সম্পদে তাদের দাবি জাহির করা, পরিবারের সদস্য বা তৃতীয় পক্ষের কাছে সম্পদের অপ্রত্যাশিত এবং আকস্মিক স্থানান্তর..ইত্যাদি। 

(৪) তত্বাবধায়ক অবহেলার লক্ষণগুলি হতে পারে, বয়স্ক ব্যক্তির ডিহাইড্রেশনে থাকা, অপুষ্টি, ফ্রিজে খাবার না রাখা, সময় মতো চিকিৎসা না করানো, শুয়ে থেকে থেকে শরীরে ঘা হওয়া, দুর্বল স্বাস্থ্যবিধি, বিপজ্জনক বা অনিরাপদ জীবনযাপনের অবস্থা(যেমন, অনুপযুক্ত ওয়্যারিং, ঘরে হিটার বা ব্যবহারিক পানি না থাকা),অস্বাস্থ্যকর এবং অপরিষ্কার জীবনযাত্রার অবস্থা (যেমন, ময়লা, মাছি, ব্যক্তির গায়ে উকুন, নোংরা বিছানা, মল/মূত্রের গন্ধ, অপরিচ্ছন্ন ও অপর্যাপ্ত পোশাক), বাইরে বেড়াতে না নেয়া, কথা বলতে না দেয়া, হাসপাতালে, দোকান, রাস্তাঘাট, শপিং সেন্টার বা অন্যান্য পাবলিক প্লেসে একজন বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্ককে ছেড়ে আসা, একা সামগ্রী কিনতে বাইরে পাঠানো, তার প্রয়োজনে সাড়া না দেয়া..ইত্যাদি। 

(৫) যৌন নির্যাতনে থাকতে পারে, স্তন বা যৌনাঙ্গের চারপাশে ঘা হওয়া, অব্যক্ত যৌনাঙ্গের রোগ বা যৌনাঙ্গে সংক্রমণ,অব্যক্ত যোনি বা পায়ূপথে রক্তপাত, বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কের আচরণে পরিবর্তন(যেমন-কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিক কাছাকাছি যেতে ভয় বা প্রত্যাহার করা), বয়স্কদের পর্নোগ্রাফিক দেখানো যাদের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে, চাদর বা পোশাকে রক্ত ​​পাওয়া...ইত্যাদি।তবে কিছু লক্ষণ অন্যান্য কারণেও ঘটতে পারে। 

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস অনুসারে, ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ১০ জনের মধ্যে অন্তত ১জন প্রতি বছর এক ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়৷ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ (NIH) এবং ন্যাশনাল সেন্টার অন এল্ডার অ্যাবিউজ (NCEA) অনুসারে, বয়স্ক মহিলারা পুরুষদের তুলনায় বেশি নির্যাতনের শিকার হন। ২০১৭ সালের হিসাবে, ১.২ মিলিয়ন প্রবীণদের নার্সিং হোম কেয়ার প্রয়োজন ছিল। পপুলেশন রেফারেন্স ব্যুরো অনুসারে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ১.৯ মিলিয়নে উন্নীত হবে। মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০৬০ সালের মধ্যে ৯৫ মিলিয়ন আমেরিকানদের বয়স ৬৫ বা তার বেশি হবে৷ 

বয়স্কদের নির্যাতন প্রায়ই রিপোর্ট করা হয় না। নিউ ইয়র্ক স্টেট অফিস অফ চিলড্রেন অ্যান্ড ফ্যামিলি সার্ভিসের একটি সমীক্ষা দেখায়, প্রায় ২৪টি বয়স্ক নির্যাতনের ঘটনার মধ্যে মাত্র ১টি কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট করা হয়েছিল। আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালের একটি সমীক্ষা অনুসারে, যারা শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন তাদের অন্যদের তুলনায় অকালমৃত্যুর ঝুঁকি ৩০০ শতাংশ বেশি ছিল। ন্যাশনাল ক্রিমানাল জাস্টিস রেফারেন্স সার্ভিস অনুযায়ী, এর মধ্যে ৬০ শতাংশ প্রবীণ স্বামী/স্ত্রী বা অন্যান্য যত্নশীলদের দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। ২০১৩ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নার্সিং হোমের অপব্যবহারের বিষয়ে ৯,৭০০টিরও বেশি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল, যার মধ্যে শারীরিক নির্যাতন জড়িত।

আমেরিকান জেরিয়াট্রিক্স সোসাইটির জার্নাল থেকে ২০১০ সালের একটি সমীক্ষা দেখায়, ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ১২৯ জন বয়স্কের মধ্যে ৫৪ জন তাদের যত্নশীলদের কাছ থেকে মানসিক নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছেন। নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের দ্বারা পরিচালিত ২০১৪-সমীক্ষা দেখায়, ৩৮ শতাংশ বয়স্করা জানিয়েছেন যে, তারা অন্তত একটি মৌখিক অপব্যবহারের শিকার হয়েছেন। বয়স্করা  আর্থিক অপব্যবহারের কারণে বছরে কমপক্ষে ২.৬ বিলিয়ন অর্থ হারান। ন্যাশনাল অ্যাডাল্ট প্রোটেক্টিভ সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশন (NAPSA) অনুসারে, আর্থিক অপব্যবহারের ৪৪টি ঘটনার মাত্র ১টি রিপোর্ট করা হয়েছে৷

NAPSA আরও উল্লেখ করে যে, আর্থিক নির্যাতনের শিকার হওয়া বয়স্কদের মৃত্যুর সম্ভাবনা তিনগুণ বেশি এবং তাদের  নার্সিং হোমে প্রবেশের সম্ভাবনা চারগুণ বেশি।ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস এবং ওযার্লড হেল্থ অর্গানাইজেশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, বয়স্কদের যৌন নির্যাতনের কম রিপোর্ট হয়। কমিউনিটি লিভিং এডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত নার্সিং হোমে যৌন নির্যাতনের প্রায় ১৬ হাজার রিপোর্ট করা হয়েছে। সিএনএন রিপোর্ট থেকে তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত, ১ হাজারটির বেশি নার্সিং হোম যৌন নির্যাতনের জন্য উদ্ধৃত করা হয়েছিল।  

ইউএস জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট নোট করে যে, বয়স্ক নির্যাতনের অন্যতম সাধারণ ধরন হল অবহেলা। যত্নশীলদের দ্বারা অবহেলা হল সবচেয়ে অপ্রীতিকর একটি অপব্যবহার, যেখানে ৫৭টি মামলার মধ্যে ১টি রিপোর্ট করা হয়েছে।২০১১ সালের সমীক্ষায় দেখা গেছে ২১ শতাংশ নার্সিং হোমের বাসিন্দারা বছরে অন্তত একবার অবহেলিত হয়েছেন।ন্যাশনাল সেন্টার ফর ভিক্টিমস অফ ক্রাইম অনুসারে, নার্সিং হোমগুলির বিরুদ্ধে ১৪ শতাংশ অভিযোগ অবহেলায় জড়িত। 

রিসার্চগেট এর আর্টিক্যাল 'Abuse and Neglect of the Elderly: Bangladesh Perspective' আর্টিক্যালে, বাংলাদেশের কিছু জেলা, উপজেলা, শহর থেকে (যেমন-ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, নীলফামারী, খুলনা ও কুড়িগ্রাম এবং ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থান, যেমন- বাড্ডা, মালিবাগ, শাজাহানপুর, মুগদা, গ্রিনরোড, মিরপুর, লক্ষীবাজার, রমনা পার্ক) ৬০ বছর এবং তার বেশি বয়সী ৮৪জন নারী পুরুষ বয়স্কদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা একটি পদ্ধিতিগত ডেটা দেখায় যে, ৯০.৫ শতাংশ বয়স্ক মানুষ তাদের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা ধমক খায়। ৬১.৯ শতাংশ বয়স্করা হুমকির সম্মুখীন হন। ৫৪.৮ শতাংশের বেশি বয়স্করা কোনো না কোনোভাবে তাদের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে বাধ্য হয় এবং একটি উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ হল যে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি (২৭.৪%) বয়স্ক ব্যক্তিরা তাদের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা নারী-পুরুষ উভয়ই শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন; যা শহরের(১৬.৭ শতাংশ) তুলনায় গ্রামীণ (৩৮.১ শতাংশ) এলাকায় বেশি ঘটে। লিঙ্গ বিবেচনা করলে, গ্রামীণ এলাকায় বয়স্ক পুরুষের অপব্যবহার ২২.৭শতাংশ এবং বয়স্ক মহিলাদের অপব্যবহারের সংখ্যা ৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে, বয়স্ক মহিলাদের(১৩শতাংশ) তুলনায় বয়স্ক পুরুষরা(২১.১) শহরাঞ্চলে বেশি শারীরিক নির্যাতনের সম্মুখীন হয়।বয়স্ক মহিলাদের তুলনায় বয়স্ক পুরুষরা তাদের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা তিরস্কার ও হুমকির সম্মুখিন হন এবং কাজ করতে বাধ্য হন। অন্যদিকে, বস্তুগত শোষণ এবং শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা বয়স্ক মহিলাদের মধ্যে বেশি।সামগ্রিকভাবে, শহুরে বয়স্কদের তুলনায় গ্রামীণ বয়স্করা বিভিন্ন ধরনের মানসিক, শারীরিক ও অবহেলা জনিত নির্যাতনের সম্মুখীন হন। 

ডেটা আরো দেখায় যে, ৮৬.৯ শতাংশ বয়স্ক লোক তাদের অসুস্থতার সময় পরিবারের সদস্যদের দ্বারা অবহেলিত হয়।গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী বয়স্করা (৯৫.২) তাদের অসুস্থতার সময় শহরে বসবাসকারী বয়স্কদের(৭৮.৬ শতাংশ) তুলনায় বেশি অবহেলিত। দুই-তৃতীয়াংশ বয়স্ক মানুষ অসুস্থতার সময় চিকিৎসার সুবিধা পান না। ৬৯ শতাংশ বয়স্কদের পরিবারের সদস্যরা তাদের সাথে খায় না। অর্ধেকেরও বেশি বয়স্ক মানুষের চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ হয় না। ৩৮.১ শতাংশ পরিবার বয়স্কদের প্রয়োজনে উপস্থিত হয় না। ২০.২ শতাংশ বয়স্কদের পরিবারের সদস্যরা তাদের বাইরে বেড়াতে নিয়ে যান না। ৭.১ শতাংশ বয়স্কদের পরিবারের সদস্যরা তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করেন না। অবাঞ্ছিত আচরণ ব্যতীত, বয়স্ক ব্যক্তিদের অবহেলার সব ঘটনাই শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বেশি। 

বেশির ভাগ বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্করা প্রাতিষ্ঠানিক নার্সিং হোম বা যত্নসেবায় না থেকে নিজ বাড়িতে তাদের স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, ভাইবোন বা অন্যান্য আত্মীয়দের সাথে বাস করে। এ কারণে বাড়িতে সবচেয়ে বেশি বয়স্কদের অপব্যবহার ঘটতে দেখা যায়। শরীর পড়ে গেলে যে কেউ দুর্বল হতে পারে। আর বয়সের ভার, তা তো মানতেই হবে। দুর্বল, একা, হতাশাগ্রস্ত বয়স্ক ব্যক্তি এবং সেইসাথে যারা শারীরিক অক্ষমতা বা মানসিক অসুস্থতার সাথে লড়াই করছেন, তারা নির্যাতনের  ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। এই দৃশ্যমান ঝুঁকির কারণগুলির দ্বারা প্রভাবিত না হয়েও কেউ আপত্তিজনক পরিস্থিতি এবং সম্পর্কের মধ্যে নিজেদের খুঁজে পেতে পারেন। বয়স্কদের নির্যাতন সমস্ত আর্থ-সামাজিক গোষ্ঠী, সংস্কৃতি, জাতি এবং জাতিসত্তার মানুষকে প্রভাবিত করে। সময়ের সাথে সাথে, বয়স্কদের প্রতি নির্যাতন একজন ব্যক্তির শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিরাট ক্ষতি করে, সামাজিক এবং পারিবারিক বন্ধনকে ধ্বংস করে দেয়। এই ধ্বংস আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন