https://www.prothomalony.com/
8705
opinion
মাতৃভাষার মর্যাদাঃ ধারন, বহন করতে পেরেছি কি?
মাতৃভাষা প্রত্যেকটি জাতির জাতিসত্তা বিকাশের অনবদ্য মাধ্যম। মাতৃভাষা ব্যতীত আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদা সমৃদ্ধ হয় না। তাই পৃথিবীর প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীই তার মাতৃভাষাকে মর্যাদা দিয়ে থাকে। মাতৃভাষার মর্যাদার ওপর ভিত্তি করেই একটা জাতিকে এগিয়ে যেতে হয়। এই পথচলায় বিপত্তি ঘটে পরাধীন জাতির। যেটি আমাদের বাঙালি জাতির ক্ষেত্রে ঘটেছিল।
মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বাঙালির জাতিসত্তা, স্বকীয়তা আর সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার আন্দোলনের অবিস্মরণীয় সেই দিন ২১শে ফেব্রুয়ারি, ফিরে আসে বার বার। শোকে বিহ্বল ও গৌরবে দীপ্ত অনন্য এ দিনেই মানব ইতিহাসের দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় প্রথমবার মানুষ মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল রাজপথে। ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধারণ করা সেই চেতনা বাঙালির মনের ভেতর জাগিয়ে দিয়েছিল রাষ্ট্রবাসনা।ফাল্গুনের সেই দিনে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর নির্দেশে মিছিলের ওপর পুলিশের গুলি চলে। শহীদ হন রফিক, শফিক, জব্বার, বরকত, শফিউদ্দীন, সালামসহ আরও অনেকে। পরবর্তীতে সেই রক্তের দামে আসে বাংলার স্বীকৃতি আর তার সিঁড়ি বেয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীনতা।
মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি—এই তিনটি শব্দের অর্থ এক নয়। এর প্রত্যেকটির রয়েছে আলাদা আলাদা অর্থ ও বৈশিষ্ট্য। আভিধানিকভাবে অর্থ ও বৈশিষ্টে্যর ভিন্নতা থাকলেও এর তাৎপর্য এক ও অভিন্ন। তিনটি শব্দের সঙ্গেই ‘মা, যুক্ত।মা যেমন তার সন্তানের কাছে শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালোবাসার পাত্র, তেমনি একটি জাতির কাছে তার ভাষা, দেশও শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালোবাসার বস্ত্ত। নিজের ভাষা ও দেশকে নিজের মায়ের মতোই দেখা উচিত। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তিনটি শব্দ একই তাৎপর্যে অঙ্কিত।
স্বদেশের ভাষা ও স্বদেশের মর্যাদা রক্ষা মানেই মায়ের মর্যাদা রক্ষা।মাতৃভাষার সম্মান এবং মাতৃভূমির মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে প্রতিটি জাতিকেই দায়িত্ব পালন করতে হয়। মাতৃভাষার উন্নতি ছাড়া মাতৃভূমি সমৃদ্ধ হয় না। মানুষ সাধারণত মাতৃভাষার মাধ্যমেই স্বাধীনভাবে মনের ভাব প্রকাশে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আমরা বাঙালি জাতি, বাঙালা আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আমাদের অনেক সংগ্রাম ও রক্ত দিতে হয়েছে। তারই ফলে আমরা বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সুযোগ লাভ করেছি।
কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছর পর আমরা আরো একটি ভাষা আন্দোলনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি। যে স্পৃহা ও যে উদ্দেশ্য নিয়ে মাতৃভাষাকে তৎকালীন পাকিস্তানি কলোনিয়াল গোষ্ঠী থেকে রক্ষা করা হয়েছিল, যে কারণে ব্রিটিশদের বিতাড়িত করতে আমরা আন্দোলন করেছিলাম, আজকে মনে হয় আমরাই আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পারছি না। আমরা নতুন একটি ভাষাগত উপনিবেশবাদের সম্মুখীন। ভাষার প্রশ্নে আজ আমরা বিভক্ত। আমাদের মাতৃভাষা, আমাদের প্রাণের ভাষা প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অবহেলিত। আমরাই আমাদের মাতৃভাষাকে দ্বিতীয় শ্রেণির একটি ভাষায় রূপান্তর করছি। কাগজে-কলমে মাতৃভাষা রক্ষায় অনেক প্রণোদনা দিলেও বাস্তবে তার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।
বাঙালি জাতিসত্তার মূলে যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেটা নতুনভাবে পরিচর্যা পায়। বাংলা ভাষা অন্য এক মাত্রায় পৌঁছায় একুশে ফেব্রুয়ারির হাত ধরে। তাই একুশের এই চেতনা এতটাই প্রবল ও ব্যাপক যে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম সব অঞ্চলেও শহীদ মিনারের দেখা মেলে। আজও মধ্যরাত কিংবা ভোর থেকে ফুল হাতে দলে দলে মানুষ এগিয়ে যাবেন এসব শহীদ মিনারের দিকে। তাদের সবার কণ্ঠে থাকবে বাংলা ভাষা, ভাষা আন্দোলন আর বাঙালির ইতিহাসে অমর হয়ে যাওয়া সেই গান—'আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি...।' বেদিতে রাখবেন বিনম্র শ্রদ্ধার ফুল। প্রতি বছর ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এই প্রক্রিয়াটিকে নিছক আনুষ্ঠানিকতা বলা যাবে না। কারণ গত সাত দশকে একুশের ভাবাদর্শ গোটা জাতির মননে মিশে তা রীতির রূপ ধারণ করেছে; ইংরেজিতে যাকে রিচুয়াল বলা যায়।
কিন্তু স্বাধীনতার ৫২ বছরেও এখনো যে আক্ষেপ বয়ে বেড়াচ্ছি আমরা তা হলো সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু না হওয়া। ভাষা সংগ্রামীদের তিনটি স্লোগান ছিল। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই এবং সর্বস্তরে বাংলা চালু কর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান ছিল এটাই—জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা চালু কর। মানে শিক্ষা, উচ্চ শিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা, উচ্চ আদালতসহ সর্বত্র বাংলা, বাংলা মাধ্যম চালু করা। আক্ষেপ তো একটাই যে, এই স্লোগানটা কার্যকর হল না।
প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে পালিত ও স্মরিত হয়। কিন্তু যে মাতৃভাষার জন্য তরুণেরা জীবন দিয়েছেন, সেই ভাষার মর্যাদা আমরা কতটা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি? ভাষার মর্যাদা মানে রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে এর প্রচলন। একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই সরকারের নীতিনির্ধারকেরা সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রবর্তনের কথা বললেও বাস্তবে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। কিন্তু দিবসটি চলে গেলে তাঁরা ভুলে যান। সরকারি কাজকর্মে বাংলা চালু থাকলেও ব্যবসা-বাণিজ্য, উচ্চশিক্ষা, গবেষণাসহ নানা ক্ষেত্রে ইংরেজি প্রাধান্য পেয়ে আসছে। বাংলায় আইন প্রণীত হচ্ছে, কিন্তু উচ্চ আদালতে এখনো প্রধানত ইংরেজিনির্ভর। বেশ কয়েক বছর আগে উচ্চ আদালত বাংলা ভাষা ব্যবহারে শৃঙ্খলা আনতে একটি কমিটি করে দিলেও তার অগ্রগতি নেই। আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি যে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের দৈনন্দিন কাজে মাতৃভাষার ব্যবহারও কমে যাচ্ছে। অধিকাংশ স্থাপনার নামফলক লেখা হচ্ছে ইংরেজিতে। যে দেশে ভাষার জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই দেশে মাতৃভাষার প্রতি এ অবহেলা খুবই দুঃখজনক।
আমাদের দেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভাষা সচেতনতার অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। সমস্যা হচ্ছে, নতুন প্রজন্ম না বাংলা না ইংরেজি—কোনো ভাষাই ভালোভাবে শিখছে না। তারা বাংলার সঙ্গে ইংরেজি-হিন্দি মিশিয়ে এক জগাখিচুড়ি ভাষার জন্ম দিচ্ছে। এতে ভাষা বিকৃতি ঘটছে চরমভাবে।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার, বিশেষ করে যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু তাই বলে নিজস্ব সত্তা বিসর্জন দিয়ে স্রোতে গা ভাসিয়ে দিতে হবে? এই আত্মবিনাশের পথ থেকে আমাদের ফিরে আসতেই হবে। লেখায়, বলায়, পঠনে-পাঠনে সর্বত্র বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে মর্যাদার আসনে।
আমরা যদি ভাষাশহীদদের প্রতি সত্যি সত্যি শ্রদ্ধাশীল হই, তাহলে একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমিত রাখলে চলবে না, এর মর্ম উপলব্ধি করতে হবে। শিক্ষা, সরকারি-বেসরকারি দপ্তরসহ রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে কেবল বাংলা ভাষার উন্নয়নের কথা ভাবলেই হবে না; বাংলাদেশে বসবাসকারী অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ভাষার উন্নয়নেও কাজ করতে হবে। মাতৃভাষার উন্নতিই একুশে ফেব্রুয়ারির প্রকৃত শিক্ষা।
এমন পরিস্থিতিতে একুশের সমস্ত গৌরব সঙ্গে নিয়েও এখন পর্যন্ত এর ভিত্তিভূমি বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা চালু না হওয়ার বিষয়টি আক্ষেপেরই বটে। আবার দুয়েকটি বাদ দিলে বাংলাদেশের বেশিরভাগ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষাও এখন মৃত্যুর অপেক্ষায়। এটা কি একুশের চেতনার পরিপন্থী নয়?
অতএব, আসুন পরিবার থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে, অফিস-আদালতে, সরকারি ও বেসরকারিভাবে বাংলার চর্চা বাড়াই। বাংলা ভাষা রক্ষা করি। বাংলার মর্যাদা রক্ষা করি। ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত উপনিবেশ থেকে নিজেদের রক্ষা করি। সেজন্য প্রয়োজন- আরও একটি ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলন পাকিস্তানিদের মত অন্য কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, এই আন্দোলন হবে আমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে। বাংলা ভাষা রক্ষা ও চর্চায় জাতীয় আন্দোলন এখন সময়ের দাবি।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন