https://www.prothomalony.com/
8572
opinion
ফিরে চল মাটির টানে - তরুণ প্রজন্মের প্রতি একুশের আহবান
একুশ আমাদের গর্ব, একুশ আমাদের অহংকার। প্রতিবছর একুশ আসে বাঙালির চেতনা ও শিল্পসত্তাকে নতুন করে আরেকবার শাণিয়ে দিতে। একুশের এই চেতনাকে হৃদয়ে লালন, বাঙালির শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে, মোটকথা জীবনযাপনে এর প্রভাব অতুলনীয়।
একুশ বা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আমাদের শুধু নয়, পুরো বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত গৌরবের। সময়ের ব্যবধান যতই হোক, এ গৌরব বয়ে নিয়ে যাওয়া জাতি হিসেবে আমাদের কর্তব্য। বাংলা ভাষার জন্য আমাদের অগ্রজদের যে আত্মবলিদান, তা তো বৃথা হয়নি, সে জন্যই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে দিনটি স্বীকৃতি পেয়েছে।
এখন ভাবার বিষয় হলো, আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষার প্রতি যথাযথ চর্চা বা যত্ন আমরা করছি কি না। সেই চর্চার বিষয়টি কিন্তু এক দিনের একুশের উদ্যাপন বা একটি বইমেলা দিয়ে সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়; বরং এ জন্য অনেক গভীর থেকে কাজ করতে হয়।
এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখতে পাই, আমাদের নতুন প্রজন্ম বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি—একধরনের মিশেল ভাষায় কথা বলে, কারও কারও আবার বাংলার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের লেখা পড়ার ব্যাপারে অনাগ্রহও রয়েছে। এসব ঘটনায় পরিবারের ভূমিকা নেওয়ার অবকাশ থাকে।
একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের চেতনার বাতিঘর। এই চেতনা আমরা পেয়েছি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কাছ থেকে, ভাষাসংগ্রামী আর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে। তবে পরিতাপের বিষয় হলো, আজকাল এমন কথাও শুনতে পাই যে নতুন প্রজন্ম রবীন্দ্র-নজরুলের গান আর সেভাবে শোনে না! ঘটনাটি আদতেই কি তাই? এ ব্যাপারে পরিবার থেকেই নজর দেওয়া প্রয়োজন। তরুণ প্রজন্মকে শিকড়ের মর্মমূলে ফিরিয়ে নেওয়ার বা ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনেই একুশের চেতনার কাছে আমাদের ফিরতে হয়, ‘ফিরে চল্, ফিরে চল্, ফিরে চল্ মাটির টানে—/ যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে॥’ ঠিক এভাবেই তো আমরা ফিরি রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের কাছে।
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষায় আমরা কথা বলি, স্বপ্ন দেখি। হৃদয়ের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা, আবেগ-অনুভূতি, সুর আর ছন্দ এই জায়গায় মিলেমিশে একাকার। আমাদের স্বাধিকার ও আত্মচেতনার বহিঃপ্রকাশ প্রিয় এই ভাষার মাধ্যমে। বিশ্বের মানচিত্রে লাল-সবুজের যে পতাকা আজ পতপত করে উড়ছে, বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বিশ্বে মাথাউঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তার ভিত্তি কিন্তু এই বাংলা ভাষার মাধ্যমেই প্রোথিত। বাঙালি হিসেবে বিশ্বের বুকে আমাদের স্বীকৃতি ও পরিচয়ের জায়গাকে সুদৃঢ় করেছে আমাদের মাতৃভাষা।
মাতৃভাষা বাংলা আজ বিশ্বব্যাপী অনন্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি এলে বিশ্বে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। পৃথিবীর দেশে দেশে যখন দিবসটি পালন হয় এবং প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হয় তখন গর্বে বুকটা ভরে যায়। কেননা এই দিবসের মূলে যে রয়েছে আমাদের প্রাণের বর্ণমালা। দিনটিতে বিভিন্ন জাতি নিজস্ব মাতৃভাষার কথা আলোচনা করলেও অবধারিতভাবে প্রথমেই উঠে আসে প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার নাম। এই বাংলা ভাষা আমাদের ইতিহাসের মৌলিক উপাদান। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় বদলে গেছে মানুষের ক্রমবিকাশের ইতিহাস। বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়নের ফলে সব পৃথিবী এখন উন্মুক্ত, সবকিছু হাতের মুঠোয়। অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলাতে গিয়ে আমাদের স্বপ্নের তারুণ্য আজ বন্দি অ্যানড্রয়েড মোবাইলের স্ক্রিনে। তাদের মনে সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন বিশ্বসংস্কৃতির ধারা, যা আমাদের শেকড় থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাচ্ছে তাদের এবং বিচ্ছিন্ন করছে আমাদের মৌলিক চিন্তা-চেতনার বিষয়গুলো থেকে। মৌলিক সংস্কৃতি আর চেতনার জায়গায় যদি আঘাত করা যায় তাহলে সেই প্রজন্মকে সহজেই বদলে দেয়া যায়। আমাদের সংস্কৃতি আর পরিচয়ের মূলে কিন্তু আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষা।
তাই এই ভাষার প্রতি আমাদের যে রক্তের বাঁধন, দরদ, আবেগ, অনুভূতি সেই জায়গায় আঘাত করে যদি শেকড়কে নড়বড়ে করা যায় তাহলে সহজেই আমাদের উপড়ে ফেলা যাবে। আর এই উপড়ানোর পথকে সুগম করছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম! প্রযুক্তির নেশায় বুদ হয়ে এই প্রজন্ম বই পড়া ভুলে গেছে। বেশির ভাগ সময় তাদের মন আর চিন্তা বন্দি থাকে কম্পিউটার অথবা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে। তরুণ প্রজন্ম বই না পড়ার কারণে ধীরে ধীরে বাংলা চর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
পরিবর্তন জীবনের অংশ। পরিবর্তন গ্রহণ করেই মানুষকে এগিয়ে যেতে হয়। সাত দশক আগে যেসব কথা মানুষ চিন্তাও করেনি সেসবই আজ বাস্তব। বর্তমান নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে নব্যপ্রযুক্তিকে সঙ্গী করে। প্রযুক্তির জাদুকাঠিতে বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয়। এক ক্লিকেই এই প্রজন্ম ভার্চুয়ালি ঘুরে আসতে পারে সারা বিশ্বে।
বিশ্বায়নের এ প্রভাব পড়েছে ভাষাতেও। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে তাই বাংলাভাষাকেই কঠিন মনে হয়। শুদ্ধভাবে বাংলা লিখতে পারা তো দূরের কথা, বলতে গেলেও হোঁচট খান অনেকেই।
এত রক্তের বিনিময়ে পাওয়া বাংলা ভাষার ব্যবহার ও চর্চা সম্পর্কে এখনো তরুণ প্রজন্ম সচেতন না। ইংরেজি ভাষায় কথা বলার চর্চা বাড়ছে। অনেকে ইংরেজি বলাকে স্মার্ট মনে করে। শুধু মূল্যবোধের অভাবে বাংলা ভাষা তার নিজস্বতা হারাচ্ছে। একটি দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের তার নিজস্ব ইতিহাস জানা প্রয়োজন। নিজের দেশের ভাষাকে সম্মান করতে না পারলে সে অন্য দেশের ভাষাকে সম্মান করতে পারবে না। শ্রদ্ধা করতে পারবে না। ইতিহাস থেকেই মানুষ শিক্ষা নেয়।
ভাষা একটা জাতির সংস্কৃতির প্রতিফলক। তাই কথা জগাখিচুড়ি ভাষায় বললে সংস্কৃতি যে নিজস্বতা হারাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর ভাষা আর সংস্কৃতি নিজস্বতা হারালে একটি জাতির স্বকীয়তা অনেকটাই হুমকির মুখে পড়ে।
তবে আশার কথা- ভাষা আন্দোলনের সাত দশক আর বিজয়ের পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও নতুন প্রজন্ম ভোলেনি পূর্বপুরুষের ত্যাগের ইতিহাস। নানা ক্ষেত্রে অবদান রেখে বিশ্ব দরবারে দেশের মুখ উজ্জ্বল করছেন তারা। তাই পরিবর্তনের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে নয়, বরং পরিবর্তনকে হাতিয়ার করে শুদ্ধতা বজায় রেখে বাংলাভাষাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবেন তারা। আজকে এ তরুণ সমাজই তো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেবে মহান একুশের চেতনা। ভাষা আন্দোলনের সাত দশকে নতুন প্রজন্মের কাছে এটাই প্রত্যাশা।
তরুণ প্রজন্মের মাঝে বাংলাভাষার ইতিহাস-ঐতিহ্য ভালোভাবে সংক্রমিত করতে হবে। এতেই বাংলাভাষার মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পাবে। আমাদের তরুণ প্রজন্মই আমাদের দেশ ও সংস্কৃতিকে পুরো বিশ্বের কাছে উপস্থাপন করবে। একুশের চেতনা জেগে উঠুক সবার প্রাণে নতুন প্রজন্ম, যুবসমাজের মাঝে দেশ ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থাকুক চির অটুট এতটুকুই কাম্য। শহীদ মিনারে গিয়ে শুধু ফুল দিয়েই নয়, নতুন প্রজন্মের প্রত্যেককে মনে প্রাণে একজন ভাষা সংগ্রামী মনে করতে হবে। আবেগ দ্বারা আত্মোপলব্ধি সবচেয়ে বেশি জরুরি। নিজস্ব সংস্কৃতির চেয়ে কোনো সংস্কৃতিই বড় নয় তাদের জানানো আমাদের দায়িত্ব। আবার বাংলাকে শুধু আবেগের ভাষা হিসেবে রাখলে চলবে না। এর উন্নয়ন ঘটাতে হবে এবং সর্বস্তরে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়াতে হবে। আমাদের নতুন প্রজন্মের মনে একুশের চেতনা জাগিয়ে তুলতে হবে, যেন ভাষার যথার্থ মর্ম ওরা উপলব্ধি করতে পারে।
তরুণ প্রজন্ম যদি আধুনিকতার নামে শিকড়কে অগ্রাহ্য করে, তাহলে নিজস্ব ভাষা–সংস্কৃতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সাবলীল ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সদিচ্ছা আর সচেতনতাই পারে বাঙালির এই গৌরবের ভাষাকে প্রজন্মে পর প্রজন্ম টিকিয়ে রাখতে।
তাই একুশের সঠিক ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে হবে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তা ছড়িয়ে দিতে হবে। আজকের প্রজন্মকে আরও বেশি বেশি একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে উৎসাহী করতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের রয়েছে ভাষা আন্দোলনের মতো অধ্যায়। আমাদের ভাষায় রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মতো লেখক, যা পৃথিবীর আর কোনো জাতির নেই। তাই একুশের চেতনায়, ভাষা আন্দোলনের মহিমায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে আমাদের নতুন প্রজন্মকে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন