https://www.prothomalony.com/

8156

opinion

অভিমত

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারী ২০২৪ ০৬:৩৫

'বাঘ পালানো' মাঘ শুরু, আর হাড়কাঁপানো শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত

পৌষের শেষ দিকে এসে দেশজুড়ে জেঁকে বসেছে শীত। হিমেল হাওয়ার সঙ্গে ঘনকুয়াশা যোগ হওয়ায় তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। দিনের বেলায় কুয়াশা ভেদ করে উত্তাপ ছড়াতে পারছে না সূর্য। এমন শীত থেকে সহসা মুক্তি মিলছে না বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। শীতের এমন অবস্থার মধ্যে চলে এসেছে ‘বাঘ পালানোর মাস’ মাঘ।

হাড় কাঁপানো শীতের সঙ্গে ঘন কুয়াশার দাপটও বেড়েছে। আর এর প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। 

ঘন কুয়াশার কারণে ইরি-বোরো বীজতলা লাল বর্ণ ধারণসহ পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। কৃষি শ্রমিকরা কাজ করতে না পারায় ব্যাহত হচ্ছে চলতি মৌসুমের ইরি-বোরো চাষাবাদ।

শীতে লোকজন ঘর থেকে কম বের হওয়ায় আয় অর্ধেকে নেমেছে খেটে খাওয়া দিনমজুরদের। এর ফলে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম কষ্ট পোহাতে হচ্ছে। শীতবস্ত্রের অভাবে খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করতে দেখা গেছে অনেককে।

কনকনে ঠান্ডা ও ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে গোটা জনপদ। ব্যাহত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। তীব্র ঠান্ডায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমজীবী, খেটে খাওয়া মানুষ বাগানের চা শ্রমিকরা। ঘন কুয়াশায় শীতের তীব্রতায় কাবু হয়ে পড়েছে জেলার জনজীবন। ছাড়িদিকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ফোটার মতো পড়ছে কুয়াশা। এখনো সরকারি বা বেসরকারিভাবে শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু হয়নি। হাড়

কাঁপানো শীতে সর্দি-কাশি, ঠান্ডা, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, হাঁপানিসহ শীতজনিত নানা রোগ নিয়ে শিশু এবং বয়স্করা ভর্তি হয়েছেন বিভিন্ন সরকারি ও প্রাইভেট হাসপাতালে।

সড়ক বিভাজন, ফুটপাত, স্টেশন ও খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নেওয়া ছিন্নমূল এবং নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। জনগণ বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন না। অনেকে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। শীতের কারণে রাস্তায় জনগণের উপস্থিতি কমে গেছে। ভোরে ঘন কুয়াশা থাকায় সড়ক ও মহাসড়কে যানবাহনগুলো ফগ বা হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। প্রচণ্ড শীতের কারণে খেটে খাওয়া মানুষগুলো ঠিকমতো কাজ পাচ্ছেন না। এতে পরিবার নিয়ে তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

ঘন কুয়াশায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক  বিমানবন্দরসহ সিলেট, সৈয়দপুর, বরিশালে   উড়োজাহাজ ওঠানামায় সমস্যা হয়েছে। ফেরি চলাচলেও বিঘ্ন ঘটেছে।  

মূলত কুয়াশার কারণে দেশে তীব্র শীতের এলাকা বাড়ছে। একসময় জানুয়ারিতে দেশের উত্তরাঞ্চল ও সিলেট বিভাগে মূলত তীব্র শীতের অনুভূতি থাকত। উপকূলীয় জেলাগুলোতে শীত পড়ত কম। কারণ, সমুদ্রের কাছাকাছি এলাকায় জলীয় বাষ্প বেশি থাকে। ফলে হিমালয় পেরিয়ে আসা শীতের শুষ্ক বাতাস উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু হয়ে মধ্যাঞ্চল, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত তীব্র শীত থাকছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, তা মূলত কুয়াশার কারণে ঘটছে।

বাংলাদেশে শীত নামে মূলত হিমালয় পেরিয়ে পঞ্চগড় দিয়ে শীতল বাতাস আসার কারণে। একইভাবে সিলেটে মেঘালয় থেকে আসা শীতল বাতাস প্রবেশ করে তাপমাত্রা কমায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ১৯৯৮ সালের পর থেকে জানুয়ারি মাসে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পাশাপাশি কুয়াশা বেড়ে যেতে দেখছি। দক্ষিণ এশিয়ার বড় অংশজুড়ে মাসের বেশির ভাগ সময় ওই কুয়াশা দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে না গেলেও তীব্র শীতের অনুভূতি থাকছে।

কুয়াশার কারণে জানুয়ারিতে দেশের অর্ধেকের বেশি এলাকাজুড়ে তীব্র শীতের অনুভূতি থাকছে, যা একসময় শুধু উত্তরাঞ্চল ও সিলেটে বেশি দেখা যেত। এতে সাধারণ মানুষের কষ্ট বেড়ে গেছে।

চলতি মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দেশজুড়ে শীতের কষ্ট বেড়ে যাওয়া নিয়ে আবহাওয়া ও জলবায়ুবিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এই প্রবণতাকে আবহাওয়ার ধরনের বদলকে ইঙ্গিত করছে বলে মনে করছেন তাঁরা। বিশেষ করে জানুয়ারির শুরু থেকে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত পাকিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশের ওপর একটি ভারী কুয়াশার চাদর ছড়িয়ে পড়ছে। সেই সঙ্গে দেশের ভেতরেও নিচু মেঘ বা লো ক্লাউড তৈরি হচ্ছে। বাতাসে ভেসে বেড়ানো ধুলা ও ধোঁয়া এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে। এ কারণেই অস্বাভাবিক কুয়াশা তৈরি হচ্ছে, যা দিনের তাপমাত্রা কমিয়ে দিচ্ছে।

আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, কুয়াশার দাপটের কারণে সূর্যের আলো ভূমিতে আসতে পারছে না। ফলে রোদ কম আসায় দিনেও তীব্র শীতের কষ্ট বাড়ছে। অন্যদিকে ওই ঘন নিচু মেঘের কারণে আটকে যাচ্ছে দৃষ্টিসীমা। উড়োজাহাজ থেকে শুরু করে নৌযান ও সড়কের যানবাহন চলাচলে সমস্যা বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে দিনে রোদ কম আসা ও শীতের অনুভূতি বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে। মাঠে শীতকালীন ফসল ধান ও সবজির উৎপাদনেও সমস্যা বাড়াচ্ছে।

শীতকালে কোন এলাকায় শীত বেশি, তা এখন আর শৈত্যপ্রবাহ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। কারণ, দিন ও রাতের তাপমাত্রা কমে এলে তা শৈত্যপ্রবাহের চেয়েও বেশি শীতের অনুভূতি হয়। এখন শৈত্যপ্রবাহ দেশের চার–পাঁচটি জেলায় থাকলেও তীব্র শীতের অনুভূতি দেশের দুই–তৃতীয়াংশ এলাকায় থাকছে। ফলে এ ধরনের শীত মোকাবিলায় আমাদের কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন