https://www.prothomalony.com/
8076
opinion
ইচ্ছে পূরণের নির্বাচন!
স্বল্প ভোটার উপস্থিতি এবং বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা-সহ নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সারাদেশে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। নির্বাচনের শেষ দিকে এসে জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের অনেক প্রার্থী অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। নির্বাচন কমিশন অবশ্য বলেছে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, তবে অনিয়মের অভিযোগে নয়টি আসনের ২১ কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের একজন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।
বিরোধী দল বিএনপি দাবি করেছে যে ভোটাররা তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভোট বর্জন করেছে।অন্যদিক আওয়ামী লীগ বলেছে ভোট বর্জনের আহবান যারা দিয়েছে তাদেরই ভোটাররা বর্জন করেছেন। এছাড়া ভোটারদের উপস্থিতিও সন্তোষজনক ছিল বলে আখ্যায়িত করেছে দলটি।
২০১৪ ও ২০১৮ সালের পর ২০২৪ সালের শুরুতে আরেকটি উচ্ছ্বাসহীন নজিরবিহীন ভোটবিমুখতার জাতীয় নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেছে বাংলাদেশ। কারণ, ভোটের দিন কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি এতটাই কম ছিল যে কোথাও কোথাও মাইকিং করেও ভোটার আনা যায় নি। ভোট উৎসবের পরিবর্তে সর্বত্র যেন ভোট বর্জনের এক নীরব প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে। এদিন সকাল ৮টায় সারা দেশে ভোট গ্রহণ শুরুর তিন ঘণ্টা পরেও ভোট দেয়ার হার কোথাও ছিল ৩ শতাংশ, কোথাও ৫ কিংবা ৮ শতাংশ। কম ভোটার উপস্থিতি ছাড়াও সারা দেশে দিনভর ভোটকে কেন্দ্র করে অনেক অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
জনগণের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হয়েছে মন্তব্য করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের কথা ইতিহাসে ‘স্বর্ণাক্ষরে’ লেখা থাকবে।
৮ জানুয়ারী মঙ্গলবার গণভবনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের পাশাপাশি দেশের সর্বস্তরের নাগরিকদের সঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
এদিকে বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হয়নি বলে মন্তব্য করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। নির্বাচনে সব দলের অংশ না নেয়া ও ভোটের দিন অনিয়মের খবরে উদ্বেগ জানিয়েছে দুই দেশ। এছাড়া জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও ভোটে গনতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুন্ন হয়েছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, আরব নিউজ, আল আরাবিয়া, সিএনএন, এপিসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নির্বাচনের খবর। শেখ হাসিনা আবারও ক্ষমতায় যাচ্ছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তাদের খবরে উল্লেখ করেছে।
আন্তর্জাতিক একদল পর্যবেক্ষক এই নির্বাচনকে ‘অবাধ, সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ’ বলে নিশ্চয়তা দেয়া সত্ত্বেও বেশ কিছু দেশের কর্মকর্তারা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রিপোর্টে আরও বলা হয়, গত রোববার বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ১২তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা চতুর্থ মেয়াদে বিজয়ী হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করেছে। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই প্রতিবাদ বিক্ষোভে বাধা দেয়া হয়েছে। কখনো কখনো তা সহিংস হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এক দমনপীড়নে হাজার হাজার সদস্যকে জেলে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন একদল আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।
নির্বাচনের আগে সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করে বিরোধী জোট। কিন্তু সেই দাবি শেখ হাসিনা প্রত্যাখ্যান করার পর সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে বিএনপি। জনগণকে আহ্বান জানানো হয় সরকারকে কোনো সহযোগিতা না করতে এবং নির্বাচনে ভোট না দিতে। নির্বাচন কমিশন সরকারিভাবে যে হিসাব দিয়েছে তাতে ভোটার উপস্থিতি ছিল শতকরা ৪১.৮ ভাগ। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়া, পর্যবেক্ষক, মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো এমনকি যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তাদের এক অংশ এই সংখ্যার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই সন্দেহের অন্যতম কারণ হলো ভোটার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে লাফিয়ে বাড়া। নির্বাচন কমিশনের সচিব ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা আগে হিসাবে বলেছিলেন শতকরা ২৭.১৫ ভাগ ভোট পড়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত হিসাবে বলেছে ভোট পড়েছে শতকরা ৪১.৮ ভাগ। বিরোধীরা বলছেন, ভোটের শেষ এক ঘণ্টায় কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ ভোট পড়েছে বলে নির্বাচন কমিশনের দাবি মারাত্মক সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন শতকরা কমপক্ষে ৮০ ভাগ ভোটার।
সরকারিভাবে ২৯৮ টি আসনের ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও কথিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা, যারা আওয়ামী লীগের নেতা- তারা ২৮০টি আসন নিশ্চিত করেছেন। ফল হিসেবে জাতীয় সংসদের শতকরা ৯৪ ভাগ আসনই ক্ষমতাসীন দলের এমপিতে পূর্ণ। ২৭টি দল নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে। তার মধ্যে ২৩টি দল একটিও আসন পায়নি।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে এমন একটি বিরোধী দল বানাতে চাইছে পার্লামেন্টে যারা ক্ষমতাসীন দলকেই সমর্থন করেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একদলীয় শাসনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সম্প্রতি দুটি সময়ে বিএনপিকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কর্মীদের মধ্যে জল্পনা দেখা দিয়েছে যে, নতুন সরকার বিএনপির রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে।
বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জয় গণতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে দেশটি আরও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। বিরোধী দল একে ‘ভুয়া নির্বাচন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এটিকে বয়কটের ডাক দিয়েছিল। নির্বাচনের দিন জনগণকে ঘরে থাকার আহ্বান জানায় বিরোধী দলটি, এতে তারা সাড়া দিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। শেখ হাসিনার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রোববারের নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২২২টি আসনে জয় পেয়েছে। বাকি আসনগুলোর বেশিরভাগ জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা, যাদেরকে ‘ডামি’ বলে আখ্যায়িত করেছে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ভোট বর্জন করার পর নির্বাচনে মাত্র ৪০ শতাংশ ভোটার ভোট দেন। দলটির দাবি, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানায়। যাইহোক, সর্বশেষ নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ৭৬ বছর বয়স্ক শেখ হাসিনা আরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকছেন। এর আগে টানা তিন দফা ক্ষমতায় ছিলেন তিনি, যে সময়ে বাংলাদেশ একইসঙ্গে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈষম্য দেখেছে।
সমালোচকদের মতে এই সময়কালকে ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদ, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা যায়।
ঢাকা জুড়ে রোববার ভোটকেন্দ্রগুলিতে ভোটারদের উৎসাহের অভাব দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের ব্যাজ পরা ক্ষমতাসীন দলের অনুগতদের দিয়ে ভোটারের সারিগুলোকে দীর্ঘ করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বস্তি এলাকার এক মধ্যবয়সী নারী জানান, তাকে সারাদিন ভোট কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য ৫০০ টাকা (৪.৫০ মার্কিন ডলার) এবং একটি বিরিয়ানির প্যাকেট দেয়া হয়। এরমধ্য দিয়ে একটি ‘ব্যস্ত নির্বাচনের’ ভ্রম তৈরির চেষ্টা হয়েছে।
পঞ্চম মেয়াদে শেখ হাসিনার ক্ষমতায় বসা নিয়ে ব্যাপক হতাশা দেখা গেছে। বিশেষ করে অল্পবয়সী ও শহুরে ভোটারদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যাচ্ছে। তাদের মতে এই প্রহসনে অংশ নেয়ার কোনো আগ্রহ নেই। এটি আওয়ামী লীগের নতুন নাটক।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বাকস্বাধীনতা এবং ভিন্নমতের সুরক্ষার পতন হয়েছে। এখন জনসমক্ষে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় খোলামেলা কথা বলতে গেলে যে বলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া কিংবা শারীরিক আক্রমণের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে।
শেখ হাসিনা সোমবার তার জয়ের পর সাধারণ নির্বাচন নিয়ে সমালোচনাকে ‘অবৈধ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। যারা সমালোচনা করতে চান তারা সমালোচনা করতে পারেন।
আওয়ামী লীগের বিজয় বাংলাদেশের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পাশাপাশি অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ, জ্বালানি এবং টেক্সটাইল প্রকল্পে ধারাবাহিকতা চাওয়া বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। গত এক দশকে বাংলাদেশ চীন থেকে ২.৬ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ পেয়েছে, যা জাপানের ৩৮০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগকে ছাড়িয়ে গেছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে আওয়ামী লীগ যেসব কৌশল নিয়েছিল, তা সফল হয়েছে। দ্বাদশ সংসদে পাঁচটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা সদস্য হচ্ছেন। আওয়ামী লীগের ২২২ জন, জাতীয় পার্টির ১১ জন, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও কল্যাণ পার্টির একজন করে এবং স্বতন্ত্র ৬২ জন বিজয়ী প্রার্থী সংসদ সদস্য হচ্ছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভোটে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা পেয়েছেন ৭৪.৫৮ শতাংশ ভোট, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছেন ২০.৭৪ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ৩.৬৮ শতাংশ ও বাকি তিন রাজনৈতিক দল পেয়েছে ১ শতাংশ ভোট।
এটি টানা তৃতীয় নির্বাচন যেখানে বাংলাদেশিদের তাদের নেতা নির্বাচনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। উল্টো অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে, সরকারের কোনো সমালোচনা হলে তার বিরুদ্ধে আরও দমন পীড়ন নেমে আসবে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন