https://www.prothomalony.com/

7862

bangladesh

বাংলাদেশ

সাংবাদিকের নোটবুক থেকে মাওলানা হাবিব, তসলিমা নাসরিন ও সাংবাদিক ফতেহ ওসমানী !

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৮:০৪

প্রায় ত্রিশ বছর আগের একটি ঘটনা। সিলেটের একটি প্রতিবাদ সভায় জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখছেন তখনকার জনপ্রিয় বক্তা মাওলানা হাবিবুর রহমান। সেই সভা কভার করা সাংবাদিক কিংবা উপস্হিত শ্রোতা কেউই জানেন না এই সভা কারো জীবনকে বদলে দেবে, একদিন ইতিহাস হবে। ! বলছি একজন তসলিমা নাসরিনের আন্তজাতিক পরিমন্ডলে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠার গল্প ! 

তসলিমা নাসরিন। বাংলাদেশের নির্বাসনে থাকা কবি ও লেখিকা।আজ দেশে-বিদেশে স্বনাম খ্যাত তসলিমা নাসরিন যে রিপোর্টের কারনে বিখ্যাত হয়ে উঠেন-সেই রিপোর্টটির পেছনের গল্প শোনাতেই এই লেখা। অথচ সেই অকাল প্রয়াত সাংবাদিক ফতেহ ওসমানী অখ্যাতই থেকে গেছেন আজো। বন্ধু ফতেহ ওসমানীকে সিলেটেও তেমন স্মরণ করা হয়না।

সময়টা ১৯৯৪ সাল। বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক-কলামিষ্ট দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী তখন একটি নতুন ধারার কাগজ দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা প্রকাশ করেছেন। অল্পসময়ে ব্যাপক পাঠক প্রিয় হওয়া এই কাগজের সিলেট ব্যুরোর রিপোর্টার ফতেহ ওসমানী। অকাল প্রয়াত সাংবাদিক-কবি ফতেহ ওসমানী ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল আততায়ীর হামলায় গুরুতর আহত হন এবং ২৮ এপ্রিল ঢাকার আ্যপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

নাস্তিক-মুরতাদের বিচার ও দেশে ব্ল্যাসফেমি আইন প্রণয়নের দাবীতে সিলেটের ঐতিহাসিক কোর্ট পয়েন্টে প্রতিবাদ সভা ডেকেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। খেলাফতের কেন্দ্রীয় আমীর প্রয়াত প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবিবুর রহমান। সিলেটে তুমুল জনপ্রিয় কাজির বাজার মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল তিনি । সব ঘরানার রাজনীতিবিদরা তাকে মান্য করেন, সমীহ করেন। রাজনীতির মাঠেও প্রভাব প্রতিপত্তি ব্যাপক। জেলা প্রসাশনসহ সকল মহল তাকে খাতির-তোয়াজ করে চলেন। তাঁর ভক্ত-মুরিদ, শিষ্যের সংখ্যা প্রচুর ।

তাঁর সভা মানে একটা বিরাট কিছু। তাঁর নিজের হাতে গড়া কাজির বাজার মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক ছাড়াও মাওলানার এক বড় অনুসারী গৌষ্ঠী রয়েছে। অনেক রাজনৈতিক দলের চেয়ে তাঁর সভা-সমাবেশে লোক সমাগম হয় বেশী। মাওলানার ভাষণও জ্বালাময়ী এবং সিলেটের মানুষ তাঁকে পছন্দ করে। একটা টান-টান উত্তেজনা থাকে তাঁর সভা সমাবেশ ঘিরে। বাম ঘরানার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সিলেটের সুশীলরা তাঁকে আদর করে "বুলবুলি"মাওলানা বলে ডাকতেন। তীব্র জামায়াত বিরোধী হওয়ার কারণে মাওলানা হাবিবুর রহমান বাম ও প্রগতিশীলদের খুব কাছের মানুষ ছিলেন। সিলেটের প্রায় সকল সংবাদিকের সাথে তার ছিল গভীর সখ্যতা।

সভায় মাওলানা হাবিবুর রহমান তাসলিমা নাসরিন সালমান রুশদী সহ অনেক স্বঘোষতি নাস্তিকদের কঠোর সমালোচনা করলেন।বললেন এরা মুরতাদ।দীর্ঘ বক্তৃতায় মাওলানা সেদিন বলেন,আমাদের দেশে ইসলামিক আইন থাকলে এদের মৃত্যুদন্ড হত। শরিয়া আইন বা বিধান না থাকায় চাইলেও এদেরকে সর্বোচ্চ দন্ডে দন্ডিত করতে পারিনা।এদের হত্যার জন্য পঞ্চাশ হাজার বা একলক্ষ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করতে পারিনা । নাস্তিকদের সমালোচনা করে তিনি বলেন,দেশে ইসলামী আইন থাকলে ইসলাম ও বিশ্বনবীকে অবমাননা এবং দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আবেগ অনুভূতিতে আঘাত হানার অপরাধে তাদের ফাঁসি হতো। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ হলেও দুঃখজনক ভাবে ইসলাম ধর্মকে আঘাত করেও নাস্তিক মুরতাদরা বারবার পার পেয়ে যায়। আমরা ইসলাম ধর্মকে অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রেখে কঠোর আইন চাই। এসকল নাস্তিকদের কর্মকান্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ করি। তওবা করে ধর্মে ফিরে আসারও আহবান জানান তিনি সকলের প্রতি। শেষে তিনি বলেন, দেশে ইসলামী শাষণ ব্যাবস্হা থাকলে আমি প্রত্যেক নাস্তিকের বিপরীতে ৫০ হাজার টাকা করে "ইনাম" ঘোষণা করতাম।

পরেরদিন বাংলাবাজার পত্রিকায় ওসমানীর নামে রিপোর্টটি "তসলিমার মাথার দাম ৫০ হাজার ঘোষণা" শিরোনামে মাওলানা হাবিবুর রহমানকে উদ্ধৃত করে প্রথম পাতায় লীড নিউজ হিসাবে প্রকাশিত হলে সারাদেশে হুলস্হুল পড়ে যায়। নিন্দা-বিবৃতি ও প্রতিবাদের ঝড় উঠে সর্বত্র। সকল জাতীয় পত্রিকায় দেশের শীর্ষস্হানীয় বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্য বিবৃতিও আসতে থাকে। শুরু হয় মিছিল-মিটিং। মাওলানা হাবিবুর রহমান রাতারাতি দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হন। পরেরদিন এবিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে কাজির বাজার মাদ্রাসায় হুমড়ি খেয়ে পড়েন সিলেটের সকল সাংবাদিক। কিন্তু মজার বিষয় সব সময় আলোচনায় থাকতে পছন্দ করা মাওলানা বক্তব্যটি স্বীকার বা অস্বীকার কোনটাই করলেন না। খুবই কৌশলী জবাব দিলেন সাংবাদিকদের। মাওলানা এটিকে তাঁর একটি বড় অর্জন হিসাবে নিলেন মনে হলো। পরে ওসমানীর কাছে এব্যাপারে জানতে চাইলে সেও একগাল হেসে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলত দ্রুত।

অথচ আমরা যাঁরা সভায় ছিলাম তাঁরা জানি কাগজে যে ভাবে মাওলানার বক্তব্য এসেছে এরকম সরাসরি কিছু তিনি বলেননি।আমাদের অন্যকারো রিপোর্টে আমরা এভাবে উল্লেখও করিনি। সভা কভার করতে সেদিন আমরা কয়েকজন সাংবাদিক একসাথে ছিলাম।ছিলেন তৎসময়ের ভোরের কাগজের সিলেট করসপন্ডেন্ট ইব্রাহীম চৌধুরী(বর্তমান সম্পাদক সাপ্তাহিক প্রথম আলো,উত্তর আমেরিকা), দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার প্রয়াত অজয় পাল, ফতেহ ওসমানী, এই নিবদ্ধের লেখক (ইনকিলাবের তৎকালীন ব্যুরো চীফ) এবং আরো কজন সহকর্মী বন্ধু। পরে একান্তে মাওলানাকে এবিষয়ে জিজ্ঞেস করলে একগাল মুচকি হেসে এড়িয়ে গেছেন প্রসঙ্গ। এই সভার প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক তসলিমাকে এই গল্প শোনালে তিনিও বিষয়টি উপভোগ করেছেন প্রাণ ভরে ।

এরপরের ঘটনা সকলের জানা,তীব্র আন্দোলনের মুখে তসলিমা দেশ ছেড়ে যান এবং সুইডেনে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেন।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন