https://www.prothomalony.com/
7785
opinion
মুক্তিযুদ্ধ, ৫২ বছর - প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার স্বাধীনতা
স্বাধীনতা মানে আত্মমর্যাদা। আত্মমর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকা। সব ধরনের অনাচার, বৈষম্য, শোষণ, নির্যাতনের বিপরীতে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, সুষম বণ্টন, অর্থনৈতিক মুক্তি, মানবিক মূল্যবোধ, অসাম্পদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এইগুলোই আমাদের আত্মমর্যাদা ও একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। একটি স্বাধীন জাতি আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ পরাধীন জাতির কখনো আত্মমর্যাদা থাকে না এবং আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতেও পারে না।
মুক্তিযোদ্ধা এমন একটি নাম, যে নামের সঙ্গে একটি দেশ ও জাতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্ম না হলে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করত কি না, সন্দেহ। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা নামক সূর্যের উদয় হয়। মুক্তিযোদ্ধারা পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিঁড়ে শোষণমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি, সুরাজনীতির চর্চা, গণতান্ত্রিক অধিকার, সাম্য ও ন্যায়নীতিতে পরিপূর্ণ থাকবে। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে; স্বাধীনতার পর প্রায় অর্ধশত বছর পার করতে চলেছি। কিন্তু আমরা কি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশিত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি?
মহান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিঁড়ে শোষণমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ তথা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিত্সা, স্বাস্থ্য,
পুষ্টি, কর্মসংস্থান প্রভৃতি নিশ্চিত করে সমাজের সব ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা। মুক্ত চিন্তা-চেতনায় সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সব নাগরিকের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ মানবাধিকারসমূহ নিশ্চিত করা। বাঙালির নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির আলোকে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা উদ্দেশ্য রক্ষায় আমরা ব্যর্থ হয়েছি। স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি ঠিক, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশ গড়তে পারিনি। আজও অনেকে তাদের ন্যূনতম মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং সামাজিকভাবে অবহেলিত। সঠিক বাসস্থান, স্বাস্থ্য, খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিত্সা থেকে বঞ্চিত। সমাজব্যবস্থায় এখনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বিদ্যমান। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কতিপয় বিত্তশালী ও টেন্ডারবাজের হাতে কুক্ষিগত। মুক্তিযোদ্ধারা দিগন্তের ঈষাণকোণে বৈষম্যের যে ঘনঘটা দেখে দেশ স্বাধীনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, সেই বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। এই বৈষম্য তথা অসমতাই মানবসমাজের উন্নয়ন-অগ্রগতির প্রধান প্রতিবন্ধক। এর ফলে ধনী আরো ধনী, গরিব আরো নিঃস্ব হচ্ছে। যদিও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমেছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষে মানুষে অসমতাও বেড়ে গেছে। সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতাই হচ্ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য আর তার থেকে সৃষ্ট সামাজিক সংকট। দেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যের অভিশাপমুক্ত করতে হলে প্রথমেই সম্পদের সুষম বণ্টন-ব্যবস্থার ওপর নজর দিতে হবে। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার এই বৈষম্য লাগামহীনভাবে বাড়তে পারে না, যদি নীতি ও আইনের দ্বারা সব ক্ষেত্রে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়।
সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানে সর্বত্র অনিয়ম আর দুর্নীতি বিরাজমান। দুর্নীতি আমাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। স্বাধীনতা লাভের পরও দুর্নীতির কারণে আমরা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী হতে পারিনি। এ কারণে ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং এর থেকে সৃষ্ট সামাজিক সংকটের সমুদ্রে আমরা ভেসে যাচ্ছি। দুর্নীতি নামক এই ব্যাধি থেকে নিস্তার পাওয়ার পথ হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের বেশ কিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন এবং জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার প্রসার ঘটানো। দুর্নীতি রোধে আইনের কঠোরতা বাড়াতে হবে এবং সরকারের পাশাপাশি সর্বস্তরের সচেতন নাগরিকদেরও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সামাজিকভাবে দুর্নীতিবাজদের বয়কট করতে হবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
একটি দুর্নীতিমুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়াই ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার। তাই আসুন আমরা সবাই মিলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও অপসংস্কৃতিমুক্ত নিজস্ব সংস্কৃতির আলোকে দেশ গড়তে এগিয়ে যাই।
মানুষ স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। একাত্তরে বাঙালি জাতি স্বপ্ন দেখেছিল পরাধীনতার শিকল ভাঙার। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। মুক্তির স্বপ্ন। স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। এ অধিকার কেউ কেড়ে নিতে ও খর্ব করতে পারে না। বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক রুশো বলেছেন, 'মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, কিন্তু জীবনের সর্বত্র সে থাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ'। তাই একাত্তরে বাঙালি জাতি জন্মগত অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে পাকিস্তানিদের পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিল বাঙালি জাতি। এ শিকল ভাঙার গান শুনিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। মূলত তাঁর নির্দেশিত পথে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জন করে।
স্বাধীনতার ৫০ বছরে আমরা একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা নির্মাণ করতে পারিনি। মুক্ত প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে না উঠার কারণে সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি আজ দানা বেঁধেছে। ফলে দুর্নীতি সর্বব্যাপী রূপ নিয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে ঠিকই কিন্তু নারী নির্যাতন বন্ধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। শিক্ষায় দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আসলে আমাদের রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে রাষ্ট্রের সর্বত্র রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, হানাহানি, অনৈক্যের কারণে রাজনীতি হয়েছে সন্ত্রাস ও দুর্নীতিনির্ভর- যা স্বাধীন দেশ হিসেবে তা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। স্বাধীনতার ৫২ বছরে এ দেশের রাজনীতিবিদরা যতটুকু দেশের উন্নয়নে আত্ম নিয়োগ করেছে তার চেয়ে বহুগুণে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ঐক্য। এটা গড়ে না উঠার কারণে দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলো শুধু নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে চলেছে। আমরা যতক্ষণ নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারব ততক্ষণ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে পারব না। তাই আসুন আমরা শপথ নিই একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলার। দেশকে ভালো বাসি এবং শোষণ দুর্নীতিমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
স্বাধীনতার ৫২ বছরে আমাদের পেছনে ফিরে তাকানোর কোনো সময় নেই। সময় এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধি করতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, স্বচ্ছতা, জবাব দিহিতা নিশ্চিত করা।
সর্বপরী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো সমগ্র জনতাকে এ লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। দুর্নীতি রোধ, সুশাসন একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই লাখো শহীদের স্বপ্ন পূরণ হবে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন