https://www.prothomalony.com/
7782
opinion
স্বাধীন- শব্দটার অর্থ ব্যাপক বিস্তৃত কিছু। স্বাধীন মানেই তো পরের অধীন নয় এমন কিছু। এই স্বাধীন এর সংজ্ঞায় নারী পুরুষ কেউ-ই উপযুক্ত নয়। আমরা কেউ স্বাধীন নই, না নিজের কাছে, না পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রের কাছে। যখন আমরা সব কথা প্রকাশ করতে পারি না, যখন আমরা সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারি না, যখন আমরা নিজের সব ভুল প্রকাশ্যে বলতে পারি না, নিজের অধিকারের পক্ষে আওয়াজ তুলতে পারি না, তখন আমরা পরাধীন। স্বাধীনতা-ভাবনার সাথে লালিত একটি শব্দ বলে মনে হয় আমার কাছে। আমরা মুক্ত হওয়ার ধারণাটি পছন্দ করি। আমরা মুক্ত হওয়ার চিন্তায় ক্ষুব্ধ হতে পছন্দ করি। এই মুক্ত হওয়াটা প্রায়শই আমাদের কাছে একটি মেরুতা হিসাবে উপস্থাপন করা হয়: একদিকে স্বাধীন মতপ্রকাশ, স্বাধীন পছন্দ এবং গণতন্ত্র - এবং অন্যদিকে দমন, কঠিন সংকল্প, এবং স্বৈরাচার। পরের অধ্যায়ে যাবার আগে আমাদের পূর্বের অধ্যায় রক্ষা করতে হয়, যা করতে আমরা আজীবন ব্যর্থ।
স্বাধীন শব্দের অর্থ কেবল বলতে জানা বা প্রকাশ করতে জানা নয়, এর অর্থ 'করে দেখানো, হয়ে দেখানো'। স্বাধীন শব্দের বিপরীত শব্দ হলো বন্দীত্ব, দাসত্ব, কারাবরণ-এবং আমরা মানুষেরা 'স্বাধীন' না হয়ে বরং এসবের মধ্যেই আমাদের সম্পূর্ণ একটা জীবন কাটিয়ে দিই।
যখন আমরা কোথাও খুব শক্তভাবে আটকা পড়ে যাই, কোনো কিছুতে আবদ্ধ থাকার শর্তে চলে যাই, তখন সেটাই বন্দিত্ব। যেমন, চিড়িয়াখানায় রাখা প্রাণীরা বন্দী। আপনি যখন একটি ফায়ারফ্লাইকে ধরে একটি বয়ামে রাখেন, যতক্ষণ না আপনি তাকে ছেড়ে দেন ততক্ষণ পর্যন্ত তার জীবন বন্দী। বন্দিত্ব মূলত আমাদের মধ্যে ভয়ের একটি স্বায়ত্তশাসন অনুভূতি জাগায় এবং দীর্ঘমেয়াদী বন্দিত্বের ক্ষেত্রে, আমরা কখনো নিজের মতো করে বেঁচে থাকার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলি। বন্দিত্ব একটি কঠিন মানব অভিজ্ঞতা। একবার যখন আমরা বন্দী হয়ে যাই, তখন আমরা অন্যের ক্ষমতা প্রয়োগের চেষ্টার ক্রিয়াকলাপে দাসত্ব করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি।
আমরা কি সব কথা বলতে পারি? পারি না। এই যেমন, আপনি ভয়ানক একটি দাম্পত্ত সম্পর্কে জড়িত যেখানে আপনি সুখী নন এবং প্রতিনিয়ত আপনাকে লড়াই করতে হয় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে। ধরুন, আপনি গোজামিলে সংসার টানছেন লোকলজ্জার ভয়ে, আপনার হয়তো পাশের মানুষটির সাথে কোনো সম্পর্কই নেই কেবল চুক্তি-শর্তের কারণে লোক দেখানো সম্পর্ক ধরে রেখেছেন, কিংবা ধরুন, আপনার সন্তান বিপথে আছে যাকে নিয়ে আপনি প্রতিদিন লড়াই করছেন-এসব কথা কি বলা যায়? সব কথা কি প্রকাশ করা যায়? যায় না। আমরা এখানেও বন্দী।
ধরুন, আপনার পরিবারের কেউ আপনার প্রতি অন্যায় করছে, আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা বা প্রতারণা করছে। আপনাকে আঘাত করছে ব্যবহার করছে। আপনি কি পারছেন তার নামে প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলতে? কিংবা পুলিশে দিতে? পারছেন না। আপনি প্রতিবাদ করতে পারছেন না। এখানেও আমরা বন্দী।
ধরুন, আপনি নিজের কাছে কিছু কাজের জন্য অপরাধী, হয়তো আপনি এমন কিছু ভুল করেছেন যা ক্ষমাযোগ্য নয় বা লজ্জাকর। হয়তো আপনি অন্যের প্রতি এমন কিছু করেছেন যা অমানবিক ও অনৈতিক। আপনি কি সেগুলি জনসম্মুখে তোলে ধরতে পারছেন? পারছেন না। আমরা এখানেও বন্দী।
ধরুন, আপনি নিজ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের এমন কিছুতে বিচলিত বা এমন কিছু তাদের দ্বারা করা হচ্ছে যা আপনার ব্যক্তি ও মৌলিক অধিকারকে খর্ব করছে। আপনি কি লড়তে পারছেন নিজের অধিকারের পক্ষে? আওয়াজ তুলতে পারছেন পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে? পারছেন না। আমরা এখানেও বন্দী।
আসলে আমাদের জীবনে এমন কিছু পরিস্থিতি থাকে যেখানে সত্য বলা কঠিন হয়ে উঠে। সব সত্য বলতে গেলে সাহসের দরকার হয় যা সবার থাকে না। তাছাড়া, আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে ব্যক্তিগত সব কথা প্রকাশ করতে গেলে আমাদেরকে পরিবার ও সমাজের মুখে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়, লজ্জায় পড়তে হয় এবং প্রায়শই বিপদে পড়তে হয়। আমরা অনেক সময় সত্য কথা বলি না কারণ আমরা অন্যকে আঘাত করতে চাই না বা বিপদে ফেলতে চাই না। আমরা সব সত্য বলি না কারণ আমরা সত্য সম্পর্কে লজ্জাবোধ করি। এমন কিছু কথা আছে যা বলতে গেলে আমাদের নিজেদের কিছু অংশ উন্মোচন হয়ে যাবে যা গোপনীয় এবং লজ্জাজনক বা ভীতিকর। আমরা সব সত্য কথা বলি না কারণ সত্য বলার ফলে কী হবে তা নিয়ে আমাদের ভয় থাকে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজের কাছে সত্য বলার কল্পিত ফলাফলের কারণে অনেক সময় আমরা সত্যকে লুকিয়ে রাখি কিংবা এড়িয়ে যাই।
আর এই সত্যকে লুকিয়ে রেখেই আমরা বন্দিত্বের সাথে বাস করতে শুরু করি এবং আমরা একটা সময় অভ্যস্ত হয়ে যাই। কিন্তু ক্ষতি যা ঘটে, তা অন্য কারো নয় বরং তা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের। আমরা কেন বন্দী থাকি? কারণ মুক্ত হতে আমাদের ভয়। আমাদের মনের বিরুদ্ধে ভয়, আমাদের জীবনিশক্তির বিরুদ্ধে ভয়, আমাদের ইচ্ছাশক্তির বিরুদ্ধে ভয়, পরিবার-সমাজ-সংস্কৃতি, ধর্ম, বিশ্বাস, রাজনীতি, রীতিনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ভয়।
এই ভয় কোথা থেকে আসে? "ভয় আমাদের বেঁচে থাকার একটি প্রতিক্রিয়া"-বলেছেন নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট জাচারি সিকোরা। ভয় আমাদের মনের অনুভূতি কিন্তু এটি আমাদের শরীরে একটি শক্তিশালী শারীরিক প্রতিক্রিয়া ট্রিগার করে। ভয় আসা মানেই আমাদের অ্যামিগডালা কাজ করতে শুরু করে। এটি আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে সতর্ক করে, যা আমাদের শরীরের ভয়ের প্রতিক্রিয়াকে গতিশীল করে। তখন কর্টিসল এবং অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। আমাদের রক্তচাপ এবং হৃদস্পন্দন বাড়তে থাকে। আমরা দ্রুত শ্বাস নিতে শুরু করি, এমনকি আমাদের রক্তের প্রবাহও পরিবর্তিত হয়। রক্ত আমাদের হৃদয় থেকে আমাদের লিম্বস-এ প্রবাহিত হয়, যা আমাদেরকে দৌঁড়ুতে উত্তেজিত করে তোলে। আর তখন আমাদের শরীর 'ফাইট অর ফ্লাইট' এর জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। ফাইট অর ফ্লাইট-প্রতিক্রিয়া হল একটি ঘটনার স্বয়ংক্রিয় শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া যা চাপ বা ভীতিজনক হিসাবে বিবেচিত হয়। হুমকির উপলব্ধি আমাদের সহানুভূতিশীল স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে তোলে এবং একটি তীব্র চাপের প্রতিক্রিয়া ট্রিগার করে যা শরীরকে এই ভয়ের সাথে লড়াই করতে বা পালিয়ে যেতে প্রস্তুত করে। অর্থাৎ এটি শরীরকে শক্তির বিস্ফোরণ প্রদান করে যাতে এটি অনুভূত বিপদের প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
মনোবিজ্ঞান বলে, ভয় হল একটি প্রাথমিক আবেগ যা একটি সর্বজনীন জৈব রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া এবং একটি উচ্চ স্বতন্ত্র মানসিক প্রতিক্রিয়ার সাথে জড়িত। ভয় আমাদের বিপদের উপস্থিতি বা ক্ষতির হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করে, সেই বিপদ শারীরিক বা মানসিক হোক না কেন। কখনও কখনও ভয় প্রকৃত হুমকি থেকে উদ্ভূত হয়, আবার কখনো কল্পনা করা বিপদ থেকেও উদ্ভূত হতে পারে। যদিও ভয় কিছু পরিস্থিতিতে একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, তবে এটি চরম বা প্রকৃত হুমকির অনুপাতের বাইরে চলে গেলে, যন্ত্রণা এবং ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ভয় কিছু মানসিক স্বাস্থ্য অবস্থার উপসর্গও হতে পারে, যার মধ্যে প্যানিক ডিসঅর্ডার, সামাজিক উদ্বেগজনিত ব্যাধি, ফোবিয়াস এবং পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার জড়িত। মনোবিজ্ঞানের মতে, ভয় হুমকির দুটি প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দ্বারা গঠিত: জৈব রাসায়নিক এবং মানসিক।
মূলত আমাদের সবার ভেতরেই একটি মানসিক দাসত্ব আছে, যা নিজের দ্বারা তৈরি হয়। সহজ কথায়, যখন আমাদের মন আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং আমরা সম্পূর্ণ অসহায় ও লক্ষ্যহীন হয়ে পড়ি, কী করবো সে সম্পর্কে বুঝতে পারি না, সেটাই মানসিক দাসত্ব। যখন আমাদের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা এবং চিন্তাভাবনাগুলো আমাদের যুক্তি, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, ধারণা, মৌলিক মূল্যবোধ, নীতি এবং নৈতিকতাকে পরাভূত করে এবং আমাদেরকে এমন কিছু করতে বাধ্য করে যা আমরা করতে চাই না, তখন এটি মানসিক দাসত্ব হিসাবে পরিচিত। নিজের মনের স্বেচ্ছাচারীতা মেনে নিয়ে আমরা অনেক সময় দাস হই নিজের মনের কাছে।
যাই হোক, ভয় নিয়েই বেশির ভাগ মানুষ আমরা পুরো একটা জীবন কারাগারে কাটিয়ে দিই - শারীরিকভাবে নয়, সেটা মানসিকভাবে। এটি আমাদের নিজস্ব সৃষ্টির একটি কারাগার, যেখানে আমরা বন্দী থাকতে মেনে নিয়েছি। এই কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় আমাদের আছে। আমাদের যা করতে হবে তা হল, সামনের দিকে তাকাতে হবে এবং একজন স্ব-নির্মিত উদ্যোক্তা হয়ে উঠে আমাদের যা করার, তা করতে হবে। আমরা যা করতে চেয়েছিলাম, সবসময় যা হতে চেয়েছিলেন সেই ব্যক্তি, সেই দৃষ্টি, সেই স্বপ্ন—পুনরুদ্ধার করতে পারলে এটাই আমাদেরকে মুক্ত করবে।
প্রশ্ন হলো, মানসিক এই শক্তি ক'জনের আছে? আমরা নিজের কাছে, পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে এতোটাই দায়বদ্ধ, এতোটাই আবদ্ধ যে, পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে আমাদের মানসিক শক্তিও কখনো কখনো তাদের কাছে বন্দী হয়ে যায়; ঠিক কারাগারে বন্দী কয়েদির মতো। তবু সকল বাধা বিপত্তি, ঘাত-প্রতিঘাত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে মুক্তির পথ খুঁজতে হবে। নিজের কাছে নিজেকে স্বাধীন করতে হবে। জীবন একটাই, এই এক জীবনে আমাদের নিজেকে, নিজের চাহিদাগুলোকে, ইচ্ছা ও স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়িত করার, উপভোগ করার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন