https://www.prothomalony.com/
7542
opinion
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিনে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ৩০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ৩০০ আসনে ২৭৪১ জন প্রার্থী হয়েছেন। সংখ্যাটা বিপুল। প্রার্থীদের অনেকেই নির্বাচনী আচরণবিধির তোয়াক্কা না করে শোডাউনের নামে শক্তি প্রদর্শন করেছেন। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে সদ্য নিবন্ধিত দল যেমন আছে, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন দলও আছে। বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না থাকলে এই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বলে স্বীকৃতি দিতে পারেন যে কেউ। কিন্তু যারা রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন তারা বলবেন, সংখ্যা বিপুল হলেও নির্বাচন শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, গেলো একযুগ ধরে সেটা মূলত: চলছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে কঠোর আন্দোলনের কৌশল নিয়েছিলো বিএনপি। কিন্তু সে আন্দোলন সফল হয়নি। কৌশলের খেলায় জয়ী হয় আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগ মনে করছে, এবারের নির্বাচকে ঘিরে বিদেশি চাপ মূলত: নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি-না সেটা নিয়ে। দলটির মূল্যায়ন হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমা দেশগুলো এখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে কথা বলবে না। সুতরাং কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে, তা নিয়ে বিদেশি চাপ নেই।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশে-বিদেশে চলছে নানান আলোচনা-সমালোচনা। সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল এক বক্তব্যে নির্বাচনে ‘বিদেশি থাবার’ কথা উল্লেখ করেন। বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার খোরাক জোগায়।
বিশেষজ্ঞ মহলের অনেকে মনে করছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে অবাধ সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা এখনও কাটেনি। যদিও নির্বাচন কমিশন বলছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করতে নির্বাচন কমিশন বদ্ধপরিকর। কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাওয়া দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ ছাড়া বাকি দলগুলো প্রায়ই সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে জাতীয় পার্টি বলে আসছে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি।
৭ জানুয়ারি পর্যন্ত নানান পরিস্থিতি মোকবিলা করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। তারা বর্তমানে অভ্যন্তরীণ চাপ ও চ্যালেঞ্জের মধ্যেই আছে। এছাড়া থাকতে পারে বাইরের চাপও। যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক না হয়, তবে পরিবেশ আশঙ্কাজনক হয়ে উঠবে বলে মনে করেন তারা। তারা বলছেন, ইসির ভেতরে নির্বাচর কমিশনারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য।
আওয়ামী লীগ বিএনপি থেকে যদি কোনো একটা দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে, তাহলে সেই নির্বাচনে এক অর্থে ক্রটি থেকেই যাবে। নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো যেহেতু অংশগ্রহণ করছে না, সেহেতু নির্বাচনে ক্রটি থেকেই গেল। এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের মিত্ররা যদি কোনো পদক্ষেপে নেয়, স্যাংশন দেয়, সেক্ষেত্রে পরিবেশ আশঙ্কাজনক হয়ে উঠবে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় শেষ হয়েছে। সময় বাড়ানোর আর সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব। তবে রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। যে কোনো সময় বদলে যেতে পারে হিসাব-নিকাশ। যদি বিএনপি এবারের নির্বাচনে অংশ না নেয় তাহলে রাজনৈতিক দলের একমাত্র লক্ষ্য ‘ক্ষমতায় যাওয়া’ এবারও হবে না। তাহলে টানা ২৩ বছর বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে থাকতে হবে। এতো দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত রাখতে বিএনপিকে আরও পাঁচটি বছর কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে।
২০১৪ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনীতি কৌশলের কাছে পেরে উঠছেনা বিএনপি। যার বড় প্রমান দেশবাসী দেখেছে ২৮ অক্টোবরের পর। আওয়ামী লীগ যখন শর্তহীন সংলাপের কথা বলেছিল, তখন বিএনপি শর্তযুক্ত সংলাপের বিষয়ে গোঁ ধরে রেখেছিল। যখন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস শর্তহীন সংলাপের আহবান জানালেন তখন সমর্থন দিল বিএনপি। কৌশলী আওয়ামী লীগ তখন জানালো- সংলাপের সময় শেষ হয়ে গেছে।
নিজেদের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের পরাস্ত করা বা ভোটের মাধ্যমে পরাজিত করা। এটা করতে না পারলে লুটপাট, দুর্নীতি বাড়বে, যেভাবেই হোক ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতা বাড়বে। বাংলাদেশের জনগণ এখন এটাই প্রত্যক্ষ করছেন আর প্রতীক্ষায় আছেন একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের।
মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতির অন্যতম যে গণতন্ত্রের কথা সমস্বরে এবং উচ্চৈঃস্বরে ক্ষমতাসীনরা বলে থাকেন, তারা ক্ষমতায় ছিলেন কিন্তু গত ৫২ বছরে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের গ্রহণযোগ্য এবং স্থায়ী পদ্ধতি তৈরি করেননি। তাই পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠে আর উত্তেজনা উঠে চরমে। জীবন ও সম্পদ নষ্ট হয়, সংঘাত-সংঘর্ষের রেশ থাকে বহুদিন। আর সমাধান ও শান্তি চলে যায় বহু দূরে।
অর্থনৈতিক নীতি ও রাজনৈতিক চরিত্র বিচারে তিন প্রধান দলের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য কি দৃশ্যমান হয়? দেখা যাচ্ছে, সবার উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক দিক থেকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিকভাবে যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতায় যাওয়া। কেউ অসাম্প্রদায়িকতা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলতে বলতে রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখে, হেফাজতকে মিত্র করে নেয়। আবার কেউ নিজেদের মুক্তিযোদ্ধার দল দাবি করেও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে। ফলে জনমানুষের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়েছে, ক্ষমতার জন্য সব করতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো।
২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগের মতো হবে না। কিন্তু ৩০ নভেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর দেখা গেল, এবারে নির্বাচন হবে প্রধানত আওয়ামী লীগ প্রার্থী বনাম আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীর মধ্যে। ইতিমধ্যেই দেখা গেছে, নানা ধরনের চাপ ও প্রলোভনের বিভিন্ন কৌশলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এমনকি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দল নয়, দলেরই নকল বা ডামি প্রার্থী অথবা বিদ্রোহী, যাদের পরিচয় দাঁড়াবে ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’ হিসেবে তাদের দাঁড় করানো হয়েছে। ফলে পত্রিকায় খবর এসেছে, ‘স্বতন্ত্র আতঙ্কে নৌকা’, ‘নৌকা পেয়েও টেনশনে’, ‘টেনশনে মাঝিরা মাঠে স্বতন্ত্র’ ইত্যাদি। এসবের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমিয়ে তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে আতঙ্কও তৈরি হচ্ছে। স্বতন্ত্রদের সঙ্গে বারবার দর-কষাকষির ঝুঁকি এড়াতে তাই রাশ টেনে ধরার ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হচ্ছে আওয়ামী লীগ। মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীদেরও স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে আওয়ামী লীগের দলীয় অনুমোদন লাগবে। অর্থাৎ তারা ঠিক স্বতন্ত্র নয় (নট কোয়াইট ইনডিপেনডেন্ট)। রাজনীতিতে এটা একটি নতুন ধারা তৈরি করবে। জনগণ আর বাছাই করবে না, ক্ষমতাসীনরা যা বেছে দেবেন তাকেই অনুমোদন দেওয়ার অধিকার পাবেন মাত্র।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন