https://www.prothomalony.com/
6893
entertainment
নিউইয়র্কে 'নজরুল জয়ন্তী’ অনুষ্ঠানে ড. নিরুপমা রহমানের অনবদ্য পরিবেশনা সকলকে মুগ্ধ করেছে। ১৪ অক্টোবর নিউইয়র্ক সিটির জ্যামাইকার মেরি লুইস একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় নজরুল জয়ন্তী। ড. নিরুপমা রহমান একজন নজরুল সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ, আমন্ত্রিত ছিলেন বিশেষ এ আয়োজনে।
সংগীতের সাথে যার জীবন জড়িত, তিনিই নিরুপমা রহমান। নীরা নামে সবাই ডাকে, মূলত বাবা-মায়ের নামের সাথে মিলিয়ে এ নাম রাখা। সংগীতের প্রতি তাঁর এই আগ্রহ মূলত ছোটকাল থেকে। স্কুলজীবন শুরু হওয়ারও আগে, বাবা-মায়ের উৎসাহে সুরের সাথে, গানের সাথে তাঁর পথচলার শুরু। তিন বছর বয়সে হাতেখড়ি নিয়েছেন শ্রীমতী স্বপ্না রায়ের কাছে। তারপর গুরু কৃষ্ণকান্ত আচার্যের কাছে শেখা শুরু করেন। ছয় বছর বয়সে পণ্ডিত বারীণ মজুমদারের কাছে শেখার সুযোগ পান তিনি। যদিও পণ্ডিত বারীণ মজুমদার সাধারণত অত ছোট বয়সী কাউকে শেখাতেন না। কিন্তু নিরুপমার পরম সৌভাগ্য ছিল যে ছোট বয়স থেকেই এমন গুণীজনের কাছে শেখার সুযোগ পান। এরপর টানা ১১/১২ বছর তাঁর কাছেই শিখেছেন নিরুপমা।
এইচ এস সি-পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলেও, আই সি সি আর স্কলারশিপ নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়বেন তিনি। কলকাতা হলো সমগ্র ভারতের সঙ্গীতের এক অনন্য পাঠস্থান, আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতারই অংশ। তাই গান শেখার সুযোগের ভাবনা আর সম্ভাবনা চিন্তা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েই ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে যান নিরুপমা।
যদিও পণ্ডিত বারীণ মজুমদার নিরুপমাকে যোগাযোগ করিয়ে দেন তাঁর গুরুবোন উপমহাদেশ প্রখ্যাত বিদুষী শ্রীমতী দিপালী নাগের সাথে, কিন্তু নিরলস প্রচেষ্টায় পরীক্ষায় উতরে নিরুপমা তালিম প্রাপ্তির সুযোগও পেয়ে যান বিদুষী শ্রীমতী দিপালী নাগের কাছে। তাঁরা দুজনেই আগ্রা ঘরানার কিংবদন্তী সম উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁর শিষ্য ছিলেন। স্নেহভরে দীর্ঘ সময় বিদুষী শ্রীমতী দিপালী নাগ, নিরুপমাকে শুধু গানই শেখাননি, তিনি শিখিয়েছেন সঙ্গীতে নানা দিক: কীভাবে সঙ্গীতকে নিজের মাঝে ধারণ করতে হয়, কীভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে অনুভব করতে হয়, আরো শিখিয়েছেন প্রতিটি রাগের প্রকাশে কীভাবে অনুভূতি তুলে ধরতে হয়।
এ ছাড়াও খুব ছোট থেকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল হকের কাছ থেকে নেয়া তালিম, নিরুপমাকে শিখিয়েছে কীভাবে বাণীপ্রধান বাংলা গান, গানের বাণী, বাণীর সাথে সুরের মেলবন্ধনকে খুঁজতে, চিনতে ও ধারণ করতে হয়। দীপালি নাগ এবং ওয়াহিদুল হক দুজনেই নিরুপমার সঙ্গীত জীবনে বিরাট প্রভাব ফেলেছেন। এছাড়াও সেই ছোট বেলাতেই প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সাদী মহম্মদের কাছে নিরুপমা রবীন্দ্রসংগীত শিখেছেন। আর নীলোৎপল সাধ্য, সালমা আকবরের মত গুণীজনদের কাছেও তালিম নেবার সুযোগ হয়েছে। নিরুপমার ক্যারিয়ার নিযে বলতে গেলে এ এক বিরাট অর্জন।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে অনার্স করার পর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা তত্ত্ব নিয়ে 'এম এ' করেন তিনি। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্বববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার 'মনাশ ইউনিভার্সিটি' থেকে ডীনস এ্যাওয়ার্ড সহ রিসার্চ মাস্টার্স শেষ করে পূর্ণ বৃত্তি সহ 'ইউনিভার্সিটি অফ মেলবোর্ন' থেকে পিএইচডি শেষ করেন । পি এইচ ডি-করতে করতেই তিনি মনাশ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা শুরু করেন। দীর্ঘদিন 'মনাশ ইউনিভার্সিটি' ও 'ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর পর বর্তমানে মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে কলা ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদে অধ্যাপনার করছেন। পাশাপাশি উচ্চতর ও বৈশ্বিক শিক্ষাপদ্ধতি উদ্ভাবন আর তার প্রায়োগিক পরিপ্রেক্ষিত গবেষণায় রত আছেন নিরুপমা।
.jpg)
লেখালেখি নিরুপমার আরো এক ভালো লাগার বিষয। অধ্যাপনা ও সংগীতচর্চার পাশাপাশি বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষাতেই নিয়মিত লিখেন তিনি। সংস্কৃতি, বাঙালির আত্মপরিচয় এবং উচ্চশিক্ষার নানা বিষয় নিয়ে তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানান প্রকাশনায় লিখেন। নিরুপমার প্রথম বই ‘বাঙালির অন্তরমহল’ এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাতিঘর থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ভাষাতত্ত্ব কিংবা শিক্ষা নিয়ে তার গবেষণা, সঙ্গীত ঘিরে তার মনন ও দর্শন, তাঁর লেখালেখিতেও বিপুল প্রভাব রাখে। এ নিয়ে তিনি বলেন, "ভাগ্যিস বাঙালি মায়ের কোলে জন্মেছিলাম, তাই তো বাংলা ভাষায় আমার আজন্ম অধিকার। বাংলা গানের বাণী, সুর, মনন দর্শনে আমি খুঁজে ফিরি নিজেকে প্রতিনিয়ত। অমন করে ভালোবেসে চর্চা আর চর্যায় থাকুক আমার বাংলা ভাষা, আমার বাঙালিয়ানা।"
যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। নিরুপমা এর উদাহরণ। গানের পাশাপাশি রান্না করা, ভীষণ ভালোবাসেন তিনি। রান্নার মধ্যেও তিনি খুঁজে পান সঙ্গীতের রাগ পূরবী। রান্নার পাশাপাশি আপ্যায়ন করতে পছন্দ করেন তিনি। এ নিয়ে তিনি বলেন 'আমার এই ছোট্ট সাধারণ আটপৌরে জীবনের প্রতিটি দিন আমার কাছে ভালোবাসার উদ্যাপন। আমার চারপাশের সকলকে নিয়ে আমার জগত আর সেই জগতের বাসিন্দা সবাই আমার পরম আত্মজন। আমার যাপিত জীবনের প্রতিটি দিনের বেঁচে থাকা সুন্দরতর উদযাপন হয়ে ওঠে কেবলমাত্র চারপাশের সকলের ভালোবাসায় আর সকলকে ভালোবেসে। এই যে সকলের ভালোবাসার আলোতে পথ চলি, মায়ার ঋণে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকি, সেই ঋণ শোধ করার সাধ্য কী আমার। তবু একটু যত্ন করে পাত পেড়ে খাওয়াতে পারলে ধন্য হই, আপ্লুত হই।'
নিরুপমার আরো একটি নেশা বই পড়া। পড়ার মাধ্যমেই নজরুলকে তিনি আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। তিনি বলেন, 'নজরুলের গানের মাঝে আমি অনিঃশেষ এক গুপ্তধন ভাণ্ডারে মণি-মাণিক্য সন্ধান করে বেড়ানোর আনন্দ খুঁজে পাই। যত পাই তত আরো খুঁজি, আরো কিছু পাওয়ার আশায়। সেই খোঁজার আনন্দে নেই ক্লান্তি, নেই নিরাশা কিংবা হারানোর ভয়। এ এক পরম আনন্দ।'
কাজী নজরুল ইসলামকে কে না জানে? বাংলা ভাষার অন্যতম সাহিত্যিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ধর্মীয় লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন। ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দিয়েছেন-ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল। এর পাশাপাশি তিনি অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামাসংগীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করে গেছেন। নজরুল প্রায় ৩০০০ গান রচনা এবং অধিকাংশে সুরারোপ করেছেন যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা "নজরুল গীতি" নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়।
এ নিয়ে নিরুপমা মনে করেন, 'নজরুল চর্চা যেমন বাড়ানো দরকার, তেমনি নজরুলের দর্শন প্রচার আরও বেশি জরুরি। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে নজরুলের নিয়মিত অনুষ্ঠান করা প্রয়োজন। নজরুল আমাদের জাতীয় কবি। সে জন্য তো বটেই, তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার কারণেও তাঁর চর্চা বাড়ানো দরকার। নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলকে আরও ভালোভাবে উপস্থাপন করার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন। তাই পরিকল্পিতভাবে তথ্যপ্রযুক্তিতে নজরুল চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন। আন্তর্জাতিকভাবে নজরুলের গবেষণা, নজরুলকে নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা এবং বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে নজরুল চর্চা হয়, সে জন্য তাদের সঙ্গে কাজ করা দরকার। সর্বোপরি বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় জানাতে হবে নজরুল কে ছিলেন। তাঁর কর্মময় জীবন ছিলো মাত্র তেইশ বছরের, এ সময়েই তিনি হয়ে উঠেছেন জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি। নজরুল ছিলেন মূলত মানুষের কবি। তাঁর চিন্তাকে কোনভাবেই নির্দিষ্ট সীমানায় চিন্তা করা যায়না।'
নিরুপমা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, রবীন্দ্র সঙ্গীতে নতুন কুঁড়ি, জাতীয় শিশু পুরষ্কার, বাংলা একাডেমী শিশু পুরষ্কারসহ অসংখ্য জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছেন বহুবার। প্রায় দু’দশক ধরে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন প্রবাসী নিরুপমা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়মিত গানের চর্চা বজায় রেখেছেন পুরোদস্তুর। আজীবন নজরুলের গানকে ভালোবেসে প্রাণে ধারণ করে বাঁচতে চান নিরুপমা। গান গেয়ে যাবার তার এই আন্তরিক যাত্রায় সকলকে পাশে চান তিনি।
বিনোদন থেকে আরো পড়ুন