https://www.prothomalony.com/
6665
literature
জগৎ সংসারে
প্রদীপ কুমার পাল
অরণ্যে ঘুরতে ঘুরতে ভানুমতীকে খুঁজে পান লেখক।
চকচকে শরীরে সরলগাছ,
পাতা ফুলে ভরে ওঠা মরসুমী ফুল।
সর্বজয়া মাতৃরূপেন, চুল আঁচড়ায় দুর্গা পিতিম।
দুর্গা ইন্দিরা পিসিমাকে খাবার দেয় লুকিয়ে
ইন্দিরা ননদের সাথে সর্বজয়ার নেউল সংসার।
অপর্ণা বিয়ে করে আসে শহর কলকাতায়৷
কারখানার ভোঁ, আর তার তোলা উনুন সংসার
হাওয়া করা হাতপাখা বাতাস,
প্রসবকালে জীবন ধূমায়িত শব।
কথার অক্ষরে নিপুণ বিভূতিভূষণের কথারূপ জলছবি,
বাস্তবিক মায়াময় জগত সংসার।
চেনা ও অচেনা
ভজন দত্ত
তোকে এক তা সাদা কাগজ দিলাম, তুই আকাশ বানিয়ে
চাঁদ তারাদের সংসার বসিয়ে দিলি
সেই কোন কালে তোকে একটা গোলাপ দিয়েছিলাম বলে,
তাই থেকে সমুদ্র বানিয়ে তার নাম দিলি সংসার
তোকে আদরে রাখব বলে কয়েকশো স্কোয়ারফুটের
সাদামাটা একটা ঘরে এনে তুলেছিলাম, আর তুই-
সেটাকেই আমাদের নিজস্ব পৃথিবী করে নিলি
জীবন, তোকে সামান্যই তো ভালোবাসতে পারলাম,
অথচ তুই সর্বস্ব উজাড় করে আমার আমিকে
মানুষ করে তুললি
তুই কে! কে তুই!
তোরা আমাদের যতটা চিনিস, আমরা কি ততটা
তোদের চিনলাম?
বৈষম্যের পটভূমি
জহিরুল হক বিদ্যুৎ
বোধকে হত্যা করতে করতে একদিন অসংখ্য শরীর
থেকে ঝরে পড়ে মানুষের গন্ধ
কী নিদারুণ বৈষম্যের পটভূমি!
কে এঁকে দেয় এ অপ্রিয় পার্থক্য?
শরীরের ক্ষুধা না কী মনের ক্ষুধা?
শরীরের ক্ষুধা যখন জ্যান্ত ইঁদুর, মনের ক্ষুধা যখন
ডাইনোসরের আগুন,
বুভুক্ষু জানালা দিয়ে তখন ঢুকে যায়
লোলুপ তপ্ত হাওয়া অতৃপ্ত যন্ত্রণায়।
অনন্ত অসীমে ঈশ্বরকে দেখবে বলে কেউ ধ্যানে থাকে,
জানালায় পেরেক ঠুকে, কেউ কপাট খুলে দাঁড়িয়ে থাকে
পার্থিব সুখ লুটে ঈশ্বর হওয়ার বাসনায়।
পঞ্চাশ বসন্তে দাঁড়িয়ে
তুহীন বিশ্বাস
নেতিয়ে পড়েছে বটবৃক্ষ;
অর্ধশত বছর আগে সযত্নে রোপিত চারাগাছ-
শৈশব, কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে,
পরিসেবায়, কর্তব্যে কৃপণতা ছিল অনুপস্থিত,
অথচ, সুবিধাভোগীর অত্যাচার ছাল-বাকলে
ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত হতে হতে নিস্তব্ধ নিস্তেজ।
পঞ্চাশ বসন্তে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত বৃক্ষ;
সময়ের ব্যবধানে অস্তিত্বের সংকট,
প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়া মানুষগুলো বড্ড অচেনা,
জীবন সায়াহ্নে বিসর্জনের স্মৃতিগুলো ঘুরপাক খায়।
অতঃপর...
কাঠুরিয়ার কুঠারে লেখা হয় জীবনের শেষ অধ্যায়।
সাদা হাতিদের নৃত্য
ফেরদৌস জান্নাতুল
ক্রমাগত এগোচ্ছে জীবন
দ্বন্দ্বে ছন্দে ও আনন্দে-সকলের।
এই রেললাইন ধরে এগোলে পৌঁছানো যায় শীতের দেশে,
চটুল বিন্যস্ততার আবহ হতে আরো দূরে।
মানুষ স্বভাবতই খোঁজে সম্ভোগের মুখচ্ছবি-
চিত্রিত অতীত, অনাগত ভবিষ্যৎ।
শরতের স্নিন্ধতা আঁকা একটি চিত্রপট কুড়িয়ে পেয়েছিলাম
একদিন, যেখানে নীলের ভাঁজে ভাঁজে সাদা মেঘ,
মেঘের সাথে বোঝাপড়ায় ব্যস্ত একদল বেনামী পাখি
বেদনায় ডানা ঝাপটায়।
এই রেললাইন শেষ হতেই নতুন একটি শহর-
দিগন্তের মতো মুখচ্ছবি এঁকে
এ শহরে সাদা হাতিরা নৃত্য করে;
প্রবল সৌন্দর্য ও সম্ভোগের নির্জন অন্ধকারে।
বিপ্লবী
ফজিলা খাতুন
বিক্ষোভের মিছিলে দাঁড়িয়ে উত্থানের ভূমিকায় দেখি,
সমাজের দুর্বলতা, বেজে ওঠে কোলাহলের শব্দ
ক্ষণে ক্ষণে; দীর্ঘশ্বাস ভীষণ দাগ প্রকৃতির উপরে।
বাহুক্ষত মানবের হৃদয়ে সহস্র প্রহর
শক্তিহীন জনতা মৃত্যুর কারাগারে একা বসে।
বিচার কাকে দেওয়া হবে?
ক্রোধের অগ্নিদেহ জ্বালায় আমি উঠবো জেগে,
জনতার হয়ে প্রতিশোধের আগুন জ্বেলে।
বিপ্লব এসেছে আজ পাহাড়সম দৃঢ়তা নিয়ে।
রুদ্র সাহাদাৎ এর কবিতা
অজস্র মুখ শব্দহীন
আমার সাজানো বাগানে দৌড়ায় রোহিঙ্গা
দৌড়াচ্ছে হাট-ঘাট মাঠ-পথ প্রান্তরে
দৌড়াচ্ছে জলে জলে নদী সাগরে
দৌড়াচ্ছে দিগ্বিদিক্ সময় অসময়।
বাইশ লক্ষ পায়ের হাঁটার ধ্বনি কানে ভাসে
বাইশ লক্ষ চোখ কি দেখে, কি খোঁজে খোদা জানে।
স্বজন হারানোর আর্তনাদ শুনে আকাশ বাতাস
ভয় আতঙ্কে অহর্নিশ অজস্র মুখ শব্দহীন।
মানুষের ভিড়ে আমাগো মানুষ নাই
মুখোশের ভিড়ে হারিয়ে ফেলছি মুখ
হারাচ্ছি যতো ছিল প্রিয় স্বজন
দৌড়াচ্ছে একে একে সব চেনামুখগুলি
এখন এই সমাজে আমরা কেউ কাউকে চিনি না
আকস্মিক দেখি, মানুষের ভিড়ে আমাগো মানুষ নাই।
ভেজা আমব্রেলা
মুসান্না হাবিব
ঘোরে আর বেঘোরে বিকালের রোদ
যৌবনবতী হয়ে ফেরে হৃদয়ের কার্ণিশে।
যশোর রোড থেকে গিনেসবার্গের ভেজা আমব্রেলা
কুড়িয়ে আনতে গিয়েছিলাম
দমদমের শেষ প্রান্তে।
ফ্রাইংপ্যানে শুকিয়ে যাওয়া গোধূলির রঙ
ফিকে হয়ে উড়ে যায় এয়ার ইন্ডিয়ার ডানায় ভর করে।
প্রেম তো এক ভার্জিন মোহিত
স্ট্রর চুমুকেই নিমিষে শেষ হয়ে যায়।
পরগাছা
শেখ জলিল
বৃদ্ধা মা থাকেন একমাত্র মেয়ের আশ্রয়ে৷ ছেলেও তার একজনই৷ বিয়ের পর ছেলে থাকে বউয়ের আঁচল তলে৷ ছেলের বাড়িতে গেলে বেশিদিন মন টেকে না তার৷ ফিরে আসেন আবার মেয়ের বাড়িতে৷ প্রচুর ধন-সম্পদ অথর্ব পড়ে আছে৷ তবু স্বামী মারা যাবার পর তিনি হয়ে উঠেছেন পরাশ্রয়ী৷ এখন বয়স হয়েছে তার৷ তার উপর নানান রোগবালাই লেগেই আছে৷ এই বিদেশ বিভুঁইয়ে একলা থাকার সাহস নেই আর৷
মেয়ের বাড়িতে শরীফা বেগম সারাদিন কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকেন৷ রান্নাবান্না করা, শাকসবজি বাগান করা, একমাত্র নাতির দেখাশোনা করা তার নিত্যনৈমিত্তক কাজ৷ তবুও মাঝে মাঝে কোথাও ঘুরতে মন চায় তার৷ মেয়ে তার স্বামী নিয়ে বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গায় ঘুরতে যায়, গ্রীষ্মের মৌসুমে বন্ধুবান্ধব নিয়ে মাছ শিকারে যায়৷ শরীফা বেগমেরও ইচ্ছা জাগে মাছ ধরতে যাবেন৷ সেই ছোট্টবেলায় গ্রামের বাড়িতে ছিপবড়শি দিয়ে কত মাছই না ধরেছেন তিনি!
অনেক পীড়াপীড়িতে একদিন মেয়ে তাকে নিয়ে মাছ ধরতে যায়৷ অনেক দূরের এক লেকে প্রচুর মাছ ধরে বড়শিতে৷ শরীফা বেগমের হাতেও দেওয়া হয় এ দেশের স্পিনিং রড এন্ড রিল৷ কিন্তু এই বড়শি তো আর দেশের মত না৷ শরীফা বেগমের জানা নেই কেমন করে এটা ফেলতে হয় পানিতে৷ প্রথম কয়েকবার মেয়ে জামাই তাকে সাহায্য করে। আর ছিপ হাতে মাছের অপেক্ষায় বসে থাকেন শরীফা বেগম৷
শরীফা বেগমের মাছ রাশি৷ অন্যান্যদের বড়শিতে মাছ না ধরলেও তারটায় ধরে৷ কিন্তু সেই মাছ টেনে তুলতে হয় মেয়ে জামাইকে৷ এভাবে বেশ কয়েকবার ধরার পর অধৈর্য হয়ে যায় তারা৷ মেয়ে তাকে বলেই ফেলে- তোমার বড়শি তুমিই সামলাও৷ শরীফা বেগম তখন অসহায়৷ দেশীয় স্টাইলে ছিপ ফেলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তিনি৷ খুব মন খারাপ হয় তার৷ পাশে বসা মেয়ে জামাইয়ের বন্ধু বলে- আন্টি ওভাবে হবে না, আমার কাছে দেন, আমি ছিপ ফেলে দেই৷
এবারে মাছ ধরায় মনোযোগ নেই শরীফা বেগমের৷ যে মেয়েকে হাতে তুলে খাইয়ে বড় করেছেন, স্কুলে যাবার আগে মাথায় দুই বেনী করে দিয়েছেন, সপ্তাহে সপ্তাহে কাপড় কেচেছেন যার- সেই কিনা বলে তোমার কাজ তুমিই করো৷ আসলে সবই বয়সের ভার, কপালের ফের৷ এখন আর আগের মত সামর্থ নেই তার৷ অনেক থেকেও তিনি যেন এখন পরগাছা মাত্র!
অন্য আকাশ
জসীম উদ্দীন মুহম্মদ
পরী মাঝেমধ্যে হাঁটতে হাঁটতে আকাশ দিয়ে উড়তো। পাখির মতো গুনগুনিয়ে গান গাইতো। যদিও তার গলা একেবারে শ্রুতিমধুর নয়, তবে শ্রুতিকটুও নয়। বলা চলে অম্লমধুর। প্রথম দুই এক চরণ বেশ ভালোই গাইতে পারে; এরপর আর তাল ঠিক রাখতে পারে না। বেতাল হয়ে যায়। তবুও পরী গান ছাড়ে না। কারণ একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে এই গান শোনেই আকাশ তার প্রেমে পড়েছিল। যে-সে প্রেম নয়; জীবন-মরণের প্রেম! একদিন না দেখলে পেটের ভাত হজম হত না। একদিন কথা না বললে মনে হত হাজার বছর ধরে কথা বলে না। নাওয়া-খাওয়া, ঘুম কিছুই ভালো লাগতো না।
পরীও দেখতে শোনতে পরীর মতোই। পার্থক্য কেবল আসল পরীর ডানা আছে; কিন্তু এই পরীর ডানা নেই। এজন্যই লোকে পরীকে বলতো ডানাকাটা পরী! এসব শোনে পরী লজ্জা পেলেও লজ্জাবতী লতা হতো না। মনে মনে পুলক অনুভব করত। এদিকে আকাশও কম না। দীর্ঘদেহী সুঠাম সুপুরুষ। তার উপর সরকারি চাকরি করে। সিগারেট ফুঁকা ছাড়া স্বভাব-চরিত্র একেবারে ফিলটারে চ্যাকা জলের মতো পবিত্র। দশ গেরামে এমন ছেলে পাওয়া ভার! সবকিছু জেনে বুঝেই পরীর মা-বাবা পরী-আকাশের প্রেমের পথে কাঁটা হয়নি। বরং প্রচ্ছন্নভাবে প্রচ্ছদে রঙ দিয়ে গেছে।
দীর্ঘ পাঁচ বছর, পাঁচ মাস, পাঁচ দিন প্রেম করার পর পরী আর আকাশ যখন বিয়ের পিঁড়িতে বসল, তখন সারা গায়ে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। কেউ বলল, মানিকজোড় আর কেউ বলল, সোনায়-সোহাগা! বাসর ঘরে আকাশ দেনমোহর এর টাকা নগদ মিটিয়ে দিতে চাইলে পরী বুকভরা গর্ব আর সমস্ত শরীরজোড়া অহংকার মিশিয়ে বলেছিল, এসব টাকা-পয়সায় আমার কাজ নেই। এগুলো তোমার কাছেই থাক। আমারে শুধু এমনি করে সারাজীবন ভালোবাসলেই অইব! পরীর কথা শোনে আকাশ খুশি হয়ে বলল, সেটা কি আর কইতে অয়.. অত:পর পুরুষালি শক্ত দুই বাহু দিয়ে পরীকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে।
পরের গল্পটা কিছুদিন গল্প ছিল। এরপর বিষাদসিন্ধু হয়ে গেল। বদলিজনিত কারণে আকাশ ময়মনসিংহ থেকে নীলফামারি চলে গেল। কিছুদিন ঘনঘন ফোন দিত। খোঁজ-খবর নিত। ধীরে ধীরে পরীর জীবনে কালো মেঘ জমতে লাগলো। আকাশ পরীর ফোন ধরে না। নিজেও ফোন করে না। অধিকাংশ সময়ই তার ফোন ব্যস্ত থাকে। মাসের পর মাস চলে যায়, আকাশ আসে না। পরীর জীবনে একটি আকাশ থাকলেও আকাশের আকাশে আজ অন্য আকাশ!!
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন