https://www.prothomalony.com/
6585
literature
যে কোনো সময় বিস্ফোরিত হবো
জি এইচ আরজু
মাথায় বারুদ নিয়ে ঘুরছি
ঠিক যেন দিয়াশালাইয়ের কাঠি।
উজানে বাঁধ, নদী নাব্যতাহীন
ফসলের জমি আনাবাদী
কৃষকের বুকের হাড় স্পষ্ট দৃশ্যমান।
ফেলানি ঝুলে আছে কাঁটাতারে দীর্ঘক্ষণ
বিশ্ববিবেক মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে
প্রহসনের বিচারে ঘাতকের নিঃশর্ত মুক্তি
অনাহারি শিশুদের মৃত্যু ত্বরান্বিত করে
রাষ্ট্রের ক্যামিকেল গ্যাস।
মাথায় বারুদ নিয়ে ঘুরছি
ঠিক যেন দিয়াশালাইয়ের কাঠি
যে কোনো সময়ে বিস্ফোরিত হবো
অগ্নুৎপাত, ভূমিধ্বস, জলোচ্ছ্বাস-তারপর
তারপর এক নতুন পৃথিবী
উজানের বাঁধবিহীন, কাঁটাতারের বেড়াবিহীন,
রাষ্ট্রের ক্যামিকেল গ্যাসবিহীন।
মাথায় বারুদ নিয়ে ঘুরছি
ঠিক যেন দিয়াশালাইয়ের কাঠি।
জেলে ডিঙি
পীযূষ কান্তি সরকার
ছাপোষা সংসারে
উথাল-পাথাল ঢেউয়ের ঝুঁটি জাপটে ধরে
ছেলেবেলা পার হল জেলে ডিঙি বেয়ে।
বিশাল কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে
ভেসে আসে 'রণং দেহি' আহ্বান
রথী-মহারথী নই
গজ-অশ্বারোহী নই
নিতান্তই পদাতিক সৈনিক আমি।
অস্ত্র আমার-'শাণিত কলম'
লক্ষ্য-'নিবিড় তমশার নাশ'
সাধ- 'একটা দাগ রেখে যাই'
সাধ্য ওড়ায় জগৎ শেঠের চিতার ছাই।
দগ্ধ ভ্রমণ
হাশিম কিয়াম
সব আছে, তবু কিছুই নেই!
প্রতিটি বেডের উপর মহাবিশ্ব ঘুরপাক খায়, ফালাফালা
মনের অলিগলি, হা-হুতাশের খাঁচায় বন্দি জীবনের রঙিলা স্বপ্নের পাখি,
মেঝেতে গোঙানির শব্দরা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, দেয়ালের চোখ বেয়ে ঝরে
প্রেমিকার কান্না, প্রেমিকের নিথর শরীর থেকে উড়ে যায় বাসি চুমোর ঝাঁক,
বন্ধুর শূন্য বুকে ভেঙে পড়ে তারাবিহীন আকাশ, পিতা-মাতার পাথর বুকে
শুকিয়ে যায় রক্তের নদী, শিশুর রেখে যাওয়া খেলনার ভিড়ে ভেংচি কাটে
বুর্জোয়া সাপ, সহপাঠী বোনের আঙুলগুলো বড্ড একলা...
স্কুল ব্যাগ আহত প্রজাতি ডানায় মায়ের দুধের সুগন্ধ লেগে আছে; মায়ের
আঁচলের ছায়া মরীচিকা, বাবার চওড়া বুকের সাহস গুটিয়ে নেয় তার ডানা..
মৃত্যু প্রাচীন নর্তকী, থামায় না তার উদ্দাম নাচ, বলো বৃক্ষ,
এই দগ্ধ ভ্রমণের কী অর্থ আছে!
মানুষের নেই তো কচিপাতার সাজানো সংসার, ঝরে যায় সে, দেখে না নতুন
পৃথিবী আর শুধু মায়া, তার রংও চটে যায় বিস্মৃতির জলে ভিজে।
কবিতা
রানাকুমার সিংহ
সিকোয়েন্স
পুরো সন্ধে ভেসে গেল
ভেসে গেল জলে!
বৃষ্টি, শ্রাবণ, তুমি...
অতঃপর মেঘঘন আকাশে
ঝুলে আছে মনমরা চাঁদ!
শ্রাবণের ফুটনোট
কোলাহলের বাইরে প্রত্যাখাত অমাবস্যা ঘরে ফিরে যায়
মনের চাইতে রহস্যের আধার খুঁজতে যাযাবর হতে হয়,
গোপন প্রণয়ে বেড়ে ওঠা মায়া ভেসে যায় শ্রাবণের দুপুরে
আচানক আয়নায় মুখ দেখে আৎকে ওঠে বেফাঁস আবেগ!
বিরহমুখর দিনকাল
সাকিব জামাল
তোমার সাথে সব সম্পর্ক শেষ আমার
এমনসব কথাবার্তা শোনার পরেও,
যুগল স্মৃতির ফোল্ডারসমূহ,
কতোবার যে রিসাইকেল বিনে পাঠিয়েছি
আবার রিস্টোর করেছি
হিসাব বিহীন। নিয়ন্ত্রণহীন!
নদীর জলে শুশুকের মতো উঁকি দেয়, মস্তিষ্কজুড়ে-
ফেলে আসা দিন। অস্থির নিউরন।
তুমি চলে যাবার পর, স্ট্রেসফুল একাকিত্বের পথে-
এখন চলছি অবিরাম। অত্যন্ত বিরহমুখর!
একদিন চলে আয়, তুমুল আনন্দ হবে
দ্বীন মোহাম্মাদ দুখু
আমি নির্বাসিত পাখি - একঘরে তসলিমার মুখচ্ছবি
রক্তস্রোতে ভেসে এসে কুহু ডাকের নির্মম আর্তনাদে
তপ্ত সাহারায় তুমুল আনন্দ খুঁজে খুঁজে দুঃখ ঢাকি
আমি নির্বাসিত পাখি - রোদের ভাঁজে প্রেমানন্দ খুঁজি
বরষার ডোবা থেকে ছুটে আসা ব্যাঙেদের সঙ্গম হুংকারে
আঁতকে উঠা যৌনতাকে লজ্জাবতির পাতায় মুড়িয়ে রাখি
আমি নির্বাসিত পাখি - একুশ পদের ভোগ রান্নাও জানি
শেষ মিলনে স্নানের ঘরে রাখা রুমাল ধুয়া শরবত খেতে
ন্যাংটো থালা বাটি নুনের ডিব্বা আর গেলাসকে কাছে ডাকি
আমি নির্বাসিত পাখি - আকাশের দেবতাদের মুখ আঁকি
একদিন চলে আয়! তন্নতন্ন কর নগ্ন শরীর, বেঁধে নে পা
তুমুল আনন্দ হবে- বোতাম খোলা সমাজের স্তন দেখে যা।
টাকার ফল
প্রতিভা সিংহ রায়
মাধ্যমিকের বেড়িয়েছে ফল, প্রথম হয়েছে ছেলে
বড্ড গরীব মা-বাপ তার; বড়ো হলো অবহেলে।
স্কুলে গেছে আধপেটে খেয়ে, তখন দেখেনি কেউ
টিভিতে খবর পাওয়ার পরে; ভালোবাসার ঢেউ।
আলোর ঝলক উপচে পড়ছে,ছেলেটির মুখের পরে
সংবর্ধনা আর বিজ্ঞাপনে; তাহারই যে ডাক পরে।
এমনি করে মেধাবী ছেলের, ব্যাঙ্কে এসেছে টাকা
টাকার বদলে পড়ার বইটি; প্রায়শই থাকে ঢাকা।
এইচ-এসের মেধা তালিকায় নামটি যে নেই তার
আলোর ঝলক অন্যখানে; ছবি তো মেলানো ভার।
গরীব ছেলে বুঝলো এবার, অন্য একটা মানে
টাকায় বড় হবে সে যে; বড় হবে না জ্ঞানে।
গরীব ঘরের মেধার থেকে, টাকার অনেক দাম
টাকার জোরে কিনবে এবার; সবার আগে নাম।
না বলা কথা
শম্পা ঘোষ
সমুদ্রের মাঝবক্ষে লুকিয়ে আছে মন্থন,
উজানের পথে এসে ঢেউয়ের চূর্ণ-বিচূর্ণতা
দাবি করে ঝিনুকের দুর্বলতা।
ঝড়ো হাওয়ায় কেতাদুরস্ত কায়দা আলিঙ্গন করে নেয়
একাকিত্বকে
বিবাগী মনেও কখনো কখনো বৈঠক জমে;
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সহজ শব্দ
পাণ্ডুলিপি ছুঁয়ে যায় একান্তে।
ইউক্লিড ও জ্যামিতিক বাহার জীবন জুড়ে,
তবু অনুভব করি ভিজে চোখে চিত্রগল্প
কত কথাই বলা হয় না।
ঘাসফড়িং এর জীবন বদলে উজ্জীবিত হতে হতে
জানালার সারশিগুলো খুলে দিই,
নিষ্পাপ ভোরের গন্ধে ঘুম ভাঙে আবার।
ভাগ
শারমিন নাহার ঝর্ণা
উঠোন জুড়ে আজ রৌদ পড়েছে,আধমরা ঝিঙে গাছে দুটো ফুল ফুটেছে। মনটা বিষণ্ণতায় ছেয়ে আছে রাহেলা বেগমের। বারবার মনে পড়ছে তার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। কত স্বপ্ন এঁকেছিল দু'চোখে দুই ছেলেকে নিয়ে এক ছাদের তলায় বসবাস করবে বলে।
স্বপ্নগুলো আজ চোখের জল হয়ে টপটপ করে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বুকের উপর। কিসের যেন শূন্যতা। এই সংসারের জন্য খেয়ে না খেয়ে জীবনে কত কষ্টই না করেছে দুজনে মিলে, অন্তিম বয়সে একসাথে এক ছাদের তলায় সন্তানদের নিয়ে সুখে দিন কাটাবে বলে।অথচ আজ তাদের স্বপ্নগুলো চোরাবালির মতো। কখনো ভাবেনি রাহেলা বেগম, তারা একদিন সন্তানের বোঝা হয়ে যাবে, এত ভারী বোঝা যে ওরা তাদের দু'জনকে ভাগ করে নেবে। এখন তারা দু'জনে দুই প্রান্তে চলে যাবে।
ছোট ছেলে মাসুদ ঢাকায় চাকরি করে। ওর ভাগে রাহেলা বেগম, যে কিনা পুরো সংসারটাকে একা কাঁধে নিয়ে ত্রিশটি বছর কাটিয়ে দিলো। বড় ছেলে শিমুল গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চাকরি করে, বাবাকে নিজের ভাগে রেখে দিয়েছে। বাবা-মা দু'জনের হাসিখুশি, সুখ দুঃখ, ব্যথা বেদনা, বোঝার ক্ষমতা আজ ওরা হারিয়ে ফেলেছে।
এতোটুকু ওদের বোঝার ক্ষমতা নেই, যে বাবা-মা এতদিন তাদের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে তিল তিল করে সোনার সংসার গড়ে তুলেছে, সন্তান যাতে সুখে থাকে সেই চেষ্টা করেছে, তাদেরকে আলাদা করতে নেই।সন্তানের কাছে আজ তারা দু'জন ভাগাভাগি।
ভাবতে ভাবতে আঁচলে চোখের জল মুছেন রাহেলা বেগম। সকালেই ছোট ছেলে মাসুদের সঙ্গে তাকে ঢাকাতে চলে যেতে হবে, দু'জনকে একসাথে খাওয়াতে পারবে না বড় ছেলে শিমুল।
পাথরের মূর্তির মত বসে আছে সোহেল বিশ্বাস।
-ওগো শুনছো, শিমুলের বাবা! তোমার ছোট ছেলে কি বলছে!
আমাকে নিয়ে যাবে। এই বয়সে তোমাকে ছেড়ে আমি এক মুহূর্ত থাকতে পারবো না।
রাহেলা বেগম কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলেন, একদিন আমায় শান্তনা দিয়ে বলেছিলে কষ্ট করো শিমুলের মা, একদিন সুখ আসবে। এ কেমন সুখ শিমুলের বাবা তুমি বলতে পারো?
যে সুখ তোমায় আমায় বিচ্ছেদ করে সেই সুখ আমি কখনো চাইনা শিমুলের বাবা! তুমি মাসুদকে আটকাও আমি ঢাকা গিয়ে থাকতে পারবো না। সংসার জীবনে অনেক কষ্ট করেছি তবুও সেই কষ্ট ভুলে গেছি তোমার জন্য, আজ এই শেষ বয়সে তোমায় ছেড়ে এক মুহূর্ত আমি থাকতে পারবো না।
বলেই কাঁদতে লাগলো রাহেলা বেগম।
-শিমুলের মা তুমি অমন করে কেঁদোনা। আজ যে আমি নিরুপায়, হাঁটতে পারি না, উইল চেয়ারে বসে থাকি আমার কি শক্তি আছে বলো তোমায় বেঁধে রাখার? বৃদ্ধ বয়সে নিজেদের সব সাধ আহ্লাদ বিসর্জন দিতে হয় গো শিমুলের মা! কিছুই আর নিজের মতো করে চলে না।
বলেই চোখের জল লুকানের চেষ্টা করলেন শিমুলের বাবা।
ছোট ছেলে মাসুদ এসে বলল, মা এত কাঁন্নার কি আছে বলতো? ঢাকায় কত সুন্দর ফ্ল্যাট নিয়েছি সেখানে তুমি সুখে শান্তিতে থাকতে পারবা, কোন কষ্ট তোমার হবে না। আর বাবার জন্য ভাইয়া তো আছে,মাঝেমাঝে এসে দেখা করে যাব।
-কাঁদবো কেন, আনন্দে চোখে পানি আসলো। কত বড় ফ্ল্যাটে থাকবো কত কি দেখবো!
শুধু তোর বাবাকে.......!
বলেই রুমে চলে গেলেন রাহেলা বেগম।
ভোর হলেই সূর্য উঠবে আকাশে। সকাল দশটায় গাড়ি। রাহেলা বেগমের মনের আকাশটায় সূর্য উঠবে না আজ, ঘন কালো মেঘ ঢেকে রেখেছে তার হৃদয়াঙ্গন। এই মেঘে হয়তো কখনো উঠবে তুমুল ঝড়, হয়তো আবার কখনো পড়বে বৃষ্টি। এভাবেই ঝড় বৃষ্টিতে হৃদয়টা ভিজে থাকবে একটি সূর্যতাপের আশায়।
-ওগো শুনছো শিমূলের বাবা! রাত তো অনেক হলো। একটু ঘুমাবে না?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, না গো ঘুম আসছে না আজ।
তুমি ঘুমিয়ে পরো, ভোরে তোমায় আবার উঠতে হবে।গাড়ি কয়টায় ছাড়বে?
-সকাল নয়টায় ছাড়বে। তুমি নিজের যত্ন নিও। যখন যা লাগবে বৌমাকে বলবে।
-রাহেলা! মানুষের জীবন কেন এমন হয় বলতে পারো?
-কখন মানুষের জীবনে কি ঘটে নিয়তি কখন কোথায় নিয়ে দাঁড় করায় কেউ বলতে পারেনা। আমরা কি ভেবেছিলাম এই বৃদ্ধ বয়সে আমাদের দু'জনকে দুই প্রান্তে থাকতে হবে!
-দুঃখ করো না শিমুলের মা। তুমি আর আমি নদীর এপার ওপার হয়ে জনমভর থাকবো দু'জন দু'জনের দিকে চেয়ে।
নদীর এই যে দু'কুল, চেয়ে থাকে মুখোমুখি! মিলবে না কভু! তারা তবুও যে কত সুখী। আশা ধরে রাখে শেষ দিনের সূর্য একত্রে দেখবে বলে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন