https://www.prothomalony.com/
6382
literature
এই সময়
কাজী আতীক
বিরূপ বৈরিতায় তৈরি হচ্ছে সময়ের ভিসেরা,
চলছে কুৎসিত কাটাছেঁড়া,
প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিজস্ব ধারনা কেবল,
অকথায় উচ্চারিত বীভৎস বিভাজন এই সময়ের,
বুঝে না বুঝে চলছে বিশ্লেষণ নিরীক্ষা, যেমন-
একদল মাইক্রোফোন হাতে লাইভে,
আরেক দল গণমাধ্যম, টকশো কিংবা ইউটিউবে,
অন্যরা ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যম সামাজিক যোগাযোগে
অসামাজিক, এক বৈহাসিক বাকবিতণ্ডা যেনো।
আহা! সময়টা- বেচারা!
বোধ বুদ্ধির বিকার গ্রন্থনা অবিরাম,
এখোন তাই চলমান অবক্ষয় কাল।
যা দেখে সময় কি থমকে দাঁড়িয়ে এখোন?
যেনো ভুলে গেছে সে তার নিজ অক্ষের পরিক্রমা।
মধ্য শ্রাবণের গান
রিজোয়ান মাহমুদ
এত বিষণ্নতা শ্রাবণ আকাশে
বাতাস মন্থনে উড়ে আসে দুটি পাতা
জলস্রোতে ভাসছে বিষণ্ণ কণা
তাদের কবোষ্ণ ঠোঁট লাগে বুকে
কোথাকার কোন নৃপতি সহসা এসে
মেঘের কৌপীন খুলে ধরেছে সঙ্গীত
জ্যান্ত শরমিন্দা জল স্পর্শ করেছে ভালোবাসার
সকল সরোদ।
এমন শ্রাবণ দিনে
বিদ্যাপতির মুকুটে দিয়েছি কামড় -
যার অর্থ শিহরণ
মেঘনাভি ছুঁয়ে মর্মমূলে যাওয়া জলের সারেঙ,
হারিয়ে ফেলেছি তাকে
জল অর্থ ভাজ খোলা আবেদন।
এমন-ই দিনে,
তোমার দুপায়ে রচনা করেছি খাম্বাজের গান
ফোঁটাগুলো গ্রীবার গম্বুজ বেয়ে নামে।
অভয়
দর্পণ কবীর
পুরুষঃ
আমি বয়ে যাবার গল্প বলি, সহে যাওয়ার
দুঃখের কথা বলি না। আমি তোমার উপেক্ষার সামনে
বিব্রত হলেও
দাঁড়িয়ে থাকি, এক পা টলি না!
আমি নদীর কথা বলি, চোখের জলের
বিন্দু বিসর্গ বলি না!
আমি তোমার চারপাশে ঘন অন্ধকার হয়েই ভালো আছি,
নক্ষত্র হয়ে জ্বলি না!
নারীঃ
আমার কোন গল্প নেই, গল্প হতে গিয়ে দেখি
গল্প কারো অল্প নেই। সবার হরেক গল্প আছে,
কাব্য আছে, গানও অনেক। আমি কী আর গল্প হব,
পাইনি ভেবে কোন কথাটা তোমায় ক’বো!
তোমার চোখের আর্তি দেখে আমি যে তাই আড়াল খুঁজি,
দেয়াল টানা পাষাণ আমি, সহজ করে নিজকে বুঝি।
আলো আমি খুঁজি নাতো, আঁধার যদি বিশ্বাসী হয়,
পথের পরে পথ পেরুবো, থাকব পাশে, দিচ্ছি অভয়!
ভালোবাসি ভালোবাসি
মৃগাঙক সিংহ
মন দরজায় একটা পাখি খুব যে এসে শিস বাজায়
পাখি ধরা সহজ যতো মনটাকে কি ততো ধরা যায়?
তোমার সীমায় দাঁড়িয়ে অসীম তুমি বাজাও বাঁশি
রুদ্ধ কপাট বলতে চায় ভালোবাসি ভালোবাসি।
ফুল ফোটানোর বেদনাও ভালোবাসি ভালোবাসি।
যৌক্তিক বলে কিছু নেই
রফিকুল ইসলাম
রোদ্র আর মেঘজল বিদ্রোহ মিছিল প্রতিরোধ
কালোত্তীর্ণ সীমাহীন শোক—
রোদে পুড়ছে মেঘেদের সজল চোখ।
অস্থির সময়— যৌক্তিক বলে কিছু নেই
প্রবাহমান স্রোতে চিরকাল—
মিথ্যা প্রলাপে শুদ্ধচারী প্রেম হারিয়েছে খেই।
ভোর হলে রাজপথে আর যায় না দেখা
কাকেদের তুমুল বিবাদ,
জলের অভাবে এখন দূষণ বাতাস
রাতেও সূর্য উঠে রাস্তায় হাঁটে বিদগ্ধ উন্মাদ।
আধাশত শ্রাবণ সিগারেটের ছাইয়ের মতো
পুড়ে গেছে হিংসার দাপটে,
রাতগুলো ঝলসে গেছে ঝাঁঝালো দুপুরের মতো
মাতৃহীন হাঁসের ছানাগুলো অপেক্ষায় থাকে
অভিশপ্ত জলশূন্য ফুরাতের ঘাটে।
আষাঢ় গেছে শ্রাবণ উত্তরিত আকাশ
আগুন জ্বালিয়ে দখল নিয়েছে উত্তাপ
মায়ের জরায়ু ছিঁড়ে শুকিয়েছে রক্তের স্রোত
শুষ্ক নদীও হারিয়েছে পথ—এ কোন অভিশাপ!
নির্বোধ মস্তিষ্কের ছন্দ
বিলকিস ঝর্ণা
প্রথম যেদিন আমি মাধবীলতা দেখি
তখন আমি আর ফুল ভালোবাসিনা
আমার চপ্পলের তলায় ফুটপাত শেষ হয় গলির মোড়ে।
হঠাৎ পিচঢালা শহুরের পথে ঘোড়ার ক্ষুরের ছন্দময়
শব্দে চমকে ওঠি!
সাদা ঘোড়ার টমটম গাড়িতে বসে –
পৃথিবী দেখবার সাধ আমার বহুদিনের।
ছন্দময় শব্দের উৎসে চোখ গেলে
আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি
ঘোড়ার ক্ষুরে মোড়া লোহার সঙ্গে
রাজপথের পাথরের ঘর্ষণের অগ্নি স্ফুলিঙ্গ!
আমি অদৃশ্য চোখে
ঘোড়ার ক্ষুরে লোহার খোলসের ভিতর
যন্ত্রণাকাতর পা আর নির্বোধ মস্তিষ্কের ছন্দ দেখতে থাকি।
আমার আর কখনও
সাদা ঘোড়ার টমটমে চড়ে পৃথিবী দেখবার সাধ হয়নি।
তারও অনেক আগেই বিষ্ণুদের কবিতার বইটি
আমার কাছ থেকে হারিয়ে গেছে।
মিথ্যে মুকুট
শরিফুজ্জামান পল
এসেছিলাম পুষ্প হাতে
গুণীজনদের সমাবেশে;
অকর্মা মূর্খ মানুষ আমি
মনুষত্ব পাইনি যে হাতে।
রজঃস্বলা মহান মানুষগণ
গর্ভবতী সংজ্ঞাহীন সুখে;
কলমের ডগায় মানবতা
বেহায়া লজ্জা নেই মুখে।
ভেঙেছে বিশ্বাস বিষাদ মন
শুনি অলীক অমৃতবাণী;
মিথ্যের দায় কেউ নেয় না
সবাই টানে স্বার্থের ঘানি।
অকালে যে গর্ভপাত ঘটেছে
সত্য সুচিন্তার,সুখের অরুচি;
মানবতা বিবেক আজ মৃত
জয় সর্বত্র মিথ্যা শিকারি।
আলোকিত ভোর
এম. আবু বকর সিদ্দিক
হৃদয়ের আঙ্গিনায় ভেসে বেড়ায় একটা আলোকিত ভোর
যেখানে ঘুমের অবসান ঘটে মিনারের সুরে। দু'চোখ মেলেই দেখা যায় ঝলমলে বসুন্ধরার হাসি।
যেখানে পাখপাখালির মধুর গানে মুখরিত হয় সাদা-কালো, ধনী-দরিদ্র সকল শ্রেণির মানুষ।
আর চিকচিকে রোদেরা শোনায় শান্তির পয়গাম।
রক্তখেকো শিয়ালেরা তওবা করে হৃদয় খামারে বপন করে মানবতার বীজ।
যেখানকার অধিবাসীরা দলমত ও বর্ণভেদ ভুলে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে। আপন অধিকারটুকু পেয়েই খুশির সুবাস ছড়ায়। কেউ লোলুপ দৃষ্টিতে তাকায় না অন্যের ধন-
মানের দিকে।
ফুলের সুবাস ছড়ানো সেই ভোরের বাস্তব রূপ দেখাই আমার প্রত্যাশা। সেই ভোরের জন্য যদি সাগরের অথৈ জলরাশি সেচে জলশুন্য করতে হয় অথবা ঘন মেঘ ভেদ করে দূর নীলিমায় পাড়ি দিতে হয়, তবুও আমি সেই পথেরই যাত্রী।
ভেজা আংটি
মোঃ আব্দুর রহমান
টপ করে এক ফোঁটা কদমের জল ঝরে পড়লো আংটিটার উপরে। সঙ্গে সঙ্গে ওড়নাটা দিয়ে মুছতে শুরু করল শিউলি। আর মুখে ইশ! ইশ! শব্দে আফসোসের করুণ সুর বেজে উঠল। আহারে! যেন অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেলো...। এতো বড় ক্ষতিটা সে মানতেই পারছেন না। তবে কাউকে কিছু বলতেও পারছে না। কারণ যতই অপরাধ করুক, আষাঢ়ে কদম ফুল বলে কথা। যেটা তার আবার খুব প্রিয়, তার উপরতো আর প্রতিশোধ নেওয়া চলে না।
তবে কষ্টটা এক জায়গায় শিউলির। এই আংটি তার প্রাণেশ্বর শিমুলের পরিয়ে দেওয়া। পাঁচ বছরের প্রেমের স্বীকৃতির টিকিট আর কী। যেটা পারিবারিক ভাবেই পাওয়া। তবে এর জন্য করতে হয়েছে অনেক সংগ্রাম আর মান অভিমান। তার ফলেই মিলেছে পরিবারের ইতিবাচক মতামত। এবার অবশ্য কদম ফুলের দিকে তাকিয়ে ওড়নায় মুখ ঢেকে হাসতে শুরু করল শিউলি। কারণ আষাঢ় এসেছে মানেই শ্রাবণও আসবে। আর শ্রাবণ এলেইতো ধুমধাম করে বিয়ে হবে শিমুল এবং শিউলির। কদম জলের ফোঁটাটা হয়তো সেই খবরটাই জানিয়ে দিলো শিউলিকে আরো একবার।
যাহোক সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিল শিমুলকে। ওপাড়ে ফোনটা তুললো শিমুল। কেমন আছো জান?
ভালোই আছি।
আর কিন্তু মাত্র এক মাস আছে।
তাই নাকি!
হ্যাঁ, আর জানো খবরটা জানালো কে? জানিয়েছে আষাঢ়ের কদম।
এবার দুজনেই নানান কথায় আর কল্পনা-জল্পনায় হেসে কুটিকুটি হতে থাকলো। পাশ থেকে শিউলির মা মেয়ের এমন হাসি মাখা মুহুর্তটা দেখে, আল্লাহর কাছে দু'হাত তুলে দোয়া করলো-"ওদেরকে সুখী করো খোদা।"
কথায় কথায় একটু কেশে উঠলো শিমুল। সঙ্গে সঙ্গে শিউলি জিজ্ঞেস করলো, তুমি কাশছো কেন? তোমার কী হয়েছে? তুমি ডাক্তার দেখাওনি? ওষুধ খাওনি?
এতোগুলি প্রশ্ন একত্রে শুনে কোনটা রেখে কোনটার উত্তর দিবে কুলকিনারা না পেয়ে অবশেষে শিমুল বললো, আচ্ছা, কী আশ্চর্য্! তুমি এতোটা সিরিয়াস হচ্ছো কেন? একটু কাশিইতো হয়েছে...।
মিথ্যা বলো না। বলো তোমার জ্বর হয়নি?
ঠিক আছে বাদ দাও আমি ডাক্তার দেখিয়ে নেবো। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে এবারের মতো ফোনটা রাখলো শিমুল।
শিমুল ঢাকায় ব্যাংকে চাকুরি করে। আর শিউলি সবেমাত্র অনার্স শেষ করলো। কথা হলো বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে শিউলিকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসবে শিমুল। শিউলি ভারী মিস্টি মেয়ে, সাংসারিক এবং সর্বোপরি কথা হলো ওরা দু'জন দু'জনকে খুব ভালোবাসে। বাড়িও ওদের একই গ্রামে। ভালোবাসাটাই ওদের সুখী হওয়ার বড় পুঁজি এবং দলিল।
এদিকে দেখতে দেখতে আষাঢ় মাসের শেষ রাত। কাল ভোরেই বাড়ি পৌঁছাবে শিমুল। এমন কী কালকেই গায়ে হলুদ; তারপরের দিন বিয়ে। ভাবতেই কেমন যেন লাগছে শিউলির। তবে সমস্যা হলো একটাই। গত এক সপ্তাহ যাবৎ সে শিমুলের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। এদিকে আশার কথা হলো, তার বাবা তাকে জানিয়েছে শিমুল খুব কাজে ব্যস্ত আছে; তবে সময়মতো সে ঠিক আসবে।
প্রতিদিন ভোরবেলা মোড়গের ডাকে ঘুম ভাঙলেও আজ শিউলির ঘুম ভাঙলো মোবাইল ফোনের শব্দে। ফোনটা বোঝা গেল শিমুলের বাবা করেছে। কিন্তু, এ কী! হঠাৎ শিমুলের বাবা কথা বলতে পারছে না! গলা কাঁপছে, কি সব বলছে!
থরথর করে একসময় শিউলি কেঁদে উঠলো! বলল, কী হয়েছিল? ডেঙ্গু জ্বর? এ্যাম্বুলেন্সটা বিকালে পৌছাবে? জানাজা হবে বিকালে?
শিউলি কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। এক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ নেই শিমুলের সাথে। তাই শিমুলের সেই জ্বর এবং কাশির কথা, ওষুধ না খাওয়ার কথা জানা হলো না। আর সেসব অবহেলা থেকেই ডেঙ্গু! তারপর এ্যাম্বুলেন্স এবং...!
এসব ভাবতে ভাবতেই শিউলির চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরতে লাগলো আংটিটার উপরে। তবে আজ আর ভেজা আংটিটা মোছার কোন আগ্রহই দেখালো না শিউলি। আষাঢ়টা পেরিয়ে শ্রাবনের প্রথম সকালে শুধু নিশ্চুপ ভাবে বসে রইলো...।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন