https://www.prothomalony.com/
6345
opinion
অর্থনীতির সংকট ক্রমশ ঘণীভুত হচ্ছে
দেশের চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার বাইরেও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আমাদের উদ্বিগ্ন করে রেখেছে। আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত নিয়ে যা বলা হয়, প্রকৃত চিত্র তা থেকে ভিন্ন। আইএমএফ সরকারের দেওয়া হিসাব মানেনি। আইএমএফ এর দেওয়া পদ্ধতি অনুযায়ী একটা হিসাব আমরা পাই, যা সরকারের দেওয়া হিসাব থেকে অনেক কম।
দৃশ্যমান এ মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকট। পুরো অর্থনীতিতে টানাপোড়েন চলছে। রাজনীতির চেয়ে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হচ্ছে। এসব নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে আগামী দিনে এটি আরও বেশি বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। আর এ সংকটের জন্য বড় অংশ দায়ী দেশ থেকে অর্থ পাচার, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং নিত্যপণ্যের সিন্ডিকেট। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলেই এই সংকট এড়ানো যেত।
বর্তমান সরকারের সামনে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মূল্যস্ফীতি। জিনিসপত্রের দাম এমনভাবে বাড়ছে, তাতে সাধারণ মানুষের টিকে থাকা কঠিন। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ রেমিট্যান্স বাড়ছে না। প্রতিবছর বিদেশে অনেক লোক যাচ্ছে, কিন্তু ওইভাবে রেমিট্যান্স আসছে না। তৃতীয় বিষয় হলো রিজার্ভ বাড়ছে না। ক্রমেই কমে আসছে। চতুর্থ বিষয় হলো এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ আরও চ্যালেঞ্জে পড়বে। বর্তমান অবস্থা ভালো নয়। এক্ষেত্রে বড় অংশই দায়ী বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। অর্থ পাচার বন্ধ হলে ডলার কিছুটা কমত। কিন্তু এটি বন্ধ করা কঠিন। কারণ, এর সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। তবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির অভিঘাত থেকে গরিব মানুষকে রক্ষা করা যেত।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতির চেয়ে অর্থনৈতিক সংকট বড় হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থ পাচার ও সিন্ডিকেট-এই তিন কারণে পুরো অর্থনীতি বেসামাল পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে। বর্তমানে এক মার্কিন ডলার কিনতে ১১৮ টাকার বেশি লাগছে। এটি খুবই উদ্বেগজনক। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে। কিন্তু এসব ঋণ নিয়ে রক্তক্ষরণে কিছুটা প্রলেপ দেওয়া যায়। সমস্যার সমাধান হয় না। কারণ, অর্থনীতিতে সমস্যা বিশাল। এটি সমাধানের দুটি উপায় ছিল। প্রথমত, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং দ্বিতীয়ত, সিন্ডিকেট ভেঙে মানুষের আস্থা বাড়ানো। এর কোনো কিছু হচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতি দিনদিন খারাপের দিকে যাচ্ছে।
বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়াই একেক সময় একেক পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরো আর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, জুন মাসের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.৭৪ শতাংশ। রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারে। রপ্তানি আয় কিছুটা বাড়লেও প্রবাসী আয় কমেছে।গত বছর এই সময়ে ডলার ৯৫ টাকায় লেনদেন হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১১০ টাকা দরে। সব ধরনের আমদানি প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে।
বহুদিন ধরে অর্থনীতিতে নানারকম যে নীতি নেয়া হয়েছে, তার ফলে আস্তে আস্তে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। কোভিডের সময় সেসব ঝুঁকি প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। এরপর সেটা সমাধানের কোন উদ্যোগ না নেয়ায় ক্রমাগত বেড়ে এখন বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে কঠোর নীতির অভাবে ব্যাংকিং খাত নাজুক হয়ে পড়েছে। খেলাপি ঋণ বেড়েছে। নিয়মনীতি না মেনে কিছু গোষ্ঠীর কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে, ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতে চরম অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি হয়েছে। অনিয়ম দেখার পরেও এক্ষেত্রে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
ডলার সংকটের কারণে একদিকে যেমন রিজার্ভ কমতে শুরু করে, পাশাপাশি কড়াকড়ির কারণে কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রপ্তানি খাতে। আবার রপ্তানি করা হলেও সেই অনুযায়ী ডলার দেশে না এসে পাচার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেটা শনাক্ত করেও কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
তবে বাংলাদেশের সরকার এমনটা মনে করছে না। সরকারের মতে, অর্থনীতিতে কিছুটা সমস্যা বা সংকট থাকতে পারে, কিন্তু সেগুলো সমাধানেও নানা ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
অর্থনীতির সংকট সহজে দূর হবে না। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ এবং ডলার বাজারের অস্থিরতা সমস্যার আশু সমাধানও দেখা যাচ্ছে না; বরং যেভাবে জোড়াতালি দিয়ে সমন্বয়হীনভাবে সমস্যাগুলো সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তাতে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কাই বেশি। প্রয়োজন ছিল সার্বিক অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানের জন্য একটি সমন্বিত কৌশল নির্ধারণের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, যাতে আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়।
নৈতিকতা আমরা ক্রমাগত বিসর্জন দিয়ে যাচ্ছি। অর্থনীতির অবশ্যই একটা নৈতিক ভিত্তি থাকতে হবে। গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা তো নৈতিকতা হতে পারে না। জনস্বার্থ রক্ষা হলো নৈতিকতা। আমাদের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগতভাবে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। তাদের যে দায়দায়িত্ব, সেটা তারা সঠিকভাবে পালন করতে পারছে না। এটা কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই হচ্ছে।
আমাদের মতো দেশে নির্বাচনের আগে অনিশ্চয়তা অনেক বেশি হয়। এটা বাস্তবতা। এমন সময়ে বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময় নেন। আমার মনে হয়, আগামী দিনগুলোতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্থবিরতা দেখা দেবে। ছয় মাস বা কাছাকাছি সময় আমাদের জন্য ক্রিটিক্যাল হবে। পরিস্থিতি যদি আমরা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে না রাখতে পারি, যদি খারাপের দিকে যায়, তাহলে আরও দুর্যোগের মধ্যে পড়ে যাব।
এখনই চিন্তা করতে হবে, আমরা অর্থনীতিকে কতটা সচল রাখতে সক্ষম হবে। স্বল্পমেয়াদি একটা দৃষ্টিভঙ্গি নিতে হবে। দেখতে হবে এ মুহূর্তে কী করণীয়। অর্থনীতিতে চাপ রয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ দুর্ভোগের মধ্যে আছে। সবকিছু মিলিয়ে একটা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে আমরা রয়েছি। এটা যাতে আরও খারাপের দিকে না যায়, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের অনিশ্চয়তা অনেক বেশি। এটা কাটিয়ে ওঠার জন্য শক্তি সঞ্চয়ের এখনই সময়।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন