https://www.prothomalony.com/
6293
literature
মনোলোক
তমিজ উদ্দীন লোদী
তোমার মনোলোকে কার যে প্রভাব
ধ্রুপদী সঙ্গীত নাকি সাহিত্য
ইউরিপিদিস, হোমার নাকি ভার্জিল
অথচ দুয়ারে এঁটে রেখেছ খিল !
উপপ্লবের মতো তুমি দৌড়াচ্ছ ফানুসে
ভুলে যাচ্ছ অস্থিত্বের অভিজ্ঞান
স্বপ্নাধিকার, মানুষের নাভিশ্বাস
শুধু দেখছ আত্মবিম্ব
স্রোতবাহী নদী নয় দেখছ আগাড়
কিছুতেই লাগছে না গায়ে গ্রামীণযাপনের তাপ
জলাশয় উপচে পড়ছে জলে
তুমি দেখছ পদ্মের বাহার!
কাকন রেজার দুই কাব্য
ঠিক ততোটা নই
ঠিক ততোটা নই পাথর, যতটুকু ভাবো
ফিরে ফিরে আসি রাত, অন্ধকার খুব করে পাবো
২
ফিরে যেতে চাও, যাও তবে
সমুদ্র ফিরে যায়, সৈকত থাকে অনুভবে
৩
না চাও, পাবে না ভেবে ঠিক
তুমি তো জানো না, হারানো হলো মৌলিক
৪
হারিয়েছে অন্ধকারে কাহার নাকফুল
আমি নাকটাকে খুঁজি, বাকোয়াজ বাকি বিলকুল
৫
নির্বাণ ধরে রাখো মুঠোর ভেতর, খুলো না ভুলে
আপাতত ঝড় দেখি এবং মৃত্যু তোমার চুলে
বলবো কাকে
বুকের ভেতর হচ্ছে ব্যথা বলবো কাকে
অনর্থকে প্রশ্ন খোঁজে জীবনটাকে...
ছবিগুলো উঠছে ভেসে চোখের দেয়াল
সর্বভূতে দেখানোটা ছবির খেয়াল...
অন্ত্যমিলে নামের সাথে উদ্ধৃতি দেই
যাচ্ছে উড়ে ধূলোখেলা খেই হারাতেই
আর কি হবে নতুন করে আবার চেনা
শোধ করবো বাড়ছে কেবল নতুন দেনা
নিলাম কবে বুকের ভেতর হৃদয় থাকে
ব্যথায় ব্যথায় টিকে আছে দুর্বিপাকে
রিলেশন
স্বপ্ন কুমার
কাগজের সাথে কলমের এক প্রকার রিলেশন থাকে
এক প্রকার রিলেশন থাকে সুঁইয়ের সাথে সুতোর,
মাছের সাথে টোপের
কাঠের সাথে লোহার কিংবা
দগদগে ক্ষতের সাথে যেমন—মলমের
অতি সাবধানে পা ফেলতে গিয়েও—
কতোজন যে পিছলে পড়ে যায় !
আঙ্গুলের ফাঁকে-ফাঁকে শুন্যতার তরজমা যারা করে
তারা হয়তো জানেই না যে চা থেকে কফিতে যেতে হলেও
কিছুটা সময় অন্তত লাগে-ই
আর পাদটিকায়ও লেখা হয়ে থাকে—কতো যে অন্ধকার
অধুনা, আপেল বনের দিকে ঝুলে আছে
যে সমস্ত সম্পুরক হাওয়া—
বস্তুতঃ তারাও মুখরা ছিলো কোনো একদিন
আর এই যে ছায়া-ছায়া রোদের ভাঁজে এতো নীরবতা
তা-ও যেনো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা— আজ
তদুপরি, কতিপয় লোক রোদ-চশমা-ই পরে থাকে
(অথচ বাইরে যখন ভিষণ অন্ধকার)
তদুপরি, কতিপয় লোক শূন্যতায় কান পাতে
অথচ বুঝেনা যে
উদ্ভুত পরিস্থিতি সামলাতে যারা ব্যস্ত
পরিশেষে তাদেরও সইতে হয়—মৃদু গুঞ্জরণ।
আমার কষ্টের আকাশ
সাহানুকা হাসান শিখা
পিজি হাসপাতাল তিন’শো এক নাম্বার কেবিন, ঝাপসা চোখে তাকাই, সাদা ড্রেস পরা নার্স মর্জিনা বলল, কে তুমি? আমি কিছু না বলে শুধু তাকিয়ে রইলাম।
মর্জিনা চিনতে পারল। বলল, মেডাম আমার সাথে আসেন, আপনাকে নিয়ে এক জায়গায় যাবো। বললাম, কোথায় যাবো? আচ্ছা চলো! খুব সাবধানে ধীর পায়ে তার সাথে এগুলাম। এলাম পাচঁতলায়, ওয়ার্ড ভর্তি নবজাতক শিশু। কি মধুর কান্নার সুর তাদের। মর্জিনা বলল, কোনটা আপনার বাচ্চা?
বললাম, জানিনা তো!
সে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এলো। কোলে ফুটেফুটে চাঁদের মতো একটি শিশু। বলল, এটা আপনার মেয়ে, দেখেন পরীর মতো।
অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলাম। সে আমার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, বলছিল-মা একটু দুধ দাও, বড্ড তৃষ্ণা পেয়েছে। দুধ দিলাম। তারপর দুধ মুখে নিয়ে চুপ করে ঘুমিয়ে পড়ল বাচ্চা। মর্জিনা তাকে আবারো নিয়ে গেলো।
মর্জিনার সাথে ফিরে এলাম কেবিনে। পরদিন বললাম, আমাকে নিয়ে চলো ওর কাছে। সে বলল, আজ না কাল নিয়ে যাবো। সেদিন আবারো গেলাম, তবে পাঁচতলায় নয়, তিন তলায়। সুন্দর একটি বড় বেলকনি, একটু বসে হাফ ছাড়লাম। বললাম চলো! এবার মর্জিনা আমাকে একেবারে ছাদে নিয়ে গেল। বললাম, এখানে কেন! আমার বাচ্চা কোথায়?
বিশাল আকাশের দিকে ইশারা করে সে বললো, ঐ যে ওখানে। বুঝতে পারলাম না কোন তারাটি আমার রাজকন্যা! আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে একটি তারা। আর বলছে-মা মা এই তো আমি, তোমার রাজকন্যা।
তারপর বুঝলাম, এটাই আমার কষ্টের নীল আকাশ।
তোফায়েল তফাজ্জল
নজর কাড়া
নজর কাড়ায় ছাতা মেলা স্বীকৃতিও কি পকেটে
উলটো দিকের বৃষ্টিতে লড়বে কিছুক্ষণ
বা সাড়া জাগানো ঘুম কেড়ে নেয়া কর্মতৎপরতা?
তাহলে চলার পথে কেন পাখনা গজানো পেখম
যেনো ছুঁয়ে ফেলেছো আকাশ, পৌঁছে গেছো নিশানায় ?
তুমি ফুল, সুবাস ছড়াচ্ছো আশেপাশে, ঘ্রাণে
ক'টি নাক খুশি, তাই? রাখো কি খবর
কতো প্রজাপতি হয়ে উড়তে চাওয়া পুষ্প
কাঙ্ক্ষিত হাতের স্পর্শ দূরে থাক, ফুটতে না ফুটতেই
পড়ে কীটের কবলে, পেয়ে বসে হলদে হওয়া রোগে?
কতো অলি বাগান না পেয়ে
স্থানান্তর হয়, বেঁচে থাকার তাগিদে খোঁজে নতুন ঠিকানা?
সেখানে তুমি তো নস্যি, বালিকণারূপে স্থান পাওয়া
চৌদ্দ পুরুষের ভাগ্য!
তাই বলি, ঊর্ধে না উঠিয়ে নাক নমিতই রাখো,
তেল দাও নিজের চরকায়, তাকাও মাটির দিকে,
মিলবে সহচর, হয়তো তিল ঠাঁইয়ের জায়গাও।
নইলে দেখবে শেষে সর্ষেফুল।
ঊন থেকে শূন্য
অনন্য আমিনুল
শূন্য থেকে পূর্ণতার তুলতুলে বহতা নদী
আদুরে রঙিন ভেলায় চড়ে নয় এর ঘাটে চলা
বয়সের মৃদু পা। নয় থেকে দশ, জীবন থেকে
ক্রমাগত রস শুষে হয় বয়সের ভরানি।
ঊনিশ থেকে কুড়ি যৌবনে ফুটন্ত কুড়িভরা
বসন্ত ছুঁতে ছুটন্ত ঋতুকাল। চল্লিশ বসন্ত আসে
ঊনচল্লিশ বছর পেরিয়ে, হাজারো দিন-রাতের
বারান্দা-উঠান আর মেঠোপথ মাড়িয়ে।
পঞ্চাশের দিক চেয়ে ঊনপঞ্চাশের মাইলপথ
মাপতে থাকা ঊনজীবনের খোলা বয়োঃদৃষ্টি।
ঊনষাটের কবাট খুলে ষাট আসে। পাপড়ি
ঝরতে ঝরতে নেড়া হতে থাকে ফাগুনের ডালপালা।
উনসপ্ততি-সত্তরের ফুল ঝরা ডালের ভারটানা
উলটো হাওয়ার পাল নেতিয়ে আসে
উনআশির উঠানের দিকে। একদিন
ঊনআশি থেকে আসি আসি করে নব্বইয়ের
বাধ টপকে শ-এর পূর্ণ ঘাট পেতে মাঝপথে
দীর্ঘ অচেনা হয় চলমান ভেলা।
শূন্য নদী এক পার থেকে পূর্ণতার দিকে ছুটতে ছুটতে
কখনও মাঝপথে বেমালুম ঢেউয়ে শেষ বেলার
সীমানা ফুঁড়ে ভেলা ঢুকে যায় অফুরন্ত রাতের গহীনে।
ঊন পূর্ণতা থেকে ঊণ ঘড়া
শূন্যতার ঘাটে ভেড়ে বয়সের অনেক বহতা নদী।
না ডাঙার, না জলের
লুনা রাহনুমা
এক, দুই, তিন.. চল্লিশ, একচল্লিশ..তিপান্ন..ছাপ্পান্ন… খিলখিল করে হাসছে দশ বছরের তারান্নুম। কাঠের ঘরের সামনের বাঁশের পাটাতন থেকে সাগরের লবন পানিতে ঝাঁপ দিচ্ছে সে। বাঁশের আরেকপাশে পানিতে পা ঝুলিয়ে বসে ঝাঁপ গুনছে কাছাকাছি বয়সের মুপিতি।
-এইবার আমি পানির অনেক নিচে যাব। তোর জন্য একটা সুন্দর পাথর খুঁজে আনব।
-চল আমিও যাই তোর সঙ্গে। গতকাল কয়েকটি সবুজ পাথর দেখেছি দক্ষিণের শ্যাওলার আড়ালে।
ঝপাং করে একটা শব্দ হলো। ওরা দুজনেই একসঙ্গে তলিয়ে গেছে সাগরের নিচে। জিন কিংবা মৎসকুমারী নয়, ওরা মানবশিশু। জন্ম থেকেই জলের কাছাকাছি কাটছে জীবন। ওদের বাবা, মা, দাদা, নানা, সবাই এই জলের উপরেই জন্ম আর জলের উপর বসবাস। সামুদ্রিক যাযাবর হিসেবে পরিচিত বাজাউ উপজাতি সম্প্রদায়ের দুই বালিকা ওরা। একটু আগে জলের তলে হারিয়ে গিয়েছিল মাছের মতো, প্রায় ছয় সাত মিনিট পর আবার ভেসে উঠতে দেখা গেল ওদের মুখ।
পানিতে সাঁতার কাটতে কাটতে তারান্নুম বলে, আরেকটু পরে আব্বা মাছ ধরতে যাবে। আমার ইচ্ছে করে আব্বার সঙ্গে যাই। সাগরের কোন গভীরে চলে যায় আব্বা! ইস, ওখানে মনে হয় আরো সুন্দর সুন্দর পাথর আর প্রবাল পাওয়া যায়।
-অত গভীরে নামতে হলে তোকে আরো বড় হতে হবে। এখনও আমি সাত মিনিটের বেশি অক্সিজেন ছাড়া থাকতে পারি না। মুপিতি বলে।
-আমার আব্বা পনের মিনিট থাকতে পারে পানির নিচে।
কথা শেষ করে আবার সাগরের নীল জলে অদৃশ্য হয়ে গেল তারান্নুম। তারান্নুমকে খুঁজতে মুপিতিও ডুব দেয়। দুপুরের খাওয়ার আগে পর্যন্ত ওদের এমন খেলা চলতে থাকবে। রোজই চলে। তারান্নুম, মুপিতির মতো আরো অনেকগুলো ছেলে-মেয়েও যুক্ত হয়েছে ওদের সঙ্গে। প্রতিটি দিন প্রায় এইভাবেই কাটে ওদের। বাজাউ-লাউট ওরা, মাটির জীবন নেই ওদের। ওদের কোনও দেশ নেই, ভূমি নেই। ওদের জীবন কাটে উপসাগরের জলে জলে। তটের কাছাকাছি, কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট তটে না। ওরা কোনও দেশের নাগরিক না। ওরা শুধুই ভাসমান এক সম্প্রদায়। সমুদ্রের নোনা জলের মতো লবনাক্ত ওদের মনুষ্য-জীবন।
তারান্নুমের মা রাসিনী বিবি চুলায় রান্না বসিয়েছে। চুলার কাছ থেকে উঠে এসে কথা বলতে বলতে স্বামীর কোমরে কয়েকটি ইট বেঁধে দেন তিনি। বলেন, তারান্নুমের জ্বর এসেছিল আবার গতকাল রাতে। গা কাঁপিয়ে জ্বর। কিন্তু সকাল থেকে ভালো মনে হচ্ছে। মেয়েটা এখন আবার গিয়ে পানিতে নেমেছে!
তারান্নুমের বাবা শিয়াং আব্বাস মেয়ের সামান্য জ্বর-জারিকে প্রশ্রয় দেন না। বলেন, নামুক পানিতে। খাটে শুয়ে না থেকে খেলা-টেলা করলেই বরং শরীর ভালো থাকবে। দেও, আরেকটা ইট দাও বামদিকে। ওজন না বাড়লে সমুদ্রের গভীরে নামতে চায় না শরীর। যত গভীরে নামতে পারব, তত বেশি মাছ ধরতে পারব।
ইট বাধা শেষ করে রাসিনী স্বামীর দিকে এগিয়ে দেন কাঠ ও কাচের টুকরো দিয়ে তৈরি করা বিশেষ জল-নিরোধক চশমাটি। আর সাগরে নামার আগে এগিয়ে দেন কাঠ দিয়ে বানানো বন্দুক। বিশেষ পদ্ধতিতে বানানো এই বন্দুক দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে তির ছুঁড়ে মাছ মারা যায়। বাইরে সূর্য এতক্ষণে মাথার ঠিক বরাবর উঠে এসেছে। সাগর থেকে মাছ ধরে শিয়াং আব্বাস সোজা উপরে ভেসে উঠলেই স্ত্রী রাসিনী মাছগুলো নিয়ে তাদের নৌকা লেপা-লেপাতে করে চলে যাবে কাছের দ্বীপে। তটের কাছে গিয়ে মাছ নিয়ে রাসিনীকে লেপা-লেপাতেই বসে থাকতে হবে। ডাঙায় নামতে পারবে না স্বাচ্ছন্দে। মাটিতে বসবাসকারী মানুষেরা এইভাবে আধিপত্য বজায় রাখে পানিতে বসবাস করা মানুষের উপর। মাছ কেনা আর অর্থ প্রদান করা ছাড়া আর কোনও সম্পর্ক হয় না এই দুই মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে।
-তারান্নুমের আব্বা, মেয়েটার যদি রাতে আবার জ্বর আসে?
শেষবারের মতো স্বামীকে কিছু বলতে চান রাসিনী বিবি। সমুদ্রে লাফ দেয়ার আগে আব্বাস বলেন, সে দেখা যাবে। জলের কন্যা জলেই সুস্থ হবে, বেশি চিন্তা করো না।
স্বামী জলের নিচে অদৃশ্য হয়ে গেছে। রাসিনী ভাবেন, সাহস করে ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে আসার কথা বলে লাভ আছে কিছু? সবাই তাদেরকে সমুদ্র জিপসি বলে ডাকে। ফিলিপাইনের উপকূলবর্তী জল সীমানায় তাদের আখড়ার শত মানুষ একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ডাঙায় ওঠে না। পুলিশের মার, মানুষের তিরস্কার, কুকুরের উপদ্রব ছাড়াও অনভ্যাসের ফলে এই মানুষগুলো এখন আর জল ছাড়া থাকতে পারে না। বংশ পরম্পরায় তাদের সন্তান সন্ততিরাও মৃত্তিকার ঘাসের চেয়ে জলের শ্যাওলাতেই ভাসতে অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাছাড়া, যেহেতু ওদের কাজগপত্র নেই, তাই পুলিশ ধরলে বিনা বিচারে জেলে ভরে রাখে।
সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করেছে। রাত পর্যন্ত আশেপাশের নারী ও পুরুষেরা সবাই মিলে একটির সঙ্গে লাগানো আরেকটি ঘরের ছাউনির ভেতরে জড়সড় হয়ে বসে বৃষ্টির হাত থেকে নিজেকে বাঁচায়। তেলের প্রদীপ জ্বেলে রাসিনী বসে আছেন তারান্নুমের মাথার কাছে। টিনের ছাদ আর বাঁশের বেড়া দেয়া ঘরগুলো কোনোদিন ইলেকট্রিক বিদ্যুতের ঝলক দেখেনি। সামুদ্রিক মাছের তেল থেকে প্রজ্বলিত মশাল ওদের অন্ধকার রাতের একমাত্র দিশারী। ঘরের এককোণে পাতলা একটা চাদরের উপর শুয়ে বিলাপ বকছে তারান্নুম। চুলার আগুনের মতো গনগনে উত্তাপ ওর শরীরে। মাথায় জলপট্টি দিতে দিতে মেয়ের সঙ্গে কথা বলেন রাসিনী। জ্বর এত বাড়েনি আগে। মেয়েকে ঘুম পড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি।
-সেই গল্পটা আবার বলো আম্মা। বিড়বিড় করে বলে তারান্নুম।
তারান্নুমের মতো বাজাউদের আর সব বাচ্চারাও এই একটি গল্প শুনতে ভীষণ ভালোবাসে। এটি তাদের জলজ জীবনের ইতিবৃত্তের সত্যি কাহিনী। মেয়ের মাথার জলপট্টি বদলাতে বদলাতে গল্প বলতে আরম্ভ করেন রাসিনী বিবি:
-হাজার বছর আগের কথা। জোহর রাজ্যের রাজকন্যা ছিলেন দায়াং আয়েশা। আয়েশাকে বিবাহ করতে আগ্রহী ছিলেন ব্রুনেইয়ের তৎকালীন সুলতান। কিন্তু জোহর রাজা তার কন্যার বিবাহ ঠিক করেন সুলু রাজ্যের রাজার সঙ্গে। আর রাজার ইচ্ছে অনুযায়ী রাজকন্যার বিয়ের নৌ-বহর নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল সমুদ্রপথে। রাজকন্যাকে পাহারা দেয়ার দায়িত্বে ছিল বাজাউ নামের উপজাতি যারা সমুদ্রপথকে চিনত তাদের হাতের তালুর মতোই পরিষ্কারভাবে। ব্রুনেইয়ের রাজা প্রত্যাখ্যাত হয়ে অপমানের প্রতিশোধ নেবার জন্য আরও বড় নৌ-বহর নিয়ে আক্রমন করেন বিয়ের-বহরকে। গভীর সমুদ্রে বাজাউদের সাথে তুমুল লড়াইয়ের পর তিনি ছিনিয়ে নিয়ে যান জোহর রাজের রাজকন্যাকে এবং দেশে ফিরেই রাজকন্যাকে বিয়ে করেন। এদিকে রাজকন্যাকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় কয়েক শত বাজাউ এবং তাদের পরিবার পড়ে গেল মহা বিপাকে। কারণ তারা যদি দেশে ফিরে আসে তাহলে রাজকন্যাকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে জোহর রাজা হত্যা করবেন তাদের। প্রাণের ভয়ে বাজাউরা আর দেশে ফিরতে পারেনি। চিরদিনের জন্য স্থলভাগের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয় তাদের। আর সাগরে ভেসে থাকতে থাকতে সমুদ্র হয়ে ওঠে তাদের ঘর। প্রথমে তারা শুধু নৌকাতেই বসবাস করত। পরবর্তীতে তাদেরকে উপকূলের কাছাকাছি অস্থায়ী কিছু পল্লী তৈরী করে দেয়া হয়। আর এখনও পর্যন্ত বাজাউরা বংশ-পরম্পরায় এভাবেই বেঁচে আছে। না ডাঙায়, না জলে।
রাসিনী বিবির গল্প চলতে থাকে আরও অনেকক্ষণ পর্যন্ত। অনেক আগেই তারান্নুম চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। তারান্নুমকে ঘিরে থাকা আরও অনেকগুলো শিশুও ঢুলুঢুলু চোখে গল্প শুনছে। কেউকেউ বাঁশের ফাঁকা মেঝেতে নেতিয়ে পড়েছে ঘুমের ঘোরে। ঘরের ফাঁকা মেঝের নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সাগরের সবুজাভ নীল জল। মেয়ের কপালে হাত ছুঁয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন রাসিনী বিবি। জ্বর নেমেছে। মায়ের মন বলছে, আজকের এই রাতটুকু পার হলেই তার মেয়ে ঠিক উঠে দাঁড়াবে। আবার সাঁতার কাটতে নামবে সমুদ্রে। চোখ বন্ধ করে রাসিনা বিবি স্বামীর কথা মনে করেন, জলের উপরে জন্ম হয়েছে যার, জলের উপরেই বেঁচে থাকবে সে সুস্থ সবল শরীরে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন