https://www.prothomalony.com/

6133

literature

সাহিত্য

উত্তরের জনপদ

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৩ ১১:১৯

দেশ একটি মানচিত্র, যা নির্দিষ্ট ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠানকে ধারণ করে। সেই মাতৃভূমি ছেড়ে যখন কেউ জীবিকার আশায় ভিন্ন দেশে বসবাস শুরু করে, তখন তাকে ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতোই মনে হয়। নিত্যকার সংগ্রামের সাথে লড়তে গিয়ে কখনোই বিদেশকে আপন ভাবতে পারে না। মন পড়ে থাকে স্বদেশে পরিবার পরিজনের সাথে। দুই ধারার বিপরীত স্রোতে ভাসতে ভাসতে প্রতিমুহূর্তে মানুষ এগিয়ে চলে সামনের দিকে। ফেলে আসা জীবনের সাথে বর্তমান জীবনের সাপলুডু খেলায় প্রবাসীরা হার মেনে নিয়ে অনেক সময় জিতে যায়। এইরকম টানাপোড়েনের দুটো গল্প রয়েছে উত্তরের জনপদে। প্রবাশ জীবনের সত্য কাহিনী। গল্পগুলো সাজিয়েছেন ফরিদা ইয়াসমিন এবং সোহানা নাজনীন।
 

একটি মানচিত্রের ছবি

ওদের কারো নাম মোহাম্মদ, কারো নাম মোস্তফা, কারো নাম আব্দুল্লাহ। ওরা সবাই মুসলিম, এসেছে আফ্রিকা থেকে। কেউ ঘানা, কেউ নাইজেরিয়া কেউবা সুদান থেকে। ওরা সবাই খেটে খাওয়া মানুষ। ওরা কাজ করে পথে- প্রান্তরে, ফুটপাতে। ওরা সবাই কৃষ্ণাঙ্গ। ওদের সবাই হতদরিদ্র কিন্তু চোখে মুখে আশ্চর্যরকম আত্মপ্রত্যয়ী ভাব তাদের।  

কথা বলছিলাম এরকমই ক'জন মানুষের সাথে। ওরা ব্যাগ আর চশমার পসরা সাজিয়ে বসেছে ম্যানহাটনের ফুটপাতে। দারুণ সুন্দর সব ব্যাগ আর চশমা ওরা বিক্রি করছে। বিক্রি করছে লুই ভুটান, ডলসে গাবানা কিংবা কেলভিন ক্লেইন এর মত নামকরা সব ব্রান্ডের ব্যাগ। দাম জিজ্ঞেস করতেই বলছে ৬০ ডলার, ৫০ ডলার কিংবা ৪০ ডলার!  অবাক হয়ে বলি এগুলো ব্রান্ড নেইম জিনিস, তবে এত সস্তা কেন? আশ্চর্যরকম সরলতায় ওরা উত্তর দেয়, এগুলো আসল নয় নকল। আসলগুলোর দাম $৯০০. $৪০০, $২০০। 

ওদের কারোই কাগজপত্র নেই, নেই বৈধভাবে থাকার পার্মিশন!  তবুও ওরা এদেশে নানাভাবে আঁকড়ে পড়ে রয়েছে! জিজ্ঞেস করলাম একজনকে, এই যে এভাবে কষ্ট করে দিনযাপন করছো, তুমি কী ভালো আছো? 

বলল, দেশে কিছু ডলার পাঠাতে পারছি। বৌ-বাচ্চা, মা-বাবা সেটা দিয়ে গ্রাসাচ্ছাদন করতে পারছে, মন্দ কি? 

বুঝতে পারি চরম দরিদ্রতা থেকে মুক্তির জন্যই নিজেকে এভাবে বিলিয়ে দিয়েছে এদেশের কষ্টের সাথে, অপমানিত জীবনের সাথে!

কেউবা জানায় আসার সময় বৌ'টা প্রেগন্যান্ট ছিল। ক’মাস পরে বাচ্চা হয়েছে। কিন্তু বাবা হিসাবে সে বাচ্চার মুখ আজ পর্যন্ত দেখতে পারেনি, সুখে-দুঃখে একসাথে থাকা হয়নি। হয়তো অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার মুখ দেখাতে পেরেছে পরিবারকে সামান্য ক'টা ডলার পাঠিয়ে। 

ওদের সাথে কথা বলতে আমার যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। কারণ ওরা কেউ-ই ইংরেজি বুঝতে পারে না। সামান্য কয়েকটা শব্দ, আকার ইঙ্গিতে এভাবেই ওদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করি। আবার কথা বলতে ওরা ভয়ও পায় কারণ ওদের তো আইনি কোন কাগজপত্র নেই। তবে ওদের আশ্বস্ত করি আমি, কারণ ওদের সাথে আমার প্রায় প্রতিদিনই দেখা হয়। আমার কাজের জায়গায় আশেপাশে ওদের ফুটপাতে বিক্রির জীবন। প্রতিদিনই আসা -যাওয়ার পথে হাসি দিয়ে হাই হ্যালো বলি। সে হিসেবে আমার অনেক পরিচিত ওরা।  

মোস্তফার কাছে জানতে চাই, তুমি থাকো কোথায়? পরিবার থেকে দূরে কিভাবে থাকো? 

উত্তরে বলে, সিস্টাস! এই যে আশেপাশে যাদেরকে দেখছো, আমরা সবাই একসাথে একটা বেসমেন্টে থাকি। আমরা সবাই মুসলিম  আমরা ভাই ভাই। একসাথে থাকি, একসাথে রান্না করি, একসাথেই খাই।

আশ্চর্যরকম সহজ সরল জীবন ওদের। জীবনের কাছে ওরা কিছুই চায় না, শুধু একটু আর্থিক স্বচ্ছলতা ছাড়া। ওদের কাছে জীবনের বিনোদন দেশে টাকা পাঠানো। ওদের কাছে জীবন মানে ফোন করে প্রিয়জনের হাসির শব্দ শোনা। ওদের কাছে জীবন মানে ফোন করে বাবা-মায়ের সুখী কণ্ঠস্বর শোনা। ওরা আশ্চর্য রকমের ধর্মভীরু!  ম্যানহাটনের মতো কর্মব্যস্ত জীবনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে নির্বিঘ্নে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করছে। ওরা জানায় আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে কিছু চাইবার নেই আমাদের। এখানে এসেছি তাও তো আল্লাহর ইচ্ছায়। তাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে আমরা কখনো ভুল করি না।

ওদের ভিতর আবাদু একটু তরুণ। ওকে বলি, দেশের জন্য মন খারাপ লাগে? 

উত্তরে আবাদু উদাস হয়। বলে, হ্যাঁ! মনটা খারাপ হয়। দেশে আমার প্রেমিকাকে রেখে এসেছি। ওর জন্য মনটা বড় পোড়ায়। উদাস কণ্ঠে আবাদু আরো বলে, কবে দেশে যাব জানি না। আমার প্রেমিকার যদি বিয়ে হয়ে যায় তাও আমি কিছু করতে পারবো না! এই কষ্টটা আমাকে সারাক্ষণ কুঁড়ে কুঁড়ে খায়!

মোহাম্মদ, মোস্তফা, আব্দুল্লাহ এবং আবাদুর মত আরো  ‌অনেকেই যেন একটা মানচিত্রের ছবি। যে মানচিত্রে শুধু পয়সা উপার্জন করে দেশে পাঠানোই সারকথা। নিজের সুখ দুঃখ বলে কিছু নেই, আছে শুধু প্রত্যাশা প্রিয়জনের হাসি মুখ।

এই জনপদের পক্ষ থেকে ওদের সবার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা। ওরা ভালো থাকুক, প্রিয়জনের হাসিমুখের সাথে ওদের মুখে ও হাসি ফোটে উঠুক। ওদের জীবনও সুন্দর হোক এই কামনা রইল।

 

তাদের আবেগ অনুভূতি থেঁতলে যায় আমাদের প্রয়োজনে

আমার পাশের বাসার একজন বয়স্ক মহিলাকে প্রায় সময়ই বাড়ির সামনে হাঁটতে দেখি। বিশেষ করে বিকালের দিকে। তিনি একাই হাঁটেন। আমার জানালা দিয়ে দেখা যায় তাকে। মাঝেমাঝে আমিও হাঁটতে বের হই। তখন উনার সাথে কথা হয়। এভাবেই এক সময় আমাদের মাঝে একটা সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠে। মাঝেমাঝে উনি হাতে করে আমার জন্য পিঠা বা পুরি নিয়ে আসেন।

একদিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মাঝে জানালায় যেতেই দেখি, উনি রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে কোনো ছাতা নেই। অবাক হলাম। বয়স্ক মানুষ, যদি জ্বর ঠান্ডা লেগে যায়! ডাকলাম, আন্টি! কী করছেন? ভিজে যাবেন তো?

তিনি হেসে তাকালেন। বললেন, এমনি দাঁড়িয়ে আছি মা। 

বললাম, বাসায় আসেন, চা খাই। গরম পুরি ভাজছি।

তিনি মিনিট দুয়েকের মধ্যেই চলে এলেন। গায়ের কাপর কিছুটা ভেজা। টাওয়াল দিলাম। তারপর বসতে দিয়ে উনাকে চা করলাম, ডাল পুরি ভাজলাম। লিভিংরুমের টেবিলে সব একসাথে রেখে বাংলা টিভি চ্যানেল অন করে দিলাম। কথা বলতে শুরু করলাম। একপর্যায়ে বুঝতে পারলাম, উনার মন আজ কোনো কারণে বিধ্বস্ত। কম কথা বলছেন তিনি। এদিকে ইতোমধ্যে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বললাম, 

-আন্টি! আপনি যে বাইরে আছেন, তা কী আপনার বাসায় জানে? 

-কি জানি। 

-আপনার কি আজ মন খারাপ আন্টি? 

-না গো মা। মন খারাপ না। আমার মন বলে কিছু আছে? 

বুঝতে অসুবিধা হলো না সত্যিই আজ উনার মন খারাপ। তারপর চা আর পুরি শেষ করলাম দু'জনে মিলে। 

হঠাৎ তিনি আমার হাত জড়িয়ে ধরলেন। তারপর বললেন, আমি দেশে চলে যেতে চাই। এখানে থাকতে চাই না। কিন্তু ছেলে আর ছেলের বৌ আমাকে দিচ্ছে না। আমি কি করি বলো তো? 

বললাম, কেন দেশে চলে যেতে চাচ্ছেন? 

তিনি একটু চুপ হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, তোমাকে একটা কথা বলি, তুমি কাউকে বলবা না তো? 

জি না আন্টি। বলব না। আপনি বলেন।

তারপরই তিনি বলতে শুরু করলেন আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। উনার কথা শুনতে শুনতে আমারও মন খারাপ হতে লাগল। কিন্তু কী করার আছে? আমি প্রতিবেশী। সান্ত্বনা দেয়া ছাড়া আর কি-ই বা করতে পারি!  

প্রতিবেশী মহিলার বয়স প্রায় ৭০ এর কাছাকাছি। উনার ছেলে উনাকে এদেশে এনেছেন চার বছর আগে। এর মধ্যে উনার দেশে যাওয়া হয়নি। দেশে উনার আরো চারজন ছেলেমেয়ে আছে। সবাই বিবাহিত। আর্থিকভাবে মোটামোটি খেয়ে পরে চলার মতো অবস্থা। 

উনাকে আনার পর নাকি অনেকবার ডাক্তারদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। একদিন এক নার্স আসে বাসায়। কি কি জানতে চান নার্স। হাঁটতে বলেন, দাঁড়াতে বলেন। ইংলিশ তিনি বুঝেন না। ছেলের বৌ নার্সের সাথে কথা বলেন। বৌ উনাকে শিখিয়ে দেন যেন নার্সের সামনে কিছুটা খুঁড়িয়ে হাঁটেন। তিনি তা-ই করেন। তার কিছুদিন পর উনার জন্য হোম সার্ভিস নেয়া হয়। সেই চাকরি তার ছেলের বৌ করছে। উনি সাইন করতে পারেন না তাই ছেলেই সাইন করলেন কাগজে। এটি দের বছর আগের কথা। সেই থেকে প্রতি সপ্তাহে ছেলে আর ছেলের বৌ একটা চেক পান। কত অর্থ পান, তা তিনি জানেন না। এই অর্থ দিয়ে তারা কী করে, সেটা একদিন তিনি নাকি জানতে চেয়েছিলেন। তখন ছেলে বেশ রাগ হয়। ছেলের বৌ নাকি বলেছেন, তার চিকিৎসার জন্য টাকা নেন সরকারের কাছ থেকে। কিন্তু তিনি কোনক্রমে অন্য প্রতিবেশীর কাছ থেকে জানতে পেরেছেন, প্রতি সপ্তাহের চেক-এ ভালো একটা অর্থ দেয়া হয় তাকে সেবা দেয়ার বদৌলতে। 

তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, এই দেশে বয়স্কদের চিকিৎসার জন্য কি অনেক টাকা লাগে? 

বললাম, না। আপনি কাজ না করলে আপনার সব চিকিৎসা ফ্রি। 

তাহলে যে ওরা টাকা নেয়? শুনলাম আমাকে সেবা দেয় বলে টাকা পায়। কিন্তু আমাকে তো থাকা খাওয়া ছাড়া আর কিছুই করে না। কাপর জুতা সব দেশ থেকে আনলাম। বিষ বেদনায় থাকি, আমাকে তো একটু মালিশ করেও দেয় না। উল্টা নাতনিকে দেখতে হয়। আমি দেশে চলে যাবো গো মা। এই বয়সে এতো কিছু ম্যানেজ করতে পারি না। বড় অসহায় লাগে।  

বলতে বলতে উনার চোখে আবারো পানি ঝরছিল। আমার খুব মন খারাপ লাগছিল। বললাম, আন্টি। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। চলেন বাড়ি পৌঁছে দিই। 

তারপর, উনার হাত ধরে উনাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিলাম। 

বাড়ির দিকে ফিরতে ফিরতে আমারও চোখ ভিজে উঠল। উনার কুঁচকানো বাদামি চামড়ার হাতটির স্পর্শ অনুভব করতে লাগলাম। উনার শেষ বাক্যটি বার বার কানে বাজতে লাগল, "আমি দেশে চলে যাবো গো মা। এই বয়সে এতো কিছু ম্যানেজ করতে পারি না। বড় অসহায় লাগে।" 

প্রবাসজীবন আমাদের কঠিন এক জীবন। এখানে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই যেতে হয়। সরকারী নানা সুযোগ সুবিধা রয়েছে এদেশে। কঠিন কাজের ফাঁকে যদি কিছু সুযোগ সুবিধা আমরা পাই, তাতে সমস্যা হবার কথা নয়। কিন্তু, সেই সুযোগ  সুবিধা নিতে গিয়ে আমাদের বয়স্ক পিতা মাতাদের কী আমরা মানসিক নির্যাতন করছি না? তাদের আবেগ অনুভূতিগুলোকে কী থেঁতলে দিচ্ছি না?

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন