https://www.prothomalony.com/
6093
literature
বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন- একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। জাতির জনক বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের স্ফুলিঙ্গে উজ্জীবিত সশস্ত্র জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের মুক্তির ইতিহাস- স্বাধীনতার ইতিহাস। আর সেই মহান নেতাকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল বিপথগামী সেনা সদস্য সপরিবারে হত্যা করেন।
আগস্ট শোকের মাস। বাঙালির জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশে 'উত্তরের সাহিত্য'-এর আজকের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস--
পিতা
বেনজির শিকদার
হে আমার প্রিয়তম সকাল!
হে আলোকিত সূর্যের সারল্য
এসো গল্প শুনি; এক মহাজাগতিক সত্তার!
কণ্ঠে তাহার ঝরতো বারুদ ; ইতিহাস হতো কথা!
সে আমার পূর্বপুরুষ! অভিনব এক পিতা।
কীভাবে বিশ্বাসী পৃথিবীতে হয় অবিশ্বাসের ধারাপাত
কীভাবে ঋতুবতী বসন্ত এসে ছুঁয়ে যায় পলাশের হাত
জীবন ও যাপনের চাতুর্যকলায় সবুজের বুকে
কীভাবে ঘুমিয়ে থাকে অনাদিকালের উত্তপ্তসূর্য!
এ এক দেশ জনপদ জাতি ও জনকের ইতিকল্প।
দেশ বলতে বঙ্গভূমি! জাতি বলতে বাঙালি!
আর জনক বলতে; শেখ মুজিব!
সাতচল্লিশের দেশভাগ
পূর্ব-পশ্চিমের বৈষম্য-লীলা ছাপিয়ে—
ভাষা আন্দোলনের বাহান্ন।
রক্তে রক্তে রাজপথ হলো ভারী!
সালাম-বরকত, রফিক-জব্বার; ঝরে গেল অগনিত প্রাণ!
এলো— চুয়ান্ন! উনসত্তর! আসাদের রক্তমাখা শার্ট!
এগারো দফা, ছয়দফা, সত্তরে নিরঙ্কুশ বিজয় বাঙালির।
একটি তর্জনীর প্রেমে উন্মাদ গোটা জাতি
অবিসংবাদিত নেতার আহ্বানে উৎসর্গ ত্রিশ লক্ষ প্রাণ!
টুঙ্গিপাড়া থেকে ধানমন্ডি;
টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত!
প্রদীপ্ত আলোর বিচ্ছুরণে চিরকালীন
সে মহানায়কের ছায়া ভেসে বেড়ায়; গোটা বাংলার জমিন!
পাখির গানে উচ্চারিত— শেখ মুজিব!
ফুলের বনে আন্দোলিত— শেখ মুজিব!
রাজপথ ভেঙে উচ্চারিত— শেখ মুজিব!
স্লোগানে স্লোগানে উন্মীলিত— শেখ মুজিব!
মশালে মশালে প্রজ্বলিত— শেখ মুজিব!
তৃণপ্রেমী পাখির ঠোঁটে— শেখ মুজিব
ছায়াজলে গান হয়— শেখ মুজিব!
বহুবর্ষী নদীর ঢেউয়ে— শেখ মুজিব
অন্তহীন মায়ার স্নানে— শেখ মুজিব!
দ্রোহ-প্রেমের উচ্চারণে— শেখ মুজিব!
প্রেরণায় প্রকাশ্যে— শেখ মুজিব!
চেতনের মায়াঘোর— শেখ মুজিব!
যেন দূর্বার তারুণ্যে কল্লোলিত ঝড়!
আকাশে বাতাসে কান পেতে দিলে একই কণ্ঠস্বর।
অকস্মাৎ কালের কলঙ্কে এক নিনাদ ভোর
সহসা থমকে যায় দেশ!
বত্রিশ নম্বর থেকে রক্ত গড়িয়ে নামলো শোকের নহর।
আমার ইতিহাস সাক্ষী-বাংলা একাডেমি চত্বরে প্রথম পাঠ
‘আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি’
বার্লিনে একজন ভায়োলিন বাদককে দেখানো
দশ টাকার নোটের সেই ছবি
অথবা ‘যতোকাল রবে পদ্মা-মেঘনা গৌরী-যমুনা বহমান
ততোকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’
শব্দের ধ্বনিকালে গর্জে কল্পনার হাতুড়ি, শাবল
কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক,
শহীদ কাদরী, রফিক আজাদসহ অসংখ্যজন
অনুভবের পবিত্র ব্যঞ্জনায় আঁকলেন—
শেখ মুজিব! শেখ মুজিব! শেখ মুজিব!
বাহুলগ্ন প্রেমিক! নিদ্রাভঙ্গ পিতা!
অগ্রজ থেকে লক্ষ্যভেদী অনুজ!
নির্বিচারে সম্মোহনী সেই নাম। শেখ মুজিব!
শেখ মুজিব এক স্বপ্নদ্রষ্টা!
এক চিরন্তন-পতাকাসম উড্ডীন মহাকাব্য।
শেখ মুজিব আমার প্রেম! আমার পিতা! এক অনল পুরুষ!
ভাসিয়ে আঁখি সে নামে গান গায় পাখি
অন্তরাত্মায় বাজে অনিবার্য চারটি শব্দ
জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু! জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!
বঙ্গবন্ধু বিশ্ব বন্ধু
পারভীন আকতার
ঊষার গগনে উঠিছে জাগি সেই স্মৃতির ঝলকানি
রয়েছো তুমি বাংলার জনতার জয় করি হৃদখানি।
মুক্তির লেলিহান শিখা যবে উদ্গীরণ বাংলা জুড়ে
দিয়েছো ক্ষুরধার সাহসী অভয় বাণী; বিশ্বময় ঘুরে।
নেতা নয় এ যেন বাঙালির, সৌভাগ্য মুকুট শোভা
সোপানের পথে রক্ত ঝরিয়ে উঠিছে নব সূর্য প্রভা।
কে বলে তুমি নেই; রয়েছো প্রতি বাঙালির অন্তরে
তুমিই মহান, বাংলার জয় গান শুনি মুজিব অম্বরে।
বিশ্বকে দেখিয়েছ তর্জনীর শক্তি কতটা যে মহিয়ান,
বাংলা ও বাঙালির বেড়েছে মান মর্যাদায় আগুয়ান।
আমরা পূজি মুজিবের দেশপ্রেম, ত্যাগের ছবি খানি,
সত্যন্যায়ে মুজিব হস্তে; বাংলা মায়ের অবয়ব খানি।
তুমি তো সবুজ বাংলার বুকে, মমতার আশ্রয় বঙ্গবন্ধু
বিশ্ব দেখেছে শিখেছে সহমর্মিতা; তুমি-ই যে বিশ্ব বন্ধু।
পনেরো আগষ্টের কান্না
সুব্রত চৌধুরী
পনেরো আগষ্ট শ্রাবণ মেঘে রাত্রি নামে ঝুপ
লেকের পানি শান্ত ভীষণ বত্রিশ নম্বর চুপ।
পনেরো আগষ্ট শ্রাবণ রাতে বত্রিশ নম্বর ঘুমে
বাংলাদেশের জনক তখন স্বপ্নালোকের ভূমে।
বুটের শব্দে জেগে ওঠে বাংলাদেশের পিতা
দরজা খুলেই দেখেন তিনি রক্তলোলুপ চিতা।
মানবতার পায়নি শিক্ষা নপুংসকের দলে
ক্ষমতার ওই উৎস জানে বন্দুকেরই নলে।
লুট হয়ে যায় বত্রিশ নম্বর স্বাধীনতার সুর
মেহেদি আঁকা হাতের কাঁকন, স্বপ্ন ভেঙ্গে চুর।
লুট হয়ে যায় ছয় দফা আর সাতই মার্চের হাঁক
উল্টো ঘুরে দেশের চাকা শতেক ডিগ্রি বাঁক।
বন্দুকের ওই তপ্ত সীসায় ঝাঁঝরা পিতার বুক
সিঁড়ির পরে ধুলায় লুটায় বাংলাদেশের সুখ।
ভাইয়ের, মায়ের তাজা রক্তে বত্রিশ নম্বর ভাসে
দেশ জুড়ে তখন বোবা কান্না চরম সর্বনাশে।
মুজিব মানে স্বাধীন বাংলার হাসি
মেশকাতুন নাহার
মুজিব মানে যুদ্ধক্ষেত্রে ছিনিয়ে আনা সেই জয়,
মুজিব মানে এমন নেতা নেই যার কোনো ভয়।
মুজিব মানে নিপীড়ন থেকে মানুষের হয় মুক্তি
মুজিব মানে শিকল ভেঙ্গে স্বাধীনতার অধিভুক্তি।
মুজিব মানে সাতই মার্চের ঐতিহাসিক সেই ভাষণ
মুজিব মানেই বিলুপ্ত হওয়া পাকিস্তানিদের শাসন।
মুজিব মানে চিন্তা চেতনায় অসাম্প্রদায়িকতার ছোঁয়া
মুজিব মানে হিন্দু মুসলিম জয় বাংলার গান গাওয়া।
মুজিব মানে রক্তে কেনা এই বাংলার মাটি
মুজিব মানে দেশের প্রতি ভালোবাসা খাঁটি।
মুজিব মানে লাল সবুজের একটা পতাকা আঁকা,
মুজিব মানে মুক্ত আকাশে মায়ের কোলে থাকা।
মুজিব মানে অধিকার আদায়ে মুক্তিযুদ্ধ করা,
মুজিব মানে বৈষম্যহীন একটা সমাজ গড়া।
মুজিব মানে গর্জে ওঠা মুক্তি সংগ্রামের বাঁশি,
মুজিব মানে স্বাধীন বাংলার প্রাণের স্বচ্ছহাসি।
মুজিব সবার
শ্যামল বণিক অঞ্জন
মুজিব কে? চন্দ্র তারা; সূর্য কিরণ ঝর্ণাধারা
মুজিব মানে? কজন জানে! মুক্তির দোল কোটি প্রাণে,
মুজিব স্বজন পরম মিত্র, স্বাধীন স্বদেশ মানচিত্র।
মুজিব কেমন? আকাশ যেমন
মরুর বুকে হিম সমীরণ,
দৃপ্ত শপথ আর কঠিন পণ।
মুজিব শ্রেষ্ঠ মুজিব ত্রাতা
জাতির অহং উঁচু মাথা।
মুজিব কাদের? দেশটা যাঁদের
দেশ তবে কার? আমজনতার।
কৃষক শ্রমিক কুমার কামার, মুজিব তোমার
মুজিব আমার; দল ও মতের উর্ধ্বে সবার।
চিরন্তন বঙ্গবন্ধু
সোহরাব হোসেন
তুমি নও চিরতরে বিলীন
তুমি যে বিস্তৃত - নও হারানো সুর
তুমি রয়েছ বাঙালির হৃদয়ে -
তুমি রয়েছ সোনালী ফসলে, সবুজ পত্রপল্লবে
তুমি বাংলার অহংকার- তুমি চিরন্তন বঙ্গবন্ধু।
তুমি নও নির্বাসনে, হারিয়ে যাওনি গহীন অরণ্যে
নও তুমি স্বাদহীন সততই অতৃপ্ত!
তুমি যে সারা বিশ্বের, সারা বাংলায় চিরস্মরণীয়।
তুমি দিয়েছ যত নাওনি তত,
তাই তো আমরা তোমার প্রেমে চিরসিক্ত
ওরা আজন্ম তোমার বৈশিষ্ট্য নিরুপনে হয় মত্ত
অবশেষে একসময় ওদের মানবাত্মায় অনুভূত।
বঙ্গবন্ধু-তুমি কেবল বাঙালির বন্ধুই নও
তুমি বিশ্বের বন্ধু; লাল সবুজে স্বাধীন বাংলাদেশ।
কারাগারের রোজনামচা-শেখ মুজিবুর রহমান
রিভিউ: আশরাফুল কবীর
কয়েদিদের ধারণা, আমি ছাড়া পেলে ওদের মুক্তিরও একটা সম্ভাবনা আছে। একজন কয়েদি কিছুদিন পূর্বে ২০ বৎসর সাজা খেটে মুক্তি পেয়েছিল, তিন বৎসরের মধ্যেই আবার ২৫ বছর জেল নিয়ে ফিরে এসেছে। খবর নিয়ে জানলাম, যারা তাকে খুনের মামলায় সাক্ষী দিয়ে জেল দিয়েছিল তারা খুব প্রভাবশালী লোক। কোথায় একটা ডাকাতি ও খুন হলো আর তাকে আসামি করে সাক্ষী দিয়ে আবার সাজা দিয়ে দিয়েছে। … ‘স্যার, আপনি নিশ্চয়ই আমাদের ছাড়বেন, আপনি যদি ক্ষমতায় যান-জেল কি জিনিস আপনিই বোঝেন, তাই আমাদের ছেড়ে দিবেন।’ মনে মনে বললাম, আমাকে এরা ছাড়বে না আর… তোমাদের আশা এ জীবনে আর পূরণ হবে না।" ৫ই আগস্ট ১৯৬৬, শুক্রবার (পৃষ্ঠা নং ১৯১)
পাঠকের মগজে অনুরণন তোলার জন্য এই কয়টি লাইনই যথেষ্ট! আমার প্রিয় বই “কারাগারের রোজনামচা” প্রথম পড়েছিলাম ২০১৮ সালে। সহজ-সরল ভাষায় বর্ণিত ও মলাটবদ্ধ স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বন্দিজীবনের এ দিনলিপি পড়তে পড়তে আমি অভিভূত হয়েছিলাম, আবার অভিভূত হতে হতে পড়ছিলাম! দুটোই সমানতালে ঘটছিল। পড়তে গিয়ে অসাধারণ এ বইয়ের আসলে কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন মনে করিনি, শুধুমাত্র একটানা পড়তে চেয়েছি, নিভৃতে অনুভব করতে চেয়েছি বর্ণিত ঘটনাসমূহের পরম্পরা আর ধারণ করতে চেয়েছি এর বিশালত্ব! এ বিশালত্বের কিছুটা হয়তো ভেতরে প্রবেশ করাতে পেরেছি আর বাকিটা হয়তো পারিনি। অলোকসামান্য ও ঘটনাবহুল এ দিনলিপি একবার পড়া শুরু করলে এর তেজোদ্দীপ্ত বর্ণনা নিজের অজান্তে পাঠককে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মন্ত্রমুগ্ধের মতো টেনে নিয়ে যাবে ঘটনাসমূহের উত্তাল দিনগুলোতে।
২১ শে জুন ১৯৬৬, রোজ মঙ্গলবার এর দিনপঞ্জি শুরু হয়েছে প্রকৃতির চমৎকার বর্ণনা দিয়ে। বন্দিজীবনের নানা মুহূর্ত, নানা ঘটনা বর্ণনার পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতি নিবিড় পর্যবেক্ষণ পাঠককে মোহিত করে। জেলখানায় বন্দিজীবনের চরম সংকটময় মুহূর্তেও দেশের স্বাধীনতার চিন্তার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু ঠিক ঠিক ঠাহর করে রেখেছিলেন তাঁর পাশের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দূর্বা ঘাসের মিষ্টত্ব আর সৌন্দর্যকে, যেখানে জেলের ডিআইজি সাহেবের আগমনের বিষয়টিও ছাপিয়ে যায় এই নিবিড় অবলোকন। এছাড়াও তাঁর মনোযোগ এড়াতে পারেনি জেলখানার গাছপালা ও পশু-পাখি, ক্ষণে ক্ষনেই দিনলিপির পৃষ্ঠায় ফুটে উঠেছে তা।
“আকাশটা আজ মেঘে ভরে রয়েছে। বৃষ্টি নাই। শুনলাম জেলের ডিআইজি সাহেব এদিকে আসবেন, যদিও আজ এখানে আসার কোনো কথা নাই। তিনি আসবেন ঐ গর্তটা দেখতে। বৃষ্টি পেয়ে দূর্বা ঘাসগুলি বেড়ে উঠেছে লিকলিক করে, সমস্ত মাঠটা দেখতে খুব সুন্দর হয়েছে। বাজে গাছ আমি তুলে ফেলে দিই। একটু ভাল লাগলেই ওর ভিতর দিয়ে হেঁটে বেড়াই আর যে পরগাছা চোখে পড়ে তাকেই ধ্বংস করি।” (পৃষ্ঠা নং ১১২)
শুধুমাত্র দুয়েকটি পৃষ্ঠায় নয়, এরকম নিবিড় দৃষ্টিপাত ছড়িয়ে আছে পুরো দিনপঞ্জির প্রতিটি পৃষ্ঠাজুড়ে। কোথাও এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ববর্তী সময়ের ধাপগুলো কতোটা সংগ্রামমুখর, কষ্টকর ও দীর্ঘ ছিল তা এই দিনলিপি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ও আলোকিতভাবে তুলে ধরেছে। বাবা-মায়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ, পরিবারের প্রতি তীব্র আবেগ, দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি তীব্র ভালোবাসা, দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার দুর্দমনীয় ইচ্ছার কথা ব্যক্ত হয়েছে সময়ের রূপরেখায়।
১৭ ই জুলাই ১৯৬৬, রবিবার এর বিবরণীও শুরু হয়েছে ঘাসের রকমফের এর বর্ণনা দিয়ে। “বাদলা ঘাসগুলি আমার দূর্বার বাগানটা নষ্ট করে দিতেছে। কত যে তুলে ফেললাম। তুলেও শেষ করতে পারছি না। আমিও নাছোড়বান্দা। আজ আবার কয়েকজন কয়েদি নিয়ে বাদলা ঘাস ধ্বংসের অভিযান শুরু করলাম।”
জেলখানার বন্দিজীবনের অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কাও বইয়ের প্রতি বঙ্গবন্ধুর তীব্র আকর্ষণ কিছুমাত্র দমাতে পারেনি বরঞ্চ একাকী বন্দিজীবনের (সৌল কনফাইনমেন্ট) এর সময়টাতে নিয়মিতভাবে লিখেছেন তিনি, লেখার মাধ্যমেই চলমান রেখেছিলেন তার নিজস্ব অনুপ্রেরণাকে:
“আমার কাছে দুইখানা মাত্র বই ছিল। অন্য বইগুলি জেলখানায় রেখে এসেছি। ভুল করেছি বই না এনে। অফিসার ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম, বই পড়তে আপত্তি আছে কিনা। তিনি বললেন, বই দেওয়ার হুকুম আপাতত পাই নাই। তবে আপনার কাছে থাকলে পড়তে পারেন। …সুকর্ণর পতন সম্বন্ধে বই দু’টি পড়তে লাগলাম। কিন্তু মন বসছে না, নানা চিন্তা ঘিরে ধরছে। কি করবো বসে বসে শুধু পাইপ খেতে লাগলাম। ভাবতে লাগলাম রাজনীতি এত জগন্য হতে পারে! ক্ষমতার জন্য মানুষ যে কোনো কাজ করতে পারে।” (পৃষ্ঠা নং ২৫৮)
শেষ ভিক্টোরিয়ান হিসেবে খ্যাত রোমান্টিসিজম ঘরানার কবি ও ঔপন্যাসিক টমাস হার্ডি’র বিখ্যাত উপন্যাস “দ্য রিটার্ন অভ দ্য নেটিভ” এর মূল চরিত্র ক্লাইম ইয়োব্রাইট এর মা, মিসেস ইয়োব্রাইট এর মৃত্যুর বর্ণনা পড়ে উপন্যাসের শেষের দিকে এসে খুবই খারাপ লেগেছিল। মিসেস ইয়োব্রাইট তার ছেলে ক্লাইম ইয়োব্রাইট এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসেন, কিন্তু ক্লাইমের স্ত্রী ইউস্টেশিয়া ভাইয়ি মিসেস ইয়োব্রাইটকে ঘরে প্রবেশ করতে না দিলে ভগ্ন হৃদয়ে মিসেস ইয়োব্রাইট ফিরে যেতে থাকেন। ফিরতি পথে বিষাক্ত সাপের কামড়ে মিসেস ইয়োব্রাইট এর মৃত্যু হয়। চরম মর্মান্তিক! প্রকৃতির পারসনিফিকেশন এবং মনোরম বর্ণনার পাশাপাশি হার্ডি শেষদিকে হৃদয়বিদারক ঘটনা দিয়ে উপন্যাসটি শেষ করেছেন। মন খারাপ হয়ে যায়...
“কারাগারের রোজনামচা” বইটি পড়তে গিয়ে বেশ কয়েকটি জায়গায় স্থান, কাল, ও পাত্রের ভেদাভেদ ভুলে যেতে হয়, মন খারাপ ভাব প্রকট হয়ে পুরো শরীরে ছড়ায়। এটা অবশ্যম্ভাবী। যদিও দুটি পারিপার্শ্বিকতা সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন, ভিন্ন আমেজের, ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের, তবে একটি দিনপঞ্জি শক্তিমান একজন লেখকের অসাধারণ সব বাস্তব অভিজ্ঞতার বয়ান, আর অপরটি শক্তিমান একজন লেখকের কাল্পনিক ভাবনাকে তুলে ধরে। দু’টি হয়তো একদমই সম্পূর্ণ ভিন্ন পটভূমি, একদমই বিচ্ছিন্ন! বই ভিন্ন হতে পারে, পারিপার্শ্বিকতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে তবে মন খারাপের অনুভূতি অভিন্ন হতে পারবে না এমন কোনো কথা নেই।
এখানে উল্লেখ করা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালীন “দ্য ডায়েরি অফ আ ইয়াং গার্ল” বা বাংলায় অনূদিত আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরির করুণ বর্ণনার কথা, যা এখনও পুরো পৃথিবীকে নাড়িয়ে চলেছে, কাঁদিয়ে চলেছে। কিন্তু “কারাগারের রোজনামচা” একজন মহান নেতার শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সময়ের দিনলিপিতেই আবদ্ধ থাকেনি বরঞ্চ তা পথ দেখিয়েছিল ভবিষ্যতের এক স্বাধীন দেশের উজ্জ্বল ও মুক্তির পথরেখার।
শেষ করছি ১৬ই সেপ্টেম্বর ১৯৬৬, রোজ শুক্রবার এর কারাগারে সাক্ষাৎ এর বর্ণনায়: “জেল কারাগারে সাক্ষাৎ করতে যারা যায় নাই তাহারা বুঝতে পারে না সেটা কি বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক। ভুক্তভোগীরা কিছু বুঝতে পারে। কয়েদিরা সপ্তাহে একদিন দেখা করতে পারে আত্মীয়-স্বজনের সাথে। সকাল বেলা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দরখাস্ত করতে হয়। তারপর জেল কর্তৃপক্ষ দরখাস্তগুলি দেখে নেয় এবং সাক্ষাতের অনুমতি দেয়”
বাস্তবিকতার সংস্পর্শে “কারাগারের রোজনামচা” ক্ষণে-ক্ষণে হয়ে ওঠে আমাদের প্রতিদিনকার জীবনভাষ্য। বঙ্গবন্ধুর জীবনের প্রচণ্ড ত্যাগ, তিতিক্ষা ও অবর্ণনীয় কষ্টের বর্ণনায় স্নাত কারাগারের রোজনামচা হয়ে উঠেছে আমাদের স্বাধীনতার উৎসমুখ।
“কারাগারের রোজনামচা” প্রকাশিত হয়েছে ফাল্গুন ১৪২৩/(মার্চ ২০১৭ সালে)। চমৎকার প্রচ্ছদ ও গ্রন্থ নকশা করেছেন তারিক সুজাত। প্রচ্ছদে ব্যবহৃত পোর্টেট করেছেন রাসেল কান্তি দাস। প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমী। বইটির মূল্য নয়শত পঞ্চাশ টাকা।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন