https://www.prothomalony.com/

6053

literature

সাহিত্য

উত্তরের জনপদ

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৩ ০৯:০০

“তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়।
জীবনের নিজের প্রতি নিজের যে তৃষ্ণা, তারা হলো তারই পুত্রকন্যা।
তারা তোমাদের মাধ্যমে আসে, তোমাদের থেকে নয়।
এবং যদিও তারা থাকে তোমাদের সঙ্গে, কিন্তু তাদের মালিক তোমরা নও।
তুমি তাদের দিতে পারো তোমার ভালোবাসা,
কিন্তু দিতে পারো না তোমার চিন্তা, কারণ তাদের নিজেদের চিন্তা আছে।“

কাহলিল জিব্রানের বিখ্যাত “সন্তান” কবিতার প্রথম কিছু লাইন। লাইনগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা গভীর কথাগুলো আমাদের মাতৃ-পিতৃ মন কিছুতেই মানতে চায় না। আরো ভালবাসতে গিয়ে আমরা বিপদ ডেকে আনি। বাবা-মা হয়েও ভুল করে বসি, আর তখনই সন্তানেরা দূরে চলে যায়। বাবা-মা’র প্রতি ভালোবাসার বীজ সন্তানদের বুকের নরম মাটিতে বাবা-মা’কেই বপন করে দিতে হয়। 

আর অন্য দিকে আছে কঠিন সংগ্রাম আর সাফল্যের গল্প। বিয়ে নামক সামাজিকতার মধ্যেও থাকে ধোঁকাবাজির খেলা। বিশ্বাস ভঙ্গের পর অবুঝ মন পুনরায় বিশ্বাস করতে চায় না। স্বপ্নের প্রেমিক পুরুষের কাছে প্রতারিত হয়ে জীবনের তাগিদে আবারো ঘুরে দাড়ায় কোন এক নারী। অনুপ্রেরণা পেয়ে এই শহরের কেউ একজন হয়ে ওঠে প্রতিবাদী, স্বাবলম্বী। প্রাপ্তি আর কষ্টের মিলিত মিস্রণে এগিয়ে চলে উত্তর আমেরিকার জন-জীবন। এরকম ভিন্নমুখী দুটো সত্য গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের উত্তরের জনপদের পাতা। ধন্যবাদান্তে—সোহানা নাজনীন/রোকেয়া দীপা।                  

-----------------------------------------------------------------------------------------------

সাহসী এক প্রতীক-অর্পা

বাইরে বিদ্যুৎ চমকের সাথে শব্দটা জানলার কাচ পেরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়লো। অর্পা চমকে উঠলো। জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলো, বৃষ্টির মাখামাখি। বৃষ্টির শব্দ অর্পার ভীষণ পছন্দ। ওর স্কুল বন্ধ হয়েছে প্রায় এক সপ্তাহ হতে চললো।

স্কুল বন্ধের দিনগুলো অনেকটা অলসভাবে কাটে তার। স্কুল খোলা থাকলে সকালে নাস্তাটা ঠিকমত করা হয়না অর্পার। তাই আজ ছুটির দিনে নাস্তা শেষ করে  বারান্দায় আয়েস করে বসেছে চা নিয়ে। বাইরে মুশল ধারায় বৃষ্টি পড়ছে সকাল থেকে। চা'য়ে চুমুক দিতে দিতে অর্পা বৃষ্টি দেখছে আর হারিয়ে যাচ্ছে অতীতের দিনগুলোতে।

আমাদের জীবনে বহু গল্প থাকে। গল্পের আড়ালেও গল্প থাকে। কখনো সেই গল্পগুলো হয় তিক্ত, যন্ত্রণার। কখনো আবার দিনশেষে সেই গল্পে থাকে সুখ, তৃপ্তি ও সফলতা।

স্বামীর বদৌলতে ইমিগ্র্যান্ট ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসে অর্পা ১৭ ছুঁই ছুঁই বয়সে। এসেই সে প্রেগনেন্ট হয়ে যায়। ১৮তে যেতে না যেতেই এক ছেলে সন্তানের মা হয়। চার বছর পর আবারো আরেক ছেলে সন্তানের জন্ম দেয়।

কিন্তু অর্পার মন পড়ে থাকে সেই স্কুলঘরে। কুইন্স এর পথে হলুদ স্কুল বাসগুলো দেখলেই তার মন উতলা হতো বই খাতা নিয়ে আবারো স্কুলে যেতে।

তার কোলে তখন দুই অবুঝ শিশু। তাছাড়া সে থাকতো শ্বশুরালয়ে। সেখানে ছিল বহু বাধা বিপত্তি। নারী মানেই যেন সেখানে স্বামী সহ পরিবারের সবার নির্দেশ পালন করা কেবল। শশুর পক্ষের ভাষ্য ছিল, মেয়েরা হলো পায়ের জুতা, লাগলে লাগবে না লাগলে ফেলে দিবে।

দিনরাত সংসারে কাজ করা, বাচ্চা দেখা আর শশুর পক্ষের লোকদের কথামত চলা ছিল অর্পার দৈনন্দিন রুটিন। নিজের মত প্রকাশের কোনো সুযোগ ছিল না। একা ঘর থেকে বের হতে দিত না। মৌখিক, মানসিক নির্যাতন চলতো রোজ। বাংলাদেশে নিজ পরিবারের সাথেও মনমতো কথা বলতে পারতো না, হোমফোনের প্যারালাল লাইন থেকে শশুরপক্ষ সব কথা শুনতো। কথার গড়মিল হলেই চলতো গালাগালি। এতসব বাধা নিষেদের মধ্যে কিশোরী অর্পার স্কুলে গিয়ে পড়তে চাওয়া ছিল-অবাস্তব এক স্বপ্ন।

একদিন অর্পা তার জা'কে বলল, আমি পড়তে চাই। জা হেসে কটাক্ষ করে বললেন, 'এই দেশে পড়া কী মুখের কথা নাকি? তুমি পড়বে? পড়তে যোগ্যতা লাগে। স্বপ্ন দেখতে থাকো। সমস্যা নাই।'

অর্পার খুব গা'য়ে লেগেছিল কথাটা। সেদিনই সে সিদ্ধান্ত নেয়, যে করেই হোক এ দেশে তাকে উচ্চশিক্ষা নিতেই হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু তাকে সাহায্য করার কেউ ছিল না।

একদিন অর্পার পাশের ফ্ল্যাট থাকা এক বাঙালির সাথে দেখা হয় তার। সেদিন বাড়ির লোকজন কোনো এক কাজে বাইরে ছিল। অর্পা প্রতিবেশীকে ডাকে ঘরে। সেই ফাঁকে অর্পা তার সব কষ্টের কথাও জানায় প্রতিবেশী মহিলাকে। সেই মহিলা নিউইয়র্কের কলেজে তখন পড়াশোনা করছিলেন এবং সাবস্টিটিউট টিচার হিসাবে স্কুলে কাজ করছিলেন। প্রতিবেশী মহিলা অর্পাকে স্কুলে ভর্তি হবার সকল ধরনের সাহায্য করবেন বলে জানান। কীভাবে কী করতে হবে সে সম্পর্কে পরাপর্শ দেন। কিন্তু অর্পার তো প্রথমে নিজ পরিবার থেকে অনুমতি নিতে হবে। তারা তো অর্পাকে পড়তে দিবে না!

একদিন অর্পা তার দেশে থাকা শাশুড়িকে কল করে পড়াশোনার কথা জানায়। শাশুড়ি তাকে মেয়ের মতো দেখতেন। আর দেখবেই না কেন? অর্পা দেশ ছাড়ার সময় তার বহু সোনার গহনা শাশুড়িকে দিয়ে এসেছিল। সুযোগ পেলেই স্বামীর থেকে ১০/২০ ডলার জমিয়ে সাদা এনভেলাপে করে শাশুড়িকে মেইল করতো। তাই অর্পা ছিল তার শাশুড়ির আদরের বৌ।

যাই হোক, অবশেষে অর্পা কৌশলে শাশুড়ির সাহায্য পেতে সফল হলো। শাশুড়িকে কথা দিল, যদি অর্পা পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করে, তবে সে বাংলাদেশে শাশুড়ির পড়ে থাকা খালি জায়গায় একটা দো'তলা বিল্ডিং করে দেবে। শাশুড়ি ভীষণ খুশি হলেন এবং অর্পার পড়াশোনায় যেন স্বামী, জা, ভাসুর কেউ বাধা না দেন সে ব্যবস্থা করলেন।  

শুরু হলো অর্পার হাইস্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে যাত্রা। শুরুতে বাচ্চাদের বেবিসিটারের কাছে রাখতো সে। যেহেতু তখন কাজ করতো না, তাই বেবিসিটিং এর বিনিময়ে অর্পা  সপ্তাহে দুইদিন বেবিসিটার মহিলার বাচ্চাকে টিউশন করতো। এভাবেই ২ বছর পার হবার পর অর্পার মা চলে আসেন এদেশে। তারপর মা'ই তার বাচ্চাদের দেখতেন।

এসোসিয়েট সম্পন্ন করে অর্পা পার্ট টাইম সরকারি চাকরিতে যোগ দেয়। সেই সাথে চলতে থাকে বাকি পড়াশোনা। ঘর সংসার, পার্টটাইম চাকরি, বাচ্চা, শশুরালয়, পড়াশোনা-এভাবেই কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্পা একে একে ব্যাচেলর, মাস্টার্স-ইউনিভার্সিটি লেভেল পার করে। লাইসেন্স নেয় শিক্ষকতার।

আজ পিছনে ফিরে তাকালে অর্পার মনে পড়ে, এমনও দিন পার করেছে সে যখন পরীক্ষার আগের দিন তার ইন্টানেট বন্ধ করে দেয়া হতো পরিবার থেকে। কখনো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিড়ে ফেলা হতো পরীক্ষার আগের দিন। তবু অর্পা হার মানেনি। পড়াশোনা অব্যাহত রেখেছে, পাশাপাশি চাকরি।

শাশুড়িকে দেয়া কথামত অর্পা ঠিকই চাকরির দুই বছরের মধ্যে প্রায় ৪২ হাজার ডলার ব্যয়ে একটা দু'তলা বাড়ি করে দেয় বাংলাদেশের জমিতে।

কিন্তু ওই যে, মেয়েরা উচ্চশিক্ষিত হলে, প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের চো্খ খুলে যায়-এমনটাই ভাবা হতো অর্পার নিউইয়র্কের পরিবারে, বিশেষ করে জা আর ভাসুরের কথায়-ই চলতো তার স্বামী। তাই পড়াশোনা আর চাকরিই হয়ে উঠে অর্পার সংসার ভাঙার কারণ।

তবে হ্যাঁ! অর্পার চোখ খুলেছিল গুহায় থাকতেই। আর তাই সে নিজ প্রচেষ্টায় সেই গুহা থেকে বের হতে সর্বপ্রথম স্কুলশিক্ষা গ্রহণ করাকেই বেছে নিয়েছিল। সে জানতো, একমাত্র শিক্ষাই পারবে তাকে সামনে বাড়াতে, সকল পথ উন্মুক্ত করে দিতে। শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এবং অর্পা সফলও হয়েছে। আজ সে নিউইয়র্কের একজন উচ্চশিক্ষিত নারী। আজ অর্পা নিউ ইয়র্কের স্কুলশিক্ষক। এখানে আসতে কতইনা কাঠ খড় পোহাতে হয়েছে তাকে।

আমাদের বাঙালি সমাজে এখনো বহু নারী পরাধীন। বিশেষ করে আমেরিকার মতো জায়গায় এতো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক নারীরা এখনো নিজ স্বপ্নকে মাটিচাপা দিয়েই দিন পার করেন। কারণও আছে। অনেকেই নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে বের হতে পারেন না। অনেকের নানা ব্যক্তি-সামাজিক দায়বোধ থাকে। আবার অনেকে আসলে জীবনটাকে এভাবেই গুছিয়ে নেন। অথচ অন্ধকার গুহায় বাস করতে করতে আমরা আলোর কথা ভুলেই যাই।

আমাদের অন্ধকার গুহা থেকে বের হতে হবে। অর্পার মতো সাহস নিয়ে।

 

 

দূরত্ব

“আচ্ছা, আপনি কিভাবে বাচ্চার সাইকোলজি বুঝলেন? কে আপনাকে শেখালো?”

“কেন? আপনার নিজের বাচ্চার মন তো আপনাকেই বুঝতে হবে।”

“এই যে এদেশে বাচ্চাদের কিভাবে মানুষ করে তুলতে হবে, তাদের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে। আপনার কোন গার্জিয়ান ছিল না আমেরিকায়, তাহলে কার থেকে বুদ্ধি নিয়েছিলেন?”

ফোনের মধ্যে এভাবেই আমাকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন জিনাত আপা। উনি প্রায়ই আমাকে ফোন করেন, এটা ওটা নিয়ে জানতে চান, মাঝে মাঝে অন্যায় আবদারও করেন। আমি মাথা ঠান্ডা রেখে এড়িয়ে যাই। বুঝতে পারি জিনাত আপা কেমন যেন একটা অস্থিরতায় ভোগেন। কিছু একটা না পাবার অতৃপ্ততা উনাকে তাড়া করে ফেরে। আমি উনাকে বোঝাই, বলি,

“আপা, বাচ্চাদের আমরা জন্ম দিয়েছি কিন্তু তাই বলে তো ওদের স্বাধীনতা কিনে নেই নাই। ওরা আলাদা মানুষ, আলাদা স্বপ্ন আছে, ভিন্ন ইচ্ছা আছে। আমরা প্যারেন্টসরা সেই স্বপ্নের বিরুদ্ধে যেতে পারিনা।“

“তাই বলে কি ওদেরকে যা খুশী তাই করতে দিতে পারি? বাবা-মা কোনদিন খারাপ চায় না, ওদের ভালোর জন্যেই তো এদেশে এসেছি। এতো কষ্ট করলাম, ওদের বড় করলাম আর ওরা এখন এসবের মুল্য দেয় না। ভাবতে পারেন এইজন্যে আমার আর আমার স্বামীর মনে কত কষ্ট?“

ফোনের ওপারে কথা বলতে বলতে জিনাত আপা রাগে লাল হয়ে যাচ্ছেন টের পাই। হয়তো আক্ষেপ করে কখনও কাঁদতে শুরু করেন। ইন্টারনেট থেকে পড়া প্যারেন্টিং সম্পর্কে লেখাগুলো উনাকে ভেঙ্গে বুঝিয়ে বলি,

“দেখেন আপা, দেশে বাচ্চা মানুষ করা আর প্রবাসে মানুষ করা এক্কেবারে ভিন্ন দুই জিনিস। এখানে আমাদের বাচ্চারা দুইটা জিনিস মোকাবিলা করে, স্থানীয় কালচার আর দেশীয় কালচার। আর আমরাও পদে পদে ভুল করে ফেলি, জোর করে ওদের ওপর চাপিয়ে দেই অনেক কিছু। আর তখনই বাঁধে বিপত্তি, বাচ্চারা দূরে সরে যেতে থাকে। আঠারো পার হলে তো কথাই নেই, এডাল্ট ডিসিশানের দোহাই দিয়ে আলাদা হয়ে যাবে। আর কলেজ শুরুর সময় এমনিতেই ওদের একটা সুযোগ আসে বাবা-মা ছেড়ে দূরে চলে যাবার। সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে ফেলে, এরপর আমরা একলা হয়ে যাই।“

জিনাত আপা লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, টেনে টেনে বলেন,

“বইন, সবই তো ঠিক ছিল, কিন্তু আমি কিছু ভুল করে ফেলছিলাম। ওদেরকে আমি খুব গাল-মন্দ করতাম, আর মারতাম খুব।“

“বলেন কি? এদেশে বাচ্চাদের গায়ে কেও হাত তোলে? শুধু এই দেশে না, এখনকার যুগে আর বাচ্চাদের পিটায় না কেও। একথা জানলে সোশ্যাল ওয়ার্কারের লোকেরা এসে আপনার বাচ্চা নিয়ে চলে যেত, জানেন সেকথা?“

আমি আঁতকে উঠি, জিনাত আপাকে দেখে কখনো এতোটা রুক্ষ আর মেজাজী মনে হয়নি। ধর্মপ্রাণ একজন মানুষ, স্বামীটা নিরীহ ধাঁচের, পোশাকে রীতিমতো বাঙ্গালিয়ানা স্বভাবের। জিনাত আপা একদিন সব ভেঙ্গে বলেন আমাকে। ডিভি নিয়ে আমেরিকায় উনারা যখন এসেছিলেন ছেলেদুটো তখন ছোট। এখানের স্কুলে ভর্তি হয়ে তারা মেধার পরিচয় রাখতে শুরু করে। বাধ্য এবং মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও তারা তাদের মায়ের হাতের পিটুনি খেত। কারণ গুরুতর কিছুই ছিল না। জিনাত আপার স্বামীর একলার ইনকাম যথেষ্ট ছিল না নিউইয়র্কের মতো বড় শহরের জন্যে। তার উপর সেই আয়ের একটা বড় অংশ চলে যেত বাংলাদেশে। দেশের বাড়িতে দালান উঠত, আত্মীয়ের বিয়ে হত, ভাইয়ের ছেলেদের পড়াশোনার খরচ হত। অথচ আমেরিকায় জিনাত আপাদের হাত-পা মেলে একটু হাসি আনন্দ করে দিন কাটত না। একসময় বাধ্য হয়েই আয় বাড়ানোর জন্যে জিনাত আপা কাজ শুরু করে। ছেলেদুটোর তখন উঠতি বয়স, তাদের আরো সময় দেয়া উচিত, কথা বলা উচিত। সারাদিন বাইরের কাজ শেষে জিনাত আপা যখন শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরতো তখন বাচ্চাদের অবুঝ আবদার আর দস্যিপনা তাকে স্বস্তি দিত না। এলোমেলো সংসার আর জমানো কাজের পাহাড় দেখে তিতিক্ষে জ্বলে উঠতেন তিনি। ছেলেদের ছোটখাট দুষ্টামিতে চিল্লিয়ে গালি দিতেন, কখনো গায়ে হাত তুলে ফেলতেন। এখানেই ছিল উনার চরম ভুল, যা পরবর্তীতে ছেলেদের মনে এক বিশাল অনাগ্রহের সৃষ্টি করেছিল। ছেলেরা বড় হল, ভালো রেসাল্ট করে নামকরা কলেজে গেলেও বাবা-মা’র সাথে দূরত্ব বাড়িয়ে দিল। বড় ছেলে ইউ এস আর্মিতে জয়েন করার কারণে ট্রেইনিং আর পোষ্টিং নিয়ে সেই যে বাড়ির বাইরে পা দিল আর কোনদিন বাড়ি ফিরলো না। ছোট ছেলে গ্রাজুয়েশন করার সময় ডরমে গেল, খুব অল্প বাসায় আসতো। একই শহরে তারা থাকে কিন্তু দেখা হয় না, অল্প দেখায় বাবা-মা’র মন ভরে না।

আমি একদিন জিজ্ঞাসা করলাম,

“আপা, ওদেরকে কোনদিন নরম স্বরে বুঝিয়ে বলেন নাই? নিজের দোষ স্বীকার করে সরি বলেন নাই? এদেশের বাচ্চারা কিন্তু সরি বলাতে খুব খুশি হয়।“

“বলেছিলাম, অনেক কেঁদেছিলাম একসময়। কিন্তু আমাকে “ড্রামা কুইন” বলেছিল এজন্যে। ওরা বিশ্বাস করতে চায় না যে আমি ওদের কথা ভেবে কষ্ট পেতে পারি।“

এখন জিনাত আপা আর উনার স্বামী দুজনেই কাজ কমিয়ে দিয়েছেন। দুই বেডরুমের একটা ভাড়া বাসায় থাকেন, সব বাঙ্গালি অনুষ্ঠানে জমায়েত হন। কালে ভাদ্রে ছেলেদুটো কল দেয়, তাঁরা যেন ভিন গ্রহের মানুষ। উনাদের আর্থিক কষ্ট নেই কিন্তু বুক জুড়ে আছে হাহাকার, যা অন্যকে দেখানো মুশকিল। 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন