https://www.prothomalony.com/
6041
opinion
সব রেকর্ড ভেঙ্গে ভয়ংকর হচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছিলেন, আগস্ট হতে যাচ্ছে ভয়ংকর। আশঙ্কাকে সত্যি প্রমাণ করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে রোগী ভর্তি হওয়ার নতুন রেকর্ড হয়েছে দেশে। ঠিক সেদিনই খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শঙ্কা জানিয়ে বলছে, আগস্ট মাসেই রেকর্ডসংখ্যক ডেঙ্গু শনাক্ত হতে পারে। আগস্ট মাসে এসেও ডেঙ্গু সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে, যা দেশে ডেঙ্গুর অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করতে পারে।
২০২৩ সালের ৫ অগাস্ট পর্যন্ত, ৮,৮৮৬জন শিশুসহ, ৬৩,৯৬৮টিরও অধিক ডেঙ্গুর কেস রিপোর্ট করা হয়েছে। এরমধ্যে এখন পর্যন্ত ৩০৩জনের বেশি ব্যাক্তির মৃত্যু হয়েছে, যার মাঝে ৪৫জন ১৫-বছর বা তার চেয়ে কমবয়সী শিশু। চলমান বর্ষা মৌসুমের কারণে, ২০২৩-এর আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলে নিরাশাজনক ধারণা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে এবার ডেঙ্গুর সংক্রমণ ২০১৯ সালকে ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এমন রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। এছাড়াও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন কিন্তু হাসপাতালে যাননি, এমন আরো কয়েক লাখ রোগী ছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। ওই সময়ে কেস রিপোর্ট ছিল এক লাখ, কিন্তু কেস ছিল ৮-১০ লাখের মতো। এবার একটা সম্ভাবনা আছে যে ওই সংখ্যাটাকেও ক্রস করে যায় কিনা।” এবছর এখনো পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ। বর্তমানে ডেঙ্গু সংক্রমণ মৌসুমের পিক-এ বা শীর্ষে রয়েছে। এই অবস্থা আগামী অগাস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতেই থাকবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত ডেঙ্গু সম্পর্কিত দৈনিক তথ্যও অবশ্য একই আভাস দিচ্ছে। এই তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই মৃত্যুর সংখ্যা ২০১৯ সালকে ছুঁইছুঁই করছে। এরইমধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৩৮৯ জন। আর ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৭৯ জন।
দেশে চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশকে অবশ্যই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে বলে পরামর্শ দিয়েছেন এক বিশেষজ্ঞ। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। এডিস মশাবাহিত রোগটির প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে মশা দমনের ওষুধ ব্যবহার এবং ফুলহাতা কাপড় পরিধানের মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে তারা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৫,৪১১ জন। অন্যদিকে, সুস্থ হয়েছেন ৭৫,২৮০ জন। যেকোনো বছরের তুলনায় সংখ্যাটি এ সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। সাধারণত আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসকে ডেঙ্গুর প্রকোপের পিক টাইম ধরা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ষাটের দশকে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) সর্বপ্রথম ডেঙ্গু ধরা পড়ে। তখন “ঢাকা জ্বর” নামে পরিচিত ছিল। ২০১০ সালে এসে মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষার সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, অত্যধিক বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা, বন্যা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ঋতুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়ার মতো অন্যান্য মশাবাহিত রোগের সংক্রমণের জন্য বাংলাদেশের জলবায়ু পরিস্থিতি আরও অনুকূল হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এবং মৃত্যুহার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
চলতি বছরে বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রমণ, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা এবং মৃত্যুহার গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। এ জন্য মশার বংশবিস্তারে বাংলাদেশের অনুকূল পরিবেশকে দায়ী করেছে সংস্থাটি। ১১ আগস্ট শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ডব্লিউএইচও। এতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত সেখানে ৬৯ হাজার ৪৮৩ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এ সংক্রান্ত মৃত্যু হয়েছে ৩২৭টি। যার মধ্যে ৬২ শতাংশ শনাক্ত এবং ৬৩ শতাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে জুলাই মাসে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুহার বেড়ে ০.৪৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত ৫ বছরের তুলনায় অনেক বেশি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে বর্তমান ডেঙ্গুর বৃদ্ধি অস্বাভাবিক এবং আগের বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। এই ঢেউ শুরু হয়েছিল জুনের শেষের দিকে। আগের বছরের তুলনায় এই বছর এখন পর্যন্ত মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রাক-বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার জরিপে দেখা যায়, মশার ঘনত্ব এবং সম্ভাব্য হটস্পটের সংখ্যা গত পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। উচ্চ তাপমাত্রা এবং উচ্চ আর্দ্রতা, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের প্রেক্ষাপটে কারণে সারা বাংলাদেশে মশার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ডব্লিউএইচও’র তথ্য মতে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে চলতি বছর ২০২৩ সালের মে মাস থেকে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর অস্বাভাবিক বিস্তার শুরু হয়েছে; যা এখনও অব্যাহত আছে। ২০০০ সাল থেকে রেকর্ড করা তথ্য অনুযায়ী একই সময়ের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ।
অন্যান্য রোগের মতো ডেঙ্গুর কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। সময়মতো রোগ শনাক্ত, গুরুতর ডেঙ্গু সংক্রমণের লক্ষণ যেমন গুরুতর পেটে ব্যথা, ক্রমাগত বমি, দ্রুত শ্বাস নেওয়া এবং জ্বর কমার পর মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া এসব লক্ষণ শনাক্ত এবং চিকিৎসাই হলো এ রোগে মৃত্যুর হার কমিয়ে ১% এর চেয়ে নিচে নামিয়ে আনার মূল উপায়।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন