https://www.prothomalony.com/

5999

literature

সাহিত্য

শুদ্ধ শিল্পের নিবিড় চর্চায় ঊনবাঙাল এর ৩৯তম সভা

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৩ ১২:৫৪

জাতির সংস্কৃতি ও সমাজ জীবনের বাস্তব চিত্র সাহিত্যের মাধ্যমে উঠে আসে বলেই সাহিত্যকে বলা হয় জাতির দর্পণ। পৃথিবীতে সব জাতির অস্তিত্বেই মিশে আছে সাহিত্য। আমাদেরও আছে সাহিত্য। তেমনি শুদ্ধ শিল্পের নিবিড় চর্চায় ১২ আগস্ট শনিবার ঊনবাঙালের ৩৯তম সভা অনুষ্ঠিত হলো জ্যামাইকার স্টার কাবাবে। যথারীতি বিকেল ৫টায়। 

স্বরচিত কবিতা পাঠ সহ-গল্প, প্রবন্ধ, পুঁথিপাঠ, মুক্ত গদ্যের পাঠ এবং পঠিত লেখাগুলোর ওপর আলোচনা নিয়ে ঊনবাঙাল-এর সাহিত্য অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন লেখক, নারী উদ্যোক্তা মুক্তি জহির। 

সভার শুরুতে ছিল ৩০ মিনিটের একটি বিষয়ভিত্তিক আলাপচারিতা। আজকের বিষয় ছিল-সাহিত্যে নৈতিকতার অবস্থান। সাহিত্যে দর্শন নিয়েও আলোচনা হয়। নির্ধারিত আলোচক ছিলেন মাহমুদ রেজা চৌধুরী এবং কাজী জহিরুল ইসলাম। আলাপচারিতা সঞ্চালনা করেন কবি ও আবৃত্তি শিল্পী সুমন শামসুদ্দিন। দর্শকদের মধ্য থেকে বন্যা মির্জা, তাসের মাহমুদ এবং ইমাম চৌধুরী আলোচনায় অংশ নেন। 

সাহিত্যে নৈতিকতার অবস্থান নিয়ে মাহমুদ রেজা চৌধুরী বলেন, "যে কাজটা আমি আমার জন্য অনৈতিক মনে করবো বা অন্যায় মনে করবো, সেটা অপরের জন্যও একইভাবে মনে করা হবে। ধরুন, আমাকে কেউ গালি দিলে বা সমালোচনা করলে আমার খারাপ লাগে, এই একই বিষয়টা অন্যের ক্ষেত্রেও ভাবতে হবে। লেখকের স্বাধীনতার বিষয়টা যেমন সত্য, একইভাবে পাঠকের স্বাধীনতা, ইচ্ছা, গ্রহণযোগ্যতাও সত্য। আমি যা খুশি তা যদি লিখতে পারি তবে যা খুশি তা শুনতেও পারি। এখানে একটা নৈতিকতার বিবেচনা আছে। অর্থাৎ যা নীতিবহির্ভূত আমার কাছে তা অন্যের কাছেও নীতিবহির্ভূত হতে পারে।"

কাজী জহিরুল ইসলাম বলেন, "একটা অভিযোগ আছে যে, নৈতিক সাহিত্য কম রচিত হচ্ছে। যেকারণে শিশুদের সচ্চরিত্র গঠন ভালো হচ্ছে না। আজ থেকে চল্লিশ পঞ্চাশ বছর আগে বা তারও আগে যারা প্রাইমারি স্কুল থেকে এমন কিছু গল্প কবিতা পড়তো যা পড়ে তারা একটা সচ্চরিত্র গঠন করতে পারত, সেই কাজটি আমরা করবো কিনা, তা একটি বিষয়। আমার মনে হয় স্যোসিওকালচারাল একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে, কেন ক্রমশ লেখকরা সদুপদেশ দেয়ার মতো সাহিত্য রচনা থেকে বেড়িয়ে আসছে।" এরপর তিনি প্রাসঙ্গিক বিষয়টি নিয়ে আরো বিস্তারিত কথা বলেন। 

সাহিত্যে উপদেশ সম্পর্কে মাহমুদ রেজা চৌধুরী বলেন, "উপদেশ যেন আদেশ না হয়। নির্ভর করে আপনি কিভাবে আপনার প্রোফেশনালিজম, বিষয় বা মতামতকে উপস্থাপন করছেন।" 

এভাবেই প্রাণবন্ত এ আলোচনায় নৈতিকতার ধারণা, দেশে দেশে এর ভিন্নতা এবং সাহিত্যে এর প্রয়োগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় উঠে আসে। সঞ্চালক সাহিত্যে পরকিয়া প্রেম বিষয়ক এক প্রশ্নের অবতারণা করলে আলোচনাটি কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং দর্শকদের মধ্য থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়ামূলক মন্তব্য উঠে আসে। 

আগস্ট বাঙালির শোকের মাস। এই মাসে বাংলা ভাষার চারজন প্রধান কবি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, তারা হলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবি শামসুর রাহমান এবং কবি শহীদ কাদরী। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে এই চার কবির কবিতা থেকে আবৃত্তি করার মধ্য দিয়ে ঊনবাঙাল তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এই পর্বটি পরিচালনা করেন মুক্তি জহির নিজেই। তিনি প্রয়াত চার কবির জীবন ও কীর্তি পড়ে শোনান, পরে আবৃত্তি শিল্পীরা তাদের কবিতা থেকে পাঠ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ করে "সাধারণ মেয়ে" কবিতাটি পড়েছেন বন্যা মির্জা এবং "হঠাৎ দেখা" পড়েছেন আহসান হাবীব। কাজী নজরুল ইসলাম স্মরণে "মানুষ" কবিতাটি পড়েছেন সুমন শামসুদ্দিন এবং "নারী" কবিতাটি পড়েছেন মোঃ নজরুল ইসলাম। শামসুর রাহমানের "আসাদের শার্ট" কবিতাটি পড়েছেন ফরিদা ইয়াসমিন এবং শহীদ কাদরীর "তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা" পাঠের মধ্য দিয়ে তৃতীয় স্বরচিত কবিতা পাঠের শুরু করেন নাসিমা আখতার ও "সঙ্গতি" কবিতাটি পড়েন মাহফিল আলী। 

এ ছাড়া তৃতীয় পর্বে ওয়াহেদ হোসেন, বাবু জামান অন্যান্য কবির কবিতা আবৃত্তি করেছেন। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট ট্রাজেডির ওপর স্বরচিত পুঁথি পাঠ করেছেন ধুপ শিখা। নিজের লেখা কবিতা ও গদ্যাংশ পড়ে শুনিয়েছেন এইচ বি রিতা, মিয়া এম আসকির, সুলতানা ফিরদৌসী, মোশাররফ হোসেন, সৈয়দ হাশমত আলী, ইমাম চৌধুরী, তাসের মাহমুদ, সৈয়দ কামরুল, সৈয়দ রাব্বী, কাওসার চৌধুরী, মাহমুদ রেজা চৌধুরী, ফাহমিদা ওয়াদুদ প্রমূখ। তৃতীয় পর্বটি সঞ্চালনা করেন ঊনবাঙালের অন্যতম সদস্য ইমাম চৌধুরী। 

ঊনবাঙাল সভার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ এর শেষ পর্ব। এই পর্বে কবি কাজী জহিরুল ইসলাম পঠিত লেখাগুলোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরে আলোচনা করেন। তিনি কবিদের কিছুকাল গভীর অভিনিবেশের সঙ্গে ছন্দে কবিতা লিখতে পরামর্শ দেন। অনুষ্ঠানে যারা শুদ্ধ ছন্দের কবিতা উপহার দিয়েছেন তিনি তাদের নাম উল্লেখ করে প্রশংসা করেন এবং অন্যদের তা অনুসরণ করতে বলেন। কবিতায় রহস্যময়তার ঘোর তৈরি করতে বলেন, চিত্রকল্প নির্মাণের পরামর্শ দেন এবং সততার সঙ্গে কবিতার চর্চা করতে বলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি কবিতায় "নিমগ্ন" হওয়া এবং নিজেকে "সমর্পণ" করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন।

মূলত গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনা সাহিত্য সমৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। কেবল লিখে গেলে আর প্রশংসা কুড়ালেই সেটা সমৃদ্ধ সাহিত্য চর্চা নয়। লেখক কবি অবশ্যয়ই জানেন তিনি কি লিখছেন এবং কেন লিখছেন। তবে গঠনমূলক আলোচনা তাদেরকে আরো সতর্ক করে যে, তাদের শিল্পশৈলীগুলো মূলত ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে কী উপহার দিচ্ছে। আলোচনামূলক এমন সাহিত্য চর্চা নিয়েই ঊনবাঙান এগিয়ে চলছে তার আপন লয়ে। উপস্থিত লেখক কবিদের অনেকেই এই আলোচনা পর্বটিকে নিজেদের সাহিত্যচর্চার একটি সমৃদ্ধশালী ধাপ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। 

ঊনবাঙাল-এ সবার প্রকাশিত বই প্রদর্শনীর ব্যবস্থা ছিল। সাথে ছিল চা, পুডিং ও বিরিয়ানির ব্যবস্থা। ডায়াসে কবিতা পাঠের ব্যবস্থার পাশাপাশি শারীরিক সঙ্কটে থাকাদের জন্য বসে কবিতা পাঠের বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। 

চমৎকার এক মনোরোম পরিবেশে অবশেষে একঝাঁক লেখক কবির উপস্থিতি ও বিভিন্ন পর্বে অংশগ্রহণের মাধমে শেষ হয় ঊনবাঙাল এর সাহিত্য সভা। 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন