https://www.prothomalony.com/

5754

opinion

অভিমত

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৩ ১৪:২৯

অকুতোভয় তাজউদ্দীন আহমদ- দুঃখিত আমরা  ভুলে গেছি!
২৩ জুলাই স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিস্মরণীয় নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদের ৯৮ তম জন্মদিন। ১৯২৫ সালের এই দিনে (২৩ জুলাই) গাজীপুরের কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন ছিলেন একাধারে দূরদর্শী নেতা এবং দক্ষ প্রশাসক। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের দায়িত্ব যেমন অত্যন্ত সুচারুভাবে পালন করেছিলেন তিনি। তেমনি তার নেতৃত্বগুণেরও ছিল মোহনীয় ও জাদুকরী শক্তি। তার আদর্শের প্রভাব মুহূর্তেই বশ করে নিত দলীয় কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা থেকে সাধারণ মানুষকে। আজীবন আদর্শের প্রতি এমন অটল থাকার উদাহরণ অতি বিরল। দেশের জনগণ আর জনগণের ভালোবাসাই ছিল তার মূল শক্তি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এক ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, 'মুছে যাক আমার নাম, তবু থাকুক বাংলাদেশ।'তাজউদ্দীন আহমদ ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ১৯৬৬ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ দেশের জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে।আজীবন সংগ্রামী রাজনীতিবিদ ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম মহানায়ক। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি করতেন তিনি। ১৯৪৩ সালে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার পরের বছরই ১৯৪৪ সালে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের (বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তাজউদ্দিন।

পূর্ব-পাকিস্তান যুবলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত এ সংগঠনের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক ছিলেন। পরে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।১৯৬৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ১৯৬৬ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভারতে যান এবং প্রবাসী সরকার গঠনের চিন্তা করেন তাজউদ্দীন। ৪ এপ্রিল দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাজউদ্দীনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়। ১০ এপ্রিল তিনি আগরতলায় সরকার গঠন করার উদ্যোগ নেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধকে সফল সমাপ্তির দিকে নিয়ে যেতে তার অসামান্য অবদান ছিল।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু খুন হওয়ার পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় আরও তিন নেতা আবুল হাসনাত মোহাম্মদ (এএইচএম) কামরুজ্জামান, এম মনসুর আলী ও সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাজউদ্দীনকে হত্যা করা হয়।বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারে তখন যুদ্ধের পুরো সময়টাতেই তাজউদ্দীন আহমদ নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাজউদ্দীন আহমদের পরিকল্পনা, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণ নেতৃত্বেই মাত্র নয় মাসেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধ পরবর্তীকালীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনেও বঙ্গতাজ অনন্য সব কর্মপরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। তাজউদ্দীনের সততা এতটাই আকাশছোঁয়া ছিল যে, দেশ স্বাধীনের পর কারামুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফিরে আসলেন তখন সঙ্গে সঙ্গেই বঙ্গতাজ যুদ্ধ পরিচালনায় যত আয়-ব্যয় হয়েছে, এবং বাকি থাকা কানাকড়িটা পর্যন্তও বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দিলেন। তিনি চাইলে সেটা নাও করতে পারতেন।

এমন সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম বর্তমানে কয়জন রাজনীতিবিদ লালন করেন? অথচ আমরা দেখি, বর্তমানে রাজনীতিবিদরা সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম বিসর্জন দিয়ে কি পরিমাণ দুর্নীতিগ্রস্ত আর অনিয়মে জর্জরিত। রাজনীতিবিদদের অভিধানে এখন এসব শব্দ পাওয়া যায় না। বর্তমানে রাজনীতিদদের অবস্থা দেখলেই মনে হয়, রাজনীতি মানেই ব্যবসা বা অনিময়-দুনীর্তির আখড়া। বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীনরা কেমন রাজনীতিবিদ ছিলেন আর বর্তমান রাজনীতিবিদদের চরিত্র কেমন—কোনভাবেই যেন কোন কিছুতে উত্তর মেলে না! বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার পথে এখন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সে অনিয়ম-দুনীর্তি আর দেশপ্রেমহীনতা।

বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে একজন তাজউদ্দীন আহমদ। নৈর্বেক্তিক ইতিহাস পাঠ আমাদের হয়ে উঠে না। ইতিহাসের বর্ণনায়, আমরা নিজেদের দেখি। নিজেদের মতো করে আমরা ইতিহাস রচনা করি। একটি দেশের জন্মের বিশাল প্রেক্ষাপট। অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে, অনেক রাজনৈতিক টানাপোড়নের মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হয়েছে।

২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত জাতীর উপর হামলা করেছিল পাক হানাদার বাহিনী। বাঙ্গালীর স্বাধীনতার মুল নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হলেন। এমন কঠিন সময়ে জাতীয় নেতাদের স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের কোন পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। এ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কোন পূর্ব নির্দেশনা ছাড়াই জাতীয় নেতারা মুজিব নগর সরকার গঠন করতে পেরেছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদের মতো নেতা না থাকলে কী হতো, তা আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অনুমানই করা যেতে পারে।
কোন দেশের স্বীকৃতি নেই। যুদ্ধের কোন প্রস্তুতি নেই। নিরস্ত্র জাতিকে নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার এমন সিদ্ধান্ত নিতে তাজউদ্দীন আহমদরা বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতে মুজিব নগর সরকারকে লড়াই করতে হয়েছে নানামুখী ষড়যন্ত্রের। ঘাপটি মেরে বসে থাকা একটি চক্র মুক্তিযদ্ধ চলাকালীন সময়েও আপোষ করতে চেয়েছে। এমন আপোষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন সেদিন থমকে যেতে পারতো। এমনকি বিজয়ের পরেও সমস্ত ষড়যন্ত্র তাজউদ্দীন মোকাবেলা করেছেন একজন দক্ষ দেশ নায়কের মতো।  
 
যতদিন বাংলাদেশ টিকে থাকবে ততদিন তাজউদ্দীন ইতিহাসের আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবেন। অথচ বঙ্গতাজ যেভাবে সমাদৃত হওয়ার দাবি রাখেন এখানে এখন তাঁকে সেভাবে তুলে ধরা হয় না, প্রকাশ করা হয় না। এমনকি তার জন্মদিবস ও মৃত্যুদিবসটুকুও ওভাবে পালিত হয় না। প্রজন্ম জানে না জাতীয় এ বীরের বীরত্বগাঁথা। কেন ইতিহাস নিয়ে এমন বিধ্বংসী খেলা, কেন এমন গোলকধাঁধা! কে দিবে বা নিবে সে দায়? তবে ইতিহাসই একসময় অনিবার্যভাবে খুলে দেয় তার বন্ধদরজা। আর ইতিহাস কাউকে কখনও ক্ষমা করে না, অতীতেও করেনি আর ভবিষ্যতেও না। 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন