https://www.prothomalony.com/

5684

opinion

অভিমত

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৩ ০৩:২৬

নিউইয়র্ক বাংলা আন্তর্জাতিক বইমেলা

'যত বই, তত প্রাণ' এই শ্লোগান নিয়ে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলা বইমেলার ৩২তম আসর। ১৪ জুলাই শুক্রবার জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে এই বইমেলা শুরু হয়েছে।

সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশীদের মধ্যে বাংলা বইমেলা ভিত্তিক একতা সংস্কৃতি তৈরী হয়েছে। নিউইয়র্কে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ও বাঙ্গালীর চেতনা মঞ্চ কাজটি শুরু করে। এখন তার ব্যাপ্তি ঘটেছে। তিন দশক ধরে একটি বেসরকারী সংগঠন বাংলা ভাষা সংস্কৃতিকে যে মমত্ব নিয়ে সাফল্যের সাথে এগিয়ে নিয়ে চলেছে তা অনুকরণীয়।

মুক্তধারা ও পুঁথিঘর প্রকাশনীর স্বত্ত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনে তার প্রকাশিত বই মাটিতে চট বিছিয়ে বিক্রি করেন। তিনি সেগুলোতে বিশেষ ছাড়ও দেন। ১৯৭৫ সালে তিনি বাংলা একাডেমির কাছে বই বিক্রির অনুমতি চান। ১৯৭৮ সালে বইমেলা পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থমেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৮৫ সালে এই বইমেলার নাম দেওয়া হয় ‘একুশে বইমেলা’। ১৯৯৫ সাল থেকে বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগে বইমেলার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। বইমেলাকে সফল করতে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের ভূমিকাও অপরিসীম। এটি উদ্যোক্তা হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের বইমেলা বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

          ১৯৯২ সালের পূর্বে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বইরে কোথাও বাংলা বইমেলা হয়েছে বলে জানা যায় নাই।  আজ সারা পৃথিবীতে বাঙালি সাহিত্য-সংস্কৃতির যে প্রচলন শুরু হয়েছে তা ধারণ করতে হবে, যার প্রচলিত অর্থ হলো বই। সে বই শুধু হরফের অক্ষরে নয়, মনেও লেখা হয়।

বইমেলা নিয়ে নিউইয়র্কে বাঙালি–অধ্যুষিত এলাকায় পোস্টারিং হয়। বসে কবি-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মীদের আড্ডা। পুরো শহরে বইমেলার আমেজ। বইয়ের মাধ্যমে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও কৃষ্টিকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এ আয়োজন এখন শুধু নিউইয়র্কেই সীমাবদ্ধ নেই, ওয়াশিংটন ডিসি সহ অন্যত্র বইমেলা কেন্দ্রিক স্বদেশীদের একটি কোলাহল প্রতিবছরই হয়ে আসছে।

এবারের মেলায় যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও কলকাতা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও লন্ডন থেকেও লেখক ও পাঠকরা যোগ দিয়েছেন । এতে অংশ নিয়েছে স্বনামধন্য সব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। ৩২ বছর পেরিয়ে এসে এই আয়োজন আন্তর্জাতিক বইমেলায় পরিণত হয়েছে। এই বই মেলা প্রবাসে বাংলা ভাষাভাষি মানুষের অংশগ্রহণে এটি অন্যতম বড় একটি আয়োজন।

নিউইয়র্ক বইমেলা আসলে একটি মিলনকেন্দ্র। মূলত বাংলা একাডেমি, কলকাতার মেলার পর নিউইয়র্কের এই বইমেলাই বাংলা ভাষার অন্যতম বইমেলা। ফলে এর আকর্ষণ অন্যরকম। দেশের বাইরে প্রবাসীদের সব আয়োজনেরই একটা উদ্দেশ্য থাকে বুকের মাঝে লালিত দেশটাকে নূতন করে ফিরে দেখা।  বইমেলা সেই আমেজের ই প্রতিফলন। বইমেলার উদ্দেশ্য বাংলা ভাষা,  বাংলা সাহিত্য,  বাংলার সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা, ৩২ বছরে  নিউইয়র্ক বইমেলা সেই কাজটিই  করে যাচ্ছে। ৩-৪ দিনের এই মেলাটি এখন একটি উৎসবে পরিনত হয়েছে। এই মেলায় আসলে নূতন বাংলাদেশ কে খুঁজে পাওয়া যায়।

খুব চেনা পরিবেশ, শত প্রাণের উদ্দীপ্ত উপস্থিতি, নতুন বইয়ের গন্ধে প্রতিবছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় একুশে বই মেলা। ভাষা শহিদদের স্মরণে আয়োজিত বাঙালির প্রাণের মেলা অমর একুশে গ্রন্থমেলা। এই গ্রন্থমেলা বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রেরণার উৎস। বাংলা একাডেমির উদ্যোগে একাডেমি প্রাঙ্গণে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বইমেলার ঐতিহ্যমন্ডিত প্রাঙ্গণ এটি। সময়টিতে বাংলা একাডেমী সরব হয়ে উঠে বইপ্রেমীদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে।  অমর একুশে গ্রন্থমেলা বাঙালির বৃহত্তম জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।

৩২ বছরে নিউইয়র্ক বইমেলার অর্জন হলো এই মেলাটিও বাৎসরিক আয়োজনে পরিনত হয়েছে। সবাই এইমেলার জন্য অপেক্ষা করে থাকে নতুন বই পাওয়া আর প্রতি বছর বাংলাদেশকে নূতন করে পাওয়ার আশায়। মেলাকে ঘিরে নতুন লেখক তৈরি হয়েছে, পাঠক তৈরি হয়েছে। সাহিত্য নিয়ে, ভাষা নিয়ে, দেশকে নিয়ে আলোচনা হয় গ্রুপ আড্ডায় মেলার আনাচে-কানাচে। এই মেলার সবচেয়ে বড় অর্জন যেটা তা হলো নূতন প্রজন্মের কাছে বাংলাভাষাকে পৌঁছে দেওয়া। মেলা তৈরি করে দিয়েছে প্রবীন ও নবীন প্রজন্মের জন্য একটা প্লাটফর্ম, যেখানে একসাথে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নবীন আর প্রবীন প্রজন্মের মাঝে দেওয়া নেওয়ার সম্পর্ক তৈরি  হয়েছে, এর ফলে একটা নতুন মেলবন্ধন গড়ে উঠেছে। নিউইয়র্ক বইমেলা প্রবাসে মানুষের মনের মধ্যে স্বদেশ চিন্তা , স্বজাত্ববোধ, স্বসংস্কৃতি এবং ভাষা ও শিল্প কে নুতন করে বুঝার, জানার ও গর্ববোধ করার প্রেরনা যোগায়। মেলার আয়োজকদের মধ্যে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে দূরদূরান্ত থেকে আসা বন্ধু বান্ধব দের মধ্যে গর্ববোধটা সঞ্চার করছে এই মেলা।

এবারে নিউইয়র্কে বইমেলার শুরুর দিনেই এর নাম পরিবর্তন করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ‘নিউইয়র্ক বাংলা বইমেলা’র নাম এখন থেকে ‘ নিউইয়র্ক বাংলা আন্তর্জাতিক বইমেলা’ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্ট সেন্টারের বীর প্রতিক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব.) ডা. সিতারা রহমানকে পাশে নিয়ে কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান ফিতা কেটে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ সময় মেলা কমিটির সকল কর্মকর্তা সেখানে ছিলেন। মিলনায়তনের ভেতরের মূলমঞ্চে উঠার সময় ৩২ বছরের মেলার মূলপর্বের আগে ৩২ জন খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিক-লেখক-প্রকাশককে উত্তরীয় পরিয়ে দেয়া হয় এবং তারা প্রদীপ প্রজ্বলন করেন।  

বইমেলার প্রধান অতিথি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্যে বীর প্রতিক খেতাবপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন (অব.) ডা. সিতারা রহমান  বলেন, ‘আমি এখানে এসে এতো আনন্দিত, খুশি এবং গর্বিত। মনে হচ্ছে যে, আমার বীর প্রতিক খেতাব পাওয়াটা বোধহয় স্বার্থকই হয়েছে। কারণ, এখানে এত বাঙালি-বাংলাদেশ, কলকাতা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রিলিয়া থেকে এসেছেন, সবারই একটি পরিচয়, তা হচ্ছে বাঙালি।’  

দেশের বাইরেও বাঙ্গালীর আত্মপরিচয়ের এ অহংকারের উচ্চারণ বইমেলায় দাড়িয়েই দেয়া যায়। নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বইমেলা সময়ের সব সমস্যা মোকাবেলা করে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যাবে। সময়ের সীমানা পেরিয়ে নতুনকে ধারণ করে নিউইয়র্কে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে যাবে এ বইমেলা, এমন প্রত্যাশা আমাদের এখনকার যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীদের।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন