https://www.prothomalony.com/
5332
entertainment
কবি যে অনুভব থেকে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে কবিতা রচনা করেন, একজন আবৃত্তিশিল্পী তা শ্রুতিগ্রাহ্য করে তোলেন। ১৭ জুন শনিবার নিউইয়র্কের উডসাইডের পি এস টুয়েলভ স্কুলের অডিটোরিয়ামে সুষমামণ্ডিত একটি পরিবেশে "পরশী কাব্য" কবিতার আসরটি শুরু হয়। আবৃত্তি শিল্পী জি এইচ আরজু নিউইয়র্ক শহরের ১৪ জন কবি, ছড়াকারের লেখা নিয়ে এ আসরটি বসান। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস-বিপা আসরটির আয়োজন করে। এতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন সংগীত শিল্পী সুপ্রিয়া চৌধুরী। মঞ্চসজ্জায় ছিলেন খ্যাতিমান ভাস্কর আকতার আহমেদ রাশা। তবলায় পিনাকপানি গোস্বামী, কিবোর্ডে মাসুদুর রহমান, মন্দিরায় আশিষ চৌধুরী এবং বাঁশিতে ছিলেন সৌগত সরকার হিল্লোল। নিবীড়ের শব্দব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাবিনা নীহার নীরু।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্মরণে বেনজির সিকদারের কবিতা "পিতা" দিয়ে কবিতার আসরটির শুরু হয়। এরপর সুপ্রিয়া চৌধুরীর আবেগময় কণ্ঠে "বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে তোমার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায়"-গানটি দর্শক স্রোতাদের আরো আবেগময় করে তোলে।

একে একে জি এইচ আরজু আবৃত্তি করতে থাকেন তাজুল ইমাম, তমিজউদ্দিন লোদী, কাজী আতিক, শামস আল মোমিন, মনজুর কাদের, খালেদ শরফুদ্দিন, মৃদুল আহমেদ, সোনিয়া কাদের, আনোয়ার সেলিম, মিশুক সেলিম, বেনজির শিকদার, আহমেদ ছহুল এবং মামুন জামিল এর কবিতা। এরই মাঝে সুপ্রিয়া চৌধুরীর কণ্ঠে দর্শক শ্রোতারা শুনতে পান "ও তোতাপাখিরে, শিকল খুলে উড়িয়ে দিব মাকে যদি এনে দাও, ঘুমিয়ে ছিলাম মায়ের কোলে কখন যে মা গেল চলে"-গানটি সহ আরো কয়েকটি গান।
জি এইচ আরজুর আবেগঘন কণ্ঠে সবার শেষের কবিতাটি ছিল এইচ বি রিতার লেখা "অচিন্ত্য।" এই কবিতাটি পড়তে গিয়ে তিনি শুরুতেই এইচ বি রিতার ব্যক্তি জীবনের কিছু শারীরিক সঙ্কট ও লড়াই নিয়ে কথা বলেন, যা দ্বারা তিনি অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের সমস্ত অর্গানগুলো ডোনেট করে দিয়েছেন কারো জীবনের প্রয়োজনে। এইচ বি রিতার লিভার ড্যামেজ হয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হওয়া, লাইফ সাপোর্ট থেকে শেষ মুহূর্তে অন্যের অর্গান নিয়ে মা ও সন্তানের বুকে ফিরে আসা এবং তার চলমান লেখালেখি, লড়াই নিয়ে জি এইচ আরজু কিছু কথা বলেন। তিনি বলেন, "আমি কবিতার আসরে এই প্রসঙ্গটা তুলে ধরার কারণ হলো, অন্যের অর্গান নিয়ে বেঁচে থাকা এইচ বি রিতার ঘটনা আমাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। মৃত্যুর আগে বা পরে আমরা চাইলে মানুষের প্রযোজনে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি। আজ ২৮ বছরের একজন মানুষের অর্গান নিয়ে এইচ বিতা ফিরে এসেছেন সন্তানের কাছে, তার মায়ের কাছে। যদি মৃত্যুর পর আমার কোনো একটি অর্গান নিয়ে কেউ বেঁচে থাকে, তবে আমিও বেঁচে থাকবো।"
শরীরের সমস্ত অর্গান ডোনেট করা জি এইচ আরজু বলেন, "আমি চাই আমার দেহটা শুয়ে থাকুক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনোএক টেবিলে, আর প্রজন্মের সন্তানেরা চারপাশ ঘুরে ঘুরে আলোকিত করুক চিকিৎসা বিজ্ঞান।"
দর্শক স্রোতাদের মনে দাগ কেটেছে জি এইচ আরজুর এমন আবেগময় আলোচনা। অনেকেরই চোখ ভিজে উঠে। অনেকেই লাঠিহাতে নিয়ে চলা এইচ বি রিতাকে দেখতে মরিয়া হয়ে উঠেন, তাকে জড়িয়ে ধরে আদর ও দোয়া দেন।
এরপরই রবীন্দ্র সঙ্গীতে মুগ্ধতা ছড়িয়ে অনুষ্ঠানটি শেষ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে রবীন্দ্র সঙ্গীত সাধনায় মনোনিবেশ করা দেশেবিদেশের সুনাম খ্যাত বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী সুপ্রিয়া চৌধূরী।

নিউইয়র্কের সবচেয়ে নিবেদিত প্রাণ সাংস্কৃতিক সংগঠন বিপা-যেটি বিগত ৩০ বছর যাবত পরম পরাকাষ্ঠায় আমাদের শিশুকিশোরদের শুদ্ধ সংস্কৃতির অনুশীলনের মাধ্যমে সোনার টুকরো ছেলেমেয়ে তৈরি করে চলেছে, সেই 'বিপা' আসরটির আয়োজন করে এই শহরের কবি ও আবৃত্তি শিল্পীদের কৃতজ্ঞতা নিংড়ে নেন।
কবিতা আবৃত্তি শৈল্পিক অভিব্যক্তির একটি রূপ যা কথ্য শব্দের শক্তির মাধ্যমে লিখিত কবিতাকে জীবন্ত করে তোলে। শ্রোতাদের সামনে একটি কবিতার উচ্চারিত উপস্থাপনা, এর ছন্দ, মিটার, স্বর এবং লেখকের আবেগের প্রতি মনোযোগ দিয়ে সেটাকে দর্শকস্রোতাদের সামনে তোলে ধরা-খুব সহজ কাজ নয়। আর এই জটিল কাজটিই খুব প্রাণবন্তভাবে করে থাকেন কবিতার জগতের এক পরিচিত মুখ জি এইচ আরজু। তাঁর কবিতার আসর বসলেই সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যান তাঁর নির্বাচিত বা নির্ধারিত কবিতাগুলো। কেবল শখের বশেই তিনি কবিতার আসর বসান না, তাঁর এই শৈল্পিক কাজটি কবিতার দরকারী বার্তাটুকুও বিলিয়ে দেয় স্রোতাদের কাছে।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় জন্মেছেন আবৃত্তি শিল্পী জি এইচ আরজু। দীর্ঘসময় নিউইয়র্ক শহরে কাটালেও বর্তমানে স্ত্রী সহবসবাস করছেন নিউইয়র্কের আপস্টেটের সিরাকিউসে। জি এইচ আরজু বাঙালি সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুকে অতিযত্নে বুকে ধারণ এবং লালন করে, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে জীবনের সিংহভাগ সময় অতিবাহিত করেছেন। জিএইচ আরজুর কবিতার সাথে সখ্য সেই ১৯৬৯ সালে ছড়াপাঠের মধ্য দিয়ে। ১৯৭৪ সালে তিনি প্রথম মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেন। ৮০-এর দশকের প্রথম দিকে শুরু করেন যাত্রাপালায় অভিনয়। দুই বছরে প্রায় ৩০টি পালায় অভিনয় করেছেন জি এইচ আরজু। তিন দশকের এই নিউইয়র্কের জীবনে অনেক মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি, যার মধ্যে দর্পন, সৎ মানুষের খোঁজে, আমার সন্তান আমার আঁচল, জনতার রঙ্গশালা এবং পুনর্মিলন রয়েছে।
বিনোদন থেকে আরো পড়ুন