https://www.prothomalony.com/

5180

opinion

অভিমত

বাংলাদেশের রাজনীতি কঠিন সমীকরনে

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৩ ০০:৪১

নির্বাচনের দিকে সময় যতই গড়াচ্ছে রাজনীতির মাঠ ততই কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও রাজপথের প্রধান বিরোধী দলের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে অস্থিরতা। বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় আওয়ামী লীগ। আর নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে বিএনপি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলন করছে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারতসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও দৌড়ঝাপ করছেন প্রতিদিন। এরই মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত ভিসা নীতি কঠিন সমীকরণে দাঁড় করে দিয়েছে দেশের রাজনীতিকে।
  তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপি যাই বলুক, পর্দার অন্তরালে নানা তৎপরতা চলছে। চলছে নানা আলোচনা। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বাংলাদেশের নির্বাচন ইস্যুতে বেশ তৎপর রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র শুধু ভিসা নীতি ঘোষণা করেই থেমে যায়নি, বাংলাদেশে নিযুক্ত সে দেশের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস প্রায় প্রতিদিনই কারো না কারো সঙ্গে বৈঠক করছেন। সর্বশেষ গতকালও প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদকবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। আগের দিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন। তারও আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করেন। আবার গতকাল বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠক করেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলির সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক শ্যামা ওবায়েদ।
অন্যদিকে ভিসা নীতি ঘোষণার সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। সেই একই অবস্থানের কথা প্রায়ই পুনর্ব্যক্ত করছে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল (এনএসসি), স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
থেমে নেই ভারতও। বিগত দুটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পাশে ভারত দাঁড়ালেও এবার সেভাবে না দাঁড়ানোর আভাস দিয়েছেন দেশটির বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ভারতের জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের প্রফেসর এবং দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক প্রফেসর শ্রীরাধা দত্ত স্পষ্ট করে বলেন, ‘ভারত সরকার আওয়ামী লীগের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দেন-দরবার করবে না’।
দেশটির আরেক বুদ্ধিজীবী সুবীর ভৌমিক তার সাম্প্রতিক দুটি আর্টিকেলে জানিয়েছেন, সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছিলেন দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর প্রধান সামন্ত গোয়েল। বাংলাদেশ ইস্যুতে দৌড়াদৌড়ি করছেন প্রনয় ভার্মা। এছাড়া কোন ধরণের আগাম ঘোষণা ও কর্মসূচি ছাড়াই হঠাৎ করেই বাংলাদেশ সফর করেন ভারতের সেনা প্রধান। বাংলাদেশ সফর করে গেছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
সুবীর ভৌমিক তার লেখায় জানান, নয়াদিল্লি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। তবে সেটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে। আগামী নির্বাচন, নির্বাচন পদ্ধতি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অনড় অবস্থান, দাবি আদায়ে বিএনপির আন্দোলন, দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-বিশ্লেষণ। এদিকে র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞার পর মার্কিন ভিসা নীতির কারণে সর্বমহলেই সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক। প্রশাসনের কর্মকর্তা, পুলিশ এখন যেকোন ধরণের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি এড়িয়ে যেতে চায় বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। ফলে নির্বিঘ্নে  রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ সৃষ্টি হবে বিরোধীদের।
এরই মধ্যে বিএনপিকে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে আলোচনার সৃষ্টি করেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু। গত মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির সঙ্গে সংলাপের বিষয়ে নাকচ করে দেয়ার পর হঠাৎ করে বিষয়টি আলোচনায় আনেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত ১৪ দলীয় জোটের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য। তিনি বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইস্যুতে মাঠের আন্দোলনে থাকা বিএনপির সঙ্গে সরকার আলোচনার দুয়ার খোলা রেখেছেন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে আওয়ামী লীগ এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তিনি বলেন, জাতিসংঘ কেন মধ্যস্থতা করবে? জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করবে এমন কোনো রাজনৈতিক সংকট এই স্বাধীন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত হয়নি। তথ্যমন্ত্রী ও সম্প্রচার মন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, আমির হোসেন আমু যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা নিয়ে সরকার, আওয়ামী লীগ এমনকি ১৪ দলের মধ্যেও কোনো আলোচনা হয়নি। 
 নিজের বক্তব্য থেকে ইউটার্ন দিয়েছেন আমির হোসেন আমু। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ৬ দফা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি বলেন, আলোচনার জন্য কাউকে বলা হয়নি, দাওয়াত দেওয়া হয়নি, আহ্বান করা হয়নি। কাউকে আহ্বান করার সুযোগ নেই।  বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ২০১৮ সালে আমাদের সঙ্গে ২ বার বসে যে কমিটমেন্টগুলো আওয়ামী লীগ সরকার করেছিল, তার কোনোটাই রক্ষা করেনি। তাই আওয়ামী লীগের ওপর আস্থা রাখার কোনো সুযোগ নেই। 
 রাজনৈতিক মহলে কেউ কেউ বলছেন, আমির হোসেন আমু আলোচনার প্রস্তাবটি রাজনীতির মাঠে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে হয়তো পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছে। সেক্ষেত্রে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে তার সঙ্গে আলোচনায় বসলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে সেটি বেগম খালেদা জিয়ার মাধ্যমেই হতে হবে। 
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়েছে, সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। এই সংকট নিরসনে জাতিসংঘের মধ্যস্থতার বিষয়ে কোন পক্ষ থেকেই এর আগে কিছু বলা হয়নি। যদিও ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত তাতে কোন সমাধান আসেনি। বিএনপি যদি সংলাপের নামে আন্দোলনের পথ থেকে সরে দাঁড়ায় তবে তা হবে তাদের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সংলাপ এটা বিএনপি’র জন্য আওয়ামীলীগের ফাতা ফাঁদ।
অবস্থাদৃষ্ঠে মনে হচ্ছে, সরকার বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন করার চেষ্টা করছে। এমনসব ব্যবস্থা বা বক্তব্য দেয়া হচ্ছে , যাতে বিএনপি নির্বাচনে আসে। সমঝোতার কোন ক্ষেত্রে প্রস্তুত হয়েছে , তা এখনও দৃশ্যমান নয়। চাপ আছে । এ চাপ শুধু সরকারের বেলায় , এমন মনে করারও কোন কারণ নেই। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও দলের জন্য , দেশের জন্য কোন ভালো ফল নিয়ে আসবে না । কার্যকর কোন গণ আন্দোলনও দলটি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের আগামীদিনের রাজনীতি ও আসছে জাতীয় নির্বাচনকে কঠিন সমীকরণের সামনে দাঁড় করে দিয়েছে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন