https://www.prothomalony.com/

5073

opinion

অভিমত

আমাদের সমস্যা অন্যরা নয়, নিজেরাই সমাধান করতে হবে

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৩ ০৯:৫৫

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে নির্বাচন যাতে সুষ্টু হয় তার জন্য চাপ দিচ্ছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। একটি স্বাধীন দেশের জন্য বিষয়টি গৌরবের নয়। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিরোধিতা মোকাবেলা করেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমেরিকার লোকজন বাংলাদেশের লড়াকু মানুষের পক্ষে সে সময় প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার অর্ধশত বছর চলে গেছে। নিজেদের স্বাধীন দেশকে শাসন করার যোগ্যতা অর্জন করার জন্য এ সময়টি যথেষ্ট। আমরা কি নিজেদের দেশকে নিজেরাই শাসন করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি।

নির্বাচনে অনিয়ম-জালিয়াতি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিকে যার যার অবস্থান থেকে স্বাগত জানিয়েছে দেশের বড় তিন রাজনৈতিক দল। বাইরে-বাইরে তারা এটা করলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মার্কিন এই পদক্ষেপে সন্তুষ্ট হতে পারেনি কোনো পক্ষই।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর গত বুধবার ঘোষণা দিয়েছে, বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের তারা ভিসা দেবে না। যারা গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের ভিসা দেওয়া হবে না। ভোটের অনিয়ম বলতে, ভোট কারচুপি, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, সহিংসতার মাধ্যমে জনগণকে সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার প্রয়োগে বাধা দেওয়া। এ ছাড়া বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল, ভোটার, সুশীল সমাজ বা গণমাধ্যমকে তাদের মতামত প্রকাশে বাধা দিলে তা-ও এর আওতায় পড়বে।

এই নীতির আওতায় কারা পড়বেন, তা-ও জানান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান ও সাবেক বাংলাদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সরকারপন্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য, আইন প্রয়োগকারী, বিচার বিভাগ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এর অন্তর্ভুক্ত হবেন।

এরপর ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের আমন্ত্রণে রাজধানীর গুলশানে তাঁর বাসায় গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার বৈঠক করেছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতারা। বৈঠকে ছিলেন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক সেলিম মাহমুদ ও কেন্দ্রীয় নেতা মো. আলী আরাফাত; বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ এবং জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু ও প্রেসিডিয়াম সদস্য রানা মোহাম্মদ সোহেল।

বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, যে বা যারা নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ সময় বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, মানবাধিকার, আইনের শাসন, গণতন্ত্রহীনতা, জীবনের নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা কারণে দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে এই সিদ্ধান্ত ভালো হলেও তা যথেষ্ট নয়। তবে আগামী দিনে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্ত সহায়ক হবে বলে মত দিয়েছে তারা।

তবে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৈঠক শেষে ফিরে গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, তারই প্রতিফলন ভিসা নীতি। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে এটি একটা বড় পদক্ষেপ। দল এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানায়।

আর বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগ নেতা আরাফাত বলেন, ‘আমরা এটাকে মেনে নিচ্ছি না, প্রত্যাখ্যানও করি না। তাই এটাকে পাত্তা দিচ্ছি না।’ তিনি আরও বলেন, বৈঠকে দলের পক্ষ থেকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। আমেরিকা কাউকে ভিসা দেবে কি দেবে না, এটা তাদের ব্যাপার।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটা সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন চায়। জাতীয় পার্টি এ ব্যাপারে একমত।

তিন দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ভিসা নীতি নিয়ে আলোচনা করেন। ওই বৈঠকের পর রাষ্ট্রদূত বলেন, নতুন ভিসা নীতি বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের অংশ। এটি বাংলাদেশের জনগণ, সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) সবার জন্য, যাতে করে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়।

আর রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকদের জানান, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি নিয়ে সরকার কোনো চাপে নেই। মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এসব নিয়ে কোনো চাপে নেই। আমাদের কোনো ব্যর্থতা নেই। বরং আমরা যা যা চাচ্ছি, সেই অনুযায়ী কাজ হচ্ছে।’

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নতুন মার্কিন ভিসা নীতির বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্তুষ্ট’ বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর।

২৫ মে বৃহস্পতিবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার এক প্রশ্নের জবাবে তাঁর দেশের এই অবস্থানের কথা জানান। ম্যাথু মিলার বলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্বাগত জানানোয় আমরা সন্তুষ্ট হয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, শান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তাকে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে স্থায়ী উপায় গণতন্ত্র। এ জন্যই আমরা এই ঘোষণা দিয়েছি। সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে আমরা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চাই।’

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্রিফিংয়ে ম্যাথু মিলারের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে বিরোধী দলকে যুক্তরাষ্ট্র অনুরোধ জানাবে কি না। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বলেন, ‘বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের কী করা উচিত বা করা উচিত নয়, সে বিষয়ে আমি কথা বলতে যাচ্ছি না। আমি বলব যে এই প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পক্ষে। এ জন্য আমরা নতুন এই নীতি ঘোষণা করেছি।’

মোদ্দা কথা হচ্ছে , আমরাই আমাদের সমস্যার সমাধান করবো। অন্যদের ডেকে এনে খবরদারী করার পরিণাম কখনো ভালো হয়নি। আবার যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ শক্তির সাথে কোন হেঁয়ালি করাও দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। বাংলাদেশের বিষয়ে মার্কিন অবস্থান নিয়ে যতই সহজ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন মহলের, বিষয়টি তত সহজ নয়। জল আরও ঘোলা হতে পারে। তা না হওয়ার জন্যই আমাদের নিজেদের সমস্যা নিজেদের মতো করে সমাধানে সবাই এগিয়ে আসবেন এ প্রত্যাশা।
 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন