https://www.prothomalony.com/
18520
new-york
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:৪৬
নিউইয়র্ক এমন এক শহর, যেখানে প্রতিদিন লাখো মানুষের পদচারণা, ব্যস্ত সাবওয়ে, ঝলমলে আকাশচুম্বী ভবন, কর্মচঞ্চল অফিস আর রাতভর খোলা থাকা রেস্তোরাঁর ভিড়। জীবিকার সন্ধানে, উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে কিংবা উন্নত ভবিষ্যতের আশায় বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন এই মহানগরে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, এখানে মানুষের অভাব নেই, সুযোগের অভাব নেই, জীবনের গতিও থেমে নেই। অথচ এই জনারণ্যের ভেতরেই নীরবে বেড়ে উঠছে এক গভীর সামাজিক সংকট—একাকিত্ব।
চারপাশে অসংখ্য মানুষ, হাতে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো পরিচিত মুখ, প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততা—সবকিছুর পরও অনেক নিউইয়র্কবাসীর জীবনে নেই এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে মন খুলে কথা বলা যায়। দিনের শেষে ঘরে ফিরে কারও অপেক্ষায় থাকার অনুভূতি নেই, দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে পাওয়া যায় না, এমনকি কখনো কখনো দিনের পর দিন অর্থপূর্ণ কথোপকথন ছাড়াই কেটে যায় সময়।
নিউইয়র্কের সামাজিক জীবনের এই বৈপরীত্য এখন নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও কমিউনিটি সংগঠকদের। তাদের মতে, একাকিত্বকে আর নিছক ব্যক্তিগত দুঃখ কিংবা সাময়িক মানসিক অবস্থা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানুষের মানসিক সুস্থতা, শারীরিক স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নগরীতে একাকিত্ব ক্রমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নীতির প্রশ্ন হয়ে উঠছে।
ব্রুকলিনের চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের তৃতীয় তলায় ছোট একটি ঘরে একা থাকেন ৬৭ বছর বয়সী জামাল উদ্দিন। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা এই মানুষটির কাছে এখন দিনের পর দিন কাটানোর সবচেয়ে বড় সঙ্গী টেলিভিশন। একসময় যে সংসার ছিল তার জীবনের কেন্দ্র, সেই সংসার এখন স্মৃতির অংশ।
নিজের জীবনের গল্প বলতে গিয়ে কিছুটা থেমে যান জামাল। তারপর ধীরে ধীরে বলেন, “একসময় সব ছিল। স্ত্রী ছিল, পরিবার ছিল। এখন কেউ নেই। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সন্তানরা আর সঙ্গে রাখতে চায়নি। তাই একাই থাকি।”
তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। সন্তান থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিনের জীবনে তাদের সান্নিধ্য নেই। ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে সময় কাটে একা। কখনো টেলিভিশন দেখেন, কখনো পুরোনো দিনের কথা মনে করেন। আর কখনো নিজের সঙ্গেই কথা বলেন।
“এখন নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলি। এখানে সবাই ব্যস্ত। কেউ কাউকে সময় দেয় না,” বলেন তিনি।
ম্যানহাটনের একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিচয় হয় ষাটোর্ধ্ব এন্ড্রুর সঙ্গে। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং কিছুটা সময় মানুষের সান্নিধ্যে কাটানোর উদ্দেশ্যেই সেখানে এসেছিলেন তিনি। আপটাউন এলাকায় বসবাসকারী এন্ড্রু জানান, স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর তার জীবন অনেকটাই বদলে গেছে।
একসময় বড় বাসায় সংসার ছিল। এখন সেই বাসা ছেড়ে ছোট একটি কক্ষে থাকতে হয় তাকে। দৈনন্দিন জীবনে তার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী একটি কুকুর।
“বড় বাসা ছেড়ে ছোট একটি রুমে চলে আসি। আমার একমাত্র সঙ্গী একটি কুকুর,” বলেন এন্ড্রু।
তবে পোষা প্রাণীর সঙ্গেও মানুষের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সম্পর্কের প্রয়োজন পুরোপুরি পূরণ হয় না বলে মনে করেন তিনি। একাকিত্ব কাটাতে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যান, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানেও স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা সহজ নয়।
“অনেক সময় ভীষণ অস্থির লাগে। তাই মানুষ খুঁজি, কোথাও যাই—শুধু কারও সঙ্গে কথা বলার জন্য,” বলেন তিনি।
একাকিত্বের সংকটকে দীর্ঘদিন ধরে প্রবীণদের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও নিউইয়র্কের বাস্তবতা বলছে, তরুণরাও এর বাইরে নয়। বরং উচ্চশিক্ষা, কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা, অভিবাসন, আর্থিক চাপ এবং ডিজিটাল যোগাযোগনির্ভর জীবন অনেক তরুণের সামাজিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলছে।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী রিফাল (ছদ্মনাম) থাকেন কুইন্সের জ্যামাইকা এলাকায়। একটি কফিশপে কথা হয় তার সঙ্গে। বাইরে থেকে একজন সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মতো মনে হলেও ভেতরে ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপের সঙ্গে লড়াই করছেন তিনি।
রিফাল জানান, পরিচিত মানুষের অভাব এবং কাছের কাউকে পাশে না পাওয়ার অনুভূতি তার দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাকে চিকিৎসকেরও শরণাপন্ন হতে হয়েছে।
“ডাক্তারের কাছেও গেছি। এখানে আমার কাছের কেউ নেই। সবাই ব্যস্ত। কেউ সময় দিতে পারে না,” বলেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের সঙ্গে খাবারে অরুচি, অতিরিক্ত উদ্বেগ ও ঘুমের সমস্যাও যুক্ত হয়েছে। শারীরিকভাবে মানুষের মধ্যে থাকলেও নিজেকে আলাদা মনে হয় তার।
“মানুষের মাঝে থেকেও নিজেকে আলাদা মনে হয়,” বলেন রিফাল।
ব্রুকলিন, কুইন্স, ব্রঙ্কস ও ম্যানহাটনের ২৫ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে একাকিত্বের নানা মাত্রা। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাম্প্রতিক অভিবাসী, দীর্ঘদিনের নিউইয়র্কবাসী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি। সাক্ষাৎকারদাতাদের মধ্যে ছিলেন এন্টনিও, সাজেদুর রহমান, শিব শঙ্কর, নাটালিয়া ও এলিসা পার্কারসহ অনেকে।
বয়স, পেশা, জাতিগত পরিচয় কিংবা পারিবারিক পরিস্থিতিতে তাদের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে মিল রয়েছে—মানুষের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে তারা নানা বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন।
সাক্ষাৎকারগুলোতে একটি প্রবণতা বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। ৪০ বছরের বেশি বয়সী কয়েকজনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে বেশি স্পষ্ট ছিল। তাদের কেউ বিবাহবিচ্ছেদের পর একা হয়ে পড়েছেন, কেউ জীবনসঙ্গীকে হারিয়েছেন, আবার কারও সন্তান দূরে চলে গেছেন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও আর্থিক চাপও অনেকের সামাজিক জীবন সংকুচিত করেছে।
কয়েকজন জানিয়েছেন, অন্য কারও সঙ্গে অর্থপূর্ণ কথোপকথন ছাড়াই তাদের একাধিক দিন কেটে যায়। কারও ক্ষেত্রে সেই সময় কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত গড়িয়েছে।
এই অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—মানুষ যখন সঙ্গ চায়, তখন সেই সঙ্গ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক পরিবেশ কি এই শহরে যথেষ্ট রয়েছে?
চারটি বরোর বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, মানুষের কাছাকাছি বসবাস করলেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় না। একই ভবনে থাকা প্রতিবেশী বছরের পর বছর পাশাপাশি বসবাস করেও একে অপরের নাম জানেন না। একই কর্মস্থলে প্রতিদিন দেখা হলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। সামাজিক অনুষ্ঠান থাকলেও সেখানে পরিচিত হওয়া মানুষদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
নিউইয়র্কের সামাজিক জীবনের এই বাস্তবতা একাকিত্বের সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
নিউইয়র্কের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে মানুষের অভাব নেই। অথচ মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের অভাব অনেকের জীবনে বড় হয়ে উঠছে। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এর পেছনে থাকা নগরজীবনের কিছু মৌলিক বৈপরীত্য।
একদিকে শহরটি কর্মসংস্থান, শিক্ষা, ব্যবসা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিপুল সুযোগ তৈরি করে। অন্যদিকে এসব সুযোগ কাজে লাগানোর প্রতিযোগিতায় মানুষকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়, ব্যয়বহুল আবাসন সামলাতে হয় এবং প্রতিদিনের জীবন পরিচালনায় বিপুল মানসিক শক্তি ব্যয় করতে হয়।
ফলে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য যে সময়, মনোযোগ ও মানসিক অবকাশ প্রয়োজন, তা অনেকের জীবন থেকেই হারিয়ে যাচ্ছে।
কমিউনিটি সংগঠন ড্রামবিটের পরিচালক কাজী ফাওজিয়া মনে করেন, আধুনিক নগরজীবনের অন্যতম বড় বৈপরীত্য হলো মানুষের শারীরিক নৈকট্য বাড়লেও সামাজিক দূরত্ব ক্রমে বেড়ে যাওয়া। তার পর্যবেক্ষণে, একই শহরে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ থাকলেও সেই সুযোগকে স্থায়ী সম্পর্কের রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধা রয়েছে।
একাকিত্বের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেল বিবেক মূর্তি সামাজিক সংযোগ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সেখানে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
প্রতিবেদনে দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিকে দিনে ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়। এই তুলনাটি ঝুঁকির গুরুত্ব বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে; এর অর্থ এই নয় যে একাকিত্ব ও ধূমপানের স্বাস্থ্যগত প্রভাব সব দিক থেকে অভিন্ন।
সামাজিক সম্পর্ক ও স্বাস্থ্যের ওপর গবেষণার জন্য পরিচিত গবেষক জুলিয়ান হোল্ট-লানস্টাডের গবেষণায়ও দেখা গেছে, সামাজিক সংযোগের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘস্থায়ী চাপ শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
নিউইয়র্ক সিটির সাবেক স্বাস্থ্য কমিশনার অ্যাশউইন ভাসানও এর আগে সতর্ক করেছেন, মানুষের মানসিক সুস্থতার সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। দীর্ঘ সময় সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকলে সব বয়স ও শ্রেণির মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়।
নিউইয়র্কের পরিচয়ের একটি বড় অংশ তার বহুসাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষ এই শহরকে গড়ে তুলেছেন। তাদের অনেকে নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে এলেও পরিচিত সামাজিক পরিবেশ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে একাকিত্বের মুখোমুখি হন।
নিজের দেশ, পরিবার, বন্ধু, ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন সমাজে মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়। বিশেষ করে যাদের পরিবার অন্য দেশে অবস্থান করছে, তাদের কাছে প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
কুইন্সের উডসাইডে বসবাসরত ভারতীয় অভিবাসী শ্রমিক শ্যাম প্যাটেল জানান, প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাজ করার পর সামাজিক যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি আর অবশিষ্ট থাকে না।
“দৈনিক ১০–১২ ঘণ্টা কাজ করি। বাসায় ফিরে কথা বলার মতো কাউকে পাওয়া যায় না, আবার শরীরের এনার্জিও থাকে না। ভিডিও কলে দেশে পরিবারের সঙ্গে সামান্য কথা হলেও তাতে হয় না। ফলে দিনে দিনে একটি শূন্যতা ঘিরে ধরে,” বলেন তিনি।
শ্যামের অভিজ্ঞতায় অভিবাসী জীবনের দুটি বাস্তবতা স্পষ্ট—জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের চাহিদা। পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে অনেক অভিবাসী দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে কাটান। কিন্তু সেই কর্মব্যস্ততার মধ্যেই পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর সুযোগ কমে যায়।
২০২৩ সালে প্রকাশিত গবেষণায় এনওয়াইইউ গ্রসম্যান স্কুল অব মেডিসিন এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন অভিবাসীদের মানসিক চাপের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পরিবার থেকে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা।
একই ধরনের ফলাফল উঠে এসেছে নিউইয়র্কভিত্তিক অভিবাসী অধিকার সংস্থা মেক দি রোড নিউইয়র্ক পরিচালিত কমিউনিটি রিপোর্টে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, নিম্ন আয়ের অভিবাসী শ্রমিকদের বড় একটি অংশ সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন না, কারণ তারা একাধিক চাকরি বা দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য হন।
২০২৪ সালে এশিয়ান আমেরিকান ফাউন্ডেশন প্রকাশিত মানসিক স্বাস্থ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিউইয়র্কে বসবাসরত এশীয় ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে একাকিত্ব ও মানসিক চাপ একটি বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, এশীয় নিউইয়র্কবাসীদের ৬০ শতাংশের বেশি সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা উদ্বেগের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। গবেষণায় বলা হয়, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, সাংস্কৃতিক সংকোচ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে সামাজিক বাধা অনেককে প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে দূরে রাখছে।
নিউইয়র্ক সিটির স্বাস্থ্য বিভাগ নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড মেন্টাল হাইজিনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জন্ম নেওয়া অনেক নিউইয়র্কবাসী পর্যাপ্ত সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন না, যা তাদের মধ্যে একাকিত্ব ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
নিউইয়র্ক সিটির উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমশ মানুষের সামাজিক জীবনকে সীমিত করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। বাড়তি বাড়িভাড়া, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং একাধিক চাকরির চাপ অনেক বাসিন্দাকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সামাজিক যোগাযোগ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অর্থনৈতিক টিকে থাকার লড়াইয়ে সামাজিক জীবন অনেকের জন্য ধীরে ধীরে দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শহুরে অঞ্চলের নিম্ন ও মধ্য আয়ের কর্মীরা জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি সময় কর্মস্থলে ব্যয় করেন। সংস্থাটির আমেরিকান টাইম ইউজ সার্ভে দেখায়, পূর্ণকালীন কর্মরত আমেরিকানরা দৈনিক গড়ে ৮ ঘণ্টারও বেশি সময় কাজে ব্যয় করেন, যার ফলে অবসর, পারিবারিক সময় এবং সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
অন্যদিকে নিউইয়র্ক সিটির হাউজিং অ্যান্ড ভ্যাকেন্সি সার্ভের তথ্য বলছে, শহরের অর্ধেকেরও বেশি ভাড়াটিয়া পরিবার তাদের মোট আয়ের ৩০ শতাংশের বেশি বাড়িভাড়ায় ব্যয় করছেন। নগর অর্থনীতিবিদরা এই পরিস্থিতিকে 'রেন্ট বার্ডেন' হিসেবে চিহ্নিত করেন। যা শুধু অর্থনৈতিক চাপই নয়, মানুষের সামাজিক অংশগ্রহণ ও মানসিক সুস্থতার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে।
কমিউনিটি সংগঠকদের ভাষায়, অনেক কর্মজীবী নিউইয়র্কবাসী এখন অবসর সময়ের চেয়ে আয় নিশ্চিত করাকেই অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে বন্ধু, পরিবার বা প্রতিবেশীভিত্তিক সম্পর্ক রক্ষা করার মতো সময় ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
সামাজিক গবেষকদের মতে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা মানুষের পারিবারিক সম্পর্ক, বন্ধুত্ব এবং কমিউনিটি সম্পৃক্ততা কমিয়ে দেয়- যা শেষ পর্যন্ত সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বের ঝুঁকি বাড়ায়।
নগর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ কতটা কার্যকর?
নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ সমস্যাটির ব্যাপকতা স্বীকার করতে শুরু করেছে। ২০২৬ অর্থবছরের নগর বাজেটে মানসিক ও আচরণগত স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রায় ২৩০ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে কমিউনিটিভিত্তিক কর্মসূচি, ভ্রাম্যমাণ সংকট মোকাবিলা দল, আচরণগত স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র এবং ৯৮৮ মানসিক স্বাস্থ্য হটলাইন পরিচালনায় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব পার্কস অ্যান্ড রিক্রিয়েশন পার্কভিত্তিক সামাজিক কার্যক্রম, প্রবীণদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ এবং সামাজিক যোগাযোগ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিউনিটি অনুষ্ঠানের পরিসর বাড়িয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যেও পার্ক, গ্রন্থাগার ও পাড়াভিত্তিক কমিউনিটি সেন্টারকে জনস্বাস্থ্যের অপরিহার্য অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা বাড়ছে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের সতর্কতা হলো, এসব উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও নিঃসঙ্গতার ঝুঁকিতে থাকা নিউইয়র্কবাসীর ৭০ শতাংশেরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ব্যবস্থার আওতার বাইরে রয়েছেন। একা বসবাসকারী প্রবীণ, নিম্ন আয়ের কর্মী এবং সদ্য আসা অভিবাসীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকলেও তাঁদেরই বিদ্যমান সেবাগুলো গ্রহণের সম্ভাবনা সবচেয়ে কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুতগতির এই শহরে নিঃসঙ্গতা মোকাবিলায় শুধু স্বাস্থ্যসেবা বাড়ালেই চলবে না। কর্মঘণ্টা, আবাসননীতি, কমিউনিটি পরিকল্পনা এবং নাগরিকদের সামাজিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে হবে।
সমন্বিত উদ্যোগ না নেওয়া হলে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই শহর সামাজিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে নিউইয়র্ক সিটি মেয়রের কার্যালয় এবং ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড মেন্টাল হাইজিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
নিউইয়র্ক সিটিতে ক্রমবর্ধমান একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। গবেষকদের মতে, একাকিত্ব এখন শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয় নয়; এটি নগর জনস্বাস্থ্য, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত একটি উদীয়মান সংকটে পরিণত হয়েছে।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেল বিবেক মূর্তি প্রকাশিত জাতীয় প্রতিবেদনে সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে দেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিবেদনে স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি সংযোগ জোরদার, সামাজিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্ক মানুষের মানসিক স্থিতিশীলতা, কর্মক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসনও বিষয়টিকে জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে বিভিন্ন কর্মসূচি সম্প্রসারণ করেছে। শহরের ২০২৬ অর্থবছরের বাজেটে মানসিক ও আচরণগত স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা বাস্তবায়ন করছে নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ এন্ড মেন্টাল হাইজিন।
এই বরাদ্দের আওতায় কমিউনিটি-ভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, মোবাইল ক্রাইসিস রেসপন্স টিম, আচরণগত স্বাস্থ্য ক্লাবহাউস এবং ৯৮৮ মানসিক স্বাস্থ্য হেল্পলাইন পরিচালিত হচ্ছে- যেগুলো একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগা বাসিন্দাদের সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
একই সঙ্গে শহরের উন্মুক্ত সামাজিক পরিবেশ শক্তিশালী করতে নিউইয়র্ক সিটির পার্ক বিভাগ, পার্কভিত্তিক সামাজিক কার্যক্রম, সিনিয়র সম্পৃক্ততা কর্মসূচি, কমিউনিটি ইভেন্ট এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন বৃদ্ধি করেছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, পার্ক, লাইব্রেরি ও স্থানীয় কমিউনিটি স্পেসগুলো এখন সামাজিক সংযোগ পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের সতর্কতা, বর্তমান উদ্যোগ সত্ত্বেও একাকিত্বের ঝুঁকিতে থাকা বিপুল সংখ্যক নিউইয়র্কবাসী এখনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার বাইরে রয়ে গেছেন। বিশেষ করে একা বসবাসকারী প্রবীণ, নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষ এবং নতুন শহুরে বাসিন্দাদের মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুতগতির নগর জীবনে একাকিত্ব মোকাবিলা করতে হলে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি কর্মঘণ্টা, আবাসন নীতি, কমিউনিটি পরিকল্পনা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধিকে একসঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে। অন্যথায় জনবহুল এই মহানগর ক্রমেই সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষের শহরে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন