https://www.prothomalony.com/

18440

north-america

উত্তর আমেরিকা

পেট চায় না তবুও মন চায়

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ ০০:৪২

‘ভাইকিং সি ওয়াল্ড ক্যাফে’র ম্যানেজার রাজেশ নায়ার আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তারকাজে ফিরে গেলেন। আমরাও রেস্টুরেন্টের ভেতরে এসে, জানালার ধারে, দুজনের একটা টেবিলেবসে পড়লাম। ওয়াল্ড ক্যাফে’তে ‘সিট ইউরসেল্ফ’ সিস্টেম।  হোস্টের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। যেখানে খুশি বসা যায়। বেশিরভাগই ২ এবং ৪ জনের টেবিল। শেয়ার করে বা বড় গ্রুপেবসার জন্য বড় কমিউনাল টেবিলও আছে। শেয়ার করে বসলে অন্যদের সাথে পরিচিত হওয়ার, গল্প করার সুযোগ থাকে।ক্লান্তি এবং ক্ষুধার রাজ্যে জীবন গদ্যময়, তাই এই মূহুর্তে নতুন কারওসাথে পরিচিত হওয়া বা গল্প করার চেয়ে খাওয়ায় মনোযোগী হতে মন চাইছে। ফুড স্টেশন ওপেনহওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে করতে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিলাম।

 

সাদা, ধূসর আর হালকা বাদামি রঙের মিশ্রণে তৈরি ওক কাঠের চেয়ার-টেবিল গুলো দেখতে খুবসাধারণ হলেও আরামদায়ক। টেবিলের ওপর কোন টেবিল ক্লথ নেই।প্রতিটি গেস্টের জন্য একটাসাদা ন্যাপকিন, কাঁটা-চামচ-ছুরি একসাথে রোল করা, প্রতিজনের জন্য পানির গ্লাস, ভরাপানির জগ আগেই রাখা আছে। আছে লবণ-মরিচের ছোট শেকার।

 

দুপুর একটা বাজতেই মাইকে ওয়েলকাম ব্রিফিং দেয়া হল। ক্যাপ্টেনের পক্ষ থেকে প্রথম পাবলিকএনাউন্সমেন্ট এলো। তিনি গমগমে কণ্ঠে ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, ওয়েলকাম অ্যাবোর্ডভাইকিং সি’ সম্ভাষণ করে নাতিদীর্ঘ বক্তব্য রাখলেন। জানালেন,  দুপুর দু’টো নাগাদ আমাদেরস্টেটরুম তৈরি হতেই আরেকটা পাবলিক এনাউন্সমেন্ট দেয়া হবে। তখন আমরা রুমে যেয়েবিশ্রাম নিতে পারবো। আপাতত ডাইনিং ওপেন করে দেয়া হচ্ছে, আমরা যেনো রিলাক্স মুডে তাদের আপ্যায়ন গ্রহণ করি। 

এনাউন্সমেন্ট শেষ হতেই গ্যালি অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট টিম তাদের ফুড স্টেশনগুলোকে ঢেকে রাখাসাদা কার্টেনগুলো  গুটিয়ে উপরে তুলে দিল। লান্চ ওপেন হওয়ামাত্রই ফুড স্টেশনগুলোরসামনে অপেক্ষারত গেস্টদের লাইন শুরু হয়ে গেলো।আমরাও উঠে গেলাম। যাওয়ার আগে অন্যকেউ যাতে আমাদের টেবিলে এসে বসে না পড়ে তাই ‘টেকেন’ সাইন হিসেবে ব্যাকপ্যাকদুটো চেয়ারের উপর দাঁড় করিয়ে রাখলাম।  ফাইভ-স্টার হোটেলের বুফের মতই এদের বুফে-স্টেশন কয়েকটা ভাগে বিভক্ত। প্লেটে খাবার নেওয়ার আগেই প্রতিটা স্টেশন ঘুরে দেখে ওদের দুপুরের খাবারের মেনু পর্যবেক্ষণ করলাম। প্রতিটা স্টেশনে লোভনীয় সব খাবার থরেথরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এর থেকে বুঝেশুনে হেলদি খাবার পছন্দ করা যেমন কঠিন কাজ, তেমনি স্বাস্থ্যসচেতনতার জন্য কম খাওয়া আরো মুশকিল। সুতরাং যা হবার হবে, আগেতো খেয়ে নেই—এমন একটা যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে খাবার সংগ্রহে মোটামুটি ঝাঁপিয়ে পড়লাম।

 

আমরা প্রথমে ঠান্ডা সেকশন থেকে শুরু করলাম। এখানে আছে চিজ আর কোল্ড কাট। হ্যাম, সালামি, স্মোকড স্যালমন। সালাদ বারে ফ্রেস সালাদের জন্য নানাধরনের সালাদ সামগ্রী, ড্রেসিং সাজানো রয়েছে। এখান থেকে যা খুশি তুলে নিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো নিজের সালাদবোল তৈরি করা যায়। এছাড়া যারা আরও সহজে, ছোট পোর্শনে নিজের জন্য সালাদ নিতে চান, তাদের জন্য ছোট ছোট বাটিতে রয়েছে রেডিমেড সালাদ। যেহেতু প্রচুর ভ্যারাইটি খাবার রয়েছে, আমি সেগুলোও যথাসম্ভব চেখে দেখতে চাই। তাই আগেই সালাদ দিয়ে পেট ভরাতে চাই না। বাবুল যদিও আমার মতো ফুডি-পার্সন না, তবুও সে আমাকে অনুসরন করতে চাইলো। আমরা কয়েক পিস চিজ এবং রেডিমেড সালাদের দুটো বাটি নিয়ে ভোজনপর্ব শুরুকরলাম।উদ্দেশ্য হল শুরুতেই কিছু রসনা উদ্রেককারী চিজ এবং ঘাসপাতা চিবিয়ে জিহ্বারজড়তা দূর করা। 

 

সালাদ-পর্ব শেষ করে এশিয়ান কর্নারে ঢূঁ মারলাম। এখানে আছে নুডলস, ফ্রাইড রাইস, স্প্রিংরোল। পিৎজা এবং কলিফ্লাওয়ার স্যুপ। ঢাকনা তুলতেই কলিফ্লাওয়ার স্যুপের রুপ-রস-গন্ধ্যআমাদের একেবারে মাতোয়ারা করে তুললো। না খেয়ে উপায় নেই গোলাম হোসেন। তাই দুইপেয়ালা কলিফ্লাওয়ার স্যুপ নিয়ে টেবিলে ফিরে এলাম। গরম ধোঁয়া ওঠা মসৃন তরল গলা দিয়েনামতেই আরামে চোখ বুজে আসতে চাইল। ফুলকপি আর মাখনের অপূর্ব স্বাদ জিহ্বায় জড়িয়েরইল বহুক্ষণ। হাতে প্রচুর সময়। তাই ঠিক করলাম, কোনো তাড়াহুড়া নয়। সময় নিয়ে, খুব করেরসিয়ে রসিয়ে খেতে হবে।

 

এরপরের গন্তব্য গরম বা কার্ভিং স্টেশন। যাকে বলে মেইন কোর্স। এখানে রয়েছে রোস্ট পর্কলয়েন, রোস্টেট বিফ, গ্রিলড ফিশ, বিনস কারি, রোস্টেড ভেজিটেবল এবং হোয়াইট রাইস। ফুডসার্ভিস অ্যাটেন্ডেন্ট জানালেন, এখানে একটা লাইভ বা একশন স্টেশনও আছে। স্পেশালকোনো অর্ডার করলে তারা সামনাসামনি ডিম বা মাছ ভেজে দিতে পারবেন। আছেমেড-টু-অর্ডার পাস্তা। রুম নম্বর জানিয়ে অর্ডার করলে ওয়েটার নির্দিষ্ট টেবিলে গিয়ে দিয়েআসবে বা কিছুক্ষণ পরে নিজে এসে পিকআপ করতে পারবো।  প্লেট হাতে লাইনে দাঁড়াতে হবেনা। প্রতিটা স্টেশনের নিচের তাকে পরিস্কার উষ্ণ প্লেট রাখা আছে। আমি এবং বাবুল প্লেটেরোস্টেট বিফ, গ্রিলড ফিশ, বিনস কারি এবং সামান্য হোয়াইট রাইস নিয়ে আমাদের লান্চের মুলকোর্স শুরু  করলাম।

 

একজন টেবিল সার্ভিস ওয়েটার এসে জুস, ওয়াইন বা বিয়ার লাগবে কিনা জানতে চাইলেন।দেখে মনে হল ইনিও রাজেশের দেশের লোক হবেন। তার বুকের উপরের নেমট্যাগের দিকে আঁড় চোখে তাকালাম। মেরি ডি'সিলভা। আমি নিজের জন্য রেড ওয়াইন চাইলাম। এবংবাবুলের জন্য নন-অ্যালকোহলিক রেড ওয়াইন পাওয়া যাবে কিনা জানতে চাইলাম।

 

মেরি  সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে জানালেন, ‘অবশ্যই পাওয়া যাবে। আপনি রেড কিংবা হোয়াইটযেকোনটা অর্ডার করতে পারেন।’

 

বাবুল রেড ওয়াইন চাইলে মেরি ওয়াইন সংগ্রহ করতে ফিরে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাতে দুটো বোতল নিয়ে ফিরেও এলেন। বোতল দুটোর লেবেলের দিকে বাবুলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন,

 

‘আমি চাই না আপনি মনে কোনো দ্বিধা নিয়ে আপনার পানীয় পান করুন। তাই বোতল সহ নিয়ে এসেছি।’ 

 

বোতলের নন-অ্যালকোহল লেখাটি দেখিয়ে এবার তা খোলার অনুমতি চাইলেন মেরি। বাবুল হ্যা বলতেই প্রথমে রেড ওয়াইনের বোতল থেকে সামান্য একটু ঢেলে বাবুলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,

 

 ‘প্লিজ, টেস্ট করে দেখুন।’

 

বাবুল রেড ওয়াইনে চুমুক দিতে শুরু করলে সে এবার হোয়াইট ওয়াইনের বোতল থেকেও সামান্য একটু ওয়াইন অন্য একটা ওয়াইন গ্লাসে ঢেলে বাবুলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,

 

‘এবার হোয়াইট ওয়াইন টেস্ট করে দেখুন। তারপর যেটা ভালো লাগবে, তাই আপনাকে পরিবেশন করবো।’

 

আমরা মেরি’র আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে ধন্যবাদ দিলাম। বাবুল হোয়াইট ওয়াইনটা বেশী পছন্দ করায় মেরি এবার তার হোয়াইট ওয়াইনের গ্লাসটা গলা অব্দি ভরে দিয়ে মিষ্টি হেসে বললো, 

‘স্যার, এনজয় ইওর ড্রিঙ্ক! জাস্ট লেট মি নো ইফ ইউ নিড এনিথিং এলস। আই'ল বি অ্যারাউন্ড।’

 

আমাকে আরও একগ্লাস ওয়াইন অফার করতেই আমি না সূচক মাথা নেড়ে তাকে আবারও ধন্যবাদ জানালাম। শেষ রাউন্ডে আমরা গেলাম ডেজার্ট সেকশনে। ইতালির সবচেয়ে বিখ্যাত ডেজার্ট হলো তিরামিসু। তিরামিসুগুলো আমাকে দেখেই লাস্যময়ী চোখের ইশারায় কাছে ডেকে নিলো।ভাবখানা হল, ‘এই-যে, আমি এখানে। আমাকে দেখো।’ আমার  ভেতরের লোভাতুর শিশুটাও যেনো খুশিতে চেচিয়ে উঠলো, ‘এইতো পেয়েছি’! তারপরেও কাকে রেখে যে কাকে দেখি। সেজেগুজে দাঁডিয়ে রয়েছেন আরও জনপ্রিয় কয়েকজন। পান্না কোটা, কানোলি,

প্যানেটোন। কী নাই সেখানে? ইতালিয়ান জেলাতো আইসক্রিমগুলো যেনো অবজ্ঞার হাসি হেসে বলছে—‘হে হে! দেখি কতক্ষণ নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারো। আমার স্বাদ না নিয়ে কোথায় যাবে, দেখিতো!’

 

তিরামিসুটাই ওয়ার্ল্ডওয়াইড সবচেয়ে বেশি চলে। এটা ইতালির বিখ্যাত জেলাতো বার, নানারকমের ডেজার্ট থরে থরে সাজানো। এছাড়াও আছে সদ্য বেক করা ব্রেড, পেস্ট্রি আর কেটে রাখাবিভিন্নরকম ফ্রুট। নিজেকে সংবরন করা খুব কঠিন। আমার মতো হালকাপাতলা মিষ্টিপ্রিয় মানুষেরই যখন এই অবস্থা তখন বাবুলের মতো ‘মিষ্টিখোর’ মানুষের রসনা সংযত করা সত্যিই ভীষণ কঠিন। তাকিয়ে দেখি, সে জুলজুল চোখে ডেজার্ট বারের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্ষুধার্ত নেকড়ের সামনে ছাগল ছেড়ে দিলে নেকড়ে যেভাবে লোলুপ চোখে তাকিয়ে থাকে, বাবুলের চোখের দৃষ্টিও তেমনি। সেও মিষ্টিগুলো চেখে দেখার পায়তারা করছে। 

 

বললাম রসো, ‘একসাথে অনেককিছু নেয়ার দরকার নেই। প্রথমত তোমাকে তোমার ডাইবেটিস এবং আমাকে আমার প্রি- ডাইবেটিসের কথা মাথায় রাখতে হবে। আমরা কয়েকটা আইটেম এক পিস করে নেবো এবং তা দুজনে শেয়ার করবো।আইসক্রীমও তাই। একটা কাপে ওয়ান স্কুপ করে কয়েকরকম আইসক্রিম নিয়ে দুজনে শেয়ার করবো।কথায় বলে না, ‘খাবো কিন্চিৎ নিজেকে না করিব বন্চিত’। 

 

বড় ছেলে সুমিত বলে দিয়েছিল, আম্মু, তোমরা নিঃসঙ্কোচে তোমাদের যা মনে চায় তাই খাবা।রুম সার্ভিস, সফট ড্রিংকস, স্পেশালিটি কফি, চা - এগুলো ২৪ ঘণ্টা ফ্রি। ওয়েটারদের জন্যটিপস এবং খাবারের মুল্য সবকিছু ইনক্লুডেট। আমরা আগেই পরিশোধ করেছি। সুতরাং নোচিন্তা, ডু ফুর্তি! ‘

 

পুত্রদের অমিয়বাণী স্মরণ করে আমরাও চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় সবধরনের খাবারপেটপুরে-মনভরে খেয়ে নিলাম।

 

যারা এতক্ষণ ঘুরেফিরে জাহাজ দেখছিল, তারা মোটামুটি সবাই  ফিরে এসেছেন। এদের সাথে সদ্য জাহাজে পা দেয়া আরও অনেক অতিথি যোগ হতে লাগলেন। ক্রমেই রেস্টুরেন্টে গেস্টের সংখ্যা বাড়ছিল।খালি টেবিল-চেয়ারগুলো সব ভরে গেলো। বহু মানুষের খন্ডবিখন্ড কথাবার্তায় পাঁচমিশালি  ভাষা এবং উচ্চরণে রেস্টুরেন্টের শান্ত পরিবেশ সরগরম হয়ে উঠল।  খাওয়া-দাওয়া শেষ হলেও এনাউন্সমেন্টের অপেক্ষায় আমরা আমাদের টেবিলেই বসে রইলাম।  যতবার ফুড স্টেশনের দিকে চোখ যায় সুদৃশ্য খাবারগুলো দেখে মন লোভাতুর হয়ে ওঠে। পেটে যায়গা নেই। তাই পেট চায় না।  তবুও মন চায়! 


বেলা দুটো বাজতেই মাইকে ক্যাপ্টেনের পক্ষ থেকে আরেকটা ঘোষণা এলো, ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, ইয়োর স্টেটরুমস আর নাউ রেডি।’

আমরা যারপর নাই আনন্দিত হয়ে যার যার রুমের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমাদের জন্য বরাদ্ধ রুমটা ছ’তলায়। রুমের সামনে যেতেই দেখি আমাদের সাদা/ লাল ক্যারিঅন দুটো দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। 
  

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন